📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 শাদ্দাদের বেহেশত

📄 শাদ্দাদের বেহেশত


সমাজে 'শাদ্দাদের বেহেশত' শিরোনামে বিভিন্ন ধরনের কিসসা প্রচলিত আছে। কেউ কিসসাটি এভাবে বলেন-
শাদ্দাদ বিশাল রাজত্ব ও ধন-সম্পদের মালিক ছিল। তার কওমের নবী তাকে দাওয়াত দিলে সে বলে, ঈমানের বদলে কী মিলবে? নবী বললেন, জান্নাত। তখন সে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে নিজেই জান্নাত বানাতে শুরু করে।
৩০০ বছর ধরে জান্নাত বানায়; তাতে বিভিন্ন ফলের গাছ লাগায়। প্রাসাদ বানায়, নহর খনন করে ইত্যাদি। এরপর সে যখন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে তার বানানো বেহেশতের দিকে রওনা হয়। এক দিন এক রাতের রাস্তা বাকি থাকতেই আল্লাহ তাকে তার সৈন্য-সামন্তসহ ধ্বংস করে দেন।
কেউ বলে, তার বানানো জান্নাত দেখতে যাওয়ার পথে একটি সুন্দর হরিণ দেখতে পায়। হরিণটি শিকার করতে গিয়ে সে একটু দূরে চলে যায়। এ মুহূর্তে মালাকুল মাউত হাযির হয় এবং তার রূহ কবয করে। সে তার বানানো জান্নাত নিজেও দেখতে পারে না।
কেউ বলে, সে তার বানানো বেহেশতে প্রবেশ করার জন্য যখন এক পা দিল, তখন দ্বিতীয় পা রাখার আগেই মালাকুল মাউত তার রূহ কবয করে ফেলে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কারো কারো মুখে এ-ও শোনা যায়, এরপর আল্লাহ তাআলা তার ঐ জান্নাত যমিনে ধ্বসিয়ে দেন; মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। বালুর মধ্যে যে অংশ চিকচিক করে, তা শাদ্দাদের বানানো বেহেশতের ধ্বংসাবশেষ।
এ ছাড়াও শাদ্দাদের বেহেশত কেন্দ্রিক আরো অনেক কথা সমাজে প্রচলিত আছে। তার বেহেশত কীভাবে বানালো, কতজন শ্রমিক লেগেছে, এর দেয়াল কিসের ছিল, ফটক কিসের ছিল, মেঝে কিসের ছিল, ইত্যাদি।
শাদ্দাদের বেহেশত বানানোর কিসসা একেবারেই অবাস্তব ও কাল্পনিক; নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত নয়। যারা এটি উল্লেখ করেছেন তারা ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে তা এনেছেন। এজন্যই ইমাম ইবনে কাসীর ও আল্লামা ইবনে খালদুনসহ আরো অনেকেই এ কিসসাকে অবাস্তব ও কাল্পনিক বলে অভিহিত করেছেন। তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৮০২-৮০৩; মুকাদ্দামাতু ইবনে খালদুন ১/১৭; আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফসীর ২৮২-২৮৪

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 আমি ছাড়া আর কেউ যেন জাহান্নামে না যায়

📄 আমি ছাড়া আর কেউ যেন জাহান্নামে না যায়


লোকমুখে প্রসিদ্ধ- হযরত মূসা আলাইহিস সালামের যামানায় এক বড় আবেদ ছিল। সে একদিন মূসা আলাইহিস সালামকে বলল, আল্লাহর নবী! আপনি আল্লাহকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন- আমি জান্নাতী না জাহান্নামী? মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ বললেন, সে জাহান্নামী।
একথা শুনে সে খুব কাঁদতে লাগল। একপর্যায়ে বলল, ঠিক আছে; তবে আপনি আল্লাহকে বলবেন, আল্লাহ যেন আমার শরীর এত বড় করে দেন যে, কেবল আমার শরীর দ্বারাই জাহান্নাম পূর্ণ হয়ে যায়; আর কারো জাহান্নামে স্থান না হয়। অর্থাৎ শুধু আমি একাই জাহান্নামে যাই আর সকলে জাহান্নাম থেকে বেঁচে যায়।
তার এ কথা শুনে আল্লাহ বললেন, সে যেহেতু সমগ্র মানবজাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর ফিকির করেছে, তো আমি তাকে মাফ করে দিলাম।
অন্যকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচানোর ফিকির করলে আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন- এ কথা বুঝাতে গিয়ে অনেকে এ কিসসাটির অবতারণা করে থাকেন। কিন্তু এটি একটি বানোয়াট কিসসা। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। (আল- কাউসার:সংখ্যা: ০১: রবিউস সানী ১৪৪০)

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 মূসা আলাইহিস সালাম ও তিন ব্যক্তির কাহিনী

