📄 একটি দরূদ ও ভিত্তিহীন ফযীলত : দরূপদে মাহি
اللهم صل على محمد و علی آل سیدنا و مولانا محمد، خير الخلائق وأفضل البشر، وشفيع الأمم يوم الحشر والنشر....
দরূদে মাহি অর্থাৎ মাছের দরূদ। এটি হাদীসে বর্ণিত দরূদ নয়। হাদীসের নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থে এ দরূদ পাওয়া যায় না। অনির্ভরযোগ্য কিছু অযিফার বইয়ে তা পাওয়া যায়। সেখানে নবীজীর সাথে সম্পৃক্ত করে এর যে ফযীলতের কথা বলা হয় তা সম্পূর্ণ বানোয়াট।
এ দরূদকেন্দ্রিক যে কিচ্ছা বলা হয় তা নিম্নরূপ- এক ব্যক্তি নদীর পাড়ে বসে এ দরূদটি পাঠ করত। একটি রুগ্ন মাছ তা শুনে মুখস্থ করে ফেলে এবং পড়তে থাকে। ফলে সে সুস্থ হয়ে যায়। পরবর্তীতে এক ব্যক্তির জালে ধরা পড়ে। সেটিকে কাটতে চেষ্টা করা হয়, কিন্তু কাটা যায় না। তেলে ভাজতে চেষ্টা করা হয়, তাও সম্ভব হয় না। লোকটি মাছটিকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে আসে এবং ঘটনা খুলে বলে। তখন আল্লাহ মাছের যবান খুলে দেন। সে কারণ বলে দেয়। এ শুনে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা.-কে দরূদটি লিখে রাখার নির্দেশ দেন ইত্যাদি ইত্যাদি। যাইহোক এ দরূদ যেমন হাদীসে নেই তেমনি এ কেন্দ্রিক কিচ্ছাটিও বানোয়াট ও জাল।
📄 বিনা অজুতে দুরুদ পড়া কি জায়েজ নয়?
কিছু কিছু মানুষ মনে করে থাকেন যে, দুরুদ শরীফ পড়তে হলে অজু করা আবশ্যক। এ ধারণা করা ঠিক নয়। দুরুদ শরীফ অযু ছাড়াও পড়া যায় । তাই এই জাতীয় ভুল ধারণার ভিত্তিতে দুরুদ শরীফ পড়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয় । অজু থাক বা না থাক সুযোগ হলেই দুরুদ শরীফ পড়া উচিত । কোরআন মাজীদ পড়ার জন্য তো অযু আবশ্যক নয়, তবে তা স্পর্শ করার জন্য অজু করা আবশ্যক। তাই কোরআন মাজীদ মুখস্থ পড়ার ক্ষেত্রে ওযু করা অপরিহার্য নয়, তবে যেহেতু অনেক মানুষ মুখস্ত করতে পারেনা তাই দেখে পড়তে হয় এক্ষেত্রে তাদের জন্য অজু করা আবশ্যক। কেননা দেখে পড়তে হলে স্পর্শ করতে হয়। তবে গোসল ফরজ হওয়া অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত করা জায়েজ নেই। এজন্য কোন ওজর ছাড়া এই অবস্থায় দীর্ঘ সময় থাকাও অনুচিত। খুব তাড়াতাড়ি গোসল করে পবিত্র অর্জন করা উচিত। এছাড়া অযু থাক বা না থাক শরীর পবিত্র থাকলে মুখস্ত কোন সূরা বা আয়াত তেলাওয়াত করা যাবে। যেখানে অযু ছাড়া কুরআনে কারীমের আয়াত বা সুরা তেলাওয়াত করা যাবে তাহলে সেখানে ওযু ছাড়া দুরুদ পড়তে সমস্যা কি? এটি একটি ভুল ধারণা। তাই অজু থাক বা না থাক দুরুদ শরীফ পড়াতে কোন সমস্যা নেই। অজু নেই মনে করে দুরুদ শরীফ পড়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। যখনই সুযোগ হয় দুরুদ শরীফ পাঠ করা।
📄 দুআয়ে মা’ছুরা কি শুধু ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী যালামতু নাফসী
নামাযের শেষ বৈঠকে দরূদ শরীফের পর দুআয়ে মা'ছুরা পড়তে হয়। এখানে কোন একটি মাসনূন দুআ পড়লেই হয়। একাধিক দুআও পড়া যায়। হাদীস শরীফে এসেছে-
ثم يتخير من المسألة ما شاء (অর্থ) অতঃপর (দরূদ পাঠের পর) যে দুআ ইচ্ছা পড়বে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪০২)
এক্ষেত্রে বেশি প্রসিদ্ধ হল, 'আল্লাহুম্মা ইন্নী যালামতু নাফসী...' এই দুআটি। ফলে অনেকেই মনে করেন দুআ মা'ছুরা শুধু এটিই। এটি ছাড়া এক্ষেত্রে অন্য কোন দুআ পড়লে হবে না। আসলে বিষয়টি তা নয়। বরং এক্ষেত্রে কুরআন-হাদীসের যে কোন দুআই পড়া যায় এবং কুরআন-হাদীসের যে কোন দুআর মাধ্যমেই এ সুন্নত আদায় হয়ে যায়।
উল্লেখিত, দুআয়ে মা'ছুর (বহুবচনে আদইয়ায়ে মা'ছুরা) শব্দের অর্থ বর্ণিত দুআ। অর্থাৎ আলকুরআনুল কারীম ও হাদীস শরীফে যেসব দুআর তালীম দেয়া হয়েছে।
