📄 ইস্তিখারার জন্য কি দুআ পড়ে ঘুমাতেই হয়
ইস্তিখারার অর্থ কল্যাণ প্রার্থনা, কল্যাণ সম্পর্কে অবগত হওয়া নয়। তাই ইস্তিখারার হাকীকত এই যে, যে কাজের ইচ্ছা করা হয়েছে সে সম্পর্কে (চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শের পর) দুই রাকাত নফল নামায পড়ে হাদীসে শিখানো দুআ পাঠ করা। যার সারকথা হল, ইয়া আল্লাহ! এ কাজে যদি আমার কল্যাণ থাকে তবে তুমি তা সহজ করে দাও এবং তাতে বরকত দান কর। আর যদি তা আমার জন্য উপযোগী না হয় তবে তা থেকে আমাকে বিরত রাখ এবং যেখানে কল্যাণ আছে সেখানে নিয়ে যাও আর আমাকে তাতে সন্তুষ্ট থাকার তাওফীক দান কর।
সহীহ হাদীসের আলোকে এটাই হল ইস্তিখারার হাকীকত। কিন্তু কেউ কেউ মনে করে, ইস্তিখারার নামায ও দুআ শোয়ার আগে করতে হয়। আর ইস্তিখারার ফলাফল অর্থাৎ কাজটি করা উচিত কি উচিত না-তা স্বপ্নযোগে জানিয়ে দেওয়া হয়। এটি নিঃসন্দেহে ভিত্তিহীন ধারণা। ইস্তিখারার পর কেউ কোনো স্বপ্ন দেখতেও পারে। কিন্তু স্বপ্ন তো ইস্তিখারা ছাড়াও দেখা যায়। স্বপ্নে কোনো কিছু দেখলে তাকে বিচার করতে হবে স্বপ্নের বিষয়ে শরীয়তের যে বিধান আছে তারই ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শরঈ বিধান অনুযায়ী। আর স্বপ্ন যে কোনো দলিল নয়-এ তো সবাই জানে।
ইস্তিখারা বিষয়ক আরেকটি ভুল হল, দুআ-ওযিফার কোনো কোনো অনির্ভরযোগ্য বইপত্রে ইস্তিখারার যে পদ্ধতি উল্লেখ রয়েছে তা পালন করা। অথচ ইস্তিখারার মাসনুন পদ্ধতি ছেড়ে কারো অভিজ্ঞতা বা উদ্ভাবন গ্রহণ করার কোনো অর্থ হতে পারে না।
ইস্তিখারার একটি নবউদ্ভাবিত ও বিদআতী পদ্ধতি হচ্ছে, কুরআন মজীদ থেকে কিংবা দেওয়ানে হাফেয, মাছনবী ইত্যাদি থেকে ইঙ্গিত গ্রহণ। এটি সম্পূর্ণ ভুল পদ্ধতি। আর কুরআন মজীদ থেকে এ জাতীয় ইঙ্গিত গ্রহণ মূলত কুরআনের সাথে বেআদবী।
আরেকটি ভুল হল, নিজে না করে অন্যকে দিয়ে ইস্তিখারা করানো। অনেকে মসজিদের ইমাম সাহেব অথবা পরিচিত কোনো আলিমের কাছে ইস্তিখারার আবেদন করে থাকেন। অথচ হাদীস শরীফে প্রয়োজনগ্রস্ত ব্যক্তিকেই ইস্তিখারা করতে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে মারাত্মক ভ্রান্তি এই যে, কোনো কোনো মানুষ শুধু কাজের ইচ্ছার সময়ই নয়; বরং গায়েবের বিভিন্ন কথা জানার জন্য বে-শরা তদবিরকারীর কাছে যায় এবং এটাকেও ইস্তিখারা বলে। এমনকি ঐ সকল কথা বিশ্বাসও করে। অথচ গায়েব জানার জন্য কারো কাছে যাওয়া এবং তার কথা বিশ্বাস করা এক প্রকারের শিরক।
আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের শিরক থেকে হেফাযত করুন। আমীন।
(বিস্তারিত জানার জন্য অধ্যয়ন করুন: আলমাদখাল, ইবনুল হাজ্ব ৪/৩৬-৪০; হায়াতুল হায়াওয়ান ৩/৩৮; ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন, মুরতাযা যাবী ২/২৮৫।)