📄 মূসা আলাইহিস সালাম ও তিন ব্যক্তির কাহিনী


লোকমুখে প্রসিদ্ধ- একদিন মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর সাথে কথা বলতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ, যার পরনে শুধু এক টুকরো কাপড়। সে বলল, হে আল্লাহর নবী! আল্লাহকে জিজ্ঞেস করবেন, কীভাবে আমার অভাব দূর হবে। এরপর আরেক ধনী লোকের সাথে সাক্ষাৎ হল, যাকে আল্লাহ অঢেল সম্পদ দিয়েছেন। সে বলল, আল্লাহকে জিজ্ঞেস করবেন, কীভাবে আমার সম্পদ কমবে। আরেক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হল, যার হাতও নেই, পা-ও নেই। সে বলল, আল্লাহকে জিজ্ঞেস করবেন, আমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে। মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ বললেন, প্রথম ব্যক্তিকে (এক টুকরা কাপড়ওয়ালা) বলবে, বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করতে। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে (সম্পদশালী) বলবে, বেশি বেশি না-শোকরি করতে। আর তৃতীয় ব্যক্তিকে বলবে, তোমাকে দিয়ে জাহান্নামের একটা ফুটা বন্ধ করার জন্য তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে (অর্থাৎ, আল্লাহর ফয়সালা মেনে না নেওয়া ও না-শোকরির কারণে সে জাহান্নামে যাবে)।
কেউ কেউ আরেকটু বাড়িয়ে বলে- প্রথম ব্যক্তিকে শুকরিয়া আদায় করার কথা বললে, সে বলল, আমি কিসের উপর শুকরিয়া আদায়: করব? এ কথা বলাতে প্রচণ্ড বাতাস এসে তার পরনে যে এক টুকরো কাপড় ছিল, তাও উড়িয়ে নিয়ে গেল। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে না-শোকরির কথা বললে সে বলল, আল্লাহ আমাকে এত সম্পদ দিয়েছেন- আমি কীভাবে তাঁর না-শোকরি করব। ফলে তার সম্পদ আরো বৃদ্ধি পেল।
শুকরিয়া আদায় করা-না করা বিষয়ে এ কিসসাটি বলা হয়। কিন্তু এটি একটি বানোয়াট কিসসা। এর নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র নেই। আমাদের সমাজে মূসা আলাইহিস সালামের সাথে যুক্ত করে বানানো অনেক কিসসা প্রচলিত আছে। সেই কিসসাসমূহের মধ্যে এটি অনেক প্রসিদ্ধ একটি কিসসা। এটি বলা যাবে না।
শুকরিয়া আদায়ের বিষয়ে কুরআনে কারীমের অসংখ্য আয়াত ও সহীহ হাদীস রয়েছে। আমরা সেগুলোই বলব, এসকল বানোয়াট কিসসা বলব না। (আল-কাউসার:সংখ্যা: ০৯: মুহাররম ১৪৪০)

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 মূসা আ.-এর পেটব্যথা ও গাছের পাতা খাওয়ার কাহিনী

📄 মূসা আ.-এর পেটব্যথা ও গাছের পাতা খাওয়ার কাহিনী


মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সমাজে বিভিন্ন বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী শোনা যায়। সে রকম একটি কিচ্ছা হল- একবার মূসা আলাইহিস সালাম-এর পেটব্যথা হল। মূসা আলাইহিস সালাম পেটব্যথার কথা আল্লাহকে বললে আল্লাহ বললেন, অমুক গাছের পাতা খাও। তিনি তা খেলেন এবং সুস্থ হযে গেলেন। পরবর্তীতে আবার মূসা আলাইহিস সালাম-এর পেটব্যাথা হলে তিনি আল্লাহ্র হুকুম ছাড়াই সেই গাছের পাতা খেলেন, কিন্তু এবার আর ব্যথা ভাল হল না। তখন আল্লাহ বললেন, গাছের পাতার কোনো ক্ষমতা নেই। (অর্থাৎ এ গাছের পাতা খেয়ে পূর্বে তুমি ভাল হয়েছ আমার হুকুমে। আর দ্বিতীয়বার যেহেতু আমার হুকুমে খাওনি; নিজে নিজে খেয়েছ, ফলে তা তোমাকে ভাল করতে পারেনি।)
এটি একটি ভিত্তিহীন ঘটনা, যার সাথে মূসা আলাইহিস সালাম-এর কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনার মাধ্যমে তা প্রমাণিত নয়। তাছাড়া এ ঘটনাটি মিথ্যা হওয়ার সাথে সাথে একজন মহান নবীর সাথে বেআদবী এবং তাঁর উপর অপবাদও বটে। এ ধরনের ঘটনা বলা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
বাস্তবে যদি তিনি প্রথমবার আল্লাহর হুকুমে গাছের পাতা খেযে ভালো হন, তাহলে তাঁর দ্বিতীয়বার খাওয়াটাও তো আল্লাহর পূর্বের হুকুমের অধীন। সেটা কীভাবে নিজে নিজে খাওয়া হল? আর গাছের পাতার রোগ ভালো করার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, বরং তা আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো করে- এ কথা কি আল্লাহর নবী মূসা আলাইহিস সালাম-এর অজানা ছিল। (নাউযুবিল্লাহ) একজন নবী সম্পর্কে এটা কত বড় অপবাদ! একজন সাধারণ মানুষও তো একথা মনে করে না যে, অমুক গাছের পাতা খেলে অমুক রোগ ভালো হওয়ার অর্থ ঐ পাতার রোগ ভালো করার নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে। তাহলে একজন নবীর ব্যাপারে এরকম কথা কত বড় বেআদবী!
এছাড়া কোনো বসত্তর মাঝে কোনো ভালো গুণ বা দোষ সেটা তো আল্লাহরই দেওয়া। কোনো ওষুধের মাঝে কোনো রোগ ভালো করার গুণ তো আল্লাহরই দেওয়া। সেটা অস্বীকারের কোনো কারণ নেই। ওষুধ খাওয়াও তো আল্লাহর আদেশের অধীন এবং উক্ত ওষুধের মাধ্যমে রোগ ভালো হওয়া না হওয়াও আল্লাহর ইচ্ছার অধীন। মুমিন ওষুধ গ্রহণ করে আর আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির প্রার্থনা করে। এর সাথে এ কথার কোনো বিরোধ নেই যে, 'অমুক ওষুধ খেলে জ্বর ভালো হয়।' কারণ ঐ ওষুধের মাঝে জ্বর ভালো করার গুণ আল্লাহরই দেওয়া। আর আল্লাহ চাইলে ঐ গুণ বা শক্তি কাজে লাগে, না চাইলে নয়。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00