📄 ঈমান বিধ্বংসী কতিপয় ভ্রান্ত বাক্যালাপ ও কার্যকলাপ
* যদি কেউ বলে আগে আল্লাহ পরে আপনি অথবা আল্লাহ আছেন উপরে আপনি নিচে তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা সর্বাবস্থায়, সর্বত্র বিদ্যমান। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, هو الاول والاخر والظاهر والباطن وهو بكل شيء عليم ؛ فأينما تولوا فثم وجه الله ؛
উপরোল্লিখিত আয়াতদ্বয়ের সারমর্ম হলো: আল্লাহ তায়ালা পূর্বে-পরে, সামনে-পিছনে, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে সবখানে বিরাজমান। এখন কোন মানুষকে এর কোন একটি স্থানে স্থাপন করা আল্লাহর স্থানে স্থাপন করার নামান্তর।
* মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া- এ কথাটি বলা অনুচিত। কেননা পাঞ্জা লড়া শক্তিশালী দুইজন ব্যক্তির দ্বারা হয়। অথচ মৃত্যুদাতা আল্লাহ তালার সমশক্তি সম্পন্ন পৃথিবীতে আর কেউ নেই ।
* বিসমিল্লায় গলদ বিসমিল্লাহতেই ভুল। এ কথাটা একেবারে সরাসরি কুফুরী। কেননা বিসমিল্লাহ পবিত্র কালামের একটি আয়াত। এতে কোন ভুল নেই। সুতরাং এসব কথা থেকে বিরত থাকা উচিত।
* যেসব বিষয়ে ঈমান আনতে হয় তার কোনো একটিকে অস্বিকার করা কুফরী।
* কোন মুসলমানকে কাফের আখ্যায়িত করা কুফুরী। (আহসানুল ফতোয়া)
* কুফর ও ভিন্ন ধর্মের কোনো শক্তিআর বা ধর্মীয় নিদর্শন গ্রহণ করা, যেমন খ্রিস্টানদের ক্রুশ, হিন্দুদের পৈতা ইত্যাদি।
* কোরআনের কোন আয়াতকে অস্বীকার করা কিংবা তার কোনো নির্দেশ সম্পর্কে ঠাট্টা করা।
* হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম মনে করা।
* কারো মৃত্যুতে আল্লাহর উপর অভিযোগ আনা। আল্লাহকে জালেম সাব্যস্ত করা ইত্যাদি কুফরি ।
* ধর্মীয় কোন বিষয়, দ্বীনি ইলম, আলেম-ওলামাগণ এর প্রতি তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য করা, অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান করা কুফুরী।
* কেউ প্রকাশ্যে কোনো কবিরা গুনাহের পর যদি বলে আমি এর জন্য গর্বিত। তাহলে সেটাও কুফুরী।
* যে জাদুর মধ্যে ঈমান পরিপন্থী কোন শিরকযুক্ত কথাবার্তা থাকে কিংবা কাজকর্ম হয়, তবে সেটাও কুফুরী।
* হাসি-ঠাট্টা করে হলেও কুফরি বাক্য মুখে উচ্চারণ করাটাও কুফুরী ।
* নিজেকে সোয়াব ও গুনাহের ঊর্ধ্বে মনে করা কুফুরী।
* নামাজ সম্পর্কে অবজ্ঞা প্রকাশ করে এ কথা বলা যেড, আমার উপর নামাজ পড়া ফরজ নয়। জ্ঞানীদের জন্য নামাজ পড়া ঠিক নয় অথবা নামাজ পড়ে কি লাভ আমার অমুক আত্মীয় মারা গেছে বা অমুক সম্পদ নষ্ট হয়ে গিয়েছে, আমার নামাজ পড়ে কি হবে ইত্যাদি বললে সে কাফের হয়ে যাবে।
* ইচ্ছাকৃতভাবে জানা থাকা সত্ত্বেও কেবলা ব্যতীত অন্য দিকে ফিরে নামাজ আদায় করা কিংবা স্বেচ্ছায় বিনা অজুতে নামাজ পড়লে কাফের হয়ে যাবে।
* যদি কেউ বলে আদম যদি গন্ধম না খেতো তাহলে আমরা বদবখত হতাম না। তাহলে সেও কাফের হয়ে যাবে।
