📄 মূসা আ.-এর পেটব্যথা ও গাছের পাতা খাওয়ার কাহিনী
মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সমাজে বিভিন্ন বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী শোনা যায়। সে রকম একটি কিচ্ছা হল- একবার মূসা আলাইহিস সালাম-এর পেটব্যথা হল। মূসা আলাইহিস সালাম পেটব্যথার কথা আল্লাহকে বললে আল্লাহ বললেন, অমুক গাছের পাতা খাও। তিনি তা খেলেন এবং সুস্থ হযে গেলেন। পরবর্তীতে আবার মূসা আলাইহিস সালাম-এর পেটব্যাথা হলে তিনি আল্লাহ্র হুকুম ছাড়াই সেই গাছের পাতা খেলেন, কিন্তু এবার আর ব্যথা ভাল হল না। তখন আল্লাহ বললেন, গাছের পাতার কোনো ক্ষমতা নেই। (অর্থাৎ এ গাছের পাতা খেয়ে পূর্বে তুমি ভাল হয়েছ আমার হুকুমে। আর দ্বিতীয়বার যেহেতু আমার হুকুমে খাওনি; নিজে নিজে খেয়েছ, ফলে তা তোমাকে ভাল করতে পারেনি।)
এটি একটি ভিত্তিহীন ঘটনা, যার সাথে মূসা আলাইহিস সালাম-এর কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনার মাধ্যমে তা প্রমাণিত নয়। তাছাড়া এ ঘটনাটি মিথ্যা হওয়ার সাথে সাথে একজন মহান নবীর সাথে বেআদবী এবং তাঁর উপর অপবাদও বটে। এ ধরনের ঘটনা বলা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
বাস্তবে যদি তিনি প্রথমবার আল্লাহর হুকুমে গাছের পাতা খেযে ভালো হন, তাহলে তাঁর দ্বিতীয়বার খাওয়াটাও তো আল্লাহর পূর্বের হুকুমের অধীন। সেটা কীভাবে নিজে নিজে খাওয়া হল? আর গাছের পাতার রোগ ভালো করার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, বরং তা আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো করে- এ কথা কি আল্লাহর নবী মূসা আলাইহিস সালাম-এর অজানা ছিল। (নাউযুবিল্লাহ) একজন নবী সম্পর্কে এটা কত বড় অপবাদ! একজন সাধারণ মানুষও তো একথা মনে করে না যে, অমুক গাছের পাতা খেলে অমুক রোগ ভালো হওয়ার অর্থ ঐ পাতার রোগ ভালো করার নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে। তাহলে একজন নবীর ব্যাপারে এরকম কথা কত বড় বেআদবী!
এছাড়া কোনো বসত্তর মাঝে কোনো ভালো গুণ বা দোষ সেটা তো আল্লাহরই দেওয়া। কোনো ওষুধের মাঝে কোনো রোগ ভালো করার গুণ তো আল্লাহরই দেওয়া। সেটা অস্বীকারের কোনো কারণ নেই। ওষুধ খাওয়াও তো আল্লাহর আদেশের অধীন এবং উক্ত ওষুধের মাধ্যমে রোগ ভালো হওয়া না হওয়াও আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। মুমিন ওষুধ গ্রহণ করে আর আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির প্রার্থনা করে। এর সাথে এ কথার কোনো বিরোধ নেই যে, 'অমুক ওষুধ খেলে জ্বর ভালো হয়।' কারণ ঐ ওষুধের মাঝে জ্বর ভালো করার গুণ আল্লাহরই দেওয়া। আর আল্লাহ চাইলে ঐ গুণ বা শক্তি কাজে লাগে, না চাইলে নয়。
📄 মূসা আ. ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথন : আল্লাহ! আসমান-যমীন-সূর্য এত বড় বড় সৃষ্টি আপনার নাফরমানী করলে কী করবেন?
