📄 ৩. পার্থিব নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে
দুনিয়ার জীবনে বান্দা যেসব নেয়ামত লাভ করে, যেসব নেয়ামতের মাঝে জীবন যাপন করে, কেয়ামতের দিন তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে- সে কি তার যথাযথ শোকর আদায় করেছিল? না কৃতঘ্ন হয়েছিল?
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ ﴾
এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। [সূরা তাকাসুর : ৮]
বলেন, পার্থিব জীবনের এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম মুজাহিদ যাবতীয় সুখ-সম্ভার ও আনন্দ-উপভোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৪৭৭]
সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন, এমনকি মধু পান সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৪৭৭]
হাসান বসরী বলেন, সকাল-বিকালের আহার নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। [সে সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে।] [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৮/৪৭৭]
আবু কিলাবা বলেন, মধু, ঘি ও ময়দার রুটিও নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। [সে সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে।] [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৪৭৭]
হাসান বসরী ও কাতাদা বলেন, কেয়ামতের দিন কেবল তিনটি বিষয়ে বনী আদমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। এর বাইরে যা কিছু আছে, তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে; হিসাব নেওয়া হবে। তবে আল্লাহ কারও ব্যাপারে ব্যতিক্রম চাইলে সেটা ভিন্ন কথা। [সেই তিনটি বিষয় হচ্ছে-] [১] যে কাপড়ের সাহায্যে সে তার সতর ঢেকে রাখে। [২] যে রুটির টুকরো [খাবার] দিয়ে সে জীবন ধারণ করে। [৩] যে ঘরের ছায়ায় সে বসবাস করে। [তাফসীরে তবারী: ২৪/৫৮৬]
প্রিয় পাঠক!
আপনি ইসলামী প্রজন্মের সুমহান তিন ব্যক্তিত্ব- রাসূলুল্লাহ, আবু বকর সিদ্দীক ও উমর-র ঘটনাটিই একটু দেখুন না। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ঘর থেকে বের হয়ে আবু বকর ও উমর-কে দেখতে পেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কোন জিনিস তোমাদেরকে এ সময় ঘর থেকে বের করেছে? তাঁরা জওয়াব দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ক্ষুধার যন্ত্রণা। রাসূলুল্লাহ বললেন, ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদেরকে যে জিনিস ঘর থেকে বের করে এনেছে আমাকেও সে জিনিসই বের করে এনেছে, চলো。
অতঃপর তাঁরা উভয়ে রাসূলুল্লাহ-র সাথে চলতে লাগলেন। এক সময় তিনি এক আনসারীর বাড়ি এসে উপস্থিত হলেন। তখন ওই আনসারী বাড়ি ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখে বললেন, 'মারহাবা ওয়া আহলান!'
রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, অমুক কোথায়?
আনসারীর স্ত্রী জওয়াব দিলেন, তিনি আমাদের জন্য মিষ্টি পানি আনতে গেছেন。
এরই মধ্যে ওই আনসারীও এসে উপস্থিত হলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর দুই সাথিকে দেখে আনন্দে বলে ওঠলেন- আলহামদুলিল্লাহ! সকল প্রশংসা আল্লাহ-র জন্য! আজ মেহমানের দিক থেকে আমার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কেউ নেই。
এরপর তিনি গিয়ে খেজুরের একটি ছড়া নিয়ে এলেন। তাতে কাঁচা, পাকা ও শুকনো খেজুর ছিল। অতঃপর বললেন, আপনারা এ থেকে খান। এ বলে তিনি [ছাগল জবাই করার জন্য] ছুরি হাতে নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সাবধান! দুধওয়ালা বকরি জবাই করবে না。
এরপর আনসারী বকরি জবাই করলে তাঁরা বকরির গোশত ও কাঁদির খেজুর খেলেন। পানি পান করলেন। সকলে ক্ষুধা নিবারণ করলেন। তৃপ্ত হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আবূ বকর ও উমর -কে লক্ষ্য করে বললেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتُسْأَلُنَّ عَنْ هَذَا النَّعِيمِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمُ الْجُوعُ ثُمَّ لَمْ تَرْجِعُوا حَتَّى أَصَابَكُمْ هَذَا النَّعِيمُ.
