📄 ২. দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও ভোগ্যসামগ্রী কম রাখা
দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি এবং আরাম-আয়েশ ও ভোগ্যসামগ্রী কম রাখা বিলাসিতা থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর একটি মাধ্যম। মানুষের উচিত, সবসময় আল্লাহ-র দরবারে নিজের জন্য এবং পরিবার-পরিজনের জন্য দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও দুনিয়াবিমুখতার জন্য দোয়া করা। যেমন, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দোয়া করতেন- اللَّهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ قُوتًا.
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনের রিযিক প্রয়োজন পরিমাণ রাখুন। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৫৫]
অর্থাৎ আপনি তাদের এই পরিমাণ রিযিকের ব্যবস্থা করুন, যেন তাদের কারও কাছে হাত পাততে না হয়; হাত পাতার লাঞ্ছনার শিকার হতে না হয়। আবার এই পরিমাণ প্রাচুর্যও যেন না হয়, যা তাদেরকে পার্থিব জীবনে বিলাসিতায় উদ্বুদ্ধ করবে。
আমাদের কেউ যদি দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা নিয়ে একটু গভীরভাবে ভেবে দেখে, তা হলে সে অবশ্যই এই দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় কিছুকে অত্যন্ত নগণ্য ও তুচ্ছ পাবে; যার জন্য এত কষ্ট করা এবং যার পিছনে ছুটে চলার কোনো অর্থ হয় না। যেমন, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুমার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِالسُّوْقِ دَاخِلاً مِنْ بَعْضِ الْعَالِيَةِ وَالنَّاسُ كَنَفَتَهُ فَمَرَّ بِجَدْيِ أَسَكَ مَيِّتٍ فَتَنَاوَلَهُ فَأَخَذَ بِأُذُنِهِ ثُمَّ قَالَ أَيُّكُمْ يُحِبُّ أَنَّ هَذَا لَهُ بِدِرْهَم ؟ فَقَالُوا مَا نُحِبُّ أَنَّهُ لَنَا بِشَيْءٍ وَمَا نَصْنَعُ بِهِ : قَالَ أَتُحِبُّونَ أَنَّهُ لَكُمْ ؟ قَالُوا وَاللهِ لَوْ كَانَ حَيًّا كَانَ عَيْبًا فِيهِ لَأَنَّهُ أَسَكُ فَكَيْفَ وَهُوَ مَيِّتُ : فَقَالَ فَوَاللهِ لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ هَذَا عَلَيْكُمْ.
একদিন রাসূলুল্লাহ 'আলিয়া' অঞ্চল থেকে মদীনায় আসার পথে বাজার দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ-র উভয় পাশে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ক্ষুদ্র কান বিশিষ্ট একটি মৃত বকরির বাচ্চার কাছে পৌঁছলেন। অতঃপর তিনি তার কান ধরে বললেন, তোমাদের কেউ কি এক দিরহাম দিয়ে এটা কিনতে আগ্রহী? তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, কোনো কিছুরই বিনিময়ে এটা আমরা নিতে আগ্রহী নই; আর এটা নিয়ে আমরা কী করব?! তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, [বিনা পয়সায়] তোমরা কি তা নিতে আগ্রহী? তারা বললেন, এ যদি জীবিত হত তবুও তো এটা দোষী। কেননা, এর কানগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। আর এখন তো এটা মৃত! আমরা কীভাবে এটা গ্রহণ করব?
তখন নবীজী ইরশাদ করলেন, আল্লাহর কসম! এটা তোমাদের কাছে যতটা নগণ্য, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়ে আরও বেশি নগণ্য। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৫৭]
সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন-
لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوْضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً ماء.
আল্লাহর নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানও হত, তা হলে তিনি কোনো কাফেরকে এখানকার পানির একটি ঢোকও পান করাতেন না। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩২০]
এ দুনিয়ার কোনো নেয়ামত এ পর্যায়ের নয়, যা পেলে আনন্দিত হওয়া যায় কিংবা হাতছাড়া হয়ে গেলে পেরেশান হতে হয়。
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- যে ব্যক্তির কাছে এক হাজার দিনার আছে, সে কি 'যাহেদ' [দুনিয়াবিমুখ ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত] হতে পারে? তিনি জওয়াব দিয়েছিলেন- হাঁ, যদি সেই পরিমাণে বৃদ্ধি ঘটলে আনন্দিত না হয় এবং হ্রাস পেলে দুঃখিতও না হয়। [মাদারিজুস সালিকীন: ১/৪৬৫, ফয়যুল কদীর : ৪/৭২]
মিহসান আল-আনসারী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوْتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا.
