📄 ৫. বিলাসিতা নেক আমলে বিমুখ করে
বিলাসিতা মানুষকে নেক আমলের প্রতি বিমুখ করে তোলে। কল্যাণকর কাজে উদাসীন বানিয়ে দেয়। যেমন, আল্লাহ পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে সেসব বিলাসীর কথা বর্ণনা করেছেন, যারা গরমের কারণে জিহাদের অভিযানে বের হতে পারেনি; বরং শীতল ও ছায়াদার স্থানে রয়ে যাওয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছে- فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلْفَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَنْ يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالُوا لَا تَنْفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ
পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রাসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর তাদের ধন- সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, 'এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না।' [হে নবী!] আপনি বলে দিন, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম। যদি তাদের বিবেচনা শক্তি থাকত! [সূরা তাওবা : ৮১]
গরম ও কষ্টের কারণে বিলাসীরা জিহাদের অভিযানে বের হয়নি। অভিযানে বের হওয়া তাদের কাছে কষ্টকর মনে হয়েছে। ফলে তারা পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী ও স্বল্পতম আরামকে চিরস্থায়ী ও পূর্ণ সুখের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। প্রচণ্ডতম গরম, যার মাত্রা পরিমাপ করা যায় না, অর্থাৎ জাহান্নামের ভয়ঙ্কর আগুনের অসহনীয় উত্তাপের পরিবর্তে সেই গরমকে ভয় করেছে, ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে যে গরম থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং সকাল-সন্ধ্যায় যার উত্তাপ উধাও হয়ে যায়。
উল্লেখ্য, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাবুকের যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তখন ছিল প্রচণ্ড গরমের সময়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে সফরে না গিয়ে গৃহের ছায়ায় অবস্থান করা তখন ছিল অত্যন্ত আরামদায়ক। তদুপরি সময়টি ছিল ফল পাকার মৌসুম। সুতরাং, এ সময় কেউ যুদ্ধে গেলে তাকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে যেতে হবে। অধিকন্তু সফরটি ছিল দূরের সফর। তাই তা ছিল আরও বেশি কষ্টকর। এ সকল কারণে মুনাফিকরা তাবুকের যুদ্ধে না গিয়ে বাড়িতেই বসে রইল。
তাই আল্লাহ তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ করেছেন-
قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدَّ حَرًّا
অর্থাৎ হে নবী! আপনি তাদের বলে দিন, তোমরা গরম থেকে বাঁচার জন্য যুদ্ধে না গিয়ে বাড়িতে বসে রয়েছ, অথচ জাহান্নামের আগুন এ থেকে অনেক অনেক বেশি উত্তপ্ত。
জাহান্নামের আগুন কতটা উত্তপ্ত?!
আবু হুরায়রা -র সূত্রে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
نَارُكُمْ جُزْءٌ مِنْ سَبْعِينَ جُزْءًا مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنْ كَانَتْ لَكَافِيَةٌ قَالَ فُضْلَتْ عَلَيْهِنَّ بِتِسْعَةٍ وَسِتِّينَ جُزْءًا كُلُهُنَّ مِثْلُ حَرِّهَا.
তোমাদের আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। বলা হল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! জাহান্নামীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য দুনিয়ার আগুনই তো যথেষ্ঠ ছিল! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জওয়াবে বললেন, দুনিয়ার আগুনের উপর জাহান্নামের আগুনের তাপ আরও ঊনসত্তর গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; প্রত্যেক অংশে তার সমপরিমাণ উত্তাপ রয়েছে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৬৫] [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ২/৪৬৮]
📄 ৬. বিলাসিতা : তাকদীরের বিরুদ্ধে অভিযোগের কারণ
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ ﴿٥﴾ وَ أَمَّا إِذَا مَا ابْتَلهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ
মানুষ তো এমন, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর রিযিক সঙ্কুচিত করে দেন, তখন বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন। [সূরা ফাজর: ১৫-১৬]
এই হচ্ছে বিলাসীদের অবস্থা। যখন আল্লাহ তাদের প্রশস্ত রিযিক ও বিপুল নেয়ামতদানে ধন্য করেন, তখন বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করেছেন; কারণ, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। আর যখন আল্লাহ বিভিন্ন অপছন্দনীয় বিষয় ও অবস্থার মাধ্যমে তাদের পরীক্ষা করেন, তখন তাকদীরের প্রতি অভিযোগের আঙুল তোলে; অধৈর্য হয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও অবস্থায় ধৈর্য হারিয়ে বেসামাল হয়ে পড়ে。
এর কারণ কী?
কারণ, বিলাসিতা。
পক্ষান্তরে তারা যদি সহজ-সরল, অল্পেতুষ্টি ও অনাসক্তির জীবন যাপন করত, তা হলে অবশ্যই সেসব অবস্থা ও পরিস্থিতি নিজেদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারত; মসিবতে সহজেই ধৈর্যধারণ করতে পারত। যেকোনো অবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে পারত। সর্বাবস্থায় আল্লাহ -র প্রশংসা ও শোকর আদায় করতে পারত。
একটু গভীরভাবে লক্ষ করলে আমরা সকলেই বুঝতে পারব- দরিদ্রতার উপর ধৈর্যধারণ করা ধনাঢ্যতার উপর ধৈর্যধারণ করার চেয়ে অনেক সহজ।