📄 ৬. সাধ্য থাকা সত্ত্বেও কিছু নেয়ামত ছেড়ে দেওয়া
বিলাসীতার গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসা হচ্ছে, সাধ্য-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু নেয়ামত ছেড়ে দেওয়া; গ্রহণ না করা。
এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ تَرَكَ اللِّبَاسَ تَوَاضُعًا لِلَّهِ وَهُوَ يَقْدِرُ عَلَيْهِ دَعَاهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ مِنْ أَيِّ حُلَلِ الْإِيمَانِ شَاءَ يَلْبَسُهَا
যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর প্রতি বিনয়বশত দামি পোশাক পরা ছেড়ে দিবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাকে সকল সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং ঈমানদারদের পোশাকের মধ্য থেকে যেকোনো পোশাক পরিধান করার এখতিয়ার দিবেন। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৮১]
অপর এক হাদীসে আবু উসমান এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
كُتِبَ إِلَيْنَا عُمَرُ وَنَحْنُ بِأَذْرَبِيْجَانَ يَا عُتْبَةُ بْنَ فَرْقَدٍ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ كَدِّكَ وَلَا مِنْ كَدِّ أَبِيْكَ وَلَا مِنْ كَدِّ أُمِّكَ فَأَشْبِعِ الْمُسْلِمِيْنَ فِي رِحَالِهِمْ مِّمَّا تُشْبِعُ مِنْهُ فِي رِحْلِكَ وَإِيَّاكُمْ وَالتَّنَعُّمَ وَزِيَّ أَهْلِ الشِّرْكِ وَلَبُوْسَ الْحَرِيْرِ فَإِنَّ رَسُوْلَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ لُّبُوْسِ الْحَرِيْرِ.
আমরা আজারবাইজান-এ ছিলাম। এ সময় উমর আমাদের [দলপতি] কাছে চিঠি লিখলেন, হে উতবা ইবনে ফারকাদ! এ ধন-সম্পদ তোমার কষ্টার্জিত নয়, তোমার বাবা-মায়েরও নয়। কষ্টার্জিত নয়। তাই তুমি যেমন নিজ বাড়িতে পেটপুরে ভক্ষণ কর, তেমনিভাবে মুসলিমদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তাদেরও পেটপুরে ভক্ষণ করাও। আর সাবধান! বিলাসিতা, মুশরিকদের বেশভূষা এবং রেশমি কাপড় পরিধান করা থেকে বিরত থাকবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ রেশমি কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৬৯]
উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন-
ذَرُوا التَّنَعُمَ وَزِيَّ الْعَجَمِ.
তোমরা বিলাসিতা ও অনারবদের বেশ-ভূষা পরিহার কর। [মুসনাদে আহমাদ: ১/৩৯৪]
অপর এক হাদীসে আবু উমামা-র সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يَا ابْنَ آدَمَ ! إِنَّكَ أَنْ تَبْذُلَ الْفَضْلَ خَيْرٌ لَكَ وَأَنْ تُمْسِكَهُ شَرُّ لَكَ وَلَا تُلَامُ عَلَى كَفَافٍ وَابْدَأُ بِمَنْ تَعُولُ وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلَى.
হে আদম সন্তান! তোমার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে মালামাল রয়েছে, তা খরচ করতে থাক; এটা তোমার জন্য উত্তম। আর যদি তুমি তা খরচ [দান] না করে কুক্ষিগত করে রাখ, তা হলে এটা তোমার জন্য অকল্যাণকর। তবে প্রয়োজন পরিমাণ রাখায় [কোনো দোষ নেই এবং সে জন্য] তোমাকে ভর্ৎসনা করা হবে না। যাদের প্রতিপালনের দায়িত্ব তোমার উপর রয়েছে, তাদের দিয়েই খরচ শুরু করবে। আর [জেনে রেখো!] উপরের হাত নীচের হাতের চেয়ে উত্তম। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৩৬]
📄 ৭. পরোপকার করুন
একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّ اللَّهَ يَقُوْلُ لِعَبْدِهِ وَهُوَ يُحَاسِبُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : يَا ابْنَ آدَمَ جُعْتُ وَلَمْ تُطْعِمْنِي . قَالَ : كَيْفَ أُطْعِمُكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ ؟! قَالَ : أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَبْدِي فُلَانَ ابْنَ فُلَانٍ جَاعَ فَمَا أَطْعَمْتَهُ ، أَمَا إِنَّكَ لَوْ أَطْعَمْتَهُ وَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِي . يَا ابْنَ آدَمَ! ظَمِئْتُ فَلَمْ تُسْقِنِي . قَالَ : كَيْفَ أُسْقِيكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ قَالَ : أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَبْدِي فُلَانَ ابْنَ فُلَانٍ ظَمِئَ فَمَا أَسْقَيْتَهُ ، أَمَا إِنَّكَ لَوْ أَسْقَيْتَهُ وَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِي . يَا ابْنَ آدَمَ! مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِي . قَالَ : كَيْفَ أَعُوْدُكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ ؟! قَالَ : أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَبْدِي فُلَانَ ابْنَ فُلَانٍ مَرِضَ فَمَا عُدْتَهُ، أَمَا إِنَّكَ لَوْ عُدْتَهُ وَجَدْتَنِي عِنْدَهُ.