তোমাদের মধ্যে যে লোক পরিবার-পরিজনসহ সকালে উপনীত হয়, শরীর সুস্থ থাকে এবং তার কাছে এক দিনের খোরাক থাকে, তা হলে যেন তার জন্য গোটা দুনিয়াটাই একত্র করা হল। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৪৬]
অতএব, মানুষের উচিত, দুনিয়া ও দুনিয়ার উপার্জনকে মানসিক প্রশস্ততা ও উদারতার সাথে গ্রহণ করা। একদিকে যেমন সম্পদ উপার্জন করবে, অন্যদিকে এ সম্পদ একজনকে হাদিয়া দিবে, আরেকজনকে সাহায্য করবে, অপরজনকে দান করবে। এভাবে কেমন যেন মানুষের সম্পদই তার কাছে গচ্ছিত রয়েছে।
📄 ৩. নিজের চেয়ে ধনীদের দিকে না তাকানো
দুনিয়ার জীবনে পার্থিব ধন-সম্পদ ও নেয়ামতের বিচারে যারা নিজের চেয়ে বড় ও ধনী, তাদের দিকে না তাকানো; তাদের মতো হতে না চাওয়া। বরং যারা নিজের চেয়ে নিম্ন মানের, তাদের দেখা, তাদের দিকে তাকানো। তা হলে নিজের উপর আল্লাহ -র কী কী নেয়ামত ও অনুগ্রহ রয়েছে, তা উপলব্ধি করা যাবে।
📄 ৪. আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কামনা-বাসনাররাস টেনে ধরা
আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبَيَّ فَقَالَ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يَقُوْلُ إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرُ الصَّبَاحَ وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرُ الْمَسَاءَ وَخُذْ مِنْ صِحَّتِكَ لِمَرَضِكَ وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ.
রাসূলুল্লাহ আমার উভয় কাঁধ ধরে বললেন, তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন কোনো ভিনদেশী মুসাফির কিংবা একজন পথিক। আর ইবনে উমর বলতেন, তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে ভোরের অপেক্ষা করো না আর ভোরে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতার সময় তোমার অসুস্থ অবস্থার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো, আর তোমার জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪১৬]
📄 ৫. দুনিয়াবিমুখ মনীষীদের জীবনী পড়া
যে কেউ-ই নবীজী -র জীবনীতে দৃষ্টি দিবে, সে-ই সেখানে এমনসব সাদাসিধে, অনাড়ম্বরপূর্ণ ও দুনিয়াবিমুখ জীবন-যাপনের চিত্র দেখতে পাবে, যার কোনো নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই。
আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
لَمْ يَأْكُلُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى خِوَانٍ حَتَّى مَاتَ وَمَا أَكَلَ خُبْرًا مُرَقَّقًا حَتَّى مَاتَ.
রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল পর্যন্ত কখনও টেবিলের উপর আহার করেননি এবং ইন্তেকাল পর্যন্ত কখনও পাতলা রুটি খেতে পাননি। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫০]
অপর এক হাদীসে আবু হাযেম এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
سَأَلْتُ سَهْلَ بْنَ سَعْدٍ فَقُلْتُ هَلْ أَكَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّقِيَّ فَقَالَ سَهْلُ مَا رَأَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّMَ النَّقِيَّ مِنْ حِيْنَ ابْتَعَثَهُ اللهُ حَتَّى قَبَضَهُ اللهُ . قَالَ فَقُلْتُ هَلْ كَانَتْ لَكُمْ فِي عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنَاخِلُ ؟ قَالَ مَا رَأَى رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْخُلًا مِنْ حِيْنَ ابْتَعَثَهُ اللَّهُ حَتَّى قَبَضَهُ اللَّهُ . قَالَ قُلْتُ كَيْفَ كُنْتُمْ تَأْكُلُونَ الشَّعِيْرَ غَيْرَ مَنْخُولٍ ؟ قَالَ كُنَّا نَطْحَنُهُ وَنَنْفُخُهُ فَيَطِيرُ مَا طَارَ وَمَا بَقِيَ ثَرَّيْنَاهُ فَأَكَلْنَاهُ.
