📄 আওজ ইবনে উনুক, নূহ আলাইহিস সালাম এবং বিসমিল্লাহর ঘটনা
বিসমিল্লাহর বরকত বিষয়ে মানুষের মুখে একটি কিসসা শোনা যায়- হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জামানায় এক লোক ছিল। সে এত লম্বা ছিল যে, সাগরের তলদেশ থেকে মাছ ধরে সূর্যের কাছে নিয়ে সেদ্ধ করে খেত। আবার সে ছিল অনেক মোটা, কখনও পেট ভরে খেতে পারত না। কিস্তি বানানোর সময় নূহ আলাইহিস সালাম তাকে গাছ এনে দিতে বললেন।
তখন সে কিছু শর্ত দিল। ১. পেট ভরে খেতে দিতে হবে। ২. মন ভরে গোসল করতে দিতে হবে ইত্যাদি। নূহ আলাইহিস সালাম তার শর্ত মেনে নিলেন। সে দুই হাতে অনেক বড় বড় দুটি গাছ এনে দিল। তা দিয়ে নূহ আলাইহিস সালাম কিস্তি বানালেন। তখন সে বলল, আমার শর্ত পূরণ করুন। নূহ আলাইহিস সালাম তাকে দুইটি রুটি দিয়ে বললেন, 'বিসমিল্লাহ' বলে খাও। সে বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া শুরু করল। দেড়টা রুটি খেয়েই তার পেট ভরে গেল, সে আর খেতে পারল না। তারপর হাঁটু পানি দেখিয়ে বললেন, যাও বিসমিল্লাহ বলে এখানে গোসল করতে নামো। সে বিসমিল্লাহ বলে পানিতে নামতেই তার পুরো শরীর পানিতে ডুবে গেল।
এটি একটি অলীক কাহিনী, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। না এমন কোনো ব্যক্তির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব ছিল, না এ ধরনের কিসসার সাথে নূহ আলাইহিস সালামের বা 'বিসমিল্লাহ'-এর ফযীলতের কোনো সম্পর্ক রয়েছে। উপরে উল্লেখিত বিশালদেহী লোকটি আউজ ইবনে উনুক নামে প্রসিদ্ধ। কেউ কেউ উস পালোয়ান বলে। তার কেন্দ্রিক লোকমুখে অনেক কাহিনী প্রসিদ্ধ আছে। সে নাকি তিন হাজার তিনশত তেত্রিশ হাত লম্বা ছিল। নূহ আলাইহিস সালামের প্লাবন নাকি তার হাঁটু পর্যন্তও পৌঁছেনি। সে সমুদ্রের তলদেশ থেকে বিশাল বিশাল মাছ ধরে সূর্যের কাছে নিয়ে সেদ্ধ করে খেত। আবার কেউ কেউ বলে, সে মূসা আলাইহিস সালামের যামানা পর্যন্ত হায়াত পেয়েছে। যাকেই মূসা আলাইহিস সালাম তার কাছে দাওয়াত দিয়ে পাঠাতেন তাকেই ধরে পকেটে ভরে রাখত। একবার মূসা আলাইহিস সালাম তার উপর রুষ্ট হলেন। মূসা আলাইহিস সালাম ছিলেন দশ হাত লম্বা। তাঁর লাঠি ছিল দশ হাত। তিনি লাফ দিতে পারতেন দশ হাত। তো তিনি লাফ দিয়ে নিজ লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করলেন। তা গিয়ে লাগল তার হাঁটুতে। এর ফলে সেখান থেকে পচন ধরল এবং এক পর্যায়ে সে মারা গেল ইত্যাদি। আউজ ইবনে উনুক কেন্দ্রিক এ সব কিচ্ছা-ই অলীক ও ভিত্তিহীন। হাদীসশাস্ত্রবিদগণ এগুলোকে ভিত্তিহীন বলেছেন। ইবনে কাসীর রাহ. এগুলো উল্লেখ করার পর বলেন-
