📘 বিলাসিতা করবেন না > 📄 ১. বিলাসিতা জালিম ও কাফেরদের বৈশিষ্ট্য

📄 ১. বিলাসিতা জালিম ও কাফেরদের বৈশিষ্ট্য


আল্লাহ কাফেরদের ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন- ﴿وَاتَّبَعَ الَّذِينَ ظَلَمُوا مَا أُتْرِفُوا فِيْهِ وَكَانُوا مُجْرِمِينَ﴾ পাপিষ্ঠরা তো ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিল, যার সামগ্রী তাদেরকে যথেষ্ট দেওয়া হয়েছিল। আসলে তারা ছিল মহা অপরাধী। [সূরা হৃদ: ১১৬]

ইবনে জারীর বলেন, আল্লাহ আমাদের জানাচ্ছেন, পূর্বেকার বহু উম্মত নিজেদের উপর জুলুম করেছে। তারা আল্লাহ-কে অস্বীকার করেছে। দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে যেসব নেয়ামতরাজি ও ভোগ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছিল, তারা সেগুলোর অনুসরণ করেছে। অতঃপর আল্লাহ-র আদেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে; অহংকার ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে। স্বেচ্ছাচারিতার জীবন বেছে নিয়েছে। মানুষকে আল্লাহ-র পথে বাধা দিয়েছে। এ সবই তারা করেছে পার্থিব জীবনে তাদেরকে যে বিপুল নেয়ামতরাজি দান করা হয়েছিল, তার কারণে। [তাফসীরে তবারী: ১৫/৫২৯]

📘 বিলাসিতা করবেন না > 📄 ২. বিলাসিতা পরকালের শাস্তির কারণ

📄 ২. বিলাসিতা পরকালের শাস্তির কারণ


আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا
অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা। তারা সালাত নষ্ট করল এবং কু-প্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। সুতরাং, তারা অচিরেই কু-কর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। [সূরা মারইয়াম : ৫৯]

কা'ব আল-আহবার বলেন, আল্লাহ -র কসম! আমি আল্লাহর কালামে মুনাফিকদের এই গুণগুলো পাই- তারা অধিক শরাব পানকারী, অধিকহারে সালাত তরককারী, পাশা খেলায় অভ্যস্ত, রাতের সালাত [ইশা ও ফজর] অনাদায়ী রেখে শুয়ে থাকে, খাবারে বিলাসিতা করে, জুমার সালাত তরক করে। এরপর তিনি এ কথার সমর্থনে নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন-
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا
অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা। তারা সালাত নষ্ট করল এবং কু-প্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। সুতরাং, তারা অচিরেই কু-কর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। [সূরা মারইয়াম : ৫৯]

পরম সৌভাগ্যের অধিকারী আম্বিয়াকে কেরাম ও তাঁদের অনুসারীগণ- যাঁরা আল্লাহ -র নির্ধারিত সীমায় অবস্থান করেছেন, তাঁর আদেশসমূহ পালন করেছেন এবং নিষেধসমূহ বর্জন করেছেন, আল্লাহ তাঁর এই প্রিয় বান্দাদের আলোচনার পর ইরশাদ করেছেন- فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ সেই সকল প্রিয়জনের পর তাঁদের স্থানে এল তাঁদের অযোগ্য বংশধররা, যারা أَضَاعُوا الصَّلوةَ সালাত বিনষ্ট করল。

দ্বীনের স্তম্ভ ও সবচেয়ে উত্তম আমল সালাতই যারা বিনষ্ট করল, তারা যে অন্যান্য আমলের কোনো গুরুত্বই দিবে না, তা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না。

সালাত বিনষ্ট করার অর্থ কী- উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে মতপার্থক্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল- সম্পূর্ণরূপে সালাত পরিত্যাগ করা। মুহাম্মাদ ইবনে কা'ব আল কুরাযী, ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম ও সুদ্দী এই মত প্রকাশ করেছেন। ইবনে জারীরও এই মতই পছন্দ করেছেন। আর এ কারণেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক উলামা ও আইম্মায়ে কেরাম সালাত ত্যাগকারীদের কাফের বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁরা দলীল হিসেবে জাবের থেকে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীস পেশ করেছেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشَّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ.
বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে সালাত ছেড়ে দেওয়া। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭]

অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
الْعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ الصَّلَاةُ فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ.
আমাদের ও তাদের [কাফের-মুশকিদের] মাঝে [মুক্তির] যে প্রতিশ্রুতি আছে, তা হচ্ছে সালাত। সুতরাং, যে ব্যক্তি সালাত ছেড়ে দিল, সে কুফরী কাজ করল। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬২১]

অপরদিকে কোনো কোনো উলামায়ে কেরাম এ মতের সঙ্গে ভিন্নতা পোষণ করেছেন। তাঁরা বলেন, সালাত বিনষ্ট করার অর্থ হল- সালাত সঠিক ওয়াক্তে আদায় না করা。

