📄 সাপের পেটে করে ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.- কে ধোঁকা দেয়
কোনো কোনো মানুষকে বলতে শোনা যায়- ইবলিস যখন আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেওয়ার ইচ্ছা করে তখন সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেয়। ফলে সাপ অভিশপ্ত। কেউ কেউ এভাবেও বলে, ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য সকল প্রাণীকে আবেদন করেছে, কেউ রাযি হয়নি। সাপ রাযি হয়; ইবলিস সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেয়। ফলে আল্লাহ সাপকে অভিশপ্ত করেন। কেউ কেউ এটাও বলে, সাপ আগে চার পা বিশিষ্ট প্রাণী ছিল, এ অপরাধের কারণে আল্লাহ তাকে পা-বিহীন করে দিয়েছেন।
এ সবই ভিত্তিহীন কথা। শয়তান সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করা এবং এ কারণে অভিশপ্ত হওয়া এবং পা-বিহীন প্রাণী হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কিসসা-কাহিনী ইসরাঈলী বর্ণনা-নির্ভর, যার গ্রহণযোগ্যতার কোনো প্রমাণ নেই। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ সকল কিসসা-কাহিনী পাওয়া যায় না। ফলে এগুলো বিশ্বাস করা যাবে না। -আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফাসীর ১৭৮-১৮০; আলবাট্ট ওয়াত তারীখ, মুতাহহির ইবনে তাহের আলমাকদিসী ২/৯৫-৯৬
📄 ইদরীস আ. জান্নাত দেখতে গিয়ে আর বের না হওয়া
ইদরীস আ. সম্পর্কে একটি ঘটনা প্রচলিত আছে যে, তিনি জান্নাত দেখতে গিযে আর জান্নাত থেকে বের হননি। ঘটনাটি এরকম- আল্লাহর নবী ইদরীস আ. ছিলেন মালাকুল মাউতের (রূহ কব্যকারী ফিরিশতার) বন্ধু। ইদরীস আ. তার কাছে জান্নাত-জাহান্নাম দেখানোর আবদার জানালেন। তিনি তাঁকে জাহান্নাম দেখালেন। জাহান্নাম দেখে ইদরীস আ. এত বেশি ভয় পেলেন যে বেহুশ হওয়ার উপক্রম হলেন। তখন মালাকুল মাউত আপন ডানা দিয়ে তাঁকে আগলে নিলেন। তারপর তাঁকে জান্নাত দেখাতে নিয়ে গেলেন। জান্নাত দেখা শেষ হলে মালাকুল মাউত বললেন, দেখা হয়েছে, এবার চলুন। তিনি বললেন, কোথায় যাব। বললেন, যেখান থেকে এসেছেন। তখন ইদরীস আ. বললেন, না, জান্নাতে প্রবেশ যখন করেছি, এখান থেকে আর বের হব না। তখন মালাকুল মাউতকে বলা হল, তুমি কি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাওনি? জান্নাতে একবার যে প্রবেশ করে সে আর বের হয় না বা তাকে আর বের করা হয় না।
এ বর্ণনাটি ভিত্তিহীন।
এতে ইবরাহীম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে খালেদ আলমিসসীসী রয়েছে। ইমাম যাহাবী রাহ. এ রাবী সম্পর্কে বলেন, الحاكم قال ، كذاب رجل هذا موضوعة أحاديثه
এ ব্যক্তি একজন চরম মিথ্যাবাদী। হাকেম রাহ. বলেছেন, তার বর্ণনাগুলো মওযু ও বানোয়াট। (মীযানুল ইতিদাল, তরজমা নং ১২৪; লীসানুল মীযান, তরজমা নং ১৭৮)
📄 হযরত জাবির (রা.) এর দুই শিশু ছেলের বকরি জবাই প্রসঙ্গে
হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত করলেন, ও মেহমানদারী করার জন্য একটি বকরি জবাই করেন। বকরি জবায়ের সময় হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর দুই শিশু ছেলে দাঁড়িয়ে দেখছিল। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বকরী নিয়ে চলে গেলকে দুই ভাই মিলে বকরি জবাই খেলা শুরু করল এবং এক ভাই অপর ভাইকে শুয়ে বকরির মত জবাই করে দিল। এরপর ভয়ে সেও পাহাড় থেকে পরে মারা গেল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পাবেন ভেবে হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ধৈর্যের সাথে ছেলে দুটোর লাশ ঘরের কুঠরীতে নিয়ে কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেতে বসে জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, তোমার ছেলে দুটাকে ডাকো। তিনি বললেন, হুজুর আপনি খান ওরা ঘুমাচ্ছে। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পেরে উঠে গিয়ে কম্বল উঁচু করে ডাকলেন, হে জাবির দুই ছেলে উঠে এসো । তখন ভোরের পাখির মত ছেলে দুটো উঠে এসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চা দুটোকে নিয়ে খেতে লাগলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু অভিভূত হয়ে গেলেন। তার দু'চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, ইত্যাদি। উল্লেখিত ঘটনাটি বানোয়াট ও ভুল। এই ঘটনার কোন ভিত্তি নেই এবং কোন প্রমাণাদি নাই。
📄 হযরত হাসান হুসাইন (রা.) এর ঈদের নতুন জামার জন্য কান্নাকাটি
ঈদের সকাল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কলিজার টুকরা হাসান হোসাইন তাদের মা ফাতেমার কাছে ঈদের নতুন জামার জন্য কান্নাকাটি করেছেন। আশপাশের সমবয়সী অনেকে নতুন জামা পড়ে হাসি ফুর্তি করছে। কিন্তু আমাদের নতুন জামা নেই কেন? মা ফাতিমা কান্না গোপন করে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। অপারগ হয়ে তাদেরকে বললেনঃ তোমরা গোসল করে এসো। আমি তোমাদেরকে নতুন জামার ব্যবস্থা করছি।
বলাবাহুল্য, ব্যবস্থা করার মত তার কাছে কোনো উপায় ছিল না। পুণ্যবতী মা ফাতেমা দুই পুত্রকে গোসল করতে পাঠিয়ে আল্লাহ তায়ালার দরবারে লুটিয়ে পড়লেন। বলতে লাগলেন হে আল্লাহ! হাসান-হোসাইন গোসল করে এসে জামা চাইলে আমি তাদেরকে কি জবাব দিব? তুমি কি চাও আজ ঈদের দিনে তাদের সামনে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হই এবং তারা মিসকিনদের মত ঈদ করুক? আল্লাহ তায়ালা তৎক্ষণাৎ জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে দর্জির দুটো জামা দিয়ে মা ফাতেমার ঘরে পাঠালেন। দরজায় নক করার শব্দ শুনে মা ফাতেমা সিজদা থেকে মাথা তুললেন এবং দর্জির কাচ থেকে জামা দুটো গ্রহণ করলেন। একটি জামা ছিল লাল আরেকটি জামা ছিলো নীল। শিশু হাসান হোসাইন ঘরে ফিরে নতুন জামা পেয়ে আনন্দে বিভোর হয়ে গেল। দুজনে জামা দুটো বুকে জড়িয়ে নবী করিম সাঃ এর ঘরের দিকে দৌড়াতে লাগলো। ডাক দিল, নানা! এই দেখো আমাদের ঈদের নতুন জামা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামা দুটো দেখে কেঁদে উঠলেন এবং লাল জামাটি হযরত হুসাইনকে এবং নীল জামাটি হাসানকে পরিয়ে দিলেন। যা পরবর্তী সময়ে হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত ও হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিষ পানের প্রতি ইঙ্গিত ছিল।
এই ঘটনাটির ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই। যে ঘটনা ঘটেনি বা ঘটেছে বলে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা সূত্রে কিংবা নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে পাওয়া যায় না এই ঘটনা প্রচার করার কোন সুযোগ নেই। এ সমস্ত কথা ভিত্তিহীন ছাড়া আর কিছুই নয়। যার আদৌ পর্যন্ত কোন দলিল প্রমাণ পাওয়া যায়নি。