কসম সেই সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! কেয়ামতের দিন এ নেয়ামত সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। ক্ষুধা তোমাদেরকে ঘর থেকে বের করে এনেছে, অথচ এ নেয়ামত লাভ না করে তোমরা প্রত্যাবর্তন করনি। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩৮]
প্রিয় পাঠক!
ইসলামী উম্মাহর সুমহান এই তিন ব্যক্তিত্বই যদি এ নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন, তা-ও আবার এমন নেয়ামত, যা একবার মাত্র লাভ হয়েছে, প্রচন্ড ক্ষুধার পর! তা হলে আমরা যারা প্রতিদিন তিন বেলা নিয়মিত আহার করি, তাদের অবস্থা কী হবে?!
আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ قَدِمَ الْمَدِينَةَ مِنْ طَعَامِ بُرِّ ثَلَاثَ لَيَالٍ تِبَاعًا حَتَّى قُبِضَ.
মুহাম্মাদ -এর পরিবারবর্গ মদীনায় আসার পর থেকে এক নাগাড়ে তিন দিন গমের রুটি পরিতৃপ্ত হয়ে খাননি এবং এ অবস্থায়ই তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৪]
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা বলেন-
كَانَ فِرَاشُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَدَمٍ وَحَشْوُهُ مِنْ لِيفٍ.
রাসূলুল্লাহ -এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি এবং তার ভেতরে ছিল খেজুরের ছাল। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৬]
কাতাদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كُنَّا نَأْتِي أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ وَخَبَّاؤُهُ قَائِمٌ وَقَالَ كُلُوا فَمَا أَعْلَمُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَغِيْفًا مُرَقَّقًا حَتَّى لَحِقَ بِاللَّهِ وَلَا رَأَى شَاةٌ سَمِيعًا بِعَيْنِهِ قَطُّ.
আমরা এমন অবস্থায় আনাস ইবনে মালেক -এর কাছে গেলাম যে, তাঁর পাচক [মেহমানদারির জন্য] দাঁড়ানো ছিল। আনাস বললেন, আপনারা খান। আমি জানি না, নবীজী ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত পাতলা রুটি দেখেছেন কি না। আর তিনি কখনও ভুনা বকরির গোশত দেখেননি। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৭]
উরওয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আয়েশা তাঁকে বলেছেন-
إِنْ كُنَّا لَتَنْظُرُ إِلَى الْهِلَالِ ثَلَاثَةَ أَهِلَّةٍ فِي شَهْرَيْنِ وَمَا أُوقِدَتْ فِي أَبْيَاتِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَارُ فَقُلْتُ مَا كَانَ يُعِيْشُكُمْ قَالَتْ الْأَسْوَدَانِ التَّمْرُ وَالْمَاءُ إِلَّا أَنَّهُ قَدْ كَانَ لِرَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِيْرَانُ مِنْ الْأَنْصَارِ كَانَ لَهُمْ مَنَائِحُ وَكَانُوا يَمْنَحُوْنَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَبْيَاتِهِمْ فَيَسْقِيْنَاهُ.
[হে ভাগ্নে] আমরা দু' মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু [এর মধ্যে] রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরগুলোতে আগুন জ্বলত না। আমি বললাম, তা হলে আপনারা দিনাতিপাত করতেন কীভাবে? তিনি [আয়েশা ] বললেন, কালো দু'টি বস্তু; খেজুর আর পানি。
অবশ্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কিছু আনসার প্রতিবেশীর কতগুলো দুধওয়ালা প্রাণী ছিল, তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তা দিত। আমরা তা-ই পান করতাম। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৯]