আমি সাহল ইবনে সা'দ-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ কি ময়দা খেয়েছেন? সাহল বললেন, আল্লাহ যখন থেকে রাসূলুল্লাহ-কে পাঠিয়েছেন, তখন থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত কোনোদিন তিনি ময়দা দেখেননি। তিনি [বর্ণনাকারী আবু হাযেম] বলেন, আমি আবার তাঁকে [সাহল ইবনে সা'দ -কে] জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ-র যুগে কি আপনাদের চালুনি ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহ যখন থেকে রাসূলুল্লাহ-কে পাঠিয়েছেন, তখন থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত কোনোদিন তিনি চালুনিও দেখেননি। তিনি [আবু হাযেম] বলেন, আমি বললাম, তা হলে আপনারা না চেলে যবের আটা খেতেন কীভাবে? তিনি বললেন, আমরা যব পিষে তাতে ফুঁ দিতাম। এতে যা উড়ে যাবার তা উড়ে যেত আর যা বাকি থাকত, তা মুখে নিতম; অতঃপর খেতাম। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৪১৩]
আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ قَدِمَ الْمَدِينَةَ مِنْ طَعَامِ بُرِّ ثَلَاثَ لَيَالٍ تِبَاعًا حَتَّى قُبِضَ.
মুহাম্মাদ-র পরিবারবর্গ মদীনায় আসার পর থেকে এক নাগাড়ে তিন দিন গমের রুটি পরিতৃপ্ত হয়ে খাননি এবং এ অবস্থায়ই তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৪]
আয়েশা থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে তিনি বলেন-
كَانَ فِرَاشُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَدَمٍ وَحَشْوُهُ مِنْ لِيفٍ.
রাসূলুল্লাহ -এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি এবং তার ভেতরে ছিল খেজুরের ছাল। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৬]
কাতাদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كُنَّا نَأْتِي أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ وَخَبَّاؤُهُ قَائِمٌ وَقَالَ كُلُوا فَمَا أَعْلَمُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَغِيْفًا مُرَقَّقًا حَتَّى لَحِقَ بِاللَّهِ وَلَا رَأَى شَاةً سَمِيعًا بِعَيْنِهِ قَطُّ.
আমরা এমন অবস্থায় আনাস ইবনে মালেক -এর কাছে গেলাম যে, তাঁর পাচক [মেহমানদারির জন্য] দাঁড়ানো ছিল। আনাস বললেন, আপনারা খান। আমি জানি না, নবীজী ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত পাতলা রুটি দেখেছেন কি না। আর তিনি কখনও ভুনা বকরির গোশত দেখেননি। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৭]
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবু বুরদা বলেন-
أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ كِسَاءً وَإِزَارًا غَلِيْظًا فَقَالَتْ قُبِضَ رُوْحُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي هَذَيْنِ.
