📄 শবে বরাতের রাতের গোসল
শাবানের ১৫ তারিখের রাতের বিষয়ে আরেকটি ভিত্তিহীন বর্ণনা সমাজে প্রচলিত আছে। সেটি শবে বরাতের রাতের গোসল কেন্দ্রিক। এই রাতে ইবাদতের উদ্দেশে যদি কেউ গোসল করে তাহলে তার গোসলের প্রতি ফোটার বিনিময়ে গুনাহ মাফ হবে। আবার কেউ কেউ বর্ণনাটি এভাবে বলে যে, প্রতি ফোটায় ৭০ রাকাত নফল নামাযের সওয়াব হবে। তো যে যেভাবেই বলুক, এটি যে একটি জাল বর্ণনা বা ভিত্তিহীন কথা তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহ আমাদের এ ধরনের জাল বর্ণনা ও ভিত্তিহীন কথা থেকে হেফাজত করুন এবং ফযীলতের প্রতিটি বিষয়কে তার গরি মধ্যে রেখে তাকে কাজে লাগানোর তাওফিক দিন। আমীন ৷ (আল-কাউসার: সংখ্যা: ০৭: শাওয়াল ১৪৩৫)
📄 বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে
একটি গ্রামের মহিলাদের প্রায় সকলকেই বলতে শোনা গেছে, 'শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাওয়া যাবে।' এটিকে রাসূলের হাদীস হিসেবেই বলা হয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নেই।
এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি জাল হাদীসের উপর লেখা কিতাবাদিতেও এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।
কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, ওহুদ যুদ্ধে যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানদান মোবরক শহীদ হয়েছিল, তখন কিছুদিন কোনো প্রকার শক্ত খাবার খেতে পারতেন না। সেই ঘটনার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই দিনে ঘটা করে হালুয়া রুটি খাওয়া হয়। কিন্তু ওহুদ যুদ্ধ তো শাবান মাসের ১৫ তারিখে হয়নি তা হয়েছে শাওয়ালের ৭ তারিখে। সুতরাং যদি সে কেন্দ্রিক কোনো বিষয় থাকত তাহলে তা শাওয়াল মাসের ৭ তারিখে থাকত শাবানের ১৫ তারিখে নয়।
শাবানের পনের তারিখের রাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (এ রাতের ফযীলত বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন, আলকাউসারের সেপ্টেম্বর ২০০৫ সংখ্যায় "বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে শাবান শবে বরাত” শিরোনামে) হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৩৮৩৩)
কিন্তু এই রাতের সাথে হালুয়া-রুটির কী সম্পর্ক? এ রাতের যতটুকু ফযীলত প্রমাণিত আছে শুধু ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। রসম-রেওয়াযের পিছে পড়ে এর মূল ফযীলত থেকে বঞ্চিত হওয়া ঠিক নয়।
আর আলোচ্য বিষয়টি মূলত এই রাতের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন রসমের অন্যতম, যার কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরণের কাজ এবং এ রাত কেন্দ্রিক আরো যত রসম-রেওয়াজ আছে এগুলে থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
📄 শবে বরাতের বিশেষ পদ্ধতির নামাজ সম্পর্কে মকসুদুল মুমিন এর ভিত্তিহীন বর্ণনা
মকসুদুল মুমিন এর যে কপিটি আছে তাতে লেখা আছে যে, (৪৬ তম সংস্করণ ১৯৯৬ সনের ছাপা এবং এর রেজিস্ট্রি নং ৬৫৯। এ কপিটির ২৪১-২৪২ পৃ: নিম্নোক্ত বর্ণনা তিনটি রয়েছে) হাদীস শরীফে আছে, মাতৃগর্ভ হইতে লোক যেরূপ নিষ্পাপ হয়ে ভূমিষ্ঠ হয় উল্লেখিত চার রাকাত নামাজ পড়লেও সেরূপ নিষ্পাপ হয়ে যায়। মিশকাত।
এই বর্ণনা এবং উদ্ধৃতি উভয়টিই মিথ্যা। মেশকাত শরীফে এ ধরনের কোন হাদিসই বর্ণিত নেই।
