📘 বিলাসিতা করবেন না > 📄 ২. পার্থিব নেয়ামত পরকালের নেয়ামত হ্রাসের কারণ

📄 ২. পার্থিব নেয়ামত পরকালের নেয়ামত হ্রাসের কারণ


আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন, কিছু লোক আছে এমন, যাদের ভালো কাজ ও পুণ্যকর্মের ফলাফল দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয়। আখেরাতে তারা কোনো বিনিময় পাবে না। যেমন, তিনি ইরশাদ করেছেন- وَيَوْمَ يُعْرَضُ الَّذِينَ كَفَرُوا عَلَى النَّارِ أَذْهَبْتُمْ طَيِّبُتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَ اسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا فَالْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ بِمَا كُنتُمْ تَسْتَكْبِرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَ بِمَا كُنْتُمْ تَفْسُقُوْنَ

যেদিন কাফেরদের জাহান্নামের কাছে উপস্থিত করা হবে, সেদিন বলা হবে, তোমরা তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই নিঃশেষ করে ফেলেছ এবং সেগুলো ভোগও করেছ; সুতরাং আজ তোমাদেরকে দেওয়া হবে অবমাননাকর শাস্তি; কারণ, তোমরা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করতে এবং তোমরা ছিলে পাপাচারী। [সূরা আহক্বাফ : ২০]

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর উমর রাঃ অনেক আকর্ষণীয় এবং সুস্বাদু খাবার ও পানীয় বর্জন করেছিলেন। আর তিনি বলতেন, আমার ভয় হয়- আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাই কি না, যাদেরকে তিরস্কার করে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا ‘তোমরা তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই নিঃশেষ করে ফেলেছ।

আবু মিজলায বলেন, কেয়ামতের দিন কিছু মানুষ তাদের নেক আমলসমূহের কোনো প্রতিদান দেখতে পাবে না। তখন তাদের বলা হবে, তোমরা তো তোমাদের নেক আমল ও পুণ্যসমূহের বিনিময় দুনিয়ার জীবনেই সুখ-সম্ভার ভোগ করে নিঃশেষ করে ফেলেছ। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৭/২৮৫]

অর্থাৎ কেয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশের সময় বহু মানুষ পার্থিব জীবনে কৃত তাদের পুণ্যকর্ম ও নেক আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, যেগুলোর কোনো প্রতিদান তারা দেখতে পাবে না। তখন তাদের জানানো হবে- দুনিয়ার জীবনে তোমরা আরাম-আয়েশ, সুখ-আনন্দ ও বিভিন্ন নেয়ামত-ভোগের মাধ্যমে তোমাদের কর্মফল নিঃশেষ করে ফেলেছ!

এ জন্যই সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের উত্তরসুরিগণ পার্থিব জীবনের সুখ-সম্ভার ও নেয়ামতরাজি কম ভোগ করেন। যেন এর বিনিময় ও প্রতিদান তাঁরা পূর্ণরূপে আখেরাতে লাভ করতে পারেন。

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন উমর আমাকে গোশত বহন করে নিয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, জাবের! এগুলো কী?
আমি বললাম, এগুলো গোশত। এক দিরহাম দিয়ে কিনেছি। ঘরের নারীরা গোশতের আগ্রহ করেছে。

আমার জওয়াব শুনে উমর বললেন, তোমাদের কেউ কোনো কিছু চাইলেই কি তা পূরণ করা হয়? তোমাদের কেউ কি তার পেটকে গুটিয়ে রাখতে পারে না তার প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাইদের জন্য? [এই যদি হয় তোমাদের অবস্থা] তা হলে এই আয়াত যাবে কোথায়- أَذْهَبْتُمْ طَيِّبُتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا

তোমরা তো তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই নিঃশেষ করে ফেলেছ! [আদ্দুররুল মানছুর: ৭/৪৪৯]

উমর মাঝে মাঝে বলতেন, যদি আমি চাইতাম, তা হলে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট খাদ্য ও সবচেয়ে কোমল পোশাকের অধিকারী হতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার উৎকৃষ্ট বস্তুসমূহ [আখেরাতের জন্য] সঞ্চয় করে রেখে দিচ্ছি। [তাফসীরে তবারী : ২২/১২০]

হাফস ইবনে আবুল আস অধিকহারে উমর-র সাক্ষাতে আসতেন। কিন্তু যখনই উমর তাঁর সামনে কোনো খাবার এগিয়ে দিতেন, তিনি তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতেন। একদিন উমর জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের খাবারের ব্যাপারে তোমার কী আপত্তি?

