📄 ১. নফসকে আরাম-আয়েশ ও অলসতায় অভ্যস্ত
আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এই দোয়া করতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْهَرَمِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ.
হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অক্ষমতা, অলসতা, ভীরুতা ও জরাগ্রস্ততা থেকে আশ্রয় চাই এবং জীবন-মরণের ফিতনা ও কবরের আযাব থেকে পানাহ চাই। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৮২৩, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৬]
অক্ষমতা মানে কোনো কাজের সক্ষমতা না থাকা, আর অলসতা মানে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উক্ত কাজ না করা。
কবি সুন্দর বলেছেন-
وَلَمْ أَرَ فِي عُيُوْبِ النَّاسِ عَيْبًا كَنَقْصِ الْقَادِرِينَ عَلَى التَّمَامِ
কোনো কাজ পূর্ণরূপে করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যারা অপূর্ণ রেখে দেয়, তাদের দোষের মতো আর কোনো দোষ আমি মানুষের মধ্যে দেখিনি। [খাযানাতুল আদব: ১/২০৫]
অতএব, মানুষের উচিত, নিজের নফসকে কাজে অভ্যস্ত রাখা; চাই সে কাজ পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক হোক কিংবা ব্যক্তিগত বা গৃহস্থালি হোক। এককথায়, যেকোনো কাজে লিপ্ত রেখে নফসকে অলস অকর্মণ্য ও অকেজো হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা。
আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম-
مَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصْنَعُ فِي بَيْتِهِ ؟ قَالَتْ كَانَ يَكُونُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ تَعْنِي خِدْمَةً أَهْلِهِ فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ خَرَجَ إِلَى الصَّلَاةِ.
নবীজী ঘরে থাকাবস্থায় কী করতেন? আয়েশা বললেন, ঘরের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন। তবে সালাতের সময় হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৭৬]
অতএব, মানুষের উচিত- নিজে কাজেকর্মে অভ্যস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিজের মেয়েকে ঘরোয়া কাজকর্মে, যথা- ঘরের আঙ্গিনা পরিষ্কার করা, রান্নাবান্নায় সহায়তা করা ইত্যাদি কাজে অভ্যস্ত করে তোলা। ছেলেকে ফসলাদি কাটা, বাগান পরিচর্যা করা, গাড়ি ধোওয়া, পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাজার থেকে কিনে আনা ইত্যাদি কাজে অভ্যস্ত করে তোলা।
📄 ২. দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও ভোগ্যসামগ্রী কম রাখা
দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি এবং আরাম-আয়েশ ও ভোগ্যসামগ্রী কম রাখা বিলাসিতা থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর একটি মাধ্যম। মানুষের উচিত, সবসময় আল্লাহ-র দরবারে নিজের জন্য এবং পরিবার-পরিজনের জন্য দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও দুনিয়াবিমুখতার জন্য দোয়া করা। যেমন, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দোয়া করতেন- اللَّهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ قُوتًا.
হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনের রিযিক প্রয়োজন পরিমাণ রাখুন। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৫৫]
অর্থাৎ আপনি তাদের এই পরিমাণ রিযিকের ব্যবস্থা করুন, যেন তাদের কারও কাছে হাত পাততে না হয়; হাত পাতার লাঞ্ছনার শিকার হতে না হয়। আবার এই পরিমাণ প্রাচুর্যও যেন না হয়, যা তাদেরকে পার্থিব জীবনে বিলাসিতায় উদ্বুদ্ধ করবে。
আমাদের কেউ যদি দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা নিয়ে একটু গভীরভাবে ভেবে দেখে, তা হলে সে অবশ্যই এই দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় কিছুকে অত্যন্ত নগণ্য ও তুচ্ছ পাবে; যার জন্য এত কষ্ট করা এবং যার পিছনে ছুটে চলার কোনো অর্থ হয় না। যেমন, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুমার সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِالسُّوْقِ دَاخِلاً مِنْ بَعْضِ الْعَالِيَةِ وَالنَّاسُ كَنَفَتَهُ فَمَرَّ بِجَدْيِ أَسَكَ مَيِّتٍ فَتَنَاوَلَهُ فَأَخَذَ بِأُذُنِهِ ثُمَّ قَالَ أَيُّكُمْ يُحِبُّ أَنَّ هَذَا لَهُ بِدِرْهَم ؟ فَقَالُوا مَا نُحِبُّ أَنَّهُ لَنَا بِشَيْءٍ وَمَا نَصْنَعُ بِهِ : قَالَ أَتُحِبُّونَ أَنَّهُ لَكُمْ ؟ قَالُوا وَاللهِ لَوْ كَانَ حَيًّا كَانَ عَيْبًا فِيهِ لَأَنَّهُ أَسَكُ فَكَيْفَ وَهُوَ مَيِّتُ : فَقَالَ فَوَاللهِ لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ هَذَا عَلَيْكُمْ.