📄 সারা জীবনের কাযা নামাযের কাফফারা
বাজারী বিভিন্ন পুস্তকে এক প্রকার নামাযের বর্ণনা পাওয়া যায়, যার দ্বারা কি না জীবনের সকল কাযা নামাযের কাফফারা হয়ে যাবে। বর্ণনাটি এই-
কারো যদি জীবনে অনেক নামায কাযা থাকে সে যেন রমযানের শেষ জুমায় এক বৈঠকে চার রাকাত নামায আদায় করে। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর পনের বার সূরা কদর ও পনের বার সূরা কাউসার তিলাওয়াত করবে। এভাবে চার রাকাত নামায আদায় করবে। নিয়ত করবে এই বলে- আমি আমার কাযা হওয়া সকল নামাযের কাফফারা হিসেবে চার রাকাত নামায আদায় করছি।
কোনো কোনোটিতে আছে, সূরা ফাতেহার পর একবার আয়াতুল কুরছি ও পনের বার ইন্না আ'তাইনা পড়বে। নামায শেষে একশত বার দরূদ পড়বে, এস্তেগফার করবে। তারপর
اللَّهُمَّ يَا سَابقِ الْفَوْت ويا سامع الصوت ...
বিশেষ এ দুআ পড়বে। এর দ্বারা দুইশত থেকে সাতশত বছরের কাযা নামাযের কাফফারা হবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের বয়স তো সত্তর/আশি বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাহলে এত অধিক সংখ্যক বছরের রহস্য কী? উত্তরে ইরশাদ হল, এই নামায তাদের পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনের নামাযের কাফফারা হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)
শাওকানী রাহ. আলফাওয়াইদুল মাজমুআয় এ ধরনেরই আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, সেখানে শুধু জুমার কথা আছে; রমযানের আখেরী জুমার কথা নেই। সেখানে আছে- জুমার রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে আট রাকাত নামায পড়বে। এরপর এক হাজার বার একটি বিশেষ দরূদ পাঠ করবে। এটা তার সারা জীবনের কাযা নামাযের কাফফারা হবে, যদিও দু'শ বছরের নামায কাযা হয়ে থাকে। এ বর্ণনা উল্লেখ করার পর তিনি বলেন, এটি একটি জাল বর্ণনা।
মোটকথা, এসবই জাল বর্ণনা, এর কোনো ভিত্তি নেই। তাছাড়া এটি কুরআন মাজীদ, সহীহ হাদীস ও ইজমায়ে উম্মতের পরিপন্থী। মোল্লা আলী কারী রাহ., মাওলানা আবদুল হাই লখনবী ও শাহ আবদুল আযীয দেহলভী রাহ. প্রমুখ এগুলোকে জাল ও ভিত্তিহীন বলেছেন।
নামায কাযা হয়ে গেলে যত ওয়াক্ত কাযা হয়েছে তত ওয়াক্তের কাযাই আদায় করা জরুরি। একটির দ্বারা অন্যগুলো আদায় হবে না।
আর ছুটে যাওয়া ফরয নামাযসমূহের যথাযথ কাযা আদায় করা যে শরীয়তে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অবকাশ রাখে না।
[দ্র. আলআছারুল মারফুআ ফিল আখবারিল মাউযূআ, পৃ. ১১০; আলমাছন' ফি মা'রিফাতিল হাদীসিল মাওযূ', বর্ণনা ৩৫৮; আলআজউইবাতুল ফাদিলাহ, পৃ. ৩১-৩২ (টাকা); আলফাওয়াইদুল মাজমুআহ ১/৫৪ বর্ণনা নং ১১৭; রদউল ইখওয়ান আম্মা আহদাহুহু ফি আখিরি জুমুআতি রমাদান]