📄 কিয়ামতের দিন কি নবীজী তিন স্থানে বেহুশ হবেন? (নাউযুবিল্লাহ)
মীযান, আমলনামা ও পুলসিরাতের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে কাউকে বলতে শোনা গেছে, এই তিন স্থানে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত এই তিন স্থানে বেহুশ হয়ে যাবেন (নাউযুবিল্লাহ)।
এ কথার কোনোই ভিত্তি নেই। এ ধরণের কথা বলা মারাত্নক গুনাহের কাজ। বরং হাদীস শরীফে তো এসেছে, হযরত আনাস রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কিয়ামতের দিন আমার জন্য সুপারিশের আবেদন জানালাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (হ্যাঁ) আমি তোমার জন্য সুপারিশ করব। আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আমি (সেদিন) আপনাকে কোথায় খুঁজব। নবীজী বললেন, প্রথমে (পুল) সিরাতের কাছে খুঁজবে। বললাম, সেখানে যদি আপনার সাথে আমার সাক্ষাৎ না হয় তাহলে কোথায় খুঁজব? তিনি বললেন, তাহলে আমাকে মীযানের কাছে খুঁজবে। আমি বললাম, সেখানেও যদি আপনাকে না পাই? নবীজী বললেন, তাহলে হাউজের (হাউজে কাউসার) কাছে খুঁজবে। কারণ আমি সেদিন এই তিন স্থানের কোনো না কোনো স্থানে থাকবই।[-জামে তিরমিযী, হাদীস: ২৪৩৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১২৮২৫]
এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেহুশ হবেন না। হাশরের ময়দানে যখন আল্লাহ তাআলা কঠিন ক্রোধের অবস্থায় থাকবেন। মানুষ সুপারিশের জন্য বড় বড় নবীগণের কাছে যাবে, সকলে অপারগতা প্রকাশ করবেন। অবশেষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আসলে তিনি সুপারিশ করবেন (বিস্তারিত: জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৪৩৪; সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩৩৪০)
হ্যাঁ, একথা ঠিক যে, এ সকল স্থানে বান্দাদের অবস্থা অনেক নাজুক ও ভয়াবহ হবে। কিন্তু এ তিন স্থানে নবীজী বেহুশ হয়ে যাবেন এ কথা একেবারেই অবাস্তব。
📄 নবীজী কি জন্মের সাথে সাথে উঠে আল্লাহকে সিজদা করেছিলেন ?
লোকমুখে প্রসিদ্ধ, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাকি জন্মের পরপরই উঠে আল্লাহ তাআলাকে সিজদা করেছিলেন এবং কাপড় পরতে চেয়েছিলেন। যখন ভূমিষ্ঠ হন তখন ঘরে আলো না থাকায় আকাশের চাঁদ নিচে নেমে এসে মা আমেনার ঘরে আলো দিয়েছিল।
কথাগুলো শুনতে ভালো লাগলেও এর কোনো দালীলিক ভিত্তি নেই। নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনায় তা পাওয়া যায় না। অবশ্য সহীহ হাদীসে এটা পাওয়া যায় যে, “নবীজী বলেছেন, আমি সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ যা আমার মাতা দেখেছিলেন- তাঁর থেকে একটি নূর বের হয়, যার আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে যায়”। এ ধরনের স্বপ্ন নবী-জননীগণ (নবীদের জন্মের আগে) দেখে থাকেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আম্মা তাঁকে জন্মদানের সময় এক নূর দেখতে পান, যার আলোয় সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ তাঁর সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭১৬৩; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৪১৭৫; আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ৬২৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৬৪০৪; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ১৩২২; মুসনাদে বাযযার, হাদীস ৪১৯৯; আলখাসাইসুল কুবরা ১/৮২-৮৩
📄 পৃথিবীর ষাঁড়ের শিং এর উপর
প্রায় মানুষকে একটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা বলতে শোনা যায় যে, পৃথিবী একটি পাথরের উপর। পাথরটি একটি ষাঁড়ের শিং এর উপর। যখন ষাঁড়টি শিং হেলায় তখন পাথর নড়ে ওঠে, সাথে সাথে পৃথিবী প্রকম্পিত হয়। আর এটাই হচ্ছে ভূমিকম্প।
আবার অনেকে এটাকে হাদিস বলে মনে করে থাকে। বাস্তব কথা হল এটা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস নয়। হাদিসের নবীর সাথে এর আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই।
