📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 মসজিদে নববীতে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়াকে জরুরী মনে করা

📄 মসজিদে নববীতে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়াকে জরুরী মনে করা


মসজিদে নববীতে এক রাকাত নামাজ ৫০ হাজার রাকাত নামাজের সমতুল্য। হজ্বের সময় মসজিদে নববীতে উপস্থিত হওয়া এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজা মোবারক গিয়ে সরাসরি সালাম করার সৌভাগ্য অর্জন এর জন্য মদিনা-মনোয়ারা উদ্দেশ্যে সফরের ধারা হাজী সাহেবানদের মধ্যে রয়েছে, যা অতি উত্তম আমল। কিন্তু সেখানে অবস্থানের জন্য শরীয়তের পক্ষ থেকে কোনো মেয়াদ নির্ধারিত নেই। অর্থাৎ এটা অপরিহার্য নয় যে, সেখানে কমপক্ষে আট দিন থাকতে হবে। কোন কোন মানুষ আট দিন অবস্থানকে এত আবশ্যক মনে করে যে, এর জন্য নিজেকে, সফরসঙ্গীদের এবং কাফেলার আমিরকে কষ্ট ফেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। অথচ তা শরীয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত কোনো মেয়াদ নির্দিষ্ট করা নেই যে, তা পূরণ করা আবশ্যক মনে করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মুসনাদে আহমদ (৩/১৫৫: পৃঃ) ও তাবরানী শরীফ এ একটি বর্ণনা আছে যে, কেউ যদি এই মসজিদে অর্থাৎ মসজিদে নববীতে ধারাবাহিকভাবে চল্লিশ দিন নামাজ আদায় করে তাহলে সে জাহান্নামের আজাব ও নিফাক থেকে মুক্তি পাবে। এই বর্ণনার কারণে লোকেরা আটদিন অবস্থান করা আবশ্যক মনে করে। অথচ উক্ত হাদীসের সনদের বিচারে দুর্বল। উপরোক্ত এই হাদীসে শরীফের প্রসিদ্ধ মতন যা তিরমিজী শরীফে রয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য চল্লিশ দিন জামাতে তাকবিরে উলার সাথে নামাজ আদায় করে তার জন্য দুটো পরোয়ানা লেখা হয়, জাহান্নাম থেকে মুক্তির পরোয়ানা ও নিফাক থেকে মুক্তির পরোয়ানা। (জামে তিরমিজি:২৪১)

অতএব স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এই ফজিলত যে কোন মসজিদে জামাতে শামিল হওয়ার দ্বারা হাসিল হতে পারে।

বিষয়টি ভুল না বুঝার অনুরোধ করবো। ফজিলত এর ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীস শর্তসাপেক্ষে আমল যোগ্য তা সবারই জানা আছে। কিন্তু একই সাথে এটাও সত্য যে, দুর্বল হাদীস দ্বারা শরীয়তের কোন বিধান প্রমাণ হয় না এবং কোনো মেয়াদ নির্ধারিত হয় না। এজন্য সহজভাবে সেখানে আট দিন থাকার সুযোগ হয়ে গেলে ভালো। কিন্তু একে আবশ্যক মনে করা কিংবা অপরিহার্য বিধানের মত এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া যাতে, কষ্ট ও পেরেশানিতে পড়ে যেতে হয় কিংবা পরস্পর মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়, যা ঠিক নয়। প্রকৃত করণীয় হচ্ছে হারাম শরীফে যতদিন থাকার সুযোগ হয় চেষ্টা করবে মসজিদে হারামে ও মসজিদে নববীতে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, আট দিন থাকতেই হবে এটাকে শরীয়তের আবশ্যক কিংবা অপরিহার্য বিষয় মনে না করা।

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 তাওয়াফের সাত চক্করের জন্য কি আলাদা আলাদা দুআ রয়েছে?

📄 তাওয়াফের সাত চক্করের জন্য কি আলাদা আলাদা দুআ রয়েছে?


হজ্জের সময় প্রতি বছর অনেক মানুষকে দেখা যায় মাতাফে তাওয়াফ করার সময় হাতে পুস্তিকা নিয়ে তাতে লেখা তাওয়াফের প্রতি চক্করের নির্দিষ্ট দোয়া জোরে পড়তে থাকে। অনেক মানুষ অশুদ্ধভাবেও পড়ে। আর অধিকাংশ মানুষ অর্থ না বুঝে শুধু মৌখিকভাবে উচ্চারণ করতে থাকে। বহু মানুষ এমনও আছে যারা মুখস্থ কিংবা পুস্তিকা দেখে কোনো ভাবেই তা পড়তে পারে না। তারা শুধু এই দুয়াগুলো পড়ার জন্য দলবেঁধে এমন কারও সঙ্গে তাওয়াফ করে যারা পুস্তিকা দেখে শুদ্ধভাবে হলেও এ দোয়া গুলো পড়তে পারে। আর অন্যরা যতটুকু সম্ভব তার অনুসরণ করতে চেষ্টা করে।

এতোখানি শ্রম স্বীকারের পিছনে তাদের এই ধারণা কাজ করে যে, তাওয়াফের প্রতি চক্করে শরীয়তের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন দুআ নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে, যা পড়া আবশ্যক কিংবা গুরুত্বের সাথে পড়া উচিত। আর এতে বিশেষ সাওয়াব ও উপকারিতা রয়েছে।

এ ধারণা ঠিক নয়। বিভিন্ন লিফলেট কিংবা পুস্তিকায় তাওয়াফের প্রত্যেক করার সময় পড়ার জন্য যে সমস্ত দোয়া লিখিত আছে সেগুলোর শব্দ অর্থ সঠিক হোক কিংবা ভুল হোক, কোরআন-হাদিসের দোয়া হোক বা কারো বানানো হোক, সেগুলো তাওয়াফের দোয়া নয়। অর্থাৎ এগুলো তাওয়াফের সময় পড়া সুন্নত বা মুস্তাহাবও নয়। তাওয়াফের সময় পড়ার জন্য যে একটি দোয়া হাদীস শরীফে এসেছে তা খুবই সংক্ষিপ্ত যেমন-
ربنا اتنا في الدنيا حسنة وفي الآخرة حسنة وقنا عذاب النار .