কেয়ামতের দিন আল্লাহ বান্দার হিসাব গ্রহণের সময় বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে খাওয়াওনি। বান্দা বলবে, হে আল্লাহ! আমি আপনাকে কীভাবে খাওয়াব, অথচ আপনি হলেন সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক? আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না আমার অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত ছিল? তুমি তাকে খাওয়াওনি। তুমি যদি তাকে খাওয়াতে, তা হলে তা আমার নিকট পেতে। হে আদম সন্তান! আমি পিপাসার্ত ছিলাম কিন্তু আমাকে পান করাওনি। বান্দা বলবে, হে আল্লাহ! আপনি হলে সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক, আমি আপনাকে কীভাবে পান করাব? আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না আমার অমুক বান্দা পিপাসার্ত ছিল? তুমি যদি তাকে পান করাতে তা হলে তা আমার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করনি। বান্দা বলবে, হে আল্লাহ! আমি আপনার শুশ্রূষা করব কীভাবে, অথচ আপনি হলেন সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক? আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি যদি তার শুশ্রূষা করতে, তা হলে তুমি আমাকে তার কাছে পেতে。
এখানে হাদীসের তৃতীয় অংশে এসে আল্লাহ বলেছেন, 'তা হলে তুমি আমাকে তার কাছে পেতে।' অথচ পূর্বের দুই স্থানে বলেছেন, 'তা হলে তা [অর্থাৎ তার প্রতিদান] আমার কাছে পেতে।' পার্থক্যের কারণ হল, অসুস্থ ব্যক্তিদের মন ভাঙ্গা থাকে। আর ভগ্নহৃদয় মানুষের সঙ্গে আল্লাহ থাকেন। [সহিহ মুসলিম: ৬৭২১]
যেমন অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
فِي كُلِّ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرُ.
প্রতিটি তাজা কলিজাতেই সাওয়াব আছে। [সহিহ বুখারি : ২৩৬৩]
অর্থাৎ জীবিত যে কোনো সৃষ্টি বা জীবের সেবাতেই প্রতিদান আছে。
একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
مَنْ كَانَ لَهُ فَضْلُ زَادٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا زَادَ لَهُ ، وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلُ ظَهْرٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لَا ظَهْرَ لَهُ.
যার কাছে অতিরিক্ত পাথেয় আছে, সে যেন তা থেকে ওই ব্যক্তিকে কিছু দেয় যার কিছুই নেই। যার কাছে অতিরিক্ত বাহন আছে, সে যেন তা থেকে ওই ব্যক্তিকে দেয়, যার কোনো বাহন নেই। [সহিহ মুসলিম : ৪৬১৪]
আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ
তারা অন্যদেরকে নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়, যদিও তারা নিজেরাই অভাবগ্রস্ত। [সূরা হাশর : ৯]
📄 ৮. দান-সদকা
যে সকল বিষয় শান্তি বয়ে আনে এবং দুশ্চিন্তা-পেরেশানী ও দুঃখ- দুর্দশা দূরে করে, তার মধ্যে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা ও দান- সদকা করা অন্যতম。
أَنْفِقُوا مِمَّا رَزَقْتُكُمْ
আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছি, তা থেকে ব্যয় কর। [সূরা বাকারা : ২৫৪]
وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقُتِ
যেসব নারী-পুরুষ দান করে। [সূরা আহযাব: ৩৫]
وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَتَثْبِيتًا مِّنْ أَنْفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبُوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَأَتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِنْ لَّمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلٌ
যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজেদের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে, তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের ন্যায়, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়, অতঃপর তা দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি প্রবল বৃষ্টিপাত না- ও হয়, তবে হাল্কা বর্ষণই যথেষ্ট। [সূরা বাকারা: ২৬৫]