* কেউ আল্লাহর কোন বিধানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলল যে, বিধান দিয়ে কি হবে? তাহলে সেঝ কাফের হয়ে যাবে।
* যদি কেউ নামাজ, রোজা সম্পর্কে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে বলল যে, কে যায় এরূপ উঠা বসা করতে অথবা বলে যার ঘরে ভাত নেই সেই রোজা রাখবে আমি রোজা রাখবো কেন? ইত্যাদি তবে এরূপ বলাটাও কাফের এর অন্তর্ভুক্ত।
* রাসূলগণ কিংবা সাহাবাগণের কোন কর্মপদ্ধতি দেখে যদি কেউ বলে এটা বেয়াদবি তবে সে কুফরি করল ।
* যদি কেউ অপর কাউকে বলে যে, তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? উত্তরে সে বলল না। তবে সেও কাফের হয়ে যাবে।
* যদি কোন ব্যক্তি কাউকে গুনাহের কাজে লিপ্ত দেখে যদি বলে তুমি কি মুসলমান নও? আর শ্রোতা উত্তরে বলে হ্যাঁ, আমি মুসলমান নই। তবে সেও কাফের হয়ে যাবে।
* যদি কেউ কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলে তুই খোদা হলেও আমার হক আদায় করে ছাড়বো অথবা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা কিংবা জিব্রাইল নেমে এসে বললেও আমি এই কাজ করব না ইত্যাদি বলে। তাহলে সে ব্যক্তি ও কাফের হয়ে যাবে।
* যদি কোন ব্যক্তি বলে আমি এমন কাজ করব যা খোদাও জানে না। এটাও কুফুরী।
* কাফের সমাজের কোন কাজ পছন্দ হওয়ার কারণে কেউ যদি বলে আর যদি কাফের হতাম তাহলে কতই না ভালো হতো। তাহলে এটাও কাফের হওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
* কারো সন্তান মারা যাওয়ার পরে কেউ যদি বলে হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রতি জুলুম করে এত কষ্ট দিচ্ছ, তাহলে এটাও কুফুরী।
* কেউ যদি ইসলাম ধর্মের নিন্দাবাদ করে বিজাতীয় ধর্মের প্রশংসা করে তাহলে তার ঈমান থাকবে না।
* “কষ্ট করলে কেষ্ট মিলে” কেষ্ট হিন্দু দেবীর নাম। তাকে পাবার জন্য কোন মুসলমান কষ্ট করবে না। ইসলামধারী একজন ব্যক্তির জন্য স্বভাবতই এ কথাটি পরিত্যাজ্য। (আহসানুল ফতোয়া)
* “আল্লাহর সাথে হিল্লাও লাগে” এ কথাটি মাজার পূজারী ভ্রষ্টদের একটি উক্তি। যারা তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মাজারে যায় এবং দলিল স্বরূপ এ কথাটি বলে থাকে। মূলত মানুষের নাজাতের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তার সাথে আর কারোর প্রয়োজন নেই। সুতরাং এ কথাটিও পরিত্যাজ্য।
* "নির্মল চরিত্র বুঝাতে” দুধে ধোয়া তুলসীপাতা বলা। এটি একটি অনৈসলামিক পরিভাষা। ইসলামে তা হারাম।
* কতিপয় লোককে দেখা যায় তারা আল্লাহ ও রাসূলের নামকে একত্রে করে এ কথা বলে থাকে যে, তারা বলে আল্লাহ ও রাসূলের নাম নিয়ে বের হলাম বা আল্লাহ, রাসূল তোমার মঙ্গল করুন কিংবা আল্লাহ রাসুলের উপর ভরসা করা ইত্যাদি। এভাবে আল্লাহ ও রাসূলের নাম মিলিয়ে বলা ঠিক নয়। কেননা মঙ্গল-অমঙ্গল ইত্যাদি সবকিছুর একচ্ছত্র আধিপতি আল্লাহ তাআলা-ই। রাসূলকে এর অংশীদার মনে করা শিরিক। (কেফায়াতুল মুফতী)
