📄 স্ত্রীকে মাছ কাটতে দিয়ে গোসল করতে যায়
লোকমুখে শোনা যায়- এক ব্যক্তি মেরাজের ঘটনা অস্বীকার করল। একদিন সে স্ত্রীকে মাছ কাটতে দিয়ে নদীতে গোসল করতে যায়। ডুব দিয়ে উঠে দেখে সে মহিলা হয়ে গেছে। সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল এক সওদাগর। সে তাকে দেখে বিবাহ করে। তাদের সন্তান-সন্ততি হয় এবং তারা বড় হয়ে যায়। পরবর্তীতে একদিন সে নদীতে গোসল করতে যায়। ডুব দেওয়ার পর দেখে আবার সে আগের পুরুষ ব্যক্তি হয়ে গেছে। তখন সে বাড়িতে ফিরে দেখে তার স্ত্রী এখনো মাছ কাটছে। স্ত্রীকে সব ঘটনা খুলে বলে এবং তার ভুল বুঝতে পারে। এভাবে তার মেরাজের ঘটনা বুঝে আসে।
এটি একটি অলীক কাহিনী, যা আরেক অসার কথার উপর ভিত্তি করে আবিষ্কার করা হয়েছে। তা হল, কিছু মানুষ মনে করে, মিরাজে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাতাশ বছর অতিবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ মিরাজে তো নবীজী গিয়েছেন এক রাতে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তখন সময় ও সৃষ্টিজগৎকে স্থির করে রেখেছেন। মাঝখান দিয়ে মেরাজে নবীজীর সাতাশ বছর সময় কেটে গেছে।
আবার এই সাতাশ বছর কেন্দ্রিক আরেক অলীক কাহিনীরও আবিষ্কার করা হয়েছে। সেটি হল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের সময় জিবরীল আমীন ও মালাকুল মাউত হাজির হল। তখন নবীজী মালাকুল মাউতকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এত তাড়াতাড়ি কেন এলেন? আল্লাহ তো আমাকে নব্বই বছর হায়াত দিয়েছিলেন। তখন জিবরীল আমীন বললেন, আপনার জীবনের সাতাশ বছর তো মেরাজের রাতেই অতিবাহিত হয়ে গেছে!
তো আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটি ভিত্তিহীন কথাকে প্রমাণ করার জন্য আরেকটি অলীক কাহিনীর আবিষ্কার করা হচ্ছে।
এসকল বর্ণনার কোনো ভিত্তি আমরা পাইনি। মেরাজের সহীহ ও নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতগুলোর কোথাও বলা হয়নি যে, মেরাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কত সময় অতিবাহিত হয়েছিল। কুরআন মজীদ এবং সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছে যে, এই ঘটনাটি রাতের কোনো একটি অংশে সংঘটিত হয়েছিল। তাতে পুরো রাত লেগেছিল নাকি রাতের কিছু অংশ, না চোখের পলকেই ঘটে গিয়েছিল তা সহীহ হাদীসে নেই। হাদীসে এই কথাও নেই যে, আল্লাহ তাআলা তখন সময় ও সৃষ্টিজগতকে স্থির রেখেছিলেন কি না।
অতএব মিরাজের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং তার রহস্য ও তাৎপর্য আলোচনার সময় এইসব অমূলক কথাবার্তার আশ্রয় নেওয়া খুবই নিন্দনীয় ও সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। আল্লাহ তাআলার পরিষ্কার আদেশ-
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
'যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই এর পিছনে পড়ো না।' এরপরও শুধু অনুমান ও ধারণার উপর ভিত্তি করে বলা বড়ই অন্যায়। (আল-কাউসার:সংখ্যা: ০১: রবিউস সানি ১৪৩৮)
📄 সাপের পেটে করে ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.- কে ধোঁকা দেয়
কোনো কোনো মানুষকে বলতে শোনা যায়- ইবলিস যখন আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেওয়ার ইচ্ছা করে তখন সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেয়। ফলে সাপ অভিশপ্ত। কেউ কেউ এভাবেও বলে, ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য সকল প্রাণীকে আবেদন করেছে, কেউ রাযি হয়নি। সাপ রাযি হয়; ইবলিস সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেয়। ফলে আল্লাহ সাপকে অভিশপ্ত করেন। কেউ কেউ এটাও বলে, সাপ আগে চার পা বিশিষ্ট প্রাণী ছিল, এ অপরাধের কারণে আল্লাহ তাকে পা-বিহীন করে দিয়েছেন।
