📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 ১. ১ লা মুহাররম : হিজরী নববর্ষ

📄 ১. ১ লা মুহাররম : হিজরী নববর্ষ


প্রথম কথা হল, ১লা মুহাররম হিজরী বর্ষের প্রথম দিন। কিন্তু এটা 'ইসলামী পবিত্র দিনসমূহ' বা 'ইসলামী ফযীলতপূর্ণ দিবস-রজনী' শিরোনামে আসবে কিনা সেটা ভাববার বিষয়। ইসলামী ফযীলতপূর্ণ দিবস হতে হলে কুরআন-সুন্নাহয় তার আলাদা ফযীলত উল্লেখ থাকতে হবে। এছাড়া এখানে হিজরী নববর্ষ শব্দ থেকে কেউ বুঝতে পারে যে, অন্যান্য জাতি যেমন নববর্ষ উদযাপন করে, হিজরী নববর্ষও মুসলমানদের জন্য সে রকম উদযাপনের দিবস। অথচ ইসলামে নববর্ষ, বর্ষপূর্তি কিংবা জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকী পালন করার কোনো বিধান নেই। তবে চান্দ্রমাস ও বছরের সাথে যেহেতু রোযা, হজ্ব, ঈদুল ফিত্র, ঈদুল আযহা ও যাকাতসহ বহু ইবাদাত ও শরয়ী বিধিবিধান সম্পৃক্ত এ জন্য এর হেফাযত ও চর্চা রাখা ফরযে কেফায়া। এবং এ ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করা জাতীয় আত্মমর্যাদাবোধ হ্রাস বা বিলুপ্তিরই নামান্তর।

ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দাদা তাঁর পিতাকে পারস্যের নওরোযের দিন (নববর্ষের দিন) আলী রা.-এর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কিছু হাদিয়াও পেশ করেছিলেন। (হাদিয়াটি ছিল নওরোয উপলক্ষে ফলে) আলী রা. বললেন, “নওরোযুনা কুল্লা ইয়াওম” মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ। (আখবারু আবি হানিফা, সয়মারী) অর্থাৎ মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব নিকাশ করবে এবং নব উদ্যমে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে।

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 ২-৩. ৯ ই মুহাররম : আশুরার রোযা, ১০ ই মুহাররম : আশুরা

📄 ২-৩. ৯ ই মুহাররম : আশুরার রোযা, ১০ ই মুহাররম : আশুরা


এই উপস্থাপন থেকে মনে হয় যে, ৯ই মুহাররম আশুরার রোজা আর ১০ই মুহাররম শুধুই আশুরা; এই দিনে রোজার কোনো বিষয় নেই। আসলে আশুরার রোযা তো মূলত ১০ই মুহাররমের রোযা। কারণ সেদিনই হল আশুরা। তবে ইহুদীদের সাদৃশ্য থেকে বাঁচার জন্য হাদীসে আশুরার দিনসহ তার আগে বা পরে একদিন মিলিয়ে দুইটি রোজা রাখার কথা এসেছে। (দ্র. সহীহ মুসলিম ১/৩৫৯; মুসনাদে আহমাদ ১/২৪১)

উল্লেখ্য, ১০ ই মুহাররমের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নানা ভিত্তিহীন কথা বলে থাকেন। যেমন, এ দিনে হযরত ইউসুফ আ. জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইয়াকুব আ. চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন। অনেকে বলে, এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। হযরত ইউনুস আ. মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হযরত ইদরীস আ.কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে ইত্যাদি। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই।
-আল আসারুল মারফুআ, আবদুল হাই লখনবী ৬৪-১০০; মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ ফী আয়্যামিস সানাহ ২৫৩-২৫৭

এ দিনের একটি সহীহ ঘটনা হল, আল্লাহ তায়ালা তাঁর কুদরতে বনী ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদের ডুবিয়ে মেরেছেন।-সহীহ বুখারী ১/৪৮১

আর এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন রা.। বলাবাহুল্য, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। কিন্তু একে কেন্দ্র করে তাজিয়া, শোকর‍্যালি, শোকগাঁথা পাঠ, বুক চাপড়ানো, হায় হোসেন হায় হোসেন করা -এগুলো সবই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, হযরত হোসাইন রা. ও আহলে বাইতের আদর্শের পরিপন্থী।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যারা মুখ চাপড়ায়, কাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যুগের কথাবার্তা বলে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ১০৩; সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৯৭; মুসনাদে আহমাদ, হা.৪৩৬১

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 ৪. সফরের শেষ বুধবার : আখেরী চাহার শোষ্বাহ

📄 ৪. সফরের শেষ বুধবার : আখেরী চাহার শোষ্বাহ


বহু মানুষ সফর মাসের শেষ বুধবারকে একটি বিশেষ দিবস গণ্য করে এবং এতে বিশেষ আমল আছে বলে মনে করে।
এমনকি তারা ধারণা করে যে, সফর মাসের শেষ বুধবার সকালে ইশরাক নামাজের সময় দুই রাকাত নামাজ পড়ে একটি পানির উপরে সাত সালাম লিপিবদ্ধ করে পান পানিতে ভিজিয়ে সেই পানি পান করলে মানুষের সমস্ত রোগ দূর হয়ে যাবে। এগুলো সবই ভিত্তিহীন এবং ভ্রান্ত। 'মকসুদুল মোমিনীন' ও 'বার চান্দের ফযীলত' এবং এ জাতীয় যেসব অনির্ভরযোগ্য পুস্তক-পুস্তিকা এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে প্রচলিত, তাতে এই বিষয়টি রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো এই সমস্ত বইগুলি ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট।