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ
তুমি একেবারে ব্যয়-কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। [সূরা বনী ইসরাঈল: ২৯]
কৃপণ লোকের অবস্থা খুবই শোচনীয়। তারা সর্বদাই অশান্তিবোধ করে। তারা এতটাই সংকীর্ণমনা হয়ে থাকে যে, আল্লাহ তাদেরকে যে নেয়ামত দান করেছেন, তাতেও তারা কৃপণতা করে। আল্লাহ -র রহমতের ভাগ নিতেও তারা ব্যয়কুণ্ঠ। তারা যদি জানতে পরত যে, মানুষকে দান করা কত ফযীলত ও সৌভাগ্যের বিষয়, তা হলে খুব দ্রুতই তারা তাতে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিত。
إِنْ تُقْرِضُوا اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا يُضْعِفُهُ لَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ
যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে তিনি তোমাদের জন্য তা দ্বিগুণ করে দিবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। [সূরা তাগাবুন : ১৭]
وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। [সূরা হাশর: ৯]
وَمِمَّا رَزَقُنُهُمْ يُنْفِقُونَ
আর আমি তাদেরকে যে রুজি দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে। [সূরা বাকারা: ৩]
এক কবি বলেছেন-
'আল্লাহ যা কিছু দান করেছেন, তা থেকে খরচ কর। ধন-সম্পদ ধার দেওয়া বস্তু। তোমার জীবন একদিন শেষ হয়ে যাবে। ধন-সম্পদ পানির মতো। যদি তার গতিপথ রোধ করে দাও, তা হলে পানি নষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি তাকে তার আপন গতি চলতে দাও, তা হলে তা নির্মল ও সুচ্ছ থাকবে।'
বিখ্যাত দানবীর হাতেম তাঈ তার স্ত্রীকে প্রতিদিন বলতেন-
'মেহমানদের মেহমানদারীর জন্য অপেক্ষা কর। অপেক্ষা করে দেখ কোনো ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত মুসাফির আসে কি না।'
তিনি আরও বলতেন-
'যখন তুমি খাবার প্রস্তুত কর, তখন একজন মেহমানও খুঁজে এনো। কেননা, আমি তা একাকী খাব না।'
নীচের কবিতায় তিনি তার দর্শন ব্যক্ত করেছেন এভাবে-
'আমাকে এমন একজন দানশীল ব্যক্তি দেখাও, যিনি [দান করে অভাবে পড়ে না খেয়ে] সময়ের সময়ের আগেই মারা গেছে। অথবা এমন একজন কৃপণ লোক দেখাও, যে [দান না করে, বরং ধন-সম্পদ জমা করে] চিরজীবী হয়েছে। তা হলে আমার অন্তর শান্তি পাবে।'
📄 ৯. চিরস্থায়ী ধনভান্ডার
ঈমান, ইসলাম, নেক আমল, জিহাদ, তাওবা, ইস্তিগফার প্রভৃতি মহা নেয়ামতই হল এমন ধন-ভাণ্ডার, যা সব সময় তার মালিকের সঙ্গে থাকবে। এ-ই হচ্ছে চিরস্থায়ী ধন-ভাণ্ডার。
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتٰبِ وَ النَّبِيِّنَ وَإِلَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبِي وَ الْيَتَى وَ الْمَسْكِينَ وَ ابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَ فِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلوةَ وَالَّى الزكوة وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عُهَدُوا وَالصَّبِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِيْنَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ﴾
সালাতে তোমাদের মুখমণ্ডলসমূহকে পূর্বদিকে ও পশ্চিম দিকে ফিরানোতে কোনো পুণ্য নেই; বরং পুণ্য আছে কেউ আল্লাহর প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, সমস্ত কিতাবের প্রতি ও নবীদের প্রতি ঈমান আনলে এবং সম্পদের মহব্বত থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর মহব্বতে আত্মীয়-স্বজনকে, এতিমদেরকে, অভাবগ্রস্থদেরকে, মুসাফিরদেরকে, সাহায্যপ্রর্থীদেরকে ও দাসমুক্তির জন্য অর্থ-সম্পদ দান করলে এবং নামায কায়েম করলে, যাকাত আদায় করলে, ওয়াদা দিয়ে তা পূর্ণ করলে এবং অর্থ সংকটের সময়ে, দুঃখ-কষ্টের সময়ে ও যুদ্ধের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করলে। [আর যারা এ সকল নেক আমল করে] তারাই ন্যায়পরায়ণ এবং তারাই মুত্তাকী। [সূরা বাকারা : ১৭৭]