এ সবই ভিত্তিহীন কথা। শয়তান সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করা এবং এ কারণে অভিশপ্ত হওয়া এবং পা-বিহীন প্রাণী হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কিসসা-কাহিনী ইসরাঈলী বর্ণনা-নির্ভর, যার গ্রহণযোগ্যতার কোনো প্রমাণ নেই। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ সকল কিসসা-কাহিনী পাওয়া যায় না। ফলে এগুলো বিশ্বাস করা যাবে না। -আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফাসীর ১৭৮-১৮০; আলবাট্ট ওয়াত তারীখ, মুতাহহির ইবনে তাহের আলমাকদিসী ২/৯৫-৯৬
📄 ইদরীস আ. জান্নাত দেখতে গিয়ে আর বের না হওয়া
ইদরীস আ. সম্পর্কে একটি ঘটনা প্রচলিত আছে যে, তিনি জান্নাত দেখতে গিযে আর জান্নাত থেকে বের হননি। ঘটনাটি এরকম- আল্লাহর নবী ইদরীস আ. ছিলেন মালাকুল মাউতের (রূহ কব্যকারী ফিরিশতার) বন্ধু। ইদরীস আ. তার কাছে জান্নাত-জাহান্নাম দেখানোর আবদার জানালেন। তিনি তাঁকে জাহান্নাম দেখালেন। জাহান্নাম দেখে ইদরীস আ. এত বেশি ভয় পেলেন যে বেহুশ হওয়ার উপক্রম হলেন। তখন মালাকুল মাউত আপন ডানা দিয়ে তাঁকে আগলে নিলেন। তারপর তাঁকে জান্নাত দেখাতে নিয়ে গেলেন। জান্নাত দেখা শেষ হলে মালাকুল মাউত বললেন, দেখা হয়েছে, এবার চলুন। তিনি বললেন, কোথায় যাব। বললেন, যেখান থেকে এসেছেন। তখন ইদরীস আ. বললেন, না, জান্নাতে প্রবেশ যখন করেছি, এখান থেকে আর বের হব না। তখন মালাকুল মাউতকে বলা হল, তুমি কি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাওনি? জান্নাতে একবার যে প্রবেশ করে সে আর বের হয় না বা তাকে আর বের করা হয় না।
এ বর্ণনাটি ভিত্তিহীন।
এতে ইবরাহীম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে খালেদ আলমিসসীসী রয়েছে। ইমাম যাহাবী রাহ. এ রাবী সম্পর্কে বলেন, الحاكم قال ، كذاب رجل هذا موضوعة أحاديثه
এ ব্যক্তি একজন চরম মিথ্যাবাদী। হাকেম রাহ. বলেছেন, তার বর্ণনাগুলো মওযু ও বানোয়াট। (মীযানুল ইতিদাল, তরজমা নং ১২৪; লীসানুল মীযান, তরজমা নং ১৭৮)
📄 হযরত জাবির (রা.) এর দুই শিশু ছেলের বকরি জবাই প্রসঙ্গে
হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত করলেন, ও মেহমানদারী করার জন্য একটি বকরি জবাই করেন। বকরি জবায়ের সময় হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর দুই শিশু ছেলে দাঁড়িয়ে দেখছিল। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বকরী নিয়ে চলে গেলকে দুই ভাই মিলে বকরি জবাই খেলা শুরু করল এবং এক ভাই অপর ভাইকে শুয়ে বকরির মত জবাই করে দিল। এরপর ভয়ে সেও পাহাড় থেকে পরে মারা গেল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পাবেন ভেবে হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ধৈর্যের সাথে ছেলে দুটোর লাশ ঘরের কুঠরীতে নিয়ে কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেতে বসে জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, তোমার ছেলে দুটাকে ডাকো। তিনি বললেন, হুজুর আপনি খান ওরা ঘুমাচ্ছে। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পেরে উঠে গিয়ে কম্বল উঁচু করে ডাকলেন, হে জাবির দুই ছেলে উঠে এসো । তখন ভোরের পাখির মত ছেলে দুটো উঠে এসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচ্চা দুটোকে নিয়ে খেতে লাগলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু অভিভূত হয়ে গেলেন। তার দু'চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, ইত্যাদি। উল্লেখিত ঘটনাটি বানোয়াট ও ভুল। এই ঘটনার কোন ভিত্তি নেই এবং কোন প্রমাণাদি নাই。