📄 পারিশ্রমিক দিয়ে ইতিকাফ করানো
কোনো কোনো এলাকায় দেখা যায়, রমযানের শেষ দশ দিনে এলাকাবাসী কেউ ইতিকাফ না করলে অন্য এলাকা থেকে বা নিজ এলাকা থেকে কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে খাবার ও পারিশ্রমিক দিয়ে ইতিকাফ করানো হয়।
এ কাজটি ঠিক নয়। পারিশ্রমিকের মাধ্যমে ইতিকাফ করালে ইতিকাফ সহীহ হয় না।
ইতিকাফ একটি ইবাদত, যা বিনিময়যোগ্য নয়। তাই ইতিকাফের জন্য বিনিময় নেওয়াও জায়েয নেই। ফলে কাউকে বিনিময় দিয়ে ইতিকাফ করালে ইতিকাফ সহীহ হবে না এবং এর দ্বারা এলাকাবাসী দায়মুক্ত হতে পারবে না।
আমরা জানি, রমযান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়াহ। যদি কোনো মসজিদে একজনও ইতিকাফে বসে তাহলে এলাকাবাসী সুন্নত তরকের গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। আর যদি একজনও ইতিকাফ না করে তাহলে ঐ এলাকার সকলেই সুন্নত তরককারী বলে গণ্য হবে।
এটি আফসোসের বিষয় যে, একটি এলাকায় বৃদ্ধ বা যুবক কাউকেই ইতিকাফ করার জন্য পাওয়া যাবে না। এমনটি হওয়া উচিত নয়। সকলেরই ব্যস্ততা রয়েছে, তাই বলে ইতিকাফের মত ফযীলতপূর্ণ আমলের জন্য পুরো এলাকায় কাউকে পাওয়া যাবে না- এটা হতে পারে না। আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে ফিকির করা দরকার এবং এ আমলের জন্য মুসল্লিদের উৎসাহিত করা দরকার। আল্লাহ আমাদের সকলকে সব ধরনের নেক আমলে অগ্রগামী থাকার তাওফীক দান করুন- আমীন। (দ্র. হেদায়া, ফাতহুল কাদীর ২/৩০৪; রদ্দুল মুহতার ২/৪৪২,৬/৫৫)
📄 বলার ভুল : আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা
সুবহানাল্লাহ- আল্লাহ তাআলার তাসবীহ বা পবিত্রতাজ্ঞাপক বাক্য। এ তাসবীহটি আলেম-সাধারণ সকলেরই জানা। সাথে সাথে এখানে আরেকটি বিষয় রয়েছে, যা জনসাধারণ আলেমদের মুখে শুনে থাকেন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। কিন্তু বিষয়টি সবাই বোঝেন না। ফলে কেউ কেউ মনে করেন, সুবহানাল্লাহ বাক্যটিই এখানে বলা হচ্ছে। আর এ ধারণা থেকেই তারা 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা'-এর স্থলে 'আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা' বলে থাকেন। এভাবে বলা ভুল। সঠিক হল, 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা'। সুবহানাল্লাহ বাক্যে 'সুবহানা'-এর সাথে সরাসরি 'আল্লাহ' এই মহান শব্দ ব্যবহৃত হয়ে (সুবহানা+আল্লাহ-এই মহান শব্দ) সুবহানাল্লাহ গঠিত হয়েছে। আর 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা' এ বাক্যের 'সুবহানাহু' শব্দে 'সুবাহানা'-এর সাথে সর্বনাম 'হু' ব্যবহৃত হয়ে (সুবহানা+হু) 'সুবহানাহু' হয়েছে। কারণ, এই বাক্যের শুরুতে 'আল্লাহ'- এই মহান শব্দ এসেছে। ফলে পরবর্তীতে সর্বনাম 'হু' ব্যবহার করা হয়েছে। আর তাই 'সুবহানাল্লাহ'-এর পরিবর্তে 'সুবহানাহু' হয়েছে। তাই 'আল্লাহ সুবহানাল্লাহি তাআলা' না বলে 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা' বলতে হয়। 'আল্লাহ'-এই মহান শব্দ উচ্চারণের পর আমরা অনেক সময়ই আল্লাহ্র বড়ত্ব বা পবিত্রতাজ্ঞাপক বাক্য বলে থাকি। যেমন, আল্লাহ তাআলা বা আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইত্যাদি। এখানে 'তাআলা' ও 'জাল্লা শানুহু' আল্লাহ্র বড়ত্ব প্রকাশক বাক্য। এরকমই আল্লাহ্র পবিত্রতা ও বড়ত্ব প্রকাশক বাক্য হল, 'সুবহানাহু ওয়া তাআলা', যা আমরা অনেক সময়ই 'আল্লাহ'-এই মহান শব্দ উচ্চারণের সাথে সাথে বলে থাকি।
📄 মাসবুক মুসল্লির দিকে মুখ করে দ্রুত নামায শেষ করার তাগাদা দেওয়া