মূসা আলাইহিস সালাম হলেন, কালীমুল্লাহ-যাঁর সাথে আল্লাহ দুনিয়াতে কথা বলেছেন। মূসা আলাইহিস সালাম ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথন কুরআনে বর্ণিত এক বাস্তব সত্য। কিন্তু একে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বিভিন্ন অবাস্তব অলীক কাহিনী প্রসিদ্ধ হয়েছে। তেমনি এক কাহিনী- একবার মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে বললেন, আল্লাহ! আপনার এত বড় বড় সৃষ্টি- আসমান-যমীন, চাঁদ-সূর্য ইত্যাদি এগুলো যদি আপনার নাফরমানী করে আপনি কী করবেন? আল্লাহ বললেন, হে মূসা! এগুলো কখনোই আমার নাফরমানী করবে না। মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, যদি করে। এভাবে তিন বার বলার পর তৃতীয়বার আল্লাহ বললেন, যদি এগুলো আমার নাফরমানী করে তো আমার সৃষ্ট এক প্রাণী আছে, তাকে হুকুম করব, সে এক লোকমায় সব খেয়ে ফেলবে। মূসা বললেন, সে প্রাণী কোথায় আছে? আল্লাহ বললেন, একটি ময়দানে তা চরে বেড়াচ্ছে। মূসা বললেন, সে ময়দান কোথায়? আল্লাহ বললেন, আমার ইলমে আছে। এটি একটি অলীক কিচ্ছা। এর কোনোই ভিত্তি নেই। এ ধরনের কিচ্ছা বিশ্বাস করা ও বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আল্লাহর কুদরতের কথা বলতে গিয়ে কিছু অসচেতন মানুষকে এগুলো অবলীলায় বলতে শোনা যায়। অথচ এর কোনোই ভিত্তি নেই। শুধু শোনার ভিত্তিতে বলে যাওয়া। আল্লাহর কুদরত তুলে ধরার জন্য আল্লাহর নিদর্শনাবলির কি কোনো অভাব রয়েছে? খোদ মানুষই তো আল্লাহর কুদরত ও নিদর্শনাবলির এক মহাসমুদ্র। হাজার বছর ধরে গবেষণা করে গেলেও আল্লাহর এই এক সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কুদরতের যত নিদর্শন আছে- শেষ হবে না। এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে কারীমে আল্লাহ বলেছেন-
অর্থ-নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে আছে বহু নিদর্শন এবং স্বয়ং তোমাদের অস্তিত্বেও! তবুও কি তোমরা অনুধাবন করতে পার না? -সূরা যারিয়াত (৫১): ২০-২১
📄 হযরত মূসা আঃ কোন নদী দিয়ে পার হয়েছিলেন?
কারো কারো মুখে শোনা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা যে নদী দিয়ে মুসা আলাইহিস সালাম ও তার সাহাবীদেরকে কুদরতীভাবে পার করেছিলেন আর ফেরাউনকে ও তার দলবলকে নিমজ্জিত করেছিলেন তা হচ্ছে নীলনদ। এই ধারণা ঠিক নয়। যেহেতু নীলনদ মিশরের নদী আর ফেরাউন ছিল মিশরের অধিপতি। সম্ভবত এই জন্য এই কথা অনেকের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। ফলে এই ভুল ধারণা ব্যাপকভাবে সয়লাব করে। সঠিক তথ্য হচ্ছে, ফেরাউন যে স্থানে নিমজ্জিত হয়েছিল তা হচ্ছে লোহিত সাগরের উত্তরের অংশ মিশরের-পূর্বে যেখানে সুয়েজ খাল খনন করা হয়েছে, তার সঙ্গে সংলগ্ন দক্ষিনে সমুদ্রের দুটি মাথা পরিলক্ষিত হয়। আমাদের আলোচিত স্থান হচ্ছে পশ্চিমের মাথা। এ স্থান বর্তমানে সুয়েজ উপসাগর নামে পরিচিত।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ ক্রমে মজলুম বনী-ইসরাঈলকে সঙ্গে নিয়ে রাতের বেলা এখানে পৌঁছলেন এবং সাথে থাকা লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত করলেন তখন সমুদ্র আল্লাহ তায়ালার আদেশ তার জন্য পথ করে দিলো। পানি উঁচু টিলার মতো দুই পাশে স্থির হয়ে গেল আর তিনি শুকনা রাস্তা দিয়ে সমুদ্র পার হলেন। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীরা সিনা উপদ্বীপে উপনীত হয়েছিলেন। এদিকে ফেরাউন যখন তার বাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল এবং সে রাস্তা অতিক্রম করতে চাইল তখন আল্লাহ তায়ালা উভয় পার্শ্ব থেকে পানিকে মিলিত হওয়ার আদেশ দিলেন। ফলে তারা সবাই নিমজ্জিত হয়ে গেল।
