📄 ‘কবুল’ শব্দ উচ্চারণ না করলে কি বিবাহ সহীহ হয় না?
কিছু কিছু মানুষের ধারণা, বিবাহের ইজাব পেশ করার পর পাত্র যদি 'কবুল' শব্দ উচ্চারণ না করে তাহলে বিবাহ সহীহ হবে না। এ ধারণা ঠিক নয়। আসল বিষয় হল সম্মতি জ্ঞাপন করা। এখন কবুল শব্দ ছাড়া যদি 'আলহামদুলিল্লাহ আমি গ্রহণ করলাম' বা এজাতীয় শব্দ উচ্চারণ করে তাহলেও সেটা সম্মতি বোঝাবে এবং বিবাহ সহীহ হবে। সুতরাং 'কবুল' শব্দই উচ্চারণ করতে হবে- এ ধারণা ভুল।
📄 স্ত্রীকে বোন,স্বামীকে ভাই বলে সম্বোধন করা যাবে কি?
অনেক মানুষকে দেখা যায় মহব্বত করে স্ত্রীকে বোন, স্বামীকে ভাই বলে সম্বোধন করা ঠিক নয়। কেননা হাদীস শরীফে এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীস শরীফে এসেছে,
عَنْ أَبِي تَمِيمَةَ الْهُجَيْمِيِّ ، أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِامْرَأَتِهِ: يَا أُخَيَّةٌ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أُخْتُكَ هِيَ؟ فَكَرِهَ ذَلِكَ وَنَهَى عَنْهُ.
এক লোক তার স্ত্রীকে বোন বলে ডাকলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনতে পেয়ে তা অপছন্দ করেন এবং তাকে এভাবে ডাকতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২২০৪)
সুতরাং এমন সম্বোধন থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে এ কারণে বৈবাহিক সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হবে না। আদ্দুররুল মুখতার ৬/৪১৮; ফাতহুল কাদীর ৪/৯১; আলবাহরুর রায়েক ৪/৯৮
তাছাড়া এরূপ সম্বোধন দ্বারা মানুষ ধোঁকায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।-আপ কে মাসায়েল-৮/১২০
উল্লেখ্য, আপনার প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্কের কোনো ক্ষতি নাহলেও এক্ষেত্রে বিশেষত স্ত্রীকে বোন সম্বোধন করা দ্বারা একটি ক্ষতির আশঙ্কাও কিন্তু আছে তাহল, স্বামী যদি স্ত্রীকে বোন সম্বোধন করা দ্বারা এরূপ নিয়ত করে যে, আমার বোন যেমন আমার জন্য হারাম, তুমিও তেমনি আমার জন্য হারাম; তাহলে 'যিহার' হয়ে যায়। এমতাবস্থায় স্ত্রী হারাম হয়ে যায় যতক্ষণ না স্বামী 'কাফফারা' আদায় করে। আর যিহারের কাফফারা হচ্ছে-
ধারাবাহিকভাবে দু'মাস ছিয়াম পালন করা বা ৬০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো।- সুরা আল-মুজাদালাহ-০৩
সুতরাং এজাতীয় অনাকাঙ্ক্ষিত অহেতুক ঝামেলা এড়াতে স্ত্রীকে বোন সম্বোধন করা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।
📄 ধর্মের বাপ/ ভাই
আমাদের দেশের প্রায় জায়গাতেই দেখা যায় ধর্মের বাপ কিংবা ধর্মের ভাই বানানোর একটা প্রচলন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায় কারো বাপ না থাকলে কিংবা ভাই না থাকলে গাইরে মাহরাম কোন ব্যক্তিকে বাপ কিংবা ভাই হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যাকে ধর্মের বাবা বানানো হয়েছে তার সাথে নিজের বাপ কিংবা ভাইয়ের মতো আচরণ করা হয়। পুরুষ মহিলার ক্ষেত্রে পর্দার কোন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ এ ক্ষেত্রে পর্দা করা ফরজ। এমনিভাবে একজন গায়রে মাহরাম ব্যক্তির সাথে যে সমস্ত আচার-আচরণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেগুলো এক্ষেত্রে মানতে হবে না বলে মনে করা হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। শরীয়তের নির্দেশিত গণ্ডির বাইরে নিজের মত কাউকে বাপ কিংবা ভাই বানিয়ে নিলেই সে বাপ ভাই হয়ে যায় না। কোনো কারণবশত কাউকে মুরুব্বী হিসেবে গ্রহণ করতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এর দ্বারা শরীয়তের বিধান লংঘন করার অধিকার কারো নেই। এ ভিত্তিতে অনেকে ধর্মের বাপ ভাইকে উত্তরাধিকারের অংশীদারও মনে করে থাকে। এর কোনো ভিত্তি নেই। এগুলো থেকে বেঁচে থাকা সকল মুমিনের জন্য আবশ্যক।
