📄 ৫. বিয়ে-শাদি ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে বাড়াবাড়ি
প্রিয় পাঠক!
আমাদের সমাজে, হাঁ, আমাদের ইসলামী সমাজে, বিয়ে-শাদি ও অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি, বিশেষত বিয়ের রাত- অপচয়, অপব্যয়, ও বাড়াবাড়ির উপমায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকেই নতুনত্ব ও বৈচিত্র আনয়নে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত; কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে এই নেশায় মত্ত。
আমাদের পার্টি সেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার ও অনুষ্ঠানালয়গুলো আজ বিলাসিতা, অহমিকা ও গর্ব-অহংকার প্রকাশের অন্যতম ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এগুলোর ভাড়াও অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে!
অপরদিকে শুধু বিয়ের পোশাকের কথাই স্বতন্ত্র এক দাস্তানে পরিণত হয়েছে। বিয়ের একটিমাত্র পোশাক তৈরি করতে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, যা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। একদিকে পাত্র সমসাময়িক সবচেয়ে মূল্যবান পোশাক পরে রেকর্ড গড়তে মত্ত, অপরদিকে পাত্রী বা পাত্রীপক্ষ পোশাকাদি, গয়না-গাঁটি, প্রসাধনী ও অলঙ্কারাদি নির্দিষ্ট কোম্পানি ও বিখ্যাত ব্রান্ড ছাড়া অন্যকোনো কোম্পানির হলে তা গ্রহণে একবাক্যে অনীহ。
বিয়ের অনুষ্ঠানে এ ধরনের অপব্যয়ের ক্ষতি ও কুফল যে কেবল অর্থ-অপচয় ও মানুষের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে-বিষয়টি এমন নয়। বরং এর ক্ষতিকর প্রভাব যুবসমাজকে বিয়ে-বিমুখতা ও বৈরাগ্যের দিকে ঠেলে দেয়। কেননা, অসমর্থ যুবকরা যখন দেখবে, বিয়ে-শাদিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, যার সামর্থ্য তাদের নেই, তখন তারা দুই আগুনের কোনো একটিতে জ্বলতে থাকবে। হয়তো তারা বৈরাগ্য ও পত্নীহীনতার আগুনে জ্বলবে, নয়তো বিবাহকার্য সম্পাদনে কৃত ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে মানসিক চাপ ও যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকবে。
সামাজিক সেসকল অনাচার ও গর্হিত কাজ, যেগুলো আমাদের পরিবারে অনুপ্রবেশ করে অতি সঙ্গোপনে; আমাদের অলক্ষে। কেননা, পথে-ঘাটে হাটে-বাজারে স্কুল-বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফেতনা-ফাসাদ ও গর্হিত বিষয় খুব সহজেই আমাদের ঘরে অনুপ্রবেশ করে ফেলে। কারণ, আমাদের পরিবার-পরিজন ও সন্তানরা সেসব স্থানে যায় এবং সেখানে গিয়ে নেককার-বদকার, ভালো-মন্দ সব রকমের মানুষের সঙ্গেই মেলামেশা করে। আর সকলেরই জানা-আমাদের আশপাশে, আমাদের সমাজে ফেতনা-ফাসাদেরই ছড়াছড়ি; অন্যায়-অনাচারেরই বাড়াবাড়ি। অতএব, গৃহকর্তা ও পরিবারের দায়িত্বশীল অভিভাবকের কর্তব্য, আবশ্যক- সমাজের এ দিকটি সম্পর্কে, সমাজের এ অন্ধকার বিষয়গুলোর ব্যাপারে স্বীয় সন্তান-সন্ততি ও পরিবারবর্গকে সতর্ক করা; সাবধানতার তালীম দেওয়া। একজন কল্যাণকামী দরদী ও খাঁটি মুমিনের উচিত, সর্বদাই দোয়া করা- যেন আল্লাহ তাঁর পরিবারকে এ সকল গর্হিত বিষয়াশয় ও ক্রিয়াকর্ম থেকে সম্পূর্ণরূপে হেফাজত করেন; বর্তমান সমাজে ছড়িয়ে পড়া এ সকল ধ্বংসাত্মক উপসর্গ থেকে পরিপূর্ণরূপে রক্ষা করেন。
আল্লাহ-র নবী লুত যখন একটি ভ্রষ্ট, অসুস্থ ও বিকৃত রুচির অধিকারী সম্প্রদায়ের মাঝে ছিলেন, তিনি ও তাঁর পরিবারের অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকার বিষয়টি যখন তাঁর সম্প্রদায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না; সর্বোপরি এ কারণে তাঁর সম্প্রদায় যখন তাঁর উপর ও তাঁর পরিবারের উপর বিভিন্ন ধরনের চাপ ও বল প্রয়োগ করছিল, তখন লূত কী বলেছিলেন? কী করেছিলেন?