আখেরাতের সফলতা ও সৌভাগ্য দুনিয়ার সৌভাগ্য ও সফলতার সঙ্গে জড়িত। আমাদের জেনে রাখা উচিত, দুনিয়ার এ জীবন আখেরাতের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জীবন মূলত একটিই- দৃশ্য ও অদৃশ্য; দুনিয়া ও আখেরা; আজ ও কাল。
কেউ কেউ পার্থিব এ জীবনকেই সবকিছু মনে করে থাকে। তারা সম্পদ সঞ্চয় করে রাখে এবং ক্ষণস্থায়ী এ জীবনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। অথচ এ জীবন চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী। অতঃপর যখন তারা মারা যায়, তখন তাদের বুকে কত শত স্বপ্ন ও সাধ অপূর্ণ থেকে যায়。
বিভিন্ন প্রয়োজনে আমরা সকাল-সন্ধ্যা আমাদের ঘর থেকে বাইরে বের হই। কিন্তু যে জীবিত থাকে তার প্রয়োজন কোনোদিন শেষ হয় না। মানুষ মারা গেলেই কেবল তার প্রয়োজন শেষ হয়। যতক্ষণ জীবিত থাকে, ততক্ষণ তার প্রয়োজনও বাকি থাকে। সকাল-সন্ধ্যার এ আসা-যাওয়া শিশুকে যুবক আর যুবককে বৃদ্ধি বানিয়ে দিচ্ছে। যখন একটি দিন চলে যায় আর রাতের আগমন ঘটে, তখন দ্বিতীয় আরেকটি নতুন ও প্রাণবন্ত দিন আগমনের অপেক্ষায় থাকে। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের জীবনপরিক্রমা。
আমি আমার নিজের উপর এবং আশপাশের মানুষের উপর আশ্চর্য হই! কত বড় বড় আশা ও দীর্ঘকালীন আকাঙ্ক্ষা আমাদের! কত স্বপ্ন দেখি আমরা! কত সাধনা আমাদের! অতঃপর একদিন আমরা এ দুনিয়া ছেড়ে এমনভাবে চলে যাই যে, আমাদের সঙ্গে না কোনো পরামর্শ করা হয়, না আমাদেরকে কোনো এখতিয়ার দেওয়া হয় আর না পূর্বে কোনো সতর্কবার্তা প্রেরণ করা হয়。
وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوتُ ﴾
কেউ জানে না সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না সে কোথায় মৃত্যুবরণ করবে। [সূরা লোকমান: ৩৪]
আমি তিনটি বিষয় আপনার সামনে তুলে ধরছি। বিষয়গুলো নিয়ে আপনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করুন-
১. আপনি কি মনে করেন আপনি আপনার প্রভুর হুকুম-আহকাম অমান্য করে, তাঁর দেওয়া বিধান ও তাকদীরের প্রতি অসন্তুষ্ট থেকে এবং আপনার যোগ্যতা, রিযিক ও প্রাপ্তি নিয়ে অসন্তুষ্ট থেকে কোথাও সুখ ও শান্তি খুঁজে পাবেন?
২. আপনি আপনার প্রভুর পক্ষ থেকে যে অনুগ্রহ, কল্যাণ ও নেয়ামত প্রাপ্ত হয়েছেন, আপনি কি তার যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করেছেন, যার ফলে আপনি অন্যান্য অনুগ্রহ চাওয়ার যোগ্য হতে পারেন? যে ব্যক্তি অল্প কাজ করতে অক্ষম, সে আরও বেশি কাজ সম্পাদন করবে কীভাবে? যে অল্পের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে অধিকের কৃতজ্ঞতা আদায় করবে কীভাবে?
৩. আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন, কেন আমরা তা থেকে পরিপূর্ণরূপে উপকৃত হই না? কেন আমরা সেগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগিয়ে তাতে বৃদ্ধি ঘটাই না। যদি আমরা তা করতাম, তা হলে আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারাই নিজেরাও অধিক হারে কল্যাণ অর্জন করতে পারতাম এবং সমাজে ও বিরাট অবদান রাখতে পারতাম。
উৎকৃষ্ট গুণাবলি ও বড় বড় যোগ্যতা প্রায়ই আমাদের মেধা ও মস্তিষ্কে সুপ্ত থাকে। কিন্তু আমাদের অনেকের মাঝেই তা মাটির নীচে লুকায়িত মূল্যবান খনিজ পদার্থের মতো। যা আমাদের দৃষ্টির আড়ালে। তারা সেগুলোকে খুঁড়ে বের করে এনে ধুয়ে-মুছে ও ঘষে-মেজে কাজে লাগাতে পারে না।
অতএব, আমাদের কাজ হল আমাদের মেধা ও যোগ্যতাকে খুঁড়ে বের করে আনা এবং যথাযথভাবে তাকে কাজে লাগানো। অতঃপর উত্তরোত্তর তার উন্নতি সাধন ও বৃদ্ধি ঘটানো।