وهذا كذب وافتراء এগুলো মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। -তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরে সূরা মায়েদা, আয়াত ২০-২৬ দ্রষ্টব্য ইবনুল কায়্যিম রাহ. 'আলমানারুল মুনীফ' কিতাবে মূলনীতি আলোচনা করেন যে, কিছু বর্ণনা আছে, যেগুলোর ভিত্তিহীন হওয়ার উপর স্পষ্ট দলীল বিদ্যমান। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি আউজ ইবনে উনুকের বর্ণনার কথা উল্লেখ করেন। -আলমানারুল মুনীফ, পৃ ৭৬ আরও দ্রষ্টব্য : কাশফুল খফা ২/৫১০; আলআসরারুল মারফুআহ ফিল আখবারিল মাউযূআহ, পৃ. ৪৪৭; আসনাল মাতালিব, পৃ. ৩৫২; আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফাসীর, পৃ. ১৮৬
📄 স্ত্রীকে মাছ কাটতে দিয়ে গোসল করতে যায়
লোকমুখে শোনা যায়- এক ব্যক্তি মেরাজের ঘটনা অস্বীকার করল। একদিন সে স্ত্রীকে মাছ কাটতে দিয়ে নদীতে গোসল করতে যায়। ডুব দিয়ে উঠে দেখে সে মহিলা হয়ে গেছে। সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল এক সওদাগর। সে তাকে দেখে বিবাহ করে। তাদের সন্তান-সন্ততি হয় এবং তারা বড় হয়ে যায়। পরবর্তীতে একদিন সে নদীতে গোসল করতে যায়। ডুব দেওয়ার পর দেখে আবার সে আগের পুরুষ ব্যক্তি হয়ে গেছে। তখন সে বাড়িতে ফিরে দেখে তার স্ত্রী এখনো মাছ কাটছে। স্ত্রীকে সব ঘটনা খুলে বলে এবং তার ভুল বুঝতে পারে। এভাবে তার মেরাজের ঘটনা বুঝে আসে।
এটি একটি অলীক কাহিনী, যা আরেক অসার কথার উপর ভিত্তি করে আবিষ্কার করা হয়েছে। তা হল, কিছু মানুষ মনে করে, মিরাজে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাতাশ বছর অতিবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ মিরাজে তো নবীজী গিয়েছেন এক রাতে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা তখন সময় ও সৃষ্টিজগৎকে স্থির করে রেখেছেন। মাঝখান দিয়ে মেরাজে নবীজীর সাতাশ বছর সময় কেটে গেছে।
আবার এই সাতাশ বছর কেন্দ্রিক আরেক অলীক কাহিনীরও আবিষ্কার করা হয়েছে। সেটি হল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের সময় জিবরীল আমীন ও মালাকুল মাউত হাজির হল। তখন নবীজী মালাকুল মাউতকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এত তাড়াতাড়ি কেন এলেন? আল্লাহ তো আমাকে নব্বই বছর হায়াত দিয়েছিলেন। তখন জিবরীল আমীন বললেন, আপনার জীবনের সাতাশ বছর তো মেরাজের রাতেই অতিবাহিত হয়ে গেছে!