এরপর আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ তারা কু-প্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। কু-প্রবৃত্তির অনুবর্তী ও বশীভূত হয়ে তারা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশে নিমগ্ন থাকে এবং তার দ্বারাই তারা শান্তি লাভ করার চেষ্টা করে。

فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا সুতরাং, অচিরেই তারা কু-কর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। অচিরেই তারা কেয়ামত দিবসে মহাক্ষতি ও তাদের অপকর্মের অশুভ পরিণতির সম্মুখীন হবে। [তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৩/১৫৮-১৫৯]

📘 বিলাসিতা করবেন না > 📄 ৩. বিলাসিতা পার্থিব জীবনে ধ্বংস ডেকে আনে

📄 ৩. বিলাসিতা পার্থিব জীবনে ধ্বংস ডেকে আনে


আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন-
وَكَمْ قَصَمْنَا مِنْ قَرْيَةٍ كَانَتْ ظَالِمَةً وَأَنْشَأْنَا بَعْدَهَا قَوْمًا آخَرِينَ ﴿1﴾ فَلَمَّا أَحَسُّوا بَأْسَنَا إِذَا هُمْ مِنْهَا يَرْكُضُونَ ﴿٢﴾ لَا تَرْكُضُوا وَارْجِعُوا إِلَى مَا أُتْرِفْتُمْ فِيهِ وَمَسْكِنِكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْأَلُونَ
আমি কত জনপদের ধ্বংস সাধন করেছি, যার অধিবাসীরা ছিল জালিম এবং তাদের পর সৃষ্টি করেছি অন্য জাতি। অতঃপর যখন তারা আমার আযাবের কথা টের পেল, তখনই তারা সেখান থেকে পলায়ন করতে লাগল। পলায়ন করো না এবং ফিরে এসো, যেখানে তোমরা বিলাসিতায় মত্ত ছিলে ও তোমাদের আবাসগৃহে; সম্ভবত, কেউ তোমাদের জিজ্ঞাসা করবে। [সূরা আম্বিয়া: ১১-১৩]

ইবনে কাসীর বলেন-
لَا تَرْكُضُوا وَارْجِعُوا إِلَى مَا أُتْرِفْتُمْ فِيْهِ
'তোমরা পলায়ন করো না এবং ফিরে এসো, যেখানে তোমরা বিলাসিতায় মত্ত ছিলে', এটা তাদের প্রতি এক ধরনের বিদ্রূপ, পরিহাস ও ধমকি। কেমন যেন তাদের বলা হচ্ছে- আযাব নাযিল হতে দেখে কেন পলায়ন করছ?! পলায়ন করো না; বরং ফিরে এসো যেখানে তোমরা নেয়ামতরাজি, ধনৈশ্বর্য ও বিলাসিতায় মত্ত ছিলে এবং তোমাদের উৎকৃষ্ট আবাসগৃহে; তোমাদের প্রাসাদে! [তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৫/৩৩৫]

অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন-
فَكَأَيِّنْ مِنْ قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ فَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا وَبِئْرٍ مُعَطَّلَةٍ وَ قَصْرٍ مَشِيدٍ
আমি কত জনপদ ধ্বংস করেছি এমতাবস্থায় যে, তারা ছিল গুনাহগার। এই সব জনপদ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং কত কূপ পরিত্যক্ত হয়েছে ও কত সুদৃঢ় প্রাসাদ ধ্বংস হয়েছে। [সূরা হজ : ৪৫]

📘 বিলাসিতা করবেন না > 📄 ৪. বিলাসিতা অন্যদেরও ধ্বংসের কারণ

📄 ৪. বিলাসিতা অন্যদেরও ধ্বংসের কারণ


বিলাসিতার অনিষ্ট ও ক্ষতি কেবল বিলাসীদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা অন্যদেরও গ্রাস করে থাকে। ফলে বিলাসীদের বিলাসিতার কারণে তারাসহ পুরো সম্প্রদায়ে ধ্বংস ও বরবাদি নেমে আসে। যেমন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْ نَهَا تَدْمِيرًا

আর যখন আমি কোনো জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন তার বিত্তশালী লোকদের উদ্বুদ্ধ করি। অতঃপর তারা পাপাচারে মেতে উঠে। তখন সে জনগোষ্ঠীর উপর আদেশ [দণ্ডাজ্ঞা] অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমি তাকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। [সূরা বনী ইসরাঈল: ১৬]

প্রিয় পাঠক!

আপনি নিজেও হয়তো সামাজিক জীবনে লক্ষ করেছেন, বিলাসীদের ক্ষতি ও ধ্বংসাত্মতা শুধু তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সর্বদাই অন্যদের মাঝেও বিস্তার লাভ করতে থাকে। মানুষ তাদের ধনৈশ্বর্য ও সম্পদের প্রাচুর্য দেখে [হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধের কোনোরূপ তোয়াক্কা না করে] তাদের মতো হতে চেষ্টা করে; তাদের অনুসরণ ও অনুগমনের অব্যাহত কসরত চালিয়ে যেতে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00