📄 রজব মাসের নামায বিষয়ে কিছু ভিত্তিহীন বর্ণনা
বার চাঁদের আমল শিরোনামের কিছু কিছু পুস্তিকায় রজব মাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভিত্তিহীন বর্ণনার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। একটি বইয়ে লেখা হয়েছে- রজব মাসের প্রথম তারিখে মাগরিবের নামায ও ইশার নামাযের মাঝখানে বিশ রাকাত নফল নামায পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস ৩ বার, সূরা কাফিরুন ৩ বার পড়বে। তাহলে আল্লাহ পাক হাশরের দিন তাকে শহীদের দলের সহিত উঠাবেন এবং আল্লাহ পাকের নিকট সে বড় আবেদ বলে গণ্য হবে।
রজব মাসের প্রত্যেক জুমার দিন জুমার পর আসরের নামাযের আগে চার রাকাত নামায এক সালামে পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ৭ বার আয়াতুল কুরসি ও পাঁচবার সূরা ইখলাস পড়বে...।
এই মাসের ১৫ তারিখকে শবে ইস্তেফতাহ বলা হয়। যে ব্যক্তি এই রাত্রিতে ৭০ রাকাত নফল নামায দুই রাকাত করে পড়বে...।
১৫ তারিখ রাতে তাহাজ্জুদের নামাযের সময়ে ৫০ রাকাত নফল নামায দুই রাকাত করে পড়বে...তার সমস্ত দুআ কবুল করা হবে, কবর আলোকিত হবে এবং শহীদদের সাথে তার হাশর হবে এবং পয়গাম্বারদের সঙ্গে সে বেহেশতে যেতে পারবে।
১৫ তারিখ দ্বিপ্রহরের পর গোসল করে আট রাকাত নফল নামায পড়বে; দুই রাকাত করে। প্রত্যেক রাকাতে...।
এ বর্ণনাগুলো মোসাম্মৎ আমেনা বেগমের লেখা 'বার চাঁদের আমল ও ঘটনা' নামক পুস্তিকায় রয়েছে। এছাড়াও শুধু রজব মাসের নামায সংক্রান্তই আরো কিছু বর্ণনা ও ঘটনা সেখানে রয়েছে, যা এখানে উল্লেখ করা হল না।
এ পুস্তিকা, মকসুদুল মুমিনীন ও বারো চান্দের ফযীলত শিরোনামে লেখা অন্যান্য পুস্তিকায়ও রজব মাসের বিভিন্ন দিন-তারিখের বিভিন্ন সময়ের নামাযের বর্ণনা এবং তার বিরাট বিরাট ফযীলত লেখা হয়েছে। এই বর্ণনাগুলো এতই উদ্ভট যে, এর মধ্যে কিছু বর্ণনার অংশবিশেষ জাল হাদীসের কিতাবে পাওয়া গেলেও অন্যগুলো জাল হাদীসের ভাণ্ডারেও পাওয়া যায় না।
অষ্টম শতকের বিখ্যাত হাদীস বিশারদ হাফেয ইবনে রজব রাহ. বলেন-
فأما الصلاة فلم يصح في شهر رجب صلاة مخصوصة تختص به.
অর্থাৎ রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো নামায প্রমাণিত নয়। -লাতায়েফুল মাআরেফ পৃ. ২২৮
তেমনিভাবে রজব মাসের বিশেষ বিশেষ রোযা বিষয়েও বিভিন্ন ধরনের জাল বর্ণনা এসকল পুস্তিকায় পাওয়া যায়, যার কোনোই ভিত্তি নেই। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-
لم يرد في فضل شهر رجب، ولا في صيامه، ولا في صيام شيء منه معين، ولا في قيام ليلة مخصوصة فيه حديث صحيح يصلح للحجة.