এরপর লেখা আছে, তারপর আবার দুই দুই রাকাত করিয়া চার রাকাত নামাজ উপরে উল্লেখিত নিয়ত করিয়া পড়িবে। নিয়ত সুবাহানাকা, আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ ও সূরা ফাতেহার পর প্রত্যেক রাকাতে সুরা একলাছ ৫০ বার করিয়া পাঠ করিবে ও এই নিয়তেই নামাজ শেষ করিবে। সালাম ফিরার পর বসিয়া ১০০ বার দুরুদ পাঠ করিয়া মোনাজাত করিবে। হাদীস শরীফে আছে, যাহারা এই নামাজ পাঠ করবে আল্লাহ্ তায়ালা তাদের ৫০ বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। তিরমিজি।
এই বর্ণনা এবং উদ্ধৃতি উভয়টিই মিথ্যা। তিরমিজী শরীফে এরূপ কোন হাদিসই নেই। এমনকি তিরমিজি শরীফে তো নেই-ই; বরং কোন সহীহ হাদীসের কিতাবেও এই নিয়ম ও ফজিলতলের কথা নেই।
এরপর লেখা আছে, আরো হাদিসে আছে যারা উক্ত রাত্রে বা দিনে ১০০ হইতে ৩০০ মর্তবা দুরুদ শরীফ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর পাঠ করিবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য দুজোখ হারাম করে দিবেন। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করিয়া তাহাদিগকে বেহেশতে লইবেন। সহীহ বুখারী।
এ বর্ণনা ও উদ্ধৃতি উভয়টিই মিথ্যা। উল্লেখিত বর্ণনা তিনটি বাতিল ও ভিত্তিহীন। এগুলোতে মেশকাত, তিরমিজি ও বুখারী শরীফের উদ্ধৃতি দেওয়া সম্পূর্ণ মিথ্যা। এসব কিতাবে উক্ত বর্ণনার নাম নিশানাও নাই । আর এমন জাল বর্ণনা এসব কিতাবে থাকতে পারেনা ।
হাদিস বিশেষজ্ঞগণ স্পষ্ট বলেছেন যে, শবে বরাতের ফজিলত এবং তাতে নফল ইবাদতের গুরুত্ব আপন জায়গায় স্বীকৃত। কিন্তু নির্দিষ্টসংখ্যক রাকাত এবং বিশেষ সূরা নির্দিষ্টকরণের সাথে শবে বরাতের নামাজ নামে যে নামাজ এবং এর বিশেষ ফজিলতের কথা জনসাধারণের মাঝে অনির্ভরযোগ্য বইপত্রে প্রসিদ্ধ আছে, সেগুলো ভিত্তিহীন। এ বিষয়ের হাদিস জালও ভিত্তিহীন।
তারপরেও বর্তমান কিছু সংখ্যক লোক এগুলোকে মানতে রাজি না। তারা ভুলটাকেই বিশ্বাস করে আমল করে যাচ্ছে। বিশেষ করে তারা এ ব্যাপারে হাদীসের ইমামগণের বক্তব্য জানার জন্য নিম্নোক্ত কিতাবগুলো দেখতে পারেন।
(কিতাবুল মওযূআত, ইবনুল জাওযী:২/৪৯-৫২ # আল-মানারুল মুনীফ, ইবনুল কাইয়ুম;৯৮-৯৯ # আললা আলীল মাসনূআ, জালালুদ্দিন সুয়ূতী:২/৫৯-৬০ # তানজীহুশ শরীয়া ইবনে আরবাব:২/৯২-৯৪ # আলমওযূআতুল কুবরা, মোল্লা আলী কারী:১৬৫ # ইতহাফুল সদাতীন মুত্তাকীন, মুরতাজা যাবিদী:৩/৪২৫ # আল ফাওয়ায়িদুল মাজমুআ, শাওকানী:১/৭৫-৭৬ # আল আসারুল মারফুআ, আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী; ৮২-৮৫)
📄 ফজিলত পূর্ণ দিবস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা
ফযীলতপূর্ণ দিবস-রজনী :
একটি মসজিদে 'ইসলামী পবিত্র দিনসমূহ' শিরোনামে একটি তালিকা নজরে পড়ল। তাতে কিছু আছে ইসলামে স্বীকৃত মহিমান্বিত দিবস-রজনী, আবার কিছু আছে আবিষ্কৃত রসম-রেওয়াজ এবং ইসলামী ইতিহাস বিষয়ে না জানার ভুল। সমাজের বিভিন্ন মহলে এসব দিবস-রজনী বিশেষভাবে পালিত হতেও দেখা যায়। কোনো কোনো দিবস এমন আছে, যেগুলোতে সরকারী ছুটি থাকে অথচ ইসলামে সে সকল দিবস স্বীকৃত নয়। আর এসব দিবস-রজনী বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য পুস্তক-পুস্তিকায়ও দেখা যায়। তাই তালিকাটির উপর একটি পর্যালোচনা সংগত মনে হল। এ পর্যালোচনায় তালিকার ভুলগুলোও যেমন উল্লেখ করা হয়েছে তেমনি ইসলামে স্বীকৃত দিবস-রজনী বিষয়ে প্রয়োজনীয় কিছু কথাও আলোচনা করা হয়েছে। যাতে স্বীকৃত বিষয়েও কেউ ভুলের শিকার না হন। প্রথমে তালিকাটি উল্লেখ করছি।