মূসা আলাইহিস সালাম সেসময় মিশর থেকে সিনা উপদ্বীপে পৌঁছেছিলেন তা একটি স্বীকৃত বিষয়। মিশর থেকে সিনা উপদ্বীপে যাওয়ার পথে যে জলভাগ রয়েছে তা হচ্ছে লোহিত সাগর। নীল নদের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। তাই লোকমুখে নীল নদের ব্যাপারে যে সমস্ত কথা শোনা যায় সেগুলো ঠিক নয়。
📄 জিবরীল আ.-এর জান্নাত মাপার কাহিনী
লোকমুখে একটি কাহিনী প্রসিদ্ধ আছে, 'একবার জিবরীল আলাইহিস সালামের জান্নাত মেপে দেখার ইচ্ছা হল। তিনি আল্লাহ্র কাছে অনুমতি চাইলেন। আল্লাহ অনুমতি দিলেন। জিবরীল আলাইহিস সালামের ডানা আসমান থেকে যমীন সমান। তো এই ডানা দিয়ে তিনি জান্নাত পরিমাপ করার জন্য উড়তে আরম্ভ করলেন। উড়তে উড়তে এক পর্যায়ে তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন এবং তাঁর ডানা ভেঙে গেল, অচল হয়ে গেল। তিনি থেমে গেলেন। তখন আল্লাহ বললেন, হে জিবরীল তুমি তো এখনো জান্নাতের এক খুঁটি (বা চৌকাঠ) থেকে আরেক খুঁটি পর্যন্তও পৌঁছতে পারনি।' কেউ কেউ এভাবেও বলে, '...জিবরীল আলাইহিস সালাম অনুমতি চাইলে আল্লাহ অনুমতি দিলেন। তিনি তিনশত বছর চললেন। তারপর আবার আল্লাহর কাছ থেকে আরো তিনশত বছরের অনুমতি চাইলেন। তিনশত বছর চললেন। তারপর আবার তিনশত বছরের অনুমতি চাইলেন। এভাবে নয়শত বছর চলার পর এক প্রাসাদের সামনে থামলেন। প্রাসাদ থেকে এক হ্রর উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, জিবরীল আমীন! আপনি এখানে কী করছেন? তিনি বললেন, জান্নাত পরিমাপ করছি। হুর বললেন, আপনি নিজেকে কষ্টে ফেলবেন না। আপনি এই নয়শত বছরে আমার রাজ্যই শেষ করতে পারেননি। জিবরীল আ. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? হুর বললেন, আমি একজন সাধারণ মুমিনের স্ত্রী।' এগুলো বানোয়াট কিসসা। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে তা পাওয়া যায় না। সুতরাং এগুলো বিশ্বাস করা ও বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। জান্নাত কত বড়- এ ব্যাপারে কুরআনে কারীমের বহু আয়াত রয়েছে। সহীহ হাদীস রয়েছে, যেগুলো থেকে জান্নাতের বিশালতা অনুমান করা যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন অর্থ- তোমরা একে অন্যের অগ্রণী হওয়ার চেষ্টা কর তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের জন্য, যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততা তুল্য। -সূরা হাদীদ (৫৭): ২১
সহীহ হাদীসে জান্নাতের গাছ সম্বন্ধেই বলা হয়েছে- অর্থ- জান্নাতে এমন গাছ রয়েছে, যার ছায়ায় আরোহী একশ বছর চললেও তার ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২৫১ এছাড়া সবচেয়ে সাধারণ জান্নাতীর জান্নাতের পরিধি বলা হয়েছে অর্থ- দুনিয়া (পৃথিবী) ও তার মত আরো দশ দুনিয়া সমান। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৫৭১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮৬ এসকল আয়াত-হাদীস থেকেই জান্নাতের বিশালতা অনুমান করা যায়। সুতরাং জান্নাতের বিশালতা বোঝানোর জন্য আমরা এসকল আয়াত ও সহীহ হাদীস বলব; কোনো অলীক কাহিনী বলব না。