📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 মূসা আলাইহিস সালাম ও তিন ব্যক্তির কাহিনী

📄 মূসা আলাইহিস সালাম ও তিন ব্যক্তির কাহিনী


লোকমুখে প্রসিদ্ধ- একদিন মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর সাথে কথা বলতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ, যার পরনে শুধু এক টুকরো কাপড়। সে বলল, হে আল্লাহর নবী! আল্লাহকে জিজ্ঞেস করবেন, কীভাবে আমার অভাব দূর হবে। এরপর আরেক ধনী লোকের সাথে সাক্ষাৎ হল, যাকে আল্লাহ অঢেল সম্পদ দিয়েছেন। সে বলল, আল্লাহকে জিজ্ঞেস করবেন, কীভাবে আমার সম্পদ কমবে। আরেক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হল, যার হাতও নেই, পা-ও নেই। সে বলল, আল্লাহকে জিজ্ঞেস করবেন, আমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে। মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ বললেন, প্রথম ব্যক্তিকে (এক টুকরা কাপড়ওয়ালা) বলবে, বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করতে। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে (সম্পদশালী) বলবে, বেশি বেশি না-শোকরি করতে। আর তৃতীয় ব্যক্তিকে বলবে, তোমাকে দিয়ে জাহান্নামের একটা ফুটা বন্ধ করার জন্য তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে (অর্থাৎ, আল্লাহর ফয়সালা মেনে না নেওয়া ও না-শোকরির কারণে সে জাহান্নামে যাবে)।
কেউ কেউ আরেকটু বাড়িয়ে বলে- প্রথম ব্যক্তিকে শুকরিয়া আদায় করার কথা বললে, সে বলল, আমি কিসের উপর শুকরিয়া আদায়: করব? এ কথা বলাতে প্রচণ্ড বাতাস এসে তার পরনে যে এক টুকরো কাপড় ছিল, তাও উড়িয়ে নিয়ে গেল। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে না-শোকরির কথা বললে সে বলল, আল্লাহ আমাকে এত সম্পদ দিয়েছেন- আমি কীভাবে তাঁর না-শোকরি করব। ফলে তার সম্পদ আরো বৃদ্ধি পেল।
শুকরিয়া আদায় করা-না করা বিষয়ে এ কিসসাটি বলা হয়। কিন্তু এটি একটি বানোয়াট কিসসা। এর নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র নেই। আমাদের সমাজে মূসা আলাইহিস সালামের সাথে যুক্ত করে বানানো অনেক কিসসা প্রচলিত আছে। সেই কিসসাসমূহের মধ্যে এটি অনেক প্রসিদ্ধ একটি কিসসা। এটি বলা যাবে না।
শুকরিয়া আদায়ের বিষয়ে কুরআনে কারীমের অসংখ্য আয়াত ও সহীহ হাদীস রয়েছে। আমরা সেগুলোই বলব, এসকল বানোয়াট কিসসা বলব না। (আল-কাউসার:সংখ্যা: ০৯: মুহাররম ১৪৪০)

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 মূসা আ.-এর পেটব্যথা ও গাছের পাতা খাওয়ার কাহিনী