* বিভিন্ন জায়গায় ভন্ড পীরের মুরিদদেরকে নিয়ে ইয়া রাসুলাল্লাহ এর জিকির করে আবার বিভিন্ন সময় ইয়া আলি, ইয়া খাজা, ইয়া গাউসুল আজম বলে চিৎকার দেয় এগুলো নাজায়েজ।
* ইয়া রাসূলাল্লাহ -এর অজিফা বানিয়ে নেওয়া কিংবা এবাদত মনে করে তা পড়া বিদ'আত যা মারাত্মক গুনাহ।
* এমনিভাবে অনেক বিপদগ্রস্থ অবস্থায় ইয়া রসুলাল্লাহ বলে থাকে। এটাও পরিত্যাজ্য। (কেফায়াতুল মুফতী)
* ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধানকে লক্ষ্য করে কতিপয় স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল বলে থাকে এটা "মধ্যযুগী বর্বরতা” এটা কুফরি বাক্য। কেননা মধ্যযুগ ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ।
* মন ঠিক থাকলে পর্দা লাগেনা। "মনের পর্দা বড় পর্দা" ইসলামী বিধান সম্পর্কে উদাসীন ব্যক্তিরা এ ধরনের সস্তা বুলি আওড়ায়। যদি কেউ সত্যিকারার্থে পর্দার বিধানকে অস্বীকার করে এ কথা বলে থাকে তাহলে তা কুফুরী হবে।
* নামাজ না পড়লে কি হবে ঈমান ঠিক আছে। এটি ইসলাম থেকে বের করার একটি মূলনীতি। মূলত যার ঈমান প্রকৃতপক্ষে ঠিক সে এ ধরনের কথা বলতে পারে না।
* ভক্তি থাকলে পাথরেও মুক্তি মিলে। অজ্ঞ একশ্রেণীর ওঝা ঝাড়-ফুঁক প্রদানকারীর একটা বক্তব্য। তারা সাধারন লোকদের আস্তাকুড়ানোর জন্য এ ধরনের ভ্রান্ত কথাবার্তা বলে থাকে। একজন মুসলিম সে কেবলমাত্র আল্লাহর উপর আস্থা রেখে তাঁকেই ভক্তি-শ্রদ্ধা করে পার্থিব উপকরণ গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে পাথর কিংবা অন্য বস্তুর প্রতিও ভক্তি স্থাপনে কোন ফলদায়ক হবে না; বরং ফলশ্রুতিতে একপর্যায়ে আল্লাহর প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়বে। যাতে ঈমান হয়ে যায় ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং এ ধরনের কথা বলা ঠিক নয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য- উপরে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে বা যেগুলোকে কুফুরী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, সেগুলো কারো মধ্যে পরিলক্ষিত হলেই তাকে কাফের বলে ফতোয়া দেওয়া যাবে না। কেননা এগুলোর কোনোটি তো স্পষ্টতই ঈমান বিধ্বংসী এবং কোনটি কুফুরী। আবার কুফুরের মধ্যেও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যদিও সব স্তরের কুফুরী গোমরাহী এবং যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে পথভ্রষ্ট এবং পাপিষ্ট; তথাপিও কুফুরের কোন স্তর পাওয়া গেলে কাফের বলে আখ্যা দেওয়া যায় তা বিজ্ঞ ওলামা ও মুফতীগণই নির্ণয় করতে পারেন। মুফতীগণের শরণাপন্ন হওয়া ব্যতীত নিজেদের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা সমীচীন হবে না।
