📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 নামাজের ফজিলত সম্পর্কে ভুল ধারণা

📄 নামাজের ফজিলত সম্পর্কে ভুল ধারণা


এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা গেল, কেউ ফজরের দুই রাকাত (ফরয) নামায আদায় করলে আলাহ তার সারা দিনের জামিন হয়ে যান। যোহরের চার রাকাত (ফরয) ও আসরের চার রাকাত (ফরয) -এই আট রাকাত আদায় করলে সে আট জান্নাতের মালিক হয়ে গেল। মাগরিবের তিন রাকাত (ফরয) ও ইশার চার রাকাত (ফরয) -এই সাত রাকাত আদায় করলে সাত জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে গেল।

এই বক্তব্যের প্রথম অংশ (ফজরের নামায আদায় করলে আলাহ সারা দিনের জামিন হয়ে যান।) সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ফযরের নামায আদায় করল সে আলাহর জিম্মায় চলে গেল...।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৫৭) কিন্তু বাকি অংশ কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না। সুতরাং এ অংশ হাদীস নয়।

এর পরিবর্তে নামাযের ফযীলত বিষয়ে নিম্নোক্ত সহীহ হাদীসগুলো বলা যেতে পারে।

রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, আলাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি সুন্দর করে ওযু করবে এবং সময় মত তা (পাঁচ ওয়াক্ত নামায) আদায় করবে, পূর্ণরূপে রুকু, (সিজদা) করবে, খুশু খুযু সহকারে তা আদায় করবে, তার ব্যাপারে আলাহর প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি তাকে ক্ষমা করবেন। আর যে তা করবে না তার ব্যাপারে আলাহর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই; তাকে ক্ষমাও করতে পারেন আবার আযাবে গ্রেফতার করতে পারেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫)

হাদীসে কুদসীতে আলাহ তাআলা বলেন, (হে নবী!) আমি আপনার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছি এবং এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি সময়মত যত্নসহকারে তা আদায় করবে আমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো। আর যে তা করবে না তার ব্যাপারে আমার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৩০)

আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হওয়ার নিম্নোক্ত হাদীস তো সবারই জানা।
রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, তোমাদের কারো বাড়ির দরজায় যদি একটি নহর থাকে আর সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তার শরীরে কি কোনো ময়লা বাকি থাকতে পারে? সাহাবার বললেন, কখনোই না। তখন রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও তেমন; এর মাধ্যমে আলাহ বান্দার গুনাহ মিটিয়ে দেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৮; সহীহ মুসলিম ১৫৫৪)

এছাড়া এধরনের আরো অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে।
আর আলকুরআনুল কারীমে তো জান্নাতুল ফিরদাউসের আধিকারীদের গুণ বলা হয়েছে -'তারা নামাযের প্রতি যত্নবান হবে, খুশু খুযু সহকারে নামায আদায়কারী হবে।' সুতরাং নামাযের সাথে জান্নাতের ওয়াদা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির বিষয়টি ওতপ্রত জড়িত। তাই নামাযের ফযীলত হিসেবে এ বিষয়ক কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীস বলা উচিত। কিন্তু নিজ থেকে কোনো ফযীলত বানিয়ে বলা বা ভিত্তিহীন কোনো কিছু ফযীলত হিসেবে বলা ঠিক নয়。

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 যৌবনে ইবাদতের সওয়াব জিবরীল আ. গুনে শেষ করতে পারেন না!

📄 যৌবনে ইবাদতের সওয়াব জিবরীল আ. গুনে শেষ করতে পারেন না!


লোকমুখে প্রসিদ্ধ- জিবরীল আ. বলেছেন, পৃথিবীতে বৃষ্টি হলে কত ফোটা পানি পড়ে, আমি তা গুনতে পারি, কিন্তু যৌবনের ইবাদতের সওয়াব গুনে শেষ করতে পারি না। যৌবনে ইবাদতের ফযীলত হিসেবে অনেক লোক উপরোক্ত কথাটিকে হাদীস হিসেবে বলে থাকেন। কিন্তু উপরোক্ত কথাটি হাদীস নয়; হাদীসের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। যৌবনের ইবাদত আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক প্রিয়। এর ফযীলত সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দিবেন; যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। ... (তন্মধ্যে) ঐ যুবক, যার যৌবন অতিবাহিত হয় আল্লাহর ইবাদতে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৬০; সহীহ মুসলিম ১০৩১ এ ছাড়াও যৌবনের ইবাদত বিষয়ে আরও সহীহ হাদীস রয়েছে। আমরা সেগুলোই বলব; ভিত্তিহীন কোনো কথা বলব না।

