📄 ৯. চিরস্থায়ী ধনভান্ডার
ঈমান, ইসলাম, নেক আমল, জিহাদ, তাওবা, ইস্তিগফার প্রভৃতি মহা নেয়ামতই হল এমন ধন-ভাণ্ডার, যা সব সময় তার মালিকের সঙ্গে থাকবে। এ-ই হচ্ছে চিরস্থায়ী ধন-ভাণ্ডার。
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتٰبِ وَ النَّبِيِّنَ وَإِلَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبِي وَ الْيَتَى وَ الْمَسْكِينَ وَ ابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَ فِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلوةَ وَالَّى الزكوة وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عُهَدُوا وَالصَّبِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِيْنَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ﴾
সালাতে তোমাদের মুখমণ্ডলসমূহকে পূর্বদিকে ও পশ্চিম দিকে ফিরানোতে কোনো পুণ্য নেই; বরং পুণ্য আছে কেউ আল্লাহর প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, সমস্ত কিতাবের প্রতি ও নবীদের প্রতি ঈমান আনলে এবং সম্পদের মহব্বত থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর মহব্বতে আত্মীয়-স্বজনকে, এতিমদেরকে, অভাবগ্রস্থদেরকে, মুসাফিরদেরকে, সাহায্যপ্রর্থীদেরকে ও দাসমুক্তির জন্য অর্থ-সম্পদ দান করলে এবং নামায কায়েম করলে, যাকাত আদায় করলে, ওয়াদা দিয়ে তা পূর্ণ করলে এবং অর্থ সংকটের সময়ে, দুঃখ-কষ্টের সময়ে ও যুদ্ধের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করলে। [আর যারা এ সকল নেক আমল করে] তারাই ন্যায়পরায়ণ এবং তারাই মুত্তাকী। [সূরা বাকারা : ১৭৭]
আখেরাতের সফলতা ও সৌভাগ্য দুনিয়ার সৌভাগ্য ও সফলতার সঙ্গে জড়িত। আমাদের জেনে রাখা উচিত, দুনিয়ার এ জীবন আখেরাতের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জীবন মূলত একটিই- দৃশ্য ও অদৃশ্য; দুনিয়া ও আখেরা; আজ ও কাল。
কেউ কেউ পার্থিব এ জীবনকেই সবকিছু মনে করে থাকে। তারা সম্পদ সঞ্চয় করে রাখে এবং ক্ষণস্থায়ী এ জীবনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। অথচ এ জীবন চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। অতঃপর যখন তারা মারা যায়, তখন তাদের বুকে কত শত স্বপ্ন ও সাধ অপূর্ণ থেকে যায়。
বিভিন্ন প্রয়োজনে আমরা সকাল-সন্ধ্যা আমাদের ঘর থেকে বাইরে বের হই। কিন্তু যে জীবিত থাকে তার প্রয়োজন কোনোদিন শেষ হয় না। মানুষ মারা গেলেই কেবল তার প্রয়োজন শেষ হয়। যতক্ষণ জীবিত থাকে, ততক্ষণ তার প্রয়োজনও বাকি থাকে। সকাল-সন্ধ্যার এ আসা-যাওয়া শিশুকে যুবক আর যুবককে বৃদ্ধি বানিয়ে দিচ্ছে। যখন একটি দিন চলে যায় আর রাতের আগমন ঘটে, তখন দ্বিতীয় আরেকটি নতুন ও প্রাণবন্ত দিন আগমনের অপেক্ষায় থাকে। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের জীবনপরিক্রমা。
আমি আমার নিজের উপর এবং আশপাশের মানুষের উপর আশ্চর্য হই! কত বড় বড় আশা ও দীর্ঘকালীন আকাঙ্ক্ষা আমাদের! কত স্বপ্ন দেখি আমরা! কত সাধনা আমাদের! অতঃপর একদিন আমরা এ দুনিয়া ছেড়ে এমনভাবে চলে যাই যে, আমাদের সঙ্গে না কোনো পরামর্শ করা হয়, না আমাদেরকে কোনো এখতিয়ার দেওয়া হয় আর না পূর্বে কোনো সতর্কবার্তা প্রেরণ করা হয়。
وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوتُ ﴾
কেউ জানে না সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না সে কোথায় মৃত্যুবরণ করবে। [সূরা লোকমান: ৩৪]
আমি তিনটি বিষয় আপনার সামনে তুলে ধরছি। বিষয়গুলো নিয়ে আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন-
১. আপনি কি মনে করেন আপনি আপনার প্রভুর হুকুম-আহকাম অমান্য করে, তাঁর দেওয়া বিধান ও তাকদীরের প্রতি অসন্তুষ্ট থেকে এবং আপনার যোগ্যতা, রিযিক ও প্রাপ্তি নিয়ে অসন্তুষ্ট থেকে কোথাও সুখ ও শান্তি খুঁজে পাবেন?
