📄 যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে একটি চুল ফেলে দিল সে যেন একটি মৃত গাধা ফেলে দিল
কোথাও কোথাও এই কথাটি হাদীস হিসেবে প্রচলিত আছে- 'যে ব্যক্তি মসজিদ থেকে একটি চুল ফেলে দিল সে যেন একটি মৃত গাধা ফেলে দিল বা সে একটি মরা গাধা সরানোর সওয়াব লাভ করল।' মসজিদে কোনো ময়লা দেখলে তা পরিষ্কার করা অনেক সওয়াব ও ফযীলতের কাজ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে কোনো ময়লা দেখলে নিজ হাতে তা পরিষ্কার করতেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের দেয়ালে ময়লা দেখতে পেলেন। তখন তিনি একটি পাথরের টুকরা নিলেন এবং নিজ হাতে তা পরিষ্কার করলেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪০৮
আরেক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার সামনে আমার উম্মতের নেক আমলের প্রতিদান পেশ করা হল, এর মধ্যে 'মসজিদ থেকে ময়লা দূর করার নেক আমলের প্রতিদানও দেখতে পেলাম...। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৬১; জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৬
সুতরাং মসজিদে কোনো ময়লা দেখলে তা পরিষ্কার করা অনেক সওয়াবের কাজ। কিন্তু মসজিদ থেকে একটি চুল ফেলে দিলে মরা গাধা ফেলার সওয়াব সম্বলিত কথাটি লোকমুখে হাদীস হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেও এটি হাদীস নয়। কোনো নির্ভরযোগ্য কিতাবে তা পাওয়া যায় না। আমাদের জানামতে এর কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ নেই।
📄 ফিরিশতারা গুনাহ মাথায় নিয়ে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন
কোনো ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশের সময় ফিরিশতারা তার গুনাহ মাথায় করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন, যাতে গুনাহসহ কোনো ব্যক্তিকে পবিত্র মসজিদে প্রবেশ করতে না হয়। ওই ব্যক্তি বেশি দেরি করলে একসময় ফিরিশতারা বলেন, আল্লাহ! তার গুনাহ বহন করতে আমাদের তো খুব কষ্ট হচ্ছে। তখন আল্লাহ বলেন, গুনাহগুলো সমুদ্রে ফেলে দাও।
মসজিদে যত বেশি সময় কাটানো যায় ততই ভালো। কিন্তু মসজিদে বেশি সময় অবস্থান করার প্রতি উদ্বুদ্ধকারী উপরোক্ত বর্ণনার কোনো ভিত্তি নেই। নামাযের পর পবিত্র অবস্থায় নামাযের স্থানে বসে থাকলে ফিরিশতা মাগফিরাতের দুআ করে - হে আল্লাহ তাকে মাফ করে দিন, তার প্রতি রহম করুন। (সহীহ বুখারী, হাদীস:৬৫৯) এক নামাযের পর আরেক নামাযের অপেক্ষায় থাকলে গুনাহ মাফ হয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস:২৫১) কিন্তু ফিরিশতারা গুনাহ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন আর দেরি করে বের হলে কষ্টের কারণে তা সমুদ্রে ফেলে দেন- গুনাহ মাফ হওয়ার এই আজগুবি কাহিনীর কোনোই ভিত্তি নেই। এ ধরনের কল্পিত বিষয় বলা আবার হাদীস হিসেবে বলা অনেক বড় অন্যায়।
📄 নামাজের ফজিলত সম্পর্কে ভুল ধারণা
এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা গেল, কেউ ফজরের দুই রাকাত (ফরয) নামায আদায় করলে আলাহ তার সারা দিনের জামিন হয়ে যান। যোহরের চার রাকাত (ফরয) ও আসরের চার রাকাত (ফরয) -এই আট রাকাত আদায় করলে সে আট জান্নাতের মালিক হয়ে গেল। মাগরিবের তিন রাকাত (ফরয) ও ইশার চার রাকাত (ফরয) -এই সাত রাকাত আদায় করলে সাত জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে গেল।
এই বক্তব্যের প্রথম অংশ (ফজরের নামায আদায় করলে আলাহ সারা দিনের জামিন হয়ে যান।) সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ফযরের নামায আদায় করল সে আলাহর জিম্মায় চলে গেল...।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৬৫৭) কিন্তু বাকি অংশ কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না। সুতরাং এ অংশ হাদীস নয়।