রজব মাসের ফযীলত, রজব মাসে রোযা রাখার ফযীলত বা রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো দিন রোযা রাখার ফযীলত অথবা রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো রাতে নামায-ইবাদত করার ফযীলত সম্পর্কে প্রমাণ হওয়ার উপযুক্ত কোনো হাদীস নেই। -তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী শাহরি রাজাব, পৃ. ১১
মোটকথা, রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো নামায বা রোযা নেই। এ মাসে নির্দিষ্ট কোনো দিনে নফল নামায বা রোযা পালনের বিশেষ কোনো ফযীলতের কথাও হাদীসে নেই। সুতরাং আমরা এগুলো বিশ্বাস করব না। (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী শাহরি রাজাব, ইবনে হাজার আসকালানী; কিতাবুল মাউযূআত, ইবনুল জাওযী; আললাআলিল মাছনূআহ, জালালুদ্দিন সুয়ূতী; তানযীহুশ শারীআহ, ইবনে আররাক; তাযকিরাতুল মাউযূআত, তাহের পাটনী; আলফাওয়াইদুল মাজমুআ, শাওকানী; আলআসারুল মারফুআহ, আবদুল হাই লখনবী ইত্যদি কিতাবের রজব মাস বা এ সংশ্লিষ্ট বর্ণনা সংক্রান্ত অধ্যায়)
তবে রজব মাস যেহেতু 'আশহুরে হুরুম' তথা সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত, তাই নির্দিষ্ট কোনো দিন-তারিখ নির্ধারণ বা নির্দিষ্ট ফযীলতের বিশ্বাস ছাড়া এ মাসে নফল নামায বা রোযা রাখতে কোনো বাধা নেই।
📄 শবে বরাতের রাতের গোসল
শাবানের ১৫ তারিখের রাতের বিষয়ে আরেকটি ভিত্তিহীন বর্ণনা সমাজে প্রচলিত আছে। সেটি শবে বরাতের রাতের গোসল কেন্দ্রিক। এই রাতে ইবাদতের উদ্দেশে যদি কেউ গোসল করে তাহলে তার গোসলের প্রতি ফোটার বিনিময়ে গুনাহ মাফ হবে। আবার কেউ কেউ বর্ণনাটি এভাবে বলে যে, প্রতি ফোটায় ৭০ রাকাত নফল নামাযের সওয়াব হবে। তো যে যেভাবেই বলুক, এটি যে একটি জাল বর্ণনা বা ভিত্তিহীন কথা তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহ আমাদের এ ধরনের জাল বর্ণনা ও ভিত্তিহীন কথা থেকে হেফাজত করুন এবং ফযীলতের প্রতিটি বিষয়কে তার গরি মধ্যে রেখে তাকে কাজে লাগানোর তাওফিক দিন। আমীন ৷ (আল-কাউসার: সংখ্যা: ০৭: শাওয়াল ১৪৩৫)
📄 বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে
একটি গ্রামের মহিলাদের প্রায় সকলকেই বলতে শোনা গেছে, 'শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাওয়া যাবে।' এটিকে রাসূলের হাদীস হিসেবেই বলা হয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নেই।
এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি জাল হাদীসের উপর লেখা কিতাবাদিতেও এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না।
কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, ওহুদ যুদ্ধে যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানদান মোবরক শহীদ হয়েছিল, তখন কিছুদিন কোনো প্রকার শক্ত খাবার খেতে পারতেন না। সেই ঘটনার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই দিনে ঘটা করে হালুয়া রুটি খাওয়া হয়। কিন্তু ওহুদ যুদ্ধ তো শাবান মাসের ১৫ তারিখে হয়নি তা হয়েছে শাওয়ালের ৭ তারিখে। সুতরাং যদি সে কেন্দ্রিক কোনো বিষয় থাকত তাহলে তা শাওয়াল মাসের ৭ তারিখে থাকত শাবানের ১৫ তারিখে নয়।
শাবানের পনের তারিখের রাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (এ রাতের ফযীলত বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন, আলকাউসারের সেপ্টেম্বর ২০০৫ সংখ্যায় "বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে শাবান শবে বরাত” শিরোনামে) হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৩৮৩৩)