(মকছুদুল মুমিনীন, বার চান্দের ফযীলত জাতীয় অনির্ভরযোগ্য বইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী) সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরী চাহার শোম্বাহ বলে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের শেষ দিকে একবার এক ইহুদীর যাদুর কারণে ভীষণ অসুস্থ হন এবং এই দিনে একটু সুস্থতা বোধ করেন এবং গোসল করেন ও মসজিদে জামাতে শরিক হন। খুশি হয়ে হযরত ওসমান রা. তাঁর নিজ খামারের ৭০টি উট জবাই করে গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। খুশিতে আত্মহারা সাহাবীগণ আনন্দ প্রকাশ ও শুকরিয়া আদায় করেছিলেন রোযা রেখে, নফল নামায পড়ে এবং হামদ-নাত গেয়ে। সুতরাং এটা মুসলমানদের খুশির দিন এবং তা উদযাপনের একটি দিবস। এ ছাড়াও এ জাতীয় বইগুলোতে এ দিনের বিভিন্ন করণীয় উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো একেবারেই ভিত্তিহীন যেমনটি ভিত্তিহীন উপরোক্ত বিবরণ। কারণ-

১. হাদীস বিশারদ ও ইতিহাসবিদ কারো মতেই সুস্থতার তারিখ সফরের আখেরী চাহার শোম্বা ছিল না। (দ্র. ফাতহুল বারী ১০/২৩৭: আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া ২/১৫৪; শরহুয যুরকানী ৯/৪৪৬-৪৪৭)
২. জাদুর ঘটনা হাদীস ও সীরাত-গ্রন্থসমূহে বিস্তারিতভাবে এসেছে। কিন্তু কোথাও জামাতে শরীক হতে না পারা ও জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার পর গোসলের কথা নেই।
৩. রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাত হয়েছে সোমবারে। এর চার-পাঁচদিন পূর্বে তাঁর সুস্থতার জন্য যে সাত কুঁয়া থেকে সাত মশক পানি আনা হয়েছিল এবং সুস্থতার জন্য তার দেহ মোবারককে ধৌত করা হয়েছিল তা কি বুধবারের ঘটনা না বৃহস্পতিবারের? ইবনে হাজার ও ইবনে কাছীর একে বৃহস্পতিবারের ঘটনা বলেছেন। (দ্র. ফাতহুল বারী ৭/৭৪৮, কিতাবুল মাগাযী ৪৪৪২; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/১৯৩; সীরাতুন নবী, শিবলী নুমানী ২/১১৩)
৪. যদি বুধবারের ঘটনা হয়ে থাকে তবে সফর মাসের শেষ বুধবার কীভাবে হচ্ছে? রসমের পৃষ্ঠপোষকতাকারীগণ সকলে ইন্তেকালের তারিখ বারো রবিউল আওয়াল বলে থাকেন। সোমবার যদি বারো রবিউল আওয়াল হয়ে থাকে তাহলে এর পূর্বের বুধবার তো সফর নয়, রবিউল আওয়ালেই হচ্ছে।
৫. রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অনেক মুসিবত এসেছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে নাজাত দিয়েছেন। তায়েফ ও অহুদে আহত হয়েছেন, আল্লাহ তাকে সুস্থ করেছেন। একবার ঘোড়া থেকে পড়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছেন, যার কারণে মসজিদে যেতে পারেননি, আল্লাহ তাঁকে সুস্থ করেছেন। তাঁর সুস্থতা লাভের এই সব আনন্দের স্মৃতিগুলোতে কি দিবস উদ্যাপনের কোনো নিয়ম আছে? তাহলে আখেরী চাহার শোম্বাহ, যার কোনো ভিত্তি নেই, তা কীভাবে উদযাপনের বিষয় হতে পারে?

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 ৫. ১২ই রবিউল আউয়াল : নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম ও ওফাত দিবস

📄 ৫. ১২ই রবিউল আউয়াল : নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম ও ওফাত দিবস


ইতিহাস ও সিরাতের কিতাবের উপর যাদের নযর আছে তারা জানেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ও ওফাতের তারিখ কোনোটিই নিশ্চিতভাবে ১২ রবিউল আওয়াল বলা ঠিক নয়। অনেক গবেষকই জন্মতারিখ ৯ই রবিউল আউয়াল সোমবার ও ওফাতের তারিখ ২ রবিউল আউয়াল সোমবার-কে তারজীহ দিয়েছেন (সবচেয়ে সহীহ বলেছেন)। (দ্র. ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার আসকালানী খ. ৮ পৃ.৭৬৩ কিতাবুল মাগাযী, বাব ৮৩; রাহমাতাল লিল আলামীন, কাজী মুহাম্মাদ সুলাইমান সালমান মানসুরপুরী খ.১ পৃ.৩৫; আসাহহুস সিয়ার পৃ.৫৫০-৫৫২; মাকালাতুল কাউছারী পৃ. ৩৬২-৩৭০; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া খ. ৪ পৃ. ২২৭-২৩০

সে যাই হোক ইসলামে জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করার কোনো অনুমতি নেই। কোনো সাহাবী, তাবেয়ী, ইমাম, উলামায়ে উম্মাহ কেউ এমনটি করেন নি; বরং করাকে বিদআত বলেছেন। সুতরাং তা পরিত্যাজ্য। আল্লাহ আমাদের সকল প্রকার রসম-রেওয়াজ ও বিদআত থেকে হেফাজত করুন। এগুলোর পিছনে না পড়ে পুরোপুরি সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00