📄 আরেকটি শিরকি আমল
অনেক মানুষকে প্রায় ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা ইয়া গাউসুল আজম ! বলে থাকে বরং সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তালাকেই ডাকা এবং সর্বক্ষেত্রে তার নামেই শুরু করা উচিত। এটাই তাওহীদ ও একত্ববাদের দাবি এবং শরীয়ত ও সুন্নতের শিক্ষা।
কুরআনে কারীমে স্থলভাগে আরোহণ করার সময় এ দোয়া পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন যে,
سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ.
এতে বলা হয়েছে পবিত্র তিনি যিনি এই বাহনটি আমাদের অধীন করেছেন। তাকে অধীন করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। আর অবশ্যই আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছেই ফিরে যাব ।
আর জলভাগে আরোহণ করার সময় এই দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন যে,
بِسْمِ اللَّهِ مَجْرِيهَا وَمُرْسَاهَا إِنَّ رَبِّي لَغَفُورٌ رَحِيمٌ.
অর্থ আল্লাহর নামে চলা ও স্থির হওয়া। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা ক্ষমতাশীল মেহেরবান।
এ দোয়া সমূহ তাওহীদের কত স্বচ্ছ শিক্ষা রয়েছে। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যাকে মূর্খ মানুষেরা গাউসুল আজম নামে ডাকে, অথচ এ নামটি সংশোধন করা আবশ্যক। কেননা আব্দুল কাদের জিলানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ফরিয়াদ পূরণকারী নন; বরং তিনি নিজেই আল্লাহ তালার দরবারে ফরিয়াদকারী ছিলেন। তাই উক্ত নামে তাকে ডাকা শিরিক। তিনি অত্যন্ত তওহিদবাদী ছিলেন। তিনি লোকদেরকে শরীয়ত ও সুন্নতের শিক্ষা দিতেন। তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা এবং শিরক ও বিদ'আতকে দূর করাই ছিল তার জন্য অন্যতম মিশন। তিনি বলতেন, আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করা অপরিহার্য। আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কাউকে ভয় করো না এবং তাকে ছাড়া অন্য কারো কাছে আশা পোষণ করোনা। সকল প্রয়োজন তার নিকট পেশ করো এবং তার কাছে প্রার্থনা করো। আল্লাহ ছাড়া কারো উপর ভরসা রেখো না। তিনি একমাত্র সত্তা যিনি সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত। খবরদার একক সত্তার উপর ভরসা করো এবং সে একক সত্তার সাথেই সকল আশা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করো। (মালফুজাত ফাতোয়ায়ে রহীমিয়া:৩/৫)
📄 আল্লাহর সহ্য হবে না
অনেকে কারো অত্যাচারের ভয়াবহতা কিংবা সীমাতিরিক্ততা প্রকাশ করার জন্য অনেক বলে থাকে, তার এত জুলুম আল্লাহ তালার সহ্য হবে না। এভাবে বলা ভুল, কারণ সহ্য না হওয়া একটি দুর্বলতা যা আল্লাহ রাব্বল আলামীনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এমন কোন ঘটনা ঘটতে পারে না, আল্লাহ সহ্য করতে পারবেন না। আর যা কিছু ঘটে সবকিছুই তো আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকেই ঘটে। তাহলে সহ্য করতে পারবেন না, হবে না এমন কথা বলাই তো অযুক্তিক। আল্লাহ তাআলা অন্যায়ের শাস্তি দিবেন। অত্যাচারের প্রতিদান নেবেন এবং বে-ইনসাফ কারীর শাস্তি দিবেন। আল্লাহ তাআলা সবকিছুর ক্ষমতা রাখেন। তাই আল্লাহ তালার সহ্য হবে না কিংবা সহ্য করবেন না এ জাতীয় কোন বাক্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
📄 একটি কুফরী বাক্য
আল্লাহ আমার সন্তান ছাড়া আর কাউকে দেখল না! মা-বাবার জন্য সন্তানের বিয়োগ-বেদনা অসহনীয়। ফলে সন্তানের মৃত্যুতে কোনো কোনো মা-বাবার মুখ থেকে এমন কথা বের হয়ে যায়, যা কুফরী কথা। যেমন সন্তানের মৃত্যুতে কোনো কোনো মা-বাবাকে বলতে শোনা যায়- "আল্লাহ আমার সন্তান ছাড়া আর কাউকে দেখল না।” মুমিন এমন কথা বলতে পারে না। দ্বীনী জ্ঞান, সহীহ দ্বীনী বুঝ ও ভারসাম্যের অভাবেই মানুষ এমন কথা বলে ফেলে। এটি একটি কুফরী বাক্য, যা আল্লাহর ফয়সালার উপর আপত্তি ও অভিযোগের বাক্য।