📄 মূসা আ.-এর পেটব্যথা ও গাছের পাতা খাওয়ার কাহিনী


মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সমাজে বিভিন্ন বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী শোনা যায়। সে রকম একটি কিচ্ছা হল- একবার মূসা আলাইহিস সালাম-এর পেটব্যথা হল। মূসা আলাইহিস সালাম পেটব্যথার কথা আল্লাহকে বললে আল্লাহ বললেন, অমুক গাছের পাতা খাও। তিনি তা খেলেন এবং সুস্থ হযে গেলেন। পরবর্তীতে আবার মূসা আলাইহিস সালাম-এর পেটব্যাথা হলে তিনি আল্লাহ্র হুকুম ছাড়াই সেই গাছের পাতা খেলেন, কিন্তু এবার আর ব্যথা ভাল হল না। তখন আল্লাহ বললেন, গাছের পাতার কোনো ক্ষমতা নেই। (অর্থাৎ এ গাছের পাতা খেয়ে পূর্বে তুমি ভাল হয়েছ আমার হুকুমে। আর দ্বিতীয়বার যেহেতু আমার হুকুমে খাওনি; নিজে নিজে খেয়েছ, ফলে তা তোমাকে ভাল করতে পারেনি।)
এটি একটি ভিত্তিহীন ঘটনা, যার সাথে মূসা আলাইহিস সালাম-এর কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনার মাধ্যমে তা প্রমাণিত নয়। তাছাড়া এ ঘটনাটি মিথ্যা হওয়ার সাথে সাথে একজন মহান নবীর সাথে বেআদবী এবং তাঁর উপর অপবাদও বটে। এ ধরনের ঘটনা বলা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
বাস্তবে যদি তিনি প্রথমবার আল্লাহর হুকুমে গাছের পাতা খেযে ভালো হন, তাহলে তাঁর দ্বিতীয়বার খাওয়াটাও তো আল্লাহর পূর্বের হুকুমের অধীন। সেটা কীভাবে নিজে নিজে খাওয়া হল? আর গাছের পাতার রোগ ভালো করার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, বরং তা আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো করে- এ কথা কি আল্লাহর নবী মূসা আলাইহিস সালাম-এর অজানা ছিল। (নাউযুবিল্লাহ) একজন নবী সম্পর্কে এটা কত বড় অপবাদ! একজন সাধারণ মানুষও তো একথা মনে করে না যে, অমুক গাছের পাতা খেলে অমুক রোগ ভালো হওয়ার অর্থ ঐ পাতার রোগ ভালো করার নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে। তাহলে একজন নবীর ব্যাপারে এরকম কথা কত বড় বেআদবী!
এছাড়া কোনো বসত্তর মাঝে কোনো ভালো গুণ বা দোষ সেটা তো আল্লাহরই দেওয়া। কোনো ওষুধের মাঝে কোনো রোগ ভালো করার গুণ তো আল্লাহরই দেওয়া। সেটা অস্বীকারের কোনো কারণ নেই। ওষুধ খাওয়াও তো আল্লাহর আদেশের অধীন এবং উক্ত ওষুধের মাধ্যমে রোগ ভালো হওয়া না হওয়াও আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। মুমিন ওষুধ গ্রহণ করে আর আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির প্রার্থনা করে। এর সাথে এ কথার কোনো বিরোধ নেই যে, 'অমুক ওষুধ খেলে জ্বর ভালো হয়।' কারণ ঐ ওষুধের মাঝে জ্বর ভালো করার গুণ আল্লাহরই দেওয়া। আর আল্লাহ চাইলে ঐ গুণ বা শক্তি কাজে লাগে, না চাইলে নয়。

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 মূসা আ. ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথন : আল্লাহ! আসমান-যমীন-সূর্য এত বড় বড় সৃষ্টি আপনার নাফরমানী করলে কী করবেন?

📄 মূসা আ. ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথন : আল্লাহ! আসমান-যমীন-সূর্য এত বড় বড় সৃষ্টি আপনার নাফরমানী করলে কী করবেন?


মূসা আলাইহিস সালাম হলেন, কালীমুল্লাহ-যাঁর সাথে আল্লাহ দুনিয়াতে কথা বলেছেন। মূসা আলাইহিস সালাম ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথন কুরআনে বর্ণিত এক বাস্তব সত্য। কিন্তু একে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে বিভিন্ন অবাস্তব অলীক কাহিনী প্রসিদ্ধ হয়েছে। তেমনি এক কাহিনী- একবার মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে বললেন, আল্লাহ! আপনার এত বড় বড় সৃষ্টি- আসমান-যমীন, চাঁদ-সূর্য ইত্যাদি এগুলো যদি আপনার নাফরমানী করে আপনি কী করবেন? আল্লাহ বললেন, হে মূসা! এগুলো কখনোই আমার নাফরমানী করবে না। মূসা আলাইহিস সালাম বললেন, যদি করে। এভাবে তিন বার বলার পর তৃতীয়বার আল্লাহ বললেন, যদি এগুলো আমার নাফরমানী করে তো আমার সৃষ্ট এক প্রাণী আছে, তাকে হুকুম করব, সে এক লোকমায় সব খেয়ে ফেলবে। মূসা বললেন, সে প্রাণী কোথায় আছে? আল্লাহ বললেন, একটি ময়দানে তা চরে বেড়াচ্ছে। মূসা বললেন, সে ময়দান কোথায়? আল্লাহ বললেন, আমার ইলমে আছে। এটি একটি অলীক কিচ্ছা। এর কোনোই ভিত্তি নেই। এ ধরনের কিচ্ছা বিশ্বাস করা ও বলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আল্লাহর কুদরতের কথা বলতে গিয়ে কিছু অসচেতন মানুষকে এগুলো অবলীলায় বলতে শোনা যায়। অথচ এর কোনোই ভিত্তি নেই। শুধু শোনার ভিত্তিতে বলে যাওয়া। আল্লাহর কুদরত তুলে ধরার জন্য আল্লাহর নিদর্শনাবলির কি কোনো অভাব রয়েছে? খোদ মানুষই তো আল্লাহর কুদরত ও নিদর্শনাবলির এক মহাসমুদ্র। হাজার বছর ধরে গবেষণা করে গেলেও আল্লাহর এই এক সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কুদরতের যত নিদর্শন আছে- শেষ হবে না। এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে কারীমে আল্লাহ বলেছেন-
অর্থ-নিশ্চিত বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে আছে বহু নিদর্শন এবং স্বয়ং তোমাদের অস্তিত্বেও! তবুও কি তোমরা অনুধাবন করতে পার না? -সূরা যারিয়াত (৫১): ২০-২১