এর পরিবর্তে নামাযের ফযীলত বিষয়ে নিম্নোক্ত সহীহ হাদীসগুলো বলা যেতে পারে।
রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, আলাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি সুন্দর করে ওযু করবে এবং সময় মত তা (পাঁচ ওয়াক্ত নামায) আদায় করবে, পূর্ণরূপে রুকু, (সিজদা) করবে, খুশু খুযু সহকারে তা আদায় করবে, তার ব্যাপারে আলাহর প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি তাকে ক্ষমা করবেন। আর যে তা করবে না তার ব্যাপারে আলাহর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই; তাকে ক্ষমাও করতে পারেন আবার আযাবে গ্রেফতার করতে পারেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪২৫)
হাদীসে কুদসীতে আলাহ তাআলা বলেন, (হে নবী!) আমি আপনার উম্মতের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছি এবং এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, যে ব্যক্তি সময়মত যত্নসহকারে তা আদায় করবে আমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো। আর যে তা করবে না তার ব্যাপারে আমার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৩০)
আর পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মাফ হওয়ার নিম্নোক্ত হাদীস তো সবারই জানা।
রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, তোমাদের কারো বাড়ির দরজায় যদি একটি নহর থাকে আর সে তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তার শরীরে কি কোনো ময়লা বাকি থাকতে পারে? সাহাবার বললেন, কখনোই না। তখন রাসূলুলাহ সালালাহু আলাইহি ওয়াসালাম বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযও তেমন; এর মাধ্যমে আলাহ বান্দার গুনাহ মিটিয়ে দেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৮; সহীহ মুসলিম ১৫৫৪)
এছাড়া এধরনের আরো অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে।
আর আলকুরআনুল কারীমে তো জান্নাতুল ফিরদাউসের আধিকারীদের গুণ বলা হয়েছে -'তারা নামাযের প্রতি যত্নবান হবে, খুশু খুযু সহকারে নামায আদায়কারী হবে।' সুতরাং নামাযের সাথে জান্নাতের ওয়াদা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির বিষয়টি ওতপ্রত জড়িত। তাই নামাযের ফযীলত হিসেবে এ বিষয়ক কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীস বলা উচিত। কিন্তু নিজ থেকে কোনো ফযীলত বানিয়ে বলা বা ভিত্তিহীন কোনো কিছু ফযীলত হিসেবে বলা ঠিক নয়。
📄 যৌবনে ইবাদতের সওয়াব জিবরীল আ. গুনে শেষ করতে পারেন না!
লোকমুখে প্রসিদ্ধ- জিবরীল আ. বলেছেন, পৃথিবীতে বৃষ্টি হলে কত ফোটা পানি পড়ে, আমি তা গুনতে পারি, কিন্তু যৌবনের ইবাদতের সওয়াব গুনে শেষ করতে পারি না। যৌবনে ইবাদতের ফযীলত হিসেবে অনেক লোক উপরোক্ত কথাটিকে হাদীস হিসেবে বলে থাকেন। কিন্তু উপরোক্ত কথাটি হাদীস নয়; হাদীসের নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। যৌবনের ইবাদত আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক প্রিয়। এর ফযীলত সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দিবেন; যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। ... (তন্মধ্যে) ঐ যুবক, যার যৌবন অতিবাহিত হয় আল্লাহর ইবাদতে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৬০; সহীহ মুসলিম ১০৩১ এ ছাড়াও যৌবনের ইবাদত বিষয়ে আরও সহীহ হাদীস রয়েছে। আমরা সেগুলোই বলব; ভিত্তিহীন কোনো কথা বলব না।