সন্তান আল্লাহর দান। তিনি যাকে ইচ্ছা, সন্তান দান করেন। যাকে ইচ্ছা, দান করেন না। তেমনি সন্তান দেওয়ার পর সন্তানকে জীবিত রাখা বা নিয়ে যাওয়াও আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আর এ সন্তান তো আল্লাহই অনুগ্রহ করে দান করেছিলেন, তিনিই আবার নিয়ে গেছেন। তাছাড়া এতে অনেক হেকমতও নিহিত থাকে, যা আমাদের জানা নেই। সুতরাং আল্লাহর ফয়সালা মেনে নেওয়া ও সবর করাই মুমিনের শান ও নবীজীর শিক্ষা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো এক কন্যা খবর পাঠালেন- তার এক সন্তান মৃতপ্রায় অবস্থা। তখন নবীজী খবরদাতাকে বললেন, তুমি গিয়ে তাকে বল-
فَلْتَصْبِرُ فَمُرْهَا مُسَمّى بِأَجَلٍ عِنْدَهُ شَيْءٍ وَكُلِّ أَعْطَى ، مَا وَلَهُ أَخَذَ مَا سِهِ إِنْ وَلْتَحْتَسِبُ
আল্লাহ যাকে নিয়ে যান সেও আল্লাহর, যাকে রাখেন সেও তাঁর। আর সবকিছুর জন্যই তাঁর কাছে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়সীমা। সুতরাং তুমি তাকে ধৈর্য ধারণ করতে বল এবং সওয়াবের আশা করতে বল। পরে নবীজী তাকে দেখতে গেলেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯২৩
কারো মৃত্যুতে মাতম করা, জামা-কাপড় ছেঁড়া, গাল চাপড়ানো, জাহেলী কথাবার্তা বলা- হাদীস শরীফে এগুলোর ব্যাপারে ধমকি এসেছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الجَاهِلِيَّةِ بِدَعْوَى وَدَعَا الجُيُوبَ، وَشَقِّ الخُدُودَ ، لَطَمَ مَنْ مِنَّا لَيْسَ
যে (কারো মৃত্যুশোকে বিলাপ করে) গাল চাপড়ায়, জামা ছেঁড়ে এবং জাহেলী যুগের মত বিভিন্ন (অন্যায়) কথা বলে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৯৪
তাহলে কি সন্তান বা কারো বিয়োগ-বেদনায় কাঁদাও যাবে না? হাঁ, কাঁদা যাবে, তবে বিলাপ করা এবং জাহেলী কথাবার্তা বলা যাবে না। নিজ সন্তানের বিয়োগ-বেদনায় নবীজীও কেঁদেছেন, কিন্তু সাথে সাথে সতর্কও করে দিয়েছেন- এ অবস্থায়ও আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কথা বলা যাবে না। নবীজীর সন্তান ইবরাহীম রা.-এর মৃত্যুর সময় নবীজী কাঁদছিলেন। এ দেখে আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বললেন, আপনিও কাঁদছেন আল্লাহর রাসূল! (তিনি ধারণা করেছিলেন, এ সাধারণ কান্নাও নিষিদ্ধ বিলাপের অন্তর্ভুক্ত।)। তখন নবীজী বললেন, (এটি বিলাপ নয়) এ তো মানুষের মনের দয়া-মায়া (-এর স্বাভাবিক প্রকাশ ও কষ্টের অশ্রæ। এতে সমস্যা নেই)। তারপর বললেন-
يَا بِفِرَاقِكَ وَإِنَّا رَبَّنَا ، يَرْضَى مَا إِلَّا نَقُولُ وَلا يَحْزَنُ، وَالقَلْبَ تَدْمَعُ العَيْنَ إِنْ لَمَحْزُونُونَ إِبْرَاهِيمُ
চোখ অশ্রুসজল, হৃদয় ব্যথিত। কিন্তু আমাদের রব অসন্তুষ্ট হন- আমরা এমন কথা বলব না। হে ইবরাহীম! তোমার বিযোগে আমরা বড়ই ব্যথিত। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১৩০৩
সুতরাং কারো মৃত্যুতেই আমরা বিলাপ করব না এবং আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কথা বলব না। বরং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন বলব এবং সবর করব, যার বিনিময়ে আল্লাহ জান্নাত দিবেন। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
ثُمَّ الدُّنْيَا أَهْلِ مِنْ صَفِيهُ قَبَضْتُ إِذَا جَزَاءُ، عِنْدِي الْمُؤْمِنِ لِعَبْدِي مَا الجَنَّةُ إِلَّا احْتَسَبَهُ
যখন আমি আমার মুমিন বান্দার প্রিয়জনকে উঠিয়ে নিই আর সে (ছবর করে এবং) সওয়াবের আশা রাখে; কেবল জান্নাতই হতে পারে এর প্রতিদান। (-সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪২৪-)
📄 একটি মারাত্মক ভ্রান্ত চিন্তা : কর্মই ধর্ম
সেদিন এক ভাইকে কথা প্রসঙ্গে বলতে শুনলাম- কর্মই ধর্ম; কে কোন ধর্মের তা কোনো বিষয় নয়, কে কেমন আমল করছে সেটাই আসল বিষয়। অর্থাৎ, ব্যক্তি যে ধর্মেরই হোক, ভালো কাজ করলে মুক্তি পাবে! লোকটি শিক্ষিত এবং মসজিদের মুসল্লি। শুনে অবাক হলাম। অবাক হওয়ারই কথা। একজন শিক্ষিত মানুষ আবার মসজিদের মুসল্লি