হাদীস শরীফে এক্ষেত্রে পড়ার আরো দুআ বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্য থেকে একটি হল,
اللهم إني أعوذ بك من عذاب القبر وأعوذ بك من فتنة المسيح الدجال وأعوذ بك من فتنة المحيا والممات، اللهم إني أعوذ بك من المأثم والمغرم
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কবরের আযাব থেকে, দাজ্জালের ফিৎনা থেকে। আশ্রয় প্রার্থনা করছি জীবন ও মৃত্যুর ফিৎন থেকে। হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় চাচ্ছি গুনাহ ও ঋণ থেকে। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৮৩২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৫৮৯)
আর আমাদের মাঝে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ যে দুআ তা আবু বকর রা.-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে শিখিয়েছেন।
হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবু বকর রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আবেদন করলেন-আমাকে একটি দুআ শিখিয়ে দিন, যা আমি নামাযে পড়ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই দুআ কর- اللهم إني ظلمت نفسي ظلما كثيرا ولا يغفر الذنوب إلا أنت فاغفر لي مغفرة من عندك وارحمني إنك أنت الغفور الرحيم অর্থ: ইয়া আল্লাহ! আমি নিজের উপর অনেক জুলুম করেছি। আর আপনি ছাড়া গুনাহ মাফকারী আর কেউ নেই। আপনি নিজ অনুগ্রহে আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার প্রতি রহম করুন। নিঃসন্দেহে আপনিই ক্ষমাকারী, করুণাময়। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৮৩৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭০৫)
📄 আগের উম্মত কি নবীর মাধ্যম ছাড়া দুআ করতে পারত না?
কিছু মানুষের ধারণা আগের উম্মতগণ নবীর মাধ্যম ছাড়া সরাসরি আল্লাহর কাছে দুআ করতে পারত না। এটি একটি অমূলক ধারণা। কুরআন হাদীসে এর কোন ভিত্তি পাওয়া যায় না। বরং এর উল্টোটা পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি তাদেরকে বলুন যে,) আমি এত নিকটবর্তী যে, কেউ যখন আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি (তার ডাকে সাড়া দিই)- সূরা বাকারা ২:১৮৬
এ আয়াতে বর্তমান উম্মত ও পূর্ববর্তী উম্মতের মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। এছাড়া পূর্ববর্তী উম্মতের সরাসরি দুআ করার নযীর কুরআনেই বিদ্যমান। এখানে কয়েকটি পেশ করা হল-
১. মূসা আলাইহিস সালাম-এর উম্মত ফিরাউনের স্ত্রীর দুআ: (তরজমা) আল্লাহ মুমিনদের জন্য ফিরাউনের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, যে দুআ করেছিল: ‘হে আমার প্রতিপালক! তোমার সন্নিধানে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ কর এবং আমাকে উদ্ধার কর ফিরাউন ও তার দুষ্কৃতি থেকে এবং আমাকে উদ্ধার কর জালিম সম্প্রদায় হতে।’-সূরা তাহরীম ৬৬ : ১১
২. আসহাবে কাহফ তথা তৎকালীন নবীর উম্মতের দুআ : (তরজমা) যখন যুবক দলটি (আসহাবে কাহফ) গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং (আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করে) বলেছিল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের প্রতি আপনার নিকট থেকে বিশেষ রহমত নাযিল করুন এবং এ পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য কল্যাণকর পথের ব্যবস্থা করে দিন।’-সূরা কাহফ ১৮ : ১০
৩. ইমরানের স্ত্রীর দুআ : (তরজমা) যখন ইমরানের স্ত্রী (আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করে) বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার গর্ভে যা আছে তা একান্ত তোমার জন্য উৎসর্গ করলাম। সুতরাং তুমি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল কর, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’-সূরা আলে ইমরান ৩ : ৩৫