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 ফজরের নামায তরক করলে চেহারার জ্যোতি কমে যায়

📄 ফজরের নামায তরক করলে চেহারার জ্যোতি কমে যায়


যে ব্যক্তি ফজরের নামায তরক করে তার চেহারার জ্যোতি কমে যায়। যে ব্যক্তি যোহরের নামায তরক করে তার রিযিকের বরকত কমে যায়। যে ব্যক্তি আসরের নামায তরক করে তার শরীরের শক্তি কমে যায়। যে ব্যক্তি মাগরিবের নামায তরক করে তার সন্তানরা তার কোনো কাজে আসবে না। যে ব্যক্তি এশার নামায তরক করে তার ঘুমের শান্তি চলে যায়। নামায তরক করার ক্ষতি হিসেবে অনেকে এ বর্ণনাটি পেশ করে থাকেন। এবং এটি লোকমুখে হাদীস হিসেবে খুব প্রসিদ্ধও বটে। কিন্তু বাস্তবে এটি নবীজীর হাদীস নয়; একটি ভিত্তিহীন বর্ণনা। হাদীসের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে আমরা এর কোনো সূত্র পাইনি; সহীহ-যঈফ কোনো ধরনের সূত্রেই পাওয়া যায়নি। সুতরাং এটিকে হাদীস হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।

বেশ কিছু আয়াত-হাদীসে নামায তরক করার বিষয়ে সাবধানবাণী উচ্চারিত হয়েছে। নামায তরক করার ক্ষতি বা শাস্তি হিসেবে সেগুলোই বর্ণনা করা উচিত। এধরনের জাল বর্ণনা পরিহার করা উচিত। এ বিষয়ক কয়েকটি আয়াত ও সহীহ হাদীস নিচে উল্লেখ করা হল

সূরা মারইয়ামের ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا.
তারপর তাদের স্থলাভিষিক্ত হল এমন লোক, যারা নামায নষ্ট করল এবং ইন্দ্রিয় চাহিদার অনুগামী হল। সুতরাং অচিরেই তারা তাদের কুকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে। সূরা মারইয়াম (১৯) : ৫৯

জাহান্নামীদের জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা কেন জাহান্নামী হলে? তারা উত্তরে বলবে, আমরা মুসল্লী (নামাযী) হতে পারিনি। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ، قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ.
তোমাদেরকে কিসে 'সাকার' জাহান্নাম-এ নিক্ষেপ করল? তারা বলবে, আমরা মুসল্লীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না (আমরা নামায পড়তাম না)। সূরা মুদ্দাছিছর (৭৪): ৪২-৪৩

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে
بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكُ الصَّلَاةِ.
নামায হল বান্দা ও কুফ্র-শিরকের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮২

আর বিশেষভাবে আসরের নামায তরক করার উপরেও সাবধানবাণী উচ্চারিত হয়েছে
مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ الْعَصْرِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ.
যে ব্যক্তি আসরের নামায তরক করল, তার আমল বরবাদ হল। সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৩

সুতরাং নামায তরক করা বিষয়ে এজাতীয় সহীহ হাদীসগুলোই আমরা বলব এবং ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে বিরত থাকব।

📘 ভুলে ভুলে জীবন পার > 📄 রজব মাসের নামায বিষয়ে কিছু ভিত্তিহীন বর্ণনা

📄 রজব মাসের নামায বিষয়ে কিছু ভিত্তিহীন বর্ণনা


বার চাঁদের আমল শিরোনামের কিছু কিছু পুস্তিকায় রজব মাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভিত্তিহীন বর্ণনার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। একটি বইয়ে লেখা হয়েছে- রজব মাসের প্রথম তারিখে মাগরিবের নামায ও ইশার নামাযের মাঝখানে বিশ রাকাত নফল নামায পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস ৩ বার, সূরা কাফিরুন ৩ বার পড়বে। তাহলে আল্লাহ পাক হাশরের দিন তাকে শহীদের দলের সহিত উঠাবেন এবং আল্লাহ পাকের নিকট সে বড় আবেদ বলে গণ্য হবে।

রজব মাসের প্রত্যেক জুমার দিন জুমার পর আসরের নামাযের আগে চার রাকাত নামায এক সালামে পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ৭ বার আয়াতুল কুরসি ও পাঁচবার সূরা ইখলাস পড়বে...।