আয়েশা একবার একটি কম্বল ও মোটা ইযার নিয়ে আমাদের কাছে এলেন এবং বললেন, এ দু'টি পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ -এর রূহ কবজ করা হয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৮১৮]
আসুন পিছনে ফিরে গিয়ে দেখি নবী কারীম -এর এক মহান সাহাবী কীভাবে জীবন যাপন করতেন। তিনি নবীজী -এর কলিজার টুকরা হযরত ফাতেমা-কে বিয়ে করেছিলেন। একদিন ভোরে উভয়েই ঘুম থেকে ওঠে ঘরে খাবার তালাশ করলেন। কিন্তু সারা ঘর খুঁজেও খাওয়ার মতো কিছু পেলেন না。
সময়টি ছিল শীতকাল। চারদিকে কনকনে শীত। আলী একটি গরম কাপড় পরিধান করে বেরিয়ে পড়লেন। বিভিন্ন স্থানে রিযিক অনুসন্ধান করলেন। হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল মদীনার পাশে এক ইহুদী বাস করে, যার একটি বাগান আছে। আলী সেদিকেই গেলেন। বাগানে যেতেই ইহুদী তাকে দেখে বলল, ওহে! এসো। কুয়া থেকে পানি তুলে দাও। প্রতি বালতি পানির বিনিময়ে আমি তোমাকে একটি করে খেজুর দিব। আলী সম্মত হলেন। বিরাট এক বালতি দিয়ে কুয়া থেকে পানি তুলতে শুরু করলেন। বহুক্ষণ পর্যন্ত এ কাজ করলেন। যতক্ষণ না তাঁর হাত ও সারা শরীরে ব্যথা অনুভব হতে লাগল, ততক্ষণ তিনি এই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে গেলেন। বিনিময়ে তিনি যে ক'টি খেজুর পেলেন, তা নিয়ে সোজা চলে গেলেন নবীজী ﷺ-র দরবারে। তা থেকে কিছু নবীজীকে দিলেন। যে ক'টি বেঁচে ছিল তা নিয়ে বাড়ি রওয়ানা হলেন। তিনি ও ফাতেমা রাঃ তা দিয়ে সারা দিন পার করলেন。
এ ছিল তাঁদের জীবন! তারপরও তাঁদের অনুভূতি ছিল এই যে, তাঁদের ঘরবাড়ি আলো ও সুখ-শান্তিতে ভরপুর ছিল। কারণ, নবী কারীম ﷺ-র উপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে তাঁদের অন্তর ছিল পরিপূর্ণ। অন্তরের আধ্যাত্মিক আলোতে তাঁরা সত্যকে উপলব্ধি করে তা গ্রহণ করেছেন এবং একই সাথে মিথ্যাকে চিনে তা বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা সত্যের পথে অটল ছিলেন। আর মিথ্যা থেকে ছিলেন বহু বহু দূরে。
কারুন ও হামান এ সুখ কোথায় পাবে? একজনকে তো জমিনে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে, আরেকজনকে চির অভিশপ্ত করা হয়েছে! ۞ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا এর উপমা বৃষ্টি, যা দ্বারা উৎপন্ন শস্য-সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে। অতঃপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তাকে পীতবর্ণের দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটায় পরিণত হয়। [সূরা হাদীদ : ২০]
সাহাবায়ে কেরام ও তাবেয়ীনে ইযামও সাদাসিধে জীবন যাপন করেছেন। তাঁরাও দুনিয়াবিমুখতা ও বিলাসী উপকরণ পরিহার করার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন。
আপনি মুসআব ইবনে উমাইর রাঃ-র কথাই ধরুন না। যাঁকে দিয়ে কুরাইশরা বিলাসিতার উপমা দিত। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ-সুগন্ধি ও চালচলনে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। এক সময় [ইসলাম গ্রহণ করে] বিলাসিতার জীবন ছেড়ে দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিদের কাতারে এসে শামিল হলেন। [শুধু বিলাসিতা ছাড়েনইনি, বরং শেষ জীবনে তাঁর অবস্থা হয়েছিল এমন] তিনি মারা যাওয়ার পর কাফন পরানোর মতো কাপড়ও তাঁর ছিল না। ছিল শুধু একটি চাদর। যা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, পা ঢাকলে মাথা উন্মুক্ত হয়ে যেত। [আছ-ছিকাত লি ইবনি হিব্বান: ১/২৩৪]
উমর ইবনে আবদুল আযীয। বিলাসিতার জীবন ছেড়ে সাদাসিধে জীবন গ্রহণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত。
হাজ্জাজ আস-সাওয়াফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার উমর ইবনে আবদুল আযীয আমাকে তাঁর জন্য কিছু কাপড় কিনে আনতে বললেন। তিনি তখন মদীনার শাসক। আমি তাঁর জন্য কয়েকটি কাপড় কিনে আনলাম। সেগুলোর মধ্যে একটি কাপড়ের মূল্য ছিল চার শ' দিরহাম। কাপড়টি কেটে তাঁর জন্য জামা বানানো হলে তিনি তাতে হাত দিয়ে বললেন- কত মোটা ও খসখসে কাপড় এটা!