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম আবু হায়্যান রহঃ প্রমুখ হাদীস বিশারদগণ একে বানোয়াট ও জাল বলেছেন। (আল মানারুল মুনীফ:৭৮)
📄 সুলাইমান আঃ এর অনুষ্ঠান
লোকমুখে প্রচুর পরিমাণে প্রসিদ্ধ রযেছে যে, হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম একবার আল্লাহ তালাকে বললেন, হে আল্লাহ! আমি সকল সৃষ্টিকে এক বছর খাওয়াতে চাই। আল্লাহ তাআলা বললেন, হে সুলাইমান! তুমি এটা পারবে না। তখন সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন, হে আল্লাহ! তাহলে এক সপ্তাহ। আল্লাহ বললেনঃ তুমি তা পারবে না। তখন সুলাইমান আলাইহিস সালাম পুনরায় আবার বললেন, হে আল্লাহ! তাহলে অন্তত একদিন। আল্লাহ তাআলা বললেন-হে সুলাইমান! তুমি এটাও পারবে না। একপর্যায়ে আল্লাহ একবেলার অনুমতি দিলেন। অতঃপর সুলাইমান আলাইহিস সালাম জিন ও মানুষকে হুকুম করলেন পৃথিবীতে যত প্রকার খাদ্যশস্য আছে এবং হালাল প্রাণী আছে তা উপস্থিত করো। তারা ছয় মাস পর্যন্ত তা জমা করলো। এরপর বিশাল বিশাল তৈরি করা হলো এবং ছয় মাস পর্যন্ত রান্না করা হলো। এরপর বাতাসকে আদেশ করা হল সে যেন খাদ্যের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। যাতে খাবার নষ্ট না হয়। তারপর খাবারগুলো সুবিস্তৃত জমিনে রাখা হলো। যে জমিনে খাবার রাখা হলো তার দৈর্ঘ্য ছিল দুই মাসের পথ। খাবার প্রস্তুত শেষ হলে, আল্লাহ বললেন, হে সুলাইমান! কোন প্রাণী দিয়ে শুরু করবে? সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন সমুদ্রের প্রাণী দিয়ে। আল্লাহ তাআলা সাগরের একটি বড় মাছকে বললেন যাও সুলাইমান এর অনুষ্ঠান খেয়ে আসো। তখন মাছটি সমুদ্র থেকে মাথা উঠিয়ে বলল, হে আল্লাহর নবী সুলাইমান! আপনি কি অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এইতো খাবার প্রস্তুত, তুমি শুরু করো। তখন সে খাওয়া শুরু করলো এবং খেতে খেতে খাবারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পৌছে গেল। সব খাবার শেষ করে ফেললো। তারপর বললো, আমাকে আরো খাবার দিন। আমি এখনো তৃপ্ত হয়নি। তখন সুলাইমান আলাইহিস সালাম বললেন, তুমি সব খাবার খেয়েছ। তাও তোমার পেট ভরেনি? তখন মাছ বলল মেজবান কি মেহমানের সাথে এভাবে কথা বলে? হে আল্লাহর নবী সুলাইমান! শুনে রাখুন আমার রব আমাকে প্রতিদিন এর তিনগুণ খাবার দেন। আপনি যে খাবার প্রস্তুত করেছেন এগুলো তো আমার একভাগ। আজ আপনার কারণে আমাকে কম খেতে হল। একথা শুনে সুলাইমান আলাইহিস সালাম সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন।
এই ঘটনাটি একটি ভিত্তিহীন ও বানোয়াট ঘটনা। এই ঘটনাটি হাদিস, তাফসির কিংবা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য কোন গ্রন্থে এর কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। তাছাড়া এই ঘটনার মাঝে এমন কিছু বিষয় আছে যা দ্বারা ঘটনাটি ভিত্তিহীন প্রমাণ করে। যা নিম্নরূপ:
প্রথম: একজন নবী এমন উদ্ভট ও অযৌক্তিক আবদার করবেন তা হতে পারে না। এর অর্থ দবারায় আল্লাহর মাখলুক সম্পর্কে তার ন্যূনতম ধারণা নাই। একজন নবীর ব্যাপারে এরকম ধারণা করা সমীচীন নয়।
দ্বিতীয়: আল্লাহ তাআলা নিষেধ করার পরেও একজন নবী এরকম আবদার করতে থাকবেন। আর আল্লাহ তাআলা তাকে এমন অযুক্তিক বিষয়ের অনুমতি দিবেন, তা কিভাবে সম্ভব হয়?
তৃতীয়: পৃথিবীর সকল প্রাণী কী রান্না করা খাবার খায়? ঘটনায় বলা হযেছে, খাবার যে জমিনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়.কেছে তার দৈর্ঘ্য দুই মাসের পথ। মাছটি কি দুই মাসের পথ মুহূর্তেই অতিক্রম করে ফেলল বা এত দীর্ঘ পথ জলের প্রাণী থাকলো কিভাবে?
চতুর্থ: যে মাছের পেটে এত খাবার সংকুলান হয় সে মাছটি কত বড়?
পঞ্চম: শুধু বাতাস প্রবাহিত হওয়াই কি রান্না করা খাদ্য নষ্ট না হওয়ার জন্য যথেষ্ট? এ ধরণের মিথ্যা ও অযুক্তিক ঘটনা বর্ণনা করা যেমন বৈধ নয় তেমন বিশ্বাস করাটা ও মূর্খ ছাড়া অন্য কোন কিছু নয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে এই সমস্ত ঘটনা এবং বিশ্বাস করা থেকে হেফাজত করুন。