অনেক মানুষকে দেখা যায়, তার পেছনের মাসবুক মুসল্লিগণের কারণে যদি উঠে আসার সুযোগ না থাকে আর সে উঠে আসতে চায় তাহলে দাঁড়িয়ে বা বসে মাসবুক মুসল্লিদের দিকে মুখ করে থাকে বা তাকিয়ে থাকে। এটি একটি অনুচিত কাজ। এর দ্বারা মুসল্লীর নামাযের মনোযোগ নষ্ট হয়।
মাসবুক মুসল্লির নামায শেষ হতে কেবলমাত্র দুই/তিন মিনিট সময় লাগে। তা খুব বেশি সময় নয়। এটি একটি মানসিক বিষয় মাত্র- জামাত শেষ হয়ে গিয়েছে, আমাকে এখনই মসজিদ থেকে বের হতে হবে। উল্লেখ্য, নামায শেষে ওযুসহ নামাযের স্থানে বসে থাকাও তো অনেক ফযীলতের বিষয়; ফিরিশতাদের দুআ পাওয়া যায়। হাদীস শরীফে এসেছে- যে ব্যক্তি নামাযের পর যে স্থানে নামায পড়েছে ওযুসহ সেখানে বসে থাকে তার জন্য ফিরিশতা দুআ করতে থাকে; যতক্ষণ সে ওযু অবস্থায় থাকে। ফিরিশতারা বলে- হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও, তার প্রতি রহম কর। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৫
হাঁ, উঠে যাওয়ার বিশেষ প্রয়োজন হলে সুতরা ব্যবহার করি। তা যদি না পাই তো একটু সবর করি। বসে তাসবীহ-তাহলীল পড়তে থাকি। আর ফিরিশতাদের দুআ তো পাচ্ছিই।
📄 ফরয নামাযের পরের তাসবীহ কি দ্রুত পড়াই নিয়ম!
ফরয নামাযের শেষে তাসবীহ-তাহলীল পাঠের অনেক ফযীলত রয়েছে। একটি হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ سَبَّحَ الله فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ ثَلاثاً وَثَلاثِينَ، وَحَمِدَ اللَّهِ ثَلاثاً وَثَلاثِينَ، وَكَبُرَ الله ثَلاثاً وَثَلاثِينَ، فَتِلْكَ تِسْعَةً وَتِسْعُونَ، وَقَالَ تَمَامَ المِائَةِ : لَا إِلَهَ إِلَّا الله وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ غُفِرَتْ خَطَايَاهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ البَحْرِ.
যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তেত্রিশ বার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশ বার আলহামদুলিল্লাহ, তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার বলবে। এ মিলে হয় মোট নিরানব্বই। আর শত পূর্ণ করবে এই বলে- لا إِلَهَ إِلَّا الله وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ. তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনা বরাবর হয়। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৯৭
এত বড় ফযীলতের এই আমলটি আমরা অনেকেই করি। কিন্তু কিছু মানুষকে দেখা যায়, এত দ্রুত গতিতে তাসবীহগুলো পাঠ করেন, যেন মনে হয়- এ তাসবীহগুলো দ্রুত পড়াই নিয়ম। তাসবীহ দানা বা যারা আঙুলে গনে পড়েন তাদের তাসবীহ বা আঙুল এত দ্রুত নড়াচরা করে, যেন তারা তাসবীহ পড়ছেন না, বরং কারো সাথে পাল্লা দিয়ে তাসবীহের দানা গুনছেন বা আঙুল নাড়ছেন। এটি একটি ভুল পদ্ধতি।
তাসবীহ স্পষ্ট উচ্চারণে ধীরে-সুস্থে সুন্দর করে পড়া উচিত। একটু চিন্তা করে দেখি, দ্রুত উচ্চারণের কারণে যেখানে আমি বলতে চাচ্ছি- 'সুবহা-নাল্ল-হ', সেখানে হয়ে যাচ্ছে- 'সুবানাল্লা', যা অর্থহীন শব্দ।
আরো গভীরভাবে যদি চিন্তা করি- আমি কার তাসবীহ পাঠ করছি। মহান রাব্বল আলামীনের। তো এভাবে তাঁর তাসবীহ পাঠ করা এক প্রকার বেআদবী নয় কি?
এর দ্বারা ফযীলতের স্থলে গুনাহ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সুতরাং এ তাসবীহগুলোসহ সকল তাসবীহ-তাহলীল, তিলাওয়াত আমরা স্পষ্ট উচ্চারণে ধীরে-সুস্থে সুন্দর করে করব ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সকল ভালো কাজ সহীহ তরীকায় করার তাওফিক দান করুন।