একদিন রাসূলুল্লাহ 'আলিয়া' অঞ্চল থেকে মদীনায় আসার পথে বাজার দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ-র উভয় পাশে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ক্ষুদ্র কান বিশিষ্ট একটি মৃত বকরির বাচ্চার কাছে পৌঁছলেন। অতঃপর তিনি তার কান ধরে বললেন, তোমাদের কেউ কি এক দিরহাম দিয়ে এটা কিনতে আগ্রহী? তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, কোনো কিছুরই বিনিময়ে এটা আমরা নিতে আগ্রহী নই; আর এটা নিয়ে আমরা কী করব?! তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, [বিনা পয়সায়] তোমরা কি তা নিতে আগ্রহী? তারা বললেন, এ যদি জীবিত হত তবুও তো এটা দোষী। কেননা, এর কানগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র। আর এখন তো এটা মৃত! আমরা কীভাবে এটা গ্রহণ করব?
তখন নবীজী ইরশাদ করলেন, আল্লাহর কসম! এটা তোমাদের কাছে যতটা নগণ্য, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়ে আরও বেশি নগণ্য। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৫৭]
সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারীম ইরশাদ করেছেন-
لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوْضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةً ماء.
আল্লাহর নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানও হত, তা হলে তিনি কোনো কাফেরকে এখানকার পানির একটি ঢোকও পান করাতেন না। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩২০]
এ দুনিয়ার কোনো নেয়ামত এ পর্যায়ের নয়, যা পেলে আনন্দিত হওয়া যায় কিংবা হাতছাড়া হয়ে গেলে পেরেশান হতে হয়。
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- যে ব্যক্তির কাছে এক হাজার দিনার আছে, সে কি 'যাহেদ' [দুনিয়াবিমুখ ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত] হতে পারে? তিনি জওয়াব দিয়েছিলেন- হাঁ, যদি সেই পরিমাণে বৃদ্ধি ঘটলে আনন্দিত না হয় এবং হ্রাস পেলে দুঃখিতও না হয়। [মাদারিজুস সালিকীন: ১/৪৬৫, ফয়যুল কদীর : ৪/৭২]
মিহসান আল-আনসারী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ مُعَافَى فِي جَسَدِهِ عِنْدَهُ قُوْتُ يَوْمِهِ فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا.
তোমাদের মধ্যে যে লোক পরিবার-পরিজনসহ সকালে উপনীত হয়, শরীর সুস্থ থাকে এবং তার কাছে এক দিনের খোরাক থাকে, তা হলে যেন তার জন্য গোটা দুনিয়াটাই একত্র করা হল। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৪৬]
অতএব, মানুষের উচিত, দুনিয়া ও দুনিয়ার উপার্জনকে মানসিক প্রশস্ততা ও উদারতার সাথে গ্রহণ করা। একদিকে যেমন সম্পদ উপার্জন করবে, অন্যদিকে এ সম্পদ একজনকে হাদিয়া দিবে, আরেকজনকে সাহায্য করবে, অপরজনকে দান করবে। এভাবে কেমন যেন মানুষের সম্পদই তার কাছে গচ্ছিত রয়েছে।
📄 ৩. নিজের চেয়ে ধনীদের দিকে না তাকানো
দুনিয়ার জীবনে পার্থিব ধন-সম্পদ ও নেয়ামতের বিচারে যারা নিজের চেয়ে বড় ও ধনী, তাদের দিকে না তাকানো; তাদের মতো হতে না চাওয়া। বরং যারা নিজের চেয়ে নিম্ন মানের, তাদের দেখা, তাদের দিকে তাকানো। তা হলে নিজের উপর আল্লাহ -র কী কী নেয়ামত ও অনুগ্রহ রয়েছে, তা উপলব্ধি করা যাবে।
📄 ৪. আশা-আকাঙ্ক্ষা ও কামনা-বাসনাররাস টেনে ধরা
আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبَيَّ فَقَالَ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يَقُوْلُ إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرُ الصَّبَاحَ وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرُ الْمَسَاءَ وَخُذْ مِنْ صِحَّتِكَ لِمَرَضِكَ وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ.
রাসূলুল্লাহ আমার উভয় কাঁধ ধরে বললেন, তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন কোনো ভিনদেশী মুসাফির কিংবা একজন পথিক। আর ইবনে উমর বলতেন, তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে ভোরের অপেক্ষা করো না আর ভোরে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতার সময় তোমার অসুস্থ অবস্থার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো, আর তোমার জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪১৬]