কিন্তু এই রাতের সাথে হালুয়া-রুটির কী সম্পর্ক? এ রাতের যতটুকু ফযীলত প্রমাণিত আছে শুধু ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। রসম-রেওয়াযের পিছে পড়ে এর মূল ফযীলত থেকে বঞ্চিত হওয়া ঠিক নয়।
আর আলোচ্য বিষয়টি মূলত এই রাতের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন রসমের অন্যতম, যার কোনো ভিত্তি নেই। এ ধরণের কাজ এবং এ রাত কেন্দ্রিক আরো যত রসম-রেওয়াজ আছে এগুলে থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
📄 শবে বরাতের বিশেষ পদ্ধতির নামাজ সম্পর্কে মকসুদুল মুমিন এর ভিত্তিহীন বর্ণনা
মকসুদুল মুমিন এর যে কপিটি আছে তাতে লেখা আছে যে, (৪৬ তম সংস্করণ ১৯৯৬ সনের ছাপা এবং এর রেজিস্ট্রি নং ৬৫৯। এ কপিটির ২৪১-২৪২ পৃ: নিম্নোক্ত বর্ণনা তিনটি রয়েছে) হাদীস শরীফে আছে, মাতৃগর্ভ হইতে লোক যেরূপ নিষ্পাপ হয়ে ভূমিষ্ঠ হয় উল্লেখিত চার রাকাত নামাজ পড়লেও সেরূপ নিষ্পাপ হয়ে যায়। মিশকাত।
এই বর্ণনা এবং উদ্ধৃতি উভয়টিই মিথ্যা। মেশকাত শরীফে এ ধরনের কোন হাদিসই বর্ণিত নেই।
এরপর লেখা আছে, তারপর আবার দুই দুই রাকাত করিয়া চার রাকাত নামাজ উপরে উল্লেখিত নিয়ত করিয়া পড়িবে। নিয়ত সুবাহানাকা, আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ ও সূরা ফাতেহার পর প্রত্যেক রাকাতে সুরা একলাছ ৫০ বার করিয়া পাঠ করিবে ও এই নিয়তেই নামাজ শেষ করিবে। সালাম ফিরার পর বসিয়া ১০০ বার দুরুদ পাঠ করিয়া মোনাজাত করিবে। হাদীস শরীফে আছে, যাহারা এই নামাজ পাঠ করবে আল্লাহ্ তায়ালা তাদের ৫০ বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। তিরমিজি।
এই বর্ণনা এবং উদ্ধৃতি উভয়টিই মিথ্যা। তিরমিজী শরীফে এরূপ কোন হাদিসই নেই। এমনকি তিরমিজি শরীফে তো নেই-ই; বরং কোন সহীহ হাদীসের কিতাবেও এই নিয়ম ও ফজিলতলের কথা নেই।
এরপর লেখা আছে, আরো হাদিসে আছে যারা উক্ত রাত্রে বা দিনে ১০০ হইতে ৩০০ মর্তবা দুরুদ শরীফ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর পাঠ করিবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য দুজোখ হারাম করে দিবেন। হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করিয়া তাহাদিগকে বেহেশতে লইবেন। সহীহ বুখারী।
এ বর্ণনা ও উদ্ধৃতি উভয়টিই মিথ্যা। উল্লেখিত বর্ণনা তিনটি বাতিল ও ভিত্তিহীন। এগুলোতে মেশকাত, তিরমিজি ও বুখারী শরীফের উদ্ধৃতি দেওয়া সম্পূর্ণ মিথ্যা। এসব কিতাবে উক্ত বর্ণনার নাম নিশানাও নাই । আর এমন জাল বর্ণনা এসব কিতাবে থাকতে পারেনা ।
হাদিস বিশেষজ্ঞগণ স্পষ্ট বলেছেন যে, শবে বরাতের ফজিলত এবং তাতে নফল ইবাদতের গুরুত্ব আপন জায়গায় স্বীকৃত। কিন্তু নির্দিষ্টসংখ্যক রাকাত এবং বিশেষ সূরা নির্দিষ্টকরণের সাথে শবে বরাতের নামাজ নামে যে নামাজ এবং এর বিশেষ ফজিলতের কথা জনসাধারণের মাঝে অনির্ভরযোগ্য বইপত্রে প্রসিদ্ধ আছে, সেগুলো ভিত্তিহীন। এ বিষয়ের হাদিস জালও ভিত্তিহীন।
তারপরেও বর্তমান কিছু সংখ্যক লোক এগুলোকে মানতে রাজি না। তারা ভুলটাকেই বিশ্বাস করে আমল করে যাচ্ছে। বিশেষ করে তারা এ ব্যাপারে হাদীসের ইমামগণের বক্তব্য জানার জন্য নিম্নোক্ত কিতাবগুলো দেখতে পারেন।
(কিতাবুল মওযূআত, ইবনুল জাওযী:২/৪৯-৫২ # আল-মানারুল মুনীফ, ইবনুল কাইয়ুম;৯৮-৯৯ # আললা আলীল মাসনূআ, জালালুদ্দিন সুয়ূতী:২/৫৯-৬০ # তানজীহুশ শরীয়া ইবনে আরবাব:২/৯২-৯৪ # আলমওযূআতুল কুবরা, মোল্লা আলী কারী:১৬৫ # ইতহাফুল সদাতীন মুত্তাকীন, মুরতাজা যাবিদী:৩/৪২৫ # আল ফাওয়ায়িদুল মাজমুআ, শাওকানী:১/৭৫-৭৬ # আল আসারুল মারফুআ, আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী; ৮২-৮৫)