তিনি তখন আল্লাহ অভিমুখী হয়েছিলেন, আল্লাহ-র কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন এবং আল্লাহ-কে ডেকে বলেছিলেন-
﴿ رَبِّ نَجِّنِي وَ أَهْلِي مِمَّا يَعْمَلُونَ ﴾
হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এবং আমার পরিবারবর্গকে তারা যা করে, তা থেকে রক্ষা কর। [সূরা শুআরা: ১৬৯]
তিনি তাঁর পরিবারকে অন্যায়-অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে দূরে ও নিরাপদে রাখতে একনিষ্ঠ ছিলেন। এখনও, বর্তমানেও প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিমের জন্য উচিত এ কথা বলা-
﴿ رَبِّ نَجِّنِي وَ أَهْلِي مِمَّا يَعْمَلُونَ ﴾
হে আমার পালনকর্তা! আমাকে এবং আমার পরিবারবর্গকে তারা যা করে, তা থেকে রক্ষা কর। [সূরা শুআরা: ১৬৯]
কেননা, আমাদের বর্তমান সমাজে বিদ্যমান গর্হিত কাজ ও অশ্লীলতা লুত-র সম্প্রদায়ের অশ্লীলতার মতোই; বরং আরও বেশি। তাই আমাদেরও তেমনই দোয়া করা উচিত, যেমন দোয়া করেছিলেন আল্লাহ-র নবী লুত। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুলও করেছিলেন। আর এটাই হল সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতার প্রতিদান। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
﴿ فَنَجَّيْنَهُ وَ أَهْلَهُ أَجْمَعِينَ . إِلَّا عَجُوزًا فِي الْغَبِرِينَ ﴾
অতঃপর আমি তাঁকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে রক্ষা করলাম। এক বৃদ্ধা ব্যতীত, সে ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। [সূরা শুআরা : ১৭০-১৭১]
সে ছিল লূত-এর স্ত্রী। কারণ, সে ছিল তার সম্প্রদায়ের ধর্মের অনুসারী।
📄 ৬. মোবাইল ফোন, আসবাব ও মূল্য
হাল যামানায় নতুন করে বহু মানুষের অন্তরে যে ধ্বংসাত্মক বিলাসী মানসিকতা শিকড় গেড়ে নিয়েছে, তা হচ্ছে- কিছুদিন পর পর নতুন থেকে আরও নতুন মোবাইল সেট ক্রয় ও তা সজ্জায়নে অকাতরে অযৌক্তিক অর্থ ব্যয়。
বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মোবাইল সেট নিলামে বিক্রির আসর জমে এবং সেখানে পরিবেশিত মোবাইল সেট এতটাই অযৌক্তিক চড়া মূল্যে বিক্রি করা হয়, যা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়।
📄 ৭. লেটেস্ট মডেলের গাড়ি সজ্জায়ন ও ব্যতিক্রমী নম্বর
আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়া বিলাসিতার আরেকটি রূপ হচ্ছে- বহু ধনী ও বিলাসী ব্যক্তি কিছু দিন পর পর নতুন থেকে আরও নতুন, সর্বশেষ মডেলের গাড়ি কেনার নেশায় থাকে। প্রতি বছরই তারা গাড়ি পরিবর্তন করে এবং নতুন নতুন গাড়ি ক্রয় করে। শুধু তা-ই নয়, গাড়ির ব্যতিক্রমী একটি নম্বর কেনার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেও তারা কোনো ধরনের কুণ্ঠাবোধ করে না。
কিছুদিন আগে উপসাগরীয় দেশগুলোর এক শহরে গাড়ির ব্যতিক্রমী নম্বর বিক্রির এক নিলাম-আসর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেই এক আসরে মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ হাওয়ায় উড়ে গেল।
📄 ৮. বাড়ি নির্মাণ ও ডেকোরেশনে অতিরঞ্জন
বহু বিলাসী পরিবার কিছুদিন পর পর তাদের ঘরের আসবাবপত্র ও ডেকোরেশন পরিবর্তন করে সর্বশেষ ও আধুনিকতমরূপে সজ্জিত করে। কোনো কোনো পরিবার এ কাজ করে ছয় মাস পর পর। কোনো কোনো পরিবার করে এক বছর অন্তর অন্তর। আবার কেউ কেউ হয়তো করে দু'চার বছর পর পর। প্রত্যেকে তাদের আর্থিক সামর্থ্য ও সঙ্গতির ভিত্তিতে এ পরিবর্তন করে থাকে。
ঘরে সৌন্দর্য ও বৈচিত্র আনয়ন কোনো দোষের বিষয় নয়। তবে তা আর বিলাসিতা এক কথা নয়。
অনেকে ঘরের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে কল্পনাতীত অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন বস্তুসামগ্রী আমদানি করে থাকে। আবার এসবের যথাযথ স্থাপন ও পরিকল্পিত ডেকোরেশনের জন্য বিশেষজ্ঞ ও পারদর্শী লোকের দলও থাকে, যাদেরকে এ কাজের জন্য মোটা অংকের অর্থ প্রদান করতে হয়。
বর্তমানে তো অনেকে তাদের টয়লেটগুলোও এতটাই উন্নত ও জাঁকজমকপূর্ণ করে তৈরি করে, যা দেখলে মনে হয় যেন কোনো শাহী বৈঠকখানা। সেখানে মোজাইক-টাইলস থেকে শুরু করে শ্বেত মর্মর, মার্বেল পাথর ও বহুমূল্যের লাইটিংসহ কোনো কিছুই বাদ যায় না।