এই মাসের ১৫ তারিখকে শবে ইস্তেফতাহ বলা হয়। যে ব্যক্তি এই রাত্রিতে ৭০ রাকাত নফল নামায দুই রাকাত করে পড়বে...।

১৫ তারিখ রাতে তাহাজ্জুদের নামাযের সময়ে ৫০ রাকাত নফল নামায দুই রাকাত করে পড়বে...তার সমস্ত দুআ কবুল করা হবে, কবর আলোকিত হবে এবং শহীদদের সাথে তার হাশর হবে এবং পয়গাম্বারদের সঙ্গে সে বেহেশতে যেতে পারবে।

১৫ তারিখ দ্বিপ্রহরের পর গোসল করে আট রাকাত নফল নামায পড়বে; দুই রাকাত করে। প্রত্যেক রাকাতে...।

এ বর্ণনাগুলো মোসাম্মৎ আমেনা বেগমের লেখা 'বার চাঁদের আমল ও ঘটনা' নামক পুস্তিকায় রয়েছে। এছাড়াও শুধু রজব মাসের নামায সংক্রান্তই আরো কিছু বর্ণনা ও ঘটনা সেখানে রয়েছে, যা এখানে উল্লেখ করা হল না।

এ পুস্তিকা, মকসুদুল মুমিনীন ও বারো চান্দের ফযীলত শিরোনামে লেখা অন্যান্য পুস্তিকায়ও রজব মাসের বিভিন্ন দিন-তারিখের বিভিন্ন সময়ের নামাযের বর্ণনা এবং তার বিরাট বিরাট ফযীলত লেখা হয়েছে। এই বর্ণনাগুলো এতই উদ্ভট যে, এর মধ্যে কিছু বর্ণনার অংশবিশেষ জাল হাদীসের কিতাবে পাওয়া গেলেও অন্যগুলো জাল হাদীসের ভাণ্ডারেও পাওয়া যায় না।

অষ্টম শতকের বিখ্যাত হাদীস বিশারদ হাফেয ইবনে রজব রাহ. বলেন-
فأما الصلاة فلم يصح في شهر رجب صلاة مخصوصة تختص به.
অর্থাৎ রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো নামায প্রমাণিত নয়। -লাতায়েফুল মাআরেফ পৃ. ২২৮

তেমনিভাবে রজব মাসের বিশেষ বিশেষ রোযা বিষয়েও বিভিন্ন ধরনের জাল বর্ণনা এসকল পুস্তিকায় পাওয়া যায়, যার কোনোই ভিত্তি নেই। হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রাহ. বলেন-
لم يرد في فضل شهر رجب، ولا في صيامه، ولا في صيام شيء منه معين، ولا في قيام ليلة مخصوصة فيه حديث صحيح يصلح للحجة.
রজব মাসের ফযীলত, রজব মাসে রোযা রাখার ফযীলত বা রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো দিন রোযা রাখার ফযীলত অথবা রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো রাতে নামায-ইবাদত করার ফযীলত সম্পর্কে প্রমাণ হওয়ার উপযুক্ত কোনো হাদীস নেই। -তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী শাহরি রাজাব, পৃ. ১১

মোটকথা, রজব মাসের নির্দিষ্ট কোনো নামায বা রোযা নেই। এ মাসে নির্দিষ্ট কোনো দিনে নফল নামায বা রোযা পালনের বিশেষ কোনো ফযীলতের কথাও হাদীসে নেই। সুতরাং আমরা এগুলো বিশ্বাস করব না। (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী শাহরি রাজাব, ইবনে হাজার আসকালানী; কিতাবুল মাউযূআত, ইবনুল জাওযী; আললাআলিল মাছনূআহ, জালালুদ্দিন সুয়ূতী; তানযীহুশ শারীআহ, ইবনে আররাক; তাযকিরাতুল মাউযূআত, তাহের পাটনী; আলফাওয়াইদুল মাজমুআ, শাওকানী; আলআসারুল মারফুআহ, আবদুল হাই লখনবী ইত্যদি কিতাবের রজব মাস বা এ সংশ্লিষ্ট বর্ণনা সংক্রান্ত অধ্যায়)

তবে রজব মাস যেহেতু 'আশহুরে হুরুম' তথা সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত, তাই নির্দিষ্ট কোনো দিন-তারিখ নির্ধারণ বা নির্দিষ্ট ফযীলতের বিশ্বাস ছাড়া এ মাসে নফল নামায বা রোযা রাখতে কোনো বাধা নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00