তো আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটি ভিত্তিহীন কথাকে প্রমাণ করার জন্য আরেকটি অলীক কাহিনীর আবিষ্কার করা হচ্ছে।
এসকল বর্ণনার কোনো ভিত্তি আমরা পাইনি। মেরাজের সহীহ ও নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতগুলোর কোথাও বলা হয়নি যে, মেরাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কত সময় অতিবাহিত হয়েছিল। কুরআন মজীদ এবং সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীসে বলা হয়েছে যে, এই ঘটনাটি রাতের কোনো একটি অংশে সংঘটিত হয়েছিল। তাতে পুরো রাত লেগেছিল নাকি রাতের কিছু অংশ, না চোখের পলকেই ঘটে গিয়েছিল তা সহীহ হাদীসে নেই। হাদীসে এই কথাও নেই যে, আল্লাহ তাআলা তখন সময় ও সৃষ্টিজগতকে স্থির রেখেছিলেন কি না।
অতএব মিরাজের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং তার রহস্য ও তাৎপর্য আলোচনার সময় এইসব অমূলক কথাবার্তার আশ্রয় নেওয়া খুবই নিন্দনীয় ও সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। আল্লাহ তাআলার পরিষ্কার আদেশ-
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
'যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই এর পিছনে পড়ো না।' এরপরও শুধু অনুমান ও ধারণার উপর ভিত্তি করে বলা বড়ই অন্যায়। (আল-কাউসার:সংখ্যা: ০১: রবিউস সানি ১৪৩৮)
📄 সাপের পেটে করে ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.- কে ধোঁকা দেয়
কোনো কোনো মানুষকে বলতে শোনা যায়- ইবলিস যখন আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেওয়ার ইচ্ছা করে তখন সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেয়। ফলে সাপ অভিশপ্ত। কেউ কেউ এভাবেও বলে, ইবলিস জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য সকল প্রাণীকে আবেদন করেছে, কেউ রাযি হয়নি। সাপ রাযি হয়; ইবলিস সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং আদম-হাওয়া আ.-কে ধোঁকা দেয়। ফলে আল্লাহ সাপকে অভিশপ্ত করেন। কেউ কেউ এটাও বলে, সাপ আগে চার পা বিশিষ্ট প্রাণী ছিল, এ অপরাধের কারণে আল্লাহ তাকে পা-বিহীন করে দিয়েছেন।
এ সবই ভিত্তিহীন কথা। শয়তান সাপের পেটে করে জান্নাতে প্রবেশ করা এবং এ কারণে অভিশপ্ত হওয়া এবং পা-বিহীন প্রাণী হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কিসসা-কাহিনী ইসরাঈলী বর্ণনা-নির্ভর, যার গ্রহণযোগ্যতার কোনো প্রমাণ নেই। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ সকল কিসসা-কাহিনী পাওয়া যায় না। ফলে এগুলো বিশ্বাস করা যাবে না। -আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফাসীর ১৭৮-১৮০; আলবাট্ট ওয়াত তারীখ, মুতাহহির ইবনে তাহের আলমাকদিসী ২/৯৫-৯৬
📄 ইদরীস আ. জান্নাত দেখতে গিয়ে আর বের না হওয়া
ইদরীস আ. সম্পর্কে একটি ঘটনা প্রচলিত আছে যে, তিনি জান্নাত দেখতে গিযে আর জান্নাত থেকে বের হননি। ঘটনাটি এরকম- আল্লাহর নবী ইদরীস আ. ছিলেন মালাকুল মাউতের (রূহ কব্যকারী ফিরিশতার) বন্ধু। ইদরীস আ. তার কাছে জান্নাত-জাহান্নাম দেখানোর আবদার জানালেন। তিনি তাঁকে জাহান্নাম দেখালেন। জাহান্নাম দেখে ইদরীস আ. এত বেশি ভয় পেলেন যে বেহুশ হওয়ার উপক্রম হলেন। তখন মালাকুল মাউত আপন ডানা দিয়ে তাঁকে আগলে নিলেন। তারপর তাঁকে জান্নাত দেখাতে নিয়ে গেলেন। জান্নাত দেখা শেষ হলে মালাকুল মাউত বললেন, দেখা হয়েছে, এবার চলুন। তিনি বললেন, কোথায় যাব। বললেন, যেখান থেকে এসেছেন। তখন ইদরীস আ. বললেন, না, জান্নাতে প্রবেশ যখন করেছি, এখান থেকে আর বের হব না। তখন মালাকুল মাউতকে বলা হল, তুমি কি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাওনি? জান্নাতে একবার যে প্রবেশ করে সে আর বের হয় না বা তাকে আর বের করা হয় না।
এ বর্ণনাটি ভিত্তিহীন।
এতে ইবরাহীম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে খালেদ আলমিসসীসী রয়েছে। ইমাম যাহাবী রাহ. এ রাবী সম্পর্কে বলেন, الحاكم قال ، كذاب رجل هذا موضوعة أحاديثه
এ ব্যক্তি একজন চরম মিথ্যাবাদী। হাকেম রাহ. বলেছেন, তার বর্ণনাগুলো মওযু ও বানোয়াট। (মীযানুল ইতিদাল, তরজমা নং ১২৪; লীসানুল মীযান, তরজমা নং ১৭৮)