এই কোরআনের দোয়া গোটা তাওয়াফের সময় করা যায়। বিশেষ করে রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদ এর মধ্যবর্তী স্থানে দোয়া করা উচিত। তেমনিভাবে অন্তরে যে, হাজতে থাকে তা আল্লাহতালার কাছে প্রার্থনা করা যায়। এটাই আল্লাহ তালার কাছে পছন্দনীয়। বান্দা যে ভাষাতেই তা প্রার্থনা করুক না কেন।

কত ভালো হতো, যদি আমাদের হাজী সাহেবরা এই মাসায়েল ভালোভাবে অনুধাবন করতেন এবং সে মোতাবেক আমল করতেন। তাহলে তাওয়াফের সময় এই দলবদ্ধতার কারণে অন্য হাজীদের কষ্ট হতো না। আর তাদের উচ্চ আওয়াজ অন্যদের মন সংযোগে কোন প্রকার ব্যাঘাত ঘটত না।

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 মিনার তিনটি জামরা কি তিন শয়তান?

📄 মিনার তিনটি জামরা কি তিন শয়তান?


অনেক মানুষ ভুল ধারণা পোষণ করে যে, তিন জামরা হল তিন শয়তান। কিংবা প্রত্যেক জমরার সাথে একটি করে শয়তান বাধা আছে; বরং কিছু মানুষকে এমন বলতে শোনা যায় যে, প্রথমটি হচ্ছে বড় শয়তান, তার পরেরটা মেজ শয়তান, তার পরেরটা ছোট শয়তান।

জেনে রাখুন, এজাতীয় ধারণা পোষণ কিংবা নামকরণ কোনটাই সঠিক নয়। আসলে জমারাত আরবি জামরাতুন শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে ছোট ছোট কংকর কিংবা নুড়িপাথর। যেহেতু এই সকল স্থানে ছোট ছোট কংকর নিক্ষেপ করা হয় এইজন্য এগুলোকে জামারাত বলে। এই নিক্ষেপের প্রেক্ষাপট হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বর্ণনা থেকে জানা যায়।

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনার্থে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সাল্লামকে কুরবানী করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন শয়তান তিনবার তাকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। আর তিনবার ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তাকে সাতটি করে কংকর নিক্ষেপ করে প্রতিহত করে ছিলেন। অবশেষে তিনি এই মহা পরীক্ষায় কামিয়াব হয়েছিলেন। তিন স্থানে শয়তান তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন সেই তিন স্থান নিশানার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে সেখানে একটি খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে যে খুঁটি মক্কার সীমানার একেবারেই নিকটবর্তী এবং মসজিদে খাইফ থেকে দূরে অবস্থিত সেটাকে জামরাতুল কুবরা বা জামরাতুল আকাবা বলা হয়। এর পরেরটাকে জামরাতুল উসতা এবং এর পরেরটাকে জামরাতুল উলা বা জামরাতুদ দুনইয়া তথা নিকটতম জামরা বলে। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সরাসরি শয়তানকেই কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন।

আজ তার অনুসরণে ঐসকল স্থানে কংকর নিক্ষেপ করা হয় যেখানে যেখানে শয়তান তাকে বাধা দিয়েছিল। আর তিনি কংকর মেরে শয়তানকে প্রতিহত করেছিলেন। আমাদের কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য হল মিল্লাতে হানিফা তথা মিল্লাতে তাওহীদ এর ইমাম হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের উক্ত কর্মের অনুকরণ যা আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ। প্রকৃতপক্ষে উক্ত কর্মের মাধ্যমে আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই আনুগত্য করা।

এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, ঐ সকল স্থানে খুঁটির আকৃতিতে শয়তানও থাকে না বা ওই শয়তানকেও সেখানে বেধে রাখা হয়নি।

এই কংকর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে যে যত বেশি আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের প্রেরণা আর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত অন্তরে পোষন করবেন এবং যত বেশি শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার ইচ্ছা রাখবে সেটা শয়তানের জন্য ততবেশি লাঞ্ছনা ও আক্ষেপের কারন হবে।

মোট কথাঃ মিনার জামারাত শয়তান নয় এবং শয়তান সেখানে খুঁটি আকৃতিতে উপস্থিতও নয়। আর শয়তানকে সেখানে বেঁধে রাখাও হয়নি; বরং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালনার্থে সেখানে কংকর নিক্ষেপ করা হয়। আল্লাহ তাআলার এই নির্দেশের মাঝে অনেক হিকমত নিহিত রয়েছে।

একটি বড় হিকমত হল আল্লাহর জিকির জিন্দা করা ও শয়তানের বিরোধিতায় পূর্ণ উজ্জীবিত হওয়া। আর এর প্রেক্ষাপট হল হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ঐ ঘটনা যা ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে । (শুআবুল ঈমান)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00