📄 ২. আখেরাতে অনীহা ও দুনিয়াপ্রীতি সৃষ্টি হয়
ধনৈশ্বর্যের অধিকারী ও সম্পদশালীদের অন্তর সুখ-ভোগ ও আরাম-আয়েশে মত্ত থাকে। তারা দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের জীবনের উপর প্রধান দেয়। দুনিয়ার প্রতি চূড়ান্ত পর্যায়ের আসক্ত থাকে। যেমন, আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا ﴾ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَ ابْقَى
বস্তুত, তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও, অথচ পরকালের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। [সূরা আ'লা : ১৬-১৭]
📄 ৩. অন্তর সর্বদা সুখের সন্ধানে থাকে
আরাম-আয়েশ ও বিলাসসামগ্রীর প্রতি মানুষের আসক্তির কারণ হচ্ছে, এর মাধ্যমে তারা সুখ খুঁজে পেতে চায়। যতক্ষণ তারা এ সুখ খুঁজে না পায়, ততক্ষণ অস্থিরতা, অশান্তি ও মানসিক দহনে দগ্ধ হতে থাকে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে- পার্থিব এ সকল উপায়-উপকরণ ও সরঞ্জামাদির মাধ্যমে কখনও সেই কাঙ্ক্ষিত সুখ খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সবই মরীচিকা। শুধু ধোঁকা আর ধোঁকা। ফলাফলে দেখা যায়, মানুষ অযথাই এ সবের পিছনে ছুটে বেড়ায়; কাঙ্ক্ষিত সুখের নাগাল সে কখনোই পায় না。
যায়েদ ইবনে সাবেত -র সূত্রে বর্ণিত, নবী কারীম ﷺ ইরশাদ করেছেন-
مَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ فَرَّقَ اللَّهُ عَلَيْهِ أَمْرَهُ وَجَعَلَ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا كَتَبَ لَهُ . وَمَنْ كَانَتِ الْآخِرَةُ نِيَّتَهُ جَمَعَ اللَّهُ لَهُ أَمْرَهُ . وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ
যার উদ্দেশ্য হবে দুনিয়া, আল্লাহ তার কাজকর্মে অস্থিরতা সৃষ্টি করে দিবেন, দরিদ্রতাকে তার চোখের সামনে তুলে ধরবেন। পার্থিব সম্পদ সে ততটুকুই লাভ করতে পারবে, যতটুকু তার তাকদীরে লেখা আছে। আর যার উদ্দেশ্য হবে আখেরাত, আল্লাহ তার সবকিছু সুষ্ঠু করে দিবেন, তার অন্তরে অমুখাপেক্ষিতা ঢেলে দিবেন এবং দুনিয়া স্বয়ং তার সামনে এসে হাজির হবে। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১০৫]
শায়েখ ইবনে তাইমিয়া যখন নির্যাতিত নিপীড়িত ও জেলখানায় বন্দি ছিলেন, যখন তাঁর থেকে তাঁর কাগজ-কলম-দোয়াতও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, জেলখানার বাইরের কারও সঙ্গে দেখা করতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল, যখন তিনি এমনই কোণঠাসা ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় দামেশকের কারাগারে বন্দি ছিলেন, তখনকার তাঁর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর শাগরেদ ইবনুল কায়্যিম বলেন, আল্লাহ জানেন, আমি তাঁর চেয়ে উৎকৃষ্টতর জীবন যাপন করতে আর কাউকে দেখিনি, অথচ সেখানে নেয়ামত-প্রাচুর্য তো দূরের কথা, সাধারণ জীবন যাপনের আসবাব, উপকরণ ও পরিধি ছিল নিতান্তই সংকীর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা তিনি তখন ছিলেন জেলখানায় বন্দি; সঙ্গে ছিল অত্যাচার-নিপীড়ন ও ভয়-ভীতি। তারপরও তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক উৎকৃষ্ট জীবন যাপনকারী; সবচেয়ে প্রশস্ত বক্ষের অধিকারী; দৃঢ় প্রত্যয়ী ও মজবুত হৃদয়ের অধিকারী; মানুষের মধ্যে সর্বাধিক প্রফুল্ল চিত্তের অধিকারী। চেহারায় ছিল স্বাচ্ছন্দ্যের সজীবতা। আমাদের যখন কোনো বিষয়ে ভয়-উৎকণ্ঠা বেড়ে যেত, নিজেদের ব্যাপারে ধারণা খারাপ হয়ে যেত, সর্বোপরি পৃথিবী আমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে উঠত, তখন আমরা তাঁর কাছে আসতাম। যখনই আমরা তাঁকে দেখতাম, তাঁর সাক্ষাত পেতাম, তাঁর কথা শুনতাম, তখন সেসব আমাদের থেকে উধাও হয়ে যেত। আমরা প্রশস্ত বক্ষে, আনন্দিত চিত্তে, দৃঢ়তা, প্রত্যয় ও পূর্ণ প্রশান্তির সাথে ফিরে যেতাম。
মহা পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর কিছু বান্দাকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বেই জান্নাত দেখিয়ে দিয়েছেন। দুনিয়াতেই তাঁদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলে দিয়েছেন। সেই উন্মুক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতের আরাম, প্রশান্তি ও মৃদুমন্দ হাওয়া তাঁদের কাছে পৌঁছে। ফলে তাঁদের সমস্ত শক্তি ও প্রচেষ্টা একত্র হয় সেই জান্নাত লাভের জন্য এবং জান্নাতের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য। সে সকল বান্দার কেউ কেউ বলতেন, আমরা যে অবস্থায় আছি, যদি দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ বা তাদের সন্তানরা জানতে পারত, তা হলে তারা আমাদের উপর তরবারি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ত। [আল-ওয়াবিলুস সয়্যিব : ৬৭]
📄 ৪. বিলাসিতা অন্তরের আরও বহুবিদ রোগ সৃষ্টি করে
পূর্বোক্ত বদ আছর ও ক্ষতিসমূহ ছাড়াও বিলাসিতা আরও অনেক ধরনের অন্তরের রোগ সৃষ্টি করে। যেমন, গর্ব-অহংকার, ঔদ্ধত্য-অহমিকা, দম্ভ-বড়াই, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি। অপরদিকে অন্তর থেকে বিনয়-নম্রতা ও সৌজন্য-ভদ্রতা ইত্যাদি ভালো গুণগুলোকে চিরতরে বিদূরিত করে।
📄 ৫. বিলাসিতা অপকর্ম ও অশ্লীলতায় প্ররোচিত করে
বিলাসিতা বিলাসীদেরকে মন্দ লোকদের সঙ্গে তাদের অপকর্ম, অশ্লীলতা ও নির্লজ্জ কাজে অংশগ্রহণ করতে প্ররোচিত করে, উদ্বুদ্ধ করে। কারণ, আসক্তি ও উগ্র বিনোদনের স্থানগুলোতে কেবল বিলাসীরাই ভিড় করে। পক্ষান্তরে দ্বীনদার ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিরা সাধারণত সেসকল স্থানে যাতায়াত করে না。
এক লোক দ্বীনদার এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করেছিল- কোন জিনিস আপনাকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত করেছে?
তিনি জওয়াবে বলেছিলেন, দুনিয়ার বিশ্বস্ততার স্বল্পতা, তার তুচ্ছতা, জঞ্জালের আধিক্য ও তার অধিকারীদের হীনতা ও নীচতা। [মাদারিজুস সালিকীন: ২/১৬]