📄 ইবরাহীম আ. কি আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন?
লোকমুখে প্রচলিত আছে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তখন জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে বললেন, আপনাকে কি আমি কোনো সাহায্য করতে পারি? তিনি বললেন, আপনার কাছে আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তখন জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন, তাহলে আপনি আপনার রবের কাছে প্রার্থনা করুন। তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, যিনি আমার অবস্থা জানেন তাঁর কাছে আমার প্রার্থনা করার প্রয়োজন নেই। তাঁর জানাটাই আমার জন্য যথেষ্ট।
এটি একটি ভিত্তিহীন কাহিনী। ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, এর নির্ভরযোগ্য কোনো সনদ নেই। এটি একটি ভিত্তিহীন কথা। বরং ইবনে আব্বাস রা. থেকে সহীহ বর্ণনায় (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৫৬৪) এসেছে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এই দুআ করেছিলেন- حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ -মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া ১/১৮৩
📄 ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কি ইসমাইল আলাইহিস সালাম ও তার মাকে দাওয়াত খাওয়ার কথা বলে নিয়ে যান?
কোনো কোনো অসতর্ক বক্তাকে বলতে শোনা যায়, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কুরবানী করার জন্য নিয়ে যান, তখন তাকে এবং তার মা'কে দাওয়াত খাওয়া বা বেড়াতে যাওয়ার কথা বলেন। মা তাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে প্রস্তুত করে দেন। পথিমধ্যে গিয়ে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে সত্য কথা খুলে বলেন।
এটি একটি বানোয়াট কিসসা, নির্ভরযোগ্য কোনো বর্ণনায় এমনটি পাওয়া যায় না। কুরআনে কারীমে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্বপ্নের কথা ও ইসমাঈল আলাইহিস সালামের কাছে তা ব্যক্ত করার কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে এজাতীয় কিছু নেই। সুতরাং এ ধরনের ভিত্তিহীন কথা বলার বা বিশ্বাস করার কোনো অবকাশ নেই।
তাছাড়া অবাস্তব কথা বলে সন্তানকে কুরবানীর জন্য নিয়ে যান- এমন কথা বলা একজন নবীর শানে বেআদবী। একজন নবী এমনটি করতে পারেন না এবং এমনটি ঘটেওনি। কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে- فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السِّعْيَ قَالَ يُبْنَى إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرَى * قَالَ يَابَتِ افْعَلُ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصُّبِرِينَ.
অতপর সে যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপণীত হল তখন ইবরাহীম বললেন, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০২
এছাড়াও আরেকটি কথাও লোকমুখে প্রসিদ্ধ- 'ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাঁকে তাঁর প্রিয় বস্তু কুরবানী করতে বলা হচ্ছে।' এ কথাও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায় না। উল্লিখিত কুরআনের আয়াতে স্পষ্ট রয়েছে- ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে যবেহ করতে দেখেছেন। সুতরাং এ কথা বলারও কোনো সুযোগ নেই。
📄 শাদ্দাদের বেহেশত
সমাজে 'শাদ্দাদের বেহেশত' শিরোনামে বিভিন্ন ধরনের কিসসা প্রচলিত আছে। কেউ কিসসাটি এভাবে বলেন-
শাদ্দাদ বিশাল রাজত্ব ও ধন-সম্পদের মালিক ছিল। তার কওমের নবী তাকে দাওয়াত দিলে সে বলে, ঈমানের বদলে কী মিলবে? নবী বললেন, জান্নাত। তখন সে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে নিজেই জান্নাত বানাতে শুরু করে।
৩০০ বছর ধরে জান্নাত বানায়; তাতে বিভিন্ন ফলের গাছ লাগায়। প্রাসাদ বানায়, নহর খনন করে ইত্যাদি। এরপর সে যখন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে তার বানানো বেহেশতের দিকে রওনা হয়। এক দিন এক রাতের রাস্তা বাকি থাকতেই আল্লাহ তাকে তার সৈন্য-সামন্তসহ ধ্বংস করে দেন।
কেউ বলে, তার বানানো জান্নাত দেখতে যাওয়ার পথে একটি সুন্দর হরিণ দেখতে পায়। হরিণটি শিকার করতে গিয়ে সে একটু দূরে চলে যায়। এ মুহূর্তে মালাকুল মাউত হাযির হয় এবং তার রূহ কবয করে। সে তার বানানো জান্নাত নিজেও দেখতে পারে না।
কেউ বলে, সে তার বানানো বেহেশতে প্রবেশ করার জন্য যখন এক পা দিল, তখন দ্বিতীয় পা রাখার আগেই মালাকুল মাউত তার রূহ কবয করে ফেলে ইত্যাদি ইত্যাদি।
কারো কারো মুখে এ-ও শোনা যায়, এরপর আল্লাহ তাআলা তার ঐ জান্নাত যমিনে ধ্বসিয়ে দেন; মাটির সাথে মিশিয়ে দেন। বালুর মধ্যে যে অংশ চিকচিক করে, তা শাদ্দাদের বানানো বেহেশতের ধ্বংসাবশেষ।
এ ছাড়াও শাদ্দাদের বেহেশত কেন্দ্রিক আরো অনেক কথা সমাজে প্রচলিত আছে। তার বেহেশত কীভাবে বানালো, কতজন শ্রমিক লেগেছে, এর দেয়াল কিসের ছিল, ফটক কিসের ছিল, মেঝে কিসের ছিল, ইত্যাদি।
শাদ্দাদের বেহেশত বানানোর কিসসা একেবারেই অবাস্তব ও কাল্পনিক; নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত নয়। যারা এটি উল্লেখ করেছেন তারা ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে তা এনেছেন। এজন্যই ইমাম ইবনে কাসীর ও আল্লামা ইবনে খালদুনসহ আরো অনেকেই এ কিসসাকে অবাস্তব ও কাল্পনিক বলে অভিহিত করেছেন। তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৮০২-৮০৩; মুকাদ্দামাতু ইবনে খালদুন ১/১৭; আলইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাউযূআত ফী কুতুবিত তাফসীর ২৮২-২৮৪
📄 আমি ছাড়া আর কেউ যেন জাহান্নামে না যায়
লোকমুখে প্রসিদ্ধ- হযরত মূসা আলাইহিস সালামের যামানায় এক বড় আবেদ ছিল। সে একদিন মূসা আলাইহিস সালামকে বলল, আল্লাহর নবী! আপনি আল্লাহকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন- আমি জান্নাতী না জাহান্নামী? মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ বললেন, সে জাহান্নামী।
একথা শুনে সে খুব কাঁদতে লাগল। একপর্যায়ে বলল, ঠিক আছে; তবে আপনি আল্লাহকে বলবেন, আল্লাহ যেন আমার শরীর এত বড় করে দেন যে, কেবল আমার শরীর দ্বারাই জাহান্নাম পূর্ণ হয়ে যায়; আর কারো জাহান্নামে স্থান না হয়। অর্থাৎ শুধু আমি একাই জাহান্নামে যাই আর সকলে জাহান্নাম থেকে বেঁচে যায়।
তার এ কথা শুনে আল্লাহ বললেন, সে যেহেতু সমগ্র মানবজাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর ফিকির করেছে, তো আমি তাকে মাফ করে দিলাম।
অন্যকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচানোর ফিকির করলে আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন- এ কথা বুঝাতে গিয়ে অনেকে এ কিসসাটির অবতারণা করে থাকেন। কিন্তু এটি একটি বানোয়াট কিসসা। কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। (আল- কাউসার:সংখ্যা: ০১: রবিউস সানী ১৪৪০)