📄 বৌভাত ও মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান
বর্তমান আরেকটি ভ্রান্ত প্রথা হল বৌভাত ও মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান করা। অনেকে মনে করে এটা না হলে তো বিবাহই হবে না। এমনও দেখা যায় মেয়ের পিতার অনুষ্ঠান করার সামর্থ্য না থাকায় মেয়ের বিবাহ পর্যন্ত ভেঙ্গে যায়। আফসোসের বিষয়! ইসলামী শরীয়তে বরযাত্রীর অনুষ্ঠানের নামে কোন অনুষ্ঠানই নেই। আমাদের দেশে প্রচলিত নিয়ম হলো বরের যাত্রা থাকবে কমপক্ষে ১০০ কিংবা ২০০ জন। আর যদি বড়লোক হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই যত বেশি যেতে পারে। তাদের জন্য উন্নত খানাপিনার আয়োজন করা মেয়ের পিতার কাঁধে পড়বে। সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক প্রথা অনুযায়ী মেয়ের পিতা বাধ্য হয়ে তাদেরকে খানাপিনার আয়োজন করে থাকেন। অনেক সময় খানার সমস্যা হলে লোকেরা অসন্তুষ্ট হয়ে যায়; বরং তার সামর্থ্য থাকলেও তার বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হবে না। এটি শরীয়ত পরিপন্থী কাজ। তবে অল্প সংখ্যক লোক পরামর্শ কিংবা সাহায্যকারী হিসেবে যেতে পারে। মেয়ের পিতা তাদেরকে তার সমর্থন অনুযায়ী খানাপিনা করাবেন।
বর্তমান যদি ছেলের পিতা-মাতা ইসলামী শরীয়ত পরিপূর্ণভাবে পালন করতেন, তাহলে এ প্রচলনটি অবশ্যই বন্ধ হয়ে যেত এবং মেয়ের পিতা মাতার উপর বোঝাস্বরূপ কোন জুলুম অর্পিত হতো না। এমনকি মেয়েদেরও দীর্ঘদিন অবিবাহিতা হয়ে ঘরে বসে থাকতে হতো না।
পরিতাপের বিষয়! মুসলিম বলে সবাই দাবি করি, অথচ ইসলামিক নিয়ম কানুন মানার ব্যাপারে আমরা উদাসীন। মেয়ের পিতা মাতার তো এমনিতেই দুঃখের সীমা নেই। তাদের আদরের কলিজার টুকরাটি আপনাদের কাছে তুলে দিচ্ছে, আর আমরা তাদের কাঁদে আরও বাড়তি জুলুম ও ঝামেলা চাপিয়ে দিচ্ছি। মুসলিম হিসাবে এগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল এ সমস্ত বিষয় থেকে যতটুকু সম্ভব বেঁচে থাকা এবং মেয়ের পিতা মাতার উপর সহানুভূতিশীল হয়ে উঠা ।
যদিও এক্ষেত্রে অনেককে দেখা যায় তারা চায় এ সমস্ত কাজ থেকে বিরত থাকতে অথচ কিছু নামধারী মুসলিম আছে যারা তাদেরকে নিয়ে উপহাস ও বিদ্রুপ করে বেড়ায়। নিজে আমল করতে পারেন না ভালো কথা, কিন্তু যারা করে তাদেরকে নিয়ে উপহাস করা খুবই নিন্দনীয় বিষয়।
উচিত হলো, বরের বাড়িতে ওলিমা করা যেটা সুন্নত। ওলিমাকে বৌভাত না বলে ওলিমা বলা উত্তম। এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত মেহমানদেরকে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়, তারা স্বেচ্ছায় আসে না। এখন তাদেরকে দাওয়াত খাওয়ানোর পর তাদের কাছ থেকে উপহার আদায় করা জায়েজ হবে না। কেননা এটা পরোক্ষভাবে খাওয়ার প্রতিদান উসুল করা হচ্ছে বলে বুঝা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। কাজেই এ ধরনের উপহার আদায় করা অনুচিত। স্বামী প্রথম রাতে স্ত্রীর সাথে থাকার পর নিজের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, ফকির-মিসকিন এবং মেয়ের পক্ষের আত্মীয়দের দাওয়াত করে খানা খাওয়াবে এটাই ওলীমা। তবে খ্যাতি অর্জনের জন্য এর চেয়ে বেশি আয়োজন করা বৈধ নয়। (রাহে সুন্নত:৩০২)