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 হযরত মূসা আঃ কোন নদী দিয়ে পার হয়েছিলেন?

📄 হযরত মূসা আঃ কোন নদী দিয়ে পার হয়েছিলেন?


কারো কারো মুখে শোনা যায় যে, আল্লাহ তা'আলা যে নদী দিয়ে মুসা আলাইহিস সালাম ও তার সাহাবীদেরকে কুদরতীভাবে পার করেছিলেন আর ফেরাউনকে ও তার দলবলকে নিমজ্জিত করেছিলেন তা হচ্ছে নীলনদ। এই ধারণা ঠিক নয়। যেহেতু নীলনদ মিশরের নদী আর ফেরাউন ছিল মিশরের অধিপতি। সম্ভবত এই জন্য এই কথা অনেকের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। ফলে এই ভুল ধারণা ব্যাপকভাবে সয়লাব করে। সঠিক তথ্য হচ্ছে, ফেরাউন যে স্থানে নিমজ্জিত হয়েছিল তা হচ্ছে লোহিত সাগরের উত্তরের অংশ মিশরের-পূর্বে যেখানে সুয়েজ খাল খনন করা হয়েছে, তার সঙ্গে সংলগ্ন দক্ষিনে সমুদ্রের দুটি মাথা পরিলক্ষিত হয়। আমাদের আলোচিত স্থান হচ্ছে পশ্চিমের মাথা। এ স্থান বর্তমানে সুয়েজ উপসাগর নামে পরিচিত।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ ক্রমে মজলুম বনী-ইসরাঈলকে সঙ্গে নিয়ে রাতের বেলা এখানে পৌঁছলেন এবং সাথে থাকা লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত করলেন তখন সমুদ্র আল্লাহ তায়ালার আদেশ তার জন্য পথ করে দিলো। পানি উঁচু টিলার মতো দুই পাশে স্থির হয়ে গেল আর তিনি শুকনা রাস্তা দিয়ে সমুদ্র পার হলেন। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীরা সিনা উপদ্বীপে উপনীত হয়েছিলেন। এদিকে ফেরাউন যখন তার বাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল এবং সে রাস্তা অতিক্রম করতে চাইল তখন আল্লাহ তায়ালা উভয় পার্শ্ব থেকে পানিকে মিলিত হওয়ার আদেশ দিলেন। ফলে তারা সবাই নিমজ্জিত হয়ে গেল।
মূসা আলাইহিস সালাম সেসময় মিশর থেকে সিনা উপদ্বীপে পৌঁছেছিলেন তা একটি স্বীকৃত বিষয়। মিশর থেকে সিনা উপদ্বীপে যাওয়ার পথে যে জলভাগ রয়েছে তা হচ্ছে লোহিত সাগর। নীল নদের প্রশ্ন এখানে অবান্তর। তাই লোকমুখে নীল নদের ব্যাপারে যে সমস্ত কথা শোনা যায় সেগুলো ঠিক নয়。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00