মোটকথা- একজন মুমিনের ঈমান খুবই দামি এবং মূল্যবান। আর এটাই তার আখেরাতের মুক্তির পরোয়ানা। পার্থিব কোন কিছুর বিনিময়ে ঈমানকে বিক্রি করা যাবে না। অতএব ঈমান বিধ্বংসী বিষয়াবলী চিহ্নিত করে তা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সুতরাং কারো যদি অতীতে এমন হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে খাঁটি মনে তওবা করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে ঈমান বিধ্বংসী কার্যকলাপ থেকে দূরে রেখে ঈমান নিয়ে কবরে যাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন ॥
📄 ঝাড়-ফুঁক বিষয়ে আকিদা
ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ কবজ এর কাজ হওয়াটা নিশ্চিত নয়। হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। দোয়া করলে রোগ ব্যাধি আরোগ্য হতে পারে, নাও হতে পারে। ঝাড়-ফুঁক তাবিজ কবজ এর চেয়ে দোয়া অধিক বেশি উত্তম। ঝাড়-ফুঁকের ও তাবিজ কবজ এর নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। আল্লাহ তাআলা যদি ইচ্ছা করেন তাহলে সবকিছু হয়ে যায়। অধিকাংশ মানুষ ঝাড়-ফুঁক কোরআন হাদিস থেকে উদ্ভুত। কোরআন হাদিসে কোন কাজ ভাল হবে স্পষ্ট করে বলা হয়নি। তাবিজের মাধ্যমে কোনো কাজ না হলে এরূপ বলার অবকাশ নেই যে, কোরআন হাদিস তাহলে কি সত্য নয়? এ ব্যাপারে আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী তার সুবিখ্যাত ফতুয়া গ্রহান্তরে উল্লেখ করেন, অর্থ ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, তাবিজ মাকরুহ হবে যদি তা আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় লিখিত হয় অথবা এমন তাবিজ যার অর্থ বুঝা যায় না। হতে পারে এতে জাদু বা কুফুরী কালাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে যদি তাবিজ কোরআনের আয়াত দ্বারা লেখা হয় অথবা কোরআন হাদিসে বর্ণিত কোন দোয়ার মাধ্যমে লেখা হয় তাহলে কোন অসুবিধা নেই। তাবিজ কিংবা ঝাড়-ফুঁকের জন্য নির্দিষ্ট দিন নির্দিষ্ট সময় কিংবা নির্দিষ্ট বিশেষ শর্ত রয়েছে, এরূপ মনে করা ঠিক নয়। তাবিজ কিংবা ঝাড়-ফুঁকের জন্য কারো অনুমতি প্রাপ্ত হওয়া আবশ্যক নয়। তাবিজ কিংবা ঝাড়-ফুঁকের মাধ্যমে ভালো প্রভাব পরলে তাবিজ দাতার বুযূর্গী মনে করা ঠিক নয়। যা কিছু হয় সব আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা যদি ইচ্ছা করেন এর মাধ্যমে তাকে আরোগ্য দিবেন তাহলে আরোগ্য দিতে পারেন। আর যদি ইচ্ছা করেন তাবিজ-কবজে আরোগ্য রাখেননি তবে তাবিজ কবজ এর দ্বারা কোন কাজ হবে না। তাই আমাদের এরকম চিন্তা করা ঠিক নয় যে, তাবিজের মাধ্যমে মানুষের আপদ-বিপদ ভালো হয়ে যাবে। আপদ-বিপদ যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালাই দিয়ে থাকেন তেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা সমাধান করে থাকেন। সুতরাং মানুষের জন্য উচিত হলো বিপদ-আপদে ও সুখ দুখে আল্লাহ তা'আলাকে সর্বদা স্মরণ করা এবং বেশি বেশি আল্লাহ তালার কাছে দোয়া করা। (রদ্দুল মুহতার-৯/৫২৩)