২. আপনি আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে যে অনুগ্রহ, কল্যাণ ও নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছেন, আপনি কি তার যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করেছেন, যার ফলে আপনি অন্যান্য অনুগ্রহ চাওয়ার যোগ্য হতে পারেন? যে ব্যক্তি অল্প কাজ করতে অক্ষম, সে আরও বেশি কাজ সম্পাদন করবে কীভাবে? যে অল্পের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে অধিকের কৃতজ্ঞতা আদায় করবে কীভাবে?
৩. আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন, কেন আমরা তা থেকে পরিপূর্ণরূপে উপকৃত হই না? কেন আমরা সেগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগিয়ে তাতে বৃদ্ধি ঘটাই না। যদি আমরা তা করতাম, তা হলে আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারাই নিজেরাও অধিক হারে কল্যাণ অর্জন করতে পারতাম এবং সমাজে ও বিরাট অবদান রাখতে পারতাম。
উৎকৃষ্ট গুণাবলি ও বড় বড় যোগ্যতা প্রায়ই আমাদের মেধা ও মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকে। কিন্তু আমাদের অনেকের মাঝেই তা মাটির নীচে লুকায়িত মূল্যবান খনিজ পদার্থের মতো। যা আমাদের দৃষ্টির আড়ালে। তারা সেগুলোকে খুঁড়ে বের করে এনে ধুয়ে-মুছে ও ঘষে-মেজে কাজে লাগাতে পারে না।
অতএব, আমাদের কাজ হল আমাদের মেধা ও যোগ্যতাকে খুঁড়ে বের করে আনা এবং যথাযথভাবে তাকে কাজে লাগানো। অতঃপর উত্তরোত্তর তার উন্নতি সাধন ও বৃদ্ধি ঘটানো।
📄 ১০. দরিদ্র ও সাধারণ মানুষদের পানাহারে শরিক হওয়া
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَ إِلَى السَّقَايَةِ فَاسْتَسْقَى فَقَالَ الْعَبَّاسُ يَا فَضْلُ اذْهَبْ إِلَى أُمِّكَ فَأْتِ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَرَابٍ مِنْ عِنْدِهَا فَقَالَ اسْقِنِي قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُمْ يَجْعَلُونَ أَيْدِيَهُمْ فِيْهِ قَالَ اسْقِنِي فَشَرِبَ مِنْه.
একবার রাসূলুল্লাহ পানি পান করার স্থানে এসে পানি চাইলেন। [এমন সময়] আব্বাস [তাঁর ছেলেকে উদ্দেশ্য করে] বললেন, ফযল! তুমি তোমার মায়ের কাছে যাও। রাসূলুল্লাহ -র জন্য তার কাছ থেকে পানি নিয়ে এসো। নবীজী বললেন, [এখান থেকেই] পান করান। আব্বাস বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকেরা এই পানিতে হাত লাগায়। রাসূলুল্লাহ বললেন, [এখান থেকেই] পান করান। অতঃপর তিনি [সেখান থেকেই] পানি পান করলেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬৩৬]
অর্থাৎ আব্বাস নবীজী -র জন্য এমন পানি আনতে চেয়েছিলেন, যাতে কারও হাত লাগেনি। কিন্তু নবীজী তা অস্বীকার করেছেন এবং সাধারণ মানুষের পানের জায়গা থেকে পানি পান করে তাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন。
আবু হুরায়রা-র সূত্রে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
لَوْ دُعِيْتُ إِلَى ذِرَاعٍ أَوْ كُرَاعٍ لَأَجَبْتُ وَلَوْ أُهْدِيَ إِلَيَّ ذِرَاعُ أَوْ كُرَاعُ لَقَبِلْتُ.
যদি আমাকে হালাল পশুর পায়া বা হাতাও খেতে আহ্বান করা হয়, তবুও আমি তা কবুল করব এবং যদি আমাকে পায়া বা হাতা হাদিয়া দেওয়া হয়, তবুও আমি তা গ্রহণ করব। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫৬৮]
অর্থাৎ আমাকে যদি এমন কোনো বস্তুও হাদিয়া দেওয়া হয়, যাতে খুব সামান্য গোশত থাকে কিংবা আদৌ কোনো গোশত না থাকে, আমি সেটাও গ্রহণ করব। ফিরিয়ে দিব না。
প্রিয় পাঠক!
এ হল বর্তমান সমাজে প্রচলিত বিলাসিতা পরিহার করা এবং বিলাসিতার সঙ্গে লড়াই করার মাধ্যমসমূহের কয়েকটি, যা এখানে উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হল। এ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং সে অনুযায়ী আমল করা আমাদের প্রত্যেকের জন্যই জরুরি। বিশেষত বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। কেননা, তারাই আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যত। তারা যদি এখন এই অবস্থা, পরিবেশ ও বিলাসিতার মাঝেই বড় হতে থাকে, তা হলে -সুনিশ্চিত জেনে রাখুন- আমাদের জন্য গভীর অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে, যদি না আল্লাহ কুদরতে আমাদের হেফাজত করেন।