এরপর। যখন তিনি খলীফাতুল মুসলিমীন। আবার তার জন্য কিছু কাপড় কিনে আনার জন্য বললেন। লোকেরা মাত্র চৌদ্দ দিরহাম দিয়ে একটি কাপড় কিনে আনল। সেই কাপড়ে হাত দিয়ে তিনি বললেন- সুবহানাল্লাহ! কত কোমল ও মিহি কাপড় এটি! [আত-তবকাতুল কুবরা লি ইবনি সা'দ : ৫/৩৩৪]
উমর ইবনে আবদুল আযীয এর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে আবদুল আযীয একদিন তার পিতার কাছে এসে পোশাক চাইল। তখন তিনি খলীফাতুল মুসলিমীন। ছেলে বলল, পিতা! আমার পোশাকের প্রয়োজন。
উমর ইবনে আবদুল আযীয বললেন, তুমি খিয়ার ইবনে রিয়াহ আল-বসরীর কাছে যাও। তার কাছে আমার কিছু কাপড় আছে। সেখান থেকে যেটা তোমার পছন্দ নিয়ে নিয়ো।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সে খিয়ার ইবনে রিয়াহ এর কাছে গিয়ে বলল, আমি আমার পিতার কাছে পোশাক চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আমাকে বলে দিয়েছেন, 'খিয়ার ইবনে রিয়াহ এর কাছে আমার কিছু কাপড় আছে। সেখান থেকে যেটা তোমার পছন্দ নিয়ে নিয়ো।'
খিয়ার ইবনে রিয়াহ বললেন, আমীরুল মুমিনীন সত্য বলেছেন। এ বলে তিনি নিম্ন মানের কিছু কাপড় বের করে দিলেন এবং বললেন, আমার কাছে আমীরুল মুমিনীনের এ কাপড়গুলোই আছে। এখান থেকে তোমার যেটা পছন্দ হয় নিয়ে নাও。
আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে আবদুল আযীয কোনো কাপড় না নিয়ে সোজা চলে এল তার পিতার কাছে। বলল, পিতা! আমি আপনার কাছে পোশাক চেয়েছিলাম। আপনি আমাকে পাঠালেন খিয়ার ইবনে রিয়াহ এর কাছে। তিনি আমাকে এমন কতগুলো কাপড় দেখালেন, যা আমার নয় এবং আমার কওমেরও নয়। [এ কাপড় পরিধান করা কীভাবে সম্ভব?]
ছেলের কথা শুনে উমর ইবনে আবদুল আযীয (রাঃ) বললেন, লোকটির কাছে আমার এ কাপড়গুলোই আছে。
পিতার কথা শুনে ছেলে বেরিয়ে যেতে লাগল। যখন সে দরজা অতিক্রম করার উপক্রম করল, তখন উমর ইবনে আবদুল আযীয (রাঃ) তাকে ডেকে বললেন, আমি কি [বাইতুল মাল থেকে সাধারণ নাগরিকদের যে ভাতা প্রদান করা হয়, তা থেকে] তোমার ভাতার এক শ' দিরহাম অগ্রিম দিয়ে দিব?
ছেলে জওয়াব দিল, হ্যাঁ, দিয়ে দিন。
উমর ইবনে আবদুল আযীয (রাঃ) ছেলেকে ভাতার এক শ' দিরহাম অগ্রিম দিয়ে দিলেন। অতঃপর নাগরিকদের ভাতা দেওয়ার সময় হলে তার ভাতা হিসাব করে কেটে রেখে দেওয়া হল। [তারীখে দিমাশক : ১৭/৬৬-৬৭]
উমর ইবনে আবদুল আযীয ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মাপের যাহেদ; দুনিয়াবি মুখ ছিলেন। মালেক ইবনে দীনার বলতেন - মানুষ বলে মালেক ইবনে দীনার যাহেদ। আরে! যাহেদ তো হচ্ছে উমর ইবনে আবদুল আযীয। তাঁর কাছে দুনিয়া এসেছিল, কিন্তু তিনি দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। [আস-সুন্নাহ লি আবদুল্লাহ ইবনি আহমাদ : ১/১১১]