হাফস ইবনে আবুল আস বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আমার পরিবার আমার জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট ও নরম খাবার তৈরি করে। তাই এ খাবারের পরিবর্তে আমি তাদের খাবারই গ্রহণ করি。

উমর বললেন, তোমার মা তোমাকে হারাক! তুমি কি দেখ না, যদি আমি চাইতাম, তা হলে অল্প বয়স্ক হৃষ্টপুষ্ট একটি বকরি জবাই করার আদেশ দিতে পারতাম। অতঃপর তার চামড়া ও পশম পরিষ্কার করতাম। তারপর ময়দা তৈরির আদেশ দিতাম। অতঃপর তা কাপড়ে চেলে মিহি করে পাতলা রুটি বানানো হত। তারপর এক সা' কিশমিশ ঘি এর মধ্যে মিশিয়ে পাকানোর আদেশ করতাম。

উমর-র কথা শুনে হাফস ইবনে আবুল আস বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আমি তো দেখছি আপনি উৎকৃষ্ট ও কোমল খাবার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন!

উমর বললেন, তোমার মা তোমাকে হারাক! কসম সেই সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যদি কেয়ামতের দিন আমার নেকী ও পুণ্য কমে যাওয়া অপছন্দ না করতাম, তা হলে অবশ্যই আমি তোমাদের সঙ্গে তোমাদের নরম-কোমল খাবারে অংশগ্রহণ করতাম। [আদ্দুররুল মানছুর: ৭/৪৪৭]

হাফসা বিনতে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি একবার তাঁর পিতা [উমর ]-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনার এমন কী ক্ষতি হয়, যদি আপনি আপনার এই কাপড়ের তুলনায় আরেকটু নরম-কোমল কাপড় পরিধান করেন? আপনার এই খাবারের তুলনায় আরেকটু উৎকৃষ্ট খাবার গ্রহণ করেন? আল্লাহ তো পৃথিবীর বহু অঞ্চল আপনার অধীনস্ত করেছেন! বহু অঞ্চলের বিজয় দান করেছেন! আল্লাহ তো আপনার জন্য প্রশস্ত রিযিকের ব্যবস্থা করেছেন!

উমর বললেন, তুমি কি জান না, রাসূলুল্লাহ কত কষ্টকর জীবন যাপন করেছেন! এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ জীবনে সে সকল কষ্ট ও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন, তার কিছুর বিবরণ দিলেন। এক পর্যায়ে হাফসা -কে কাঁদিয়ে ফেললেন। তারপর বললেন, আমি তোমাকে বলেছি, আমার দু'জন বন্ধু আছেন। যদি আমি তাঁদের পথ ছেড়ে ভিন্ন পথে চলি, তা হলে তাঁদের সঙ্গে যে আচরণ করা হবে তার ব্যতিক্রম আচরণ করা হবে আমার সঙ্গে। আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি কষ্টকর জীবন যাপনে তাঁদের অনুসরণ করব। যাতে [আখেরাতে] তাঁদের আনন্দময় জীবনেও আমি তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারি。

উমর তাঁর দুই বন্ধু বলে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর সিদ্দীক -কে বুঝিয়েছেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং ৩৪৪৩৪]

উমর যখন শামে এলেন, তখন তাঁর জন্য উন্নত খাবার তৈরি করা হল, যা তিনি ইতিপূর্বে কখনও দেখেননি। তা দেখে তিনি বললেন, এই খাবার যদি আমাদের জন্য হয়, তা হলে সেসকল দরিদ্র মুসলমানের জন্য কী থাকবে, যারা মৃত্যুর পূর্বে কোনোদিন যবের রুটি দিয়েও পেট পূর্ণ করতে পারেননি?!

এ সময় খালেদ ইবনে ওয়ালিদ বললেন, তাঁদের জন্য জান্নাত。

উমর-র চোখ অশ্রুতে ভেসে গেল। বললেন, আমাদের অংশে যদি থাকে খড়কুটো আর তারা যদি জান্নাত নিয়ে চলে যান, তা হলে তো তাঁরা আমাদেরকে বহু দূরে ছেড়ে গেলেন! [তাফসীরে তবারী : ২২/১২০]

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
رَأَيْتُ سَبْعِيْنَ مِنْ أَصْحَابِ الصُّفَةِ مَا مِنْهُمْ رَجُلٌ عَلَيْهِ رِدَاءُ إِمَّا إِزَارُ وَإِمَّا كِسَاءٌ قَدْ رَبَطُوا فِي أَعْنَاقِهِمْ فَمِنْهَا مَا يَبْلُغُ نِصْفَ السَّاقَيْنِ وَمِنْهَا مَا يَبْلُغُ الْكَعْبَيْنِ فَيَجْمَعُهُ بِيَدِهِ كَرَاهِيَةً أَنْ تُرَى عَوْرَتُهُ.
আমি সত্তরজন আসহাবে সুফফাকে দেখেছি, তাঁদের কারও গায়ে বড় চাদর ছিল না। হয়তো ছিল কেবল লুঙ্গি কিংবা ছোট চাদর, যা তাঁদের ঘাড়ে বেঁধে রাখতেন। [নীচের দিকে] কারোটা নিসফে সাক বা হাঁটু পর্যন্ত আর কারোটা টাখনু পর্যন্ত ছিল। লজ্জাস্থান দেখা যাবার ভয়ে তাঁরা হাত দিয়ে কাপড় ধরে রাখতেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪২]

আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
أَخَذَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَنْكِبَيَّ فَقَالَ كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার উভয় কাঁধ ধরে বললেন, তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন কোনো ভিনদেশী মুসাফির কিংবা একজন পথিক। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪১৬]

আর ইবনে উমর বলতেন-
إِذَا أَمْسَيْتَ فَلَا تَنْتَظِرُ الصَّبَاحَ وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلَا تَنْتَظِرُ الْمَسَاءَ وَخُذْ مِنْ صِحْتِكَ لِمَرَضِكَ وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ.
তুমি সন্ধ্যায় উপনীত হলে ভোরের অপেক্ষা করো না আর ভোরে উপনীত হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতার সময় তোমার অসুস্থ অবস্থার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো, আর তোমার জীবিত অবস্থায় তোমার মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো。

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেছেন-
الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ.
দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা আর কাফেরের জন্য জান্নাততুল্য। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৬০৬, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪১১৩, সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩২৪]

কাতাদা বলতেন, আল্লাহর কসম! তোমরা জান, কেয়ামতের দিন বহু মানুষ তাঁদের পুণ্যকর্মের প্রতিদান দেখতে পাবে না বা পেলেও কম পাবে। অতএব, কারও পক্ষে যদি সম্ভব হয়, তা হলে সে যেন তার পুণ্যকর্ম ও নেকীগুলো [আখেরাতের জন্য] রেখে দেয়। আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো ক্ষমতা নেই। [তাফসীরে তবারী : ২২/১২০]

অনাড়ম্বরপূর্ণ ও সাদাসিধে জীবনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং দুনিয়ার নেয়ামত দেখে ধোঁকায় নিমজ্জিত হতে সতর্ক করে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
وَمَا هُذِهِ الْحَيُوةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهُوَ وَ لَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া-কৌতুক বৈ তো কিছুই নয়। পরকালের গৃহই প্রকৃত জীবন; যদি তারা জানত। [সূরা আনকাবুত : ৬৪]

অপর এক স্থানে তিনি ইরশাদ করেছেন-
الهُكُمُ التَّكَاثُرُ وَ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ ﴿﴾ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ ﴿٣﴾ ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ ﴿٢﴾ كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ ﴿5﴾ لَتَرَوُنَ الْجَحِيمَ ﴿1﴾ ثُمَّ لَتَرَوْنَهَا عَيْنَ الْيَقِينِ ﴿4﴾ ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ ﴾
প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে; যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও। এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্বরই জেনে যাবে। অতঃপর এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্বরই জেনে যাবে। কখনই নয়; যদি তোমরা নিশ্চিত জানতে। তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে; অতঃপর তোমরা তা অবশ্যই দেখবে দিব্য প্রত্যয়ে, এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। [সূরা তাকাসুর: ১-৮]

অপর এক আয়াতে তিনি সতর্ক করে বলেছেন-
يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيُوةُ الدُّنْيَانَ وَلَا يَغُرَّنَّكُمْ بِاللَّهِ الْغَرُورُ
হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং, পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে; এবং সেই প্রবঞ্চক [শয়তান] যেন কিছুতেই তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে। [সূরা ফাতির : ৫]

📘 বিলাসিতা করবেন না > 📄 ৩. পার্থিব নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে

📄 ৩. পার্থিব নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে


দুনিয়ার জীবনে বান্দা যেসব নেয়ামত লাভ করে, যেসব নেয়ামতের মাঝে জীবন যাপন করে, কেয়ামতের দিন তাকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে- সে কি তার যথাযথ শোকর আদায় করেছিল? না কৃতঘ্ন হয়েছিল?

আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ ﴾

এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। [সূরা তাকাসুর : ৮]

বলেন, পার্থিব জীবনের এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম মুজাহিদ যাবতীয় সুখ-সম্ভার ও আনন্দ-উপভোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৪৭৭]

সাঈদ ইবনে জুবাইর বলেন, এমনকি মধু পান সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৪৭৭]

হাসান বসরী বলেন, সকাল-বিকালের আহার নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। [সে সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে।] [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৮/৪৭৭]

আবু কিলাবা বলেন, মধু, ঘি ও ময়দার রুটিও নেয়ামতের অন্তর্ভুক্ত। [সে সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করা হবে।] [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৪৭৭]

হাসান বসরী ও কাতাদা বলেন, কেয়ামতের দিন কেবল তিনটি বিষয়ে বনী আদমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। এর বাইরে যা কিছু আছে, তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে; হিসাব নেওয়া হবে। তবে আল্লাহ কারও ব্যাপারে ব্যতিক্রম চাইলে সেটা ভিন্ন কথা। [সেই তিনটি বিষয় হচ্ছে-] [১] যে কাপড়ের সাহায্যে সে তার সতর ঢেকে রাখে। [২] যে রুটির টুকরো [খাবার] দিয়ে সে জীবন ধারণ করে। [৩] যে ঘরের ছায়ায় সে বসবাস করে। [তাফসীরে তবারী: ২৪/৫৮৬]

প্রিয় পাঠক!

আপনি ইসলামী প্রজন্মের সুমহান তিন ব্যক্তিত্ব- রাসূলুল্লাহ, আবু বকর সিদ্দীক ও উমর-র ঘটনাটিই একটু দেখুন না। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ঘর থেকে বের হয়ে আবু বকর ও উমর-কে দেখতে পেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কোন জিনিস তোমাদেরকে এ সময় ঘর থেকে বের করেছে? তাঁরা জওয়াব দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ক্ষুধার যন্ত্রণা। রাসূলুল্লাহ বললেন, ওই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদেরকে যে জিনিস ঘর থেকে বের করে এনেছে আমাকেও সে জিনিসই বের করে এনেছে, চলো。

অতঃপর তাঁরা উভয়ে রাসূলুল্লাহ-র সাথে চলতে লাগলেন। এক সময় তিনি এক আনসারীর বাড়ি এসে উপস্থিত হলেন। তখন ওই আনসারী বাড়ি ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখে বললেন, 'মারহাবা ওয়া আহলান!'

রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, অমুক কোথায়?

আনসারীর স্ত্রী জওয়াব দিলেন, তিনি আমাদের জন্য মিষ্টি পানি আনতে গেছেন。

এরই মধ্যে ওই আনসারীও এসে উপস্থিত হলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর দুই সাথিকে দেখে আনন্দে বলে ওঠলেন- আলহামদুলিল্লাহ! সকল প্রশংসা আল্লাহ-র জন্য! আজ মেহমানের দিক থেকে আমার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কেউ নেই。

এরপর তিনি গিয়ে খেজুরের একটি ছড়া নিয়ে এলেন। তাতে কাঁচা, পাকা ও শুকনো খেজুর ছিল। অতঃপর বললেন, আপনারা এ থেকে খান। এ বলে তিনি [ছাগল জবাই করার জন্য] ছুরি হাতে নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সাবধান! দুধওয়ালা বকরি জবাই করবে না。

এরপর আনসারী বকরি জবাই করলে তাঁরা বকরির গোশত ও কাঁদির খেজুর খেলেন। পানি পান করলেন। সকলে ক্ষুধা নিবারণ করলেন। তৃপ্ত হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আবূ বকর ও উমর -কে লক্ষ্য করে বললেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتُسْأَلُنَّ عَنْ هَذَا النَّعِيمِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمُ الْجُوعُ ثُمَّ لَمْ تَرْجِعُوا حَتَّى أَصَابَكُمْ هَذَا النَّعِيمُ.
কসম সেই সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! কেয়ামতের দিন এ নেয়ামত সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। ক্ষুধা তোমাদেরকে ঘর থেকে বের করে এনেছে, অথচ এ নেয়ামত লাভ না করে তোমরা প্রত্যাবর্তন করনি। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২০৩৮]

প্রিয় পাঠক!

ইসলামী উম্মাহর সুমহান এই তিন ব্যক্তিত্বই যদি এ নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হন, তা-ও আবার এমন নেয়ামত, যা একবার মাত্র লাভ হয়েছে, প্রচন্ড ক্ষুধার পর! তা হলে আমরা যারা প্রতিদিন তিন বেলা নিয়মিত আহার করি, তাদের অবস্থা কী হবে?!

আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنْذُ قَدِمَ الْمَدِينَةَ مِنْ طَعَامِ بُرِّ ثَلَاثَ لَيَالٍ تِبَاعًا حَتَّى قُبِضَ.
মুহাম্মাদ -এর পরিবারবর্গ মদীনায় আসার পর থেকে এক নাগাড়ে তিন দিন গমের রুটি পরিতৃপ্ত হয়ে খাননি এবং এ অবস্থায়ই তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৪]

অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা বলেন-
كَانَ فِرَاشُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَدَمٍ وَحَشْوُهُ مِنْ لِيفٍ.
রাসূলুল্লাহ -এর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি এবং তার ভেতরে ছিল খেজুরের ছাল। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৬]

কাতাদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
كُنَّا نَأْتِي أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ وَخَبَّاؤُهُ قَائِمٌ وَقَالَ كُلُوا فَمَا أَعْلَمُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى رَغِيْفًا مُرَقَّقًا حَتَّى لَحِقَ بِاللَّهِ وَلَا رَأَى شَاةٌ سَمِيعًا بِعَيْنِهِ قَطُّ.
আমরা এমন অবস্থায় আনাস ইবনে মালেক -এর কাছে গেলাম যে, তাঁর পাচক [মেহমানদারির জন্য] দাঁড়ানো ছিল। আনাস বললেন, আপনারা খান। আমি জানি না, নবীজী ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত পাতলা রুটি দেখেছেন কি না। আর তিনি কখনও ভুনা বকরির গোশত দেখেননি। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৭]

উরওয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আয়েশা তাঁকে বলেছেন-
إِنْ كُنَّا لَتَنْظُرُ إِلَى الْهِلَالِ ثَلَاثَةَ أَهِلَّةٍ فِي شَهْرَيْنِ وَمَا أُوقِدَتْ فِي أَبْيَاتِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَارُ فَقُلْتُ مَا كَانَ يُعِيْشُكُمْ قَالَتْ الْأَسْوَدَانِ التَّمْرُ وَالْمَاءُ إِلَّا أَنَّهُ قَدْ كَانَ لِرَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِيْرَانُ مِنْ الْأَنْصَارِ كَانَ لَهُمْ مَنَائِحُ وَكَانُوا يَمْنَحُوْنَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَبْيَاتِهِمْ فَيَسْقِيْنَاهُ.
[হে ভাগ্নে] আমরা দু' মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু [এর মধ্যে] রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরগুলোতে আগুন জ্বলত না। আমি বললাম, তা হলে আপনারা দিনাতিপাত করতেন কীভাবে? তিনি [আয়েশা ] বললেন, কালো দু'টি বস্তু; খেজুর আর পানি。

অবশ্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কিছু আনসার প্রতিবেশীর কতগুলো দুধওয়ালা প্রাণী ছিল, তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তা দিত। আমরা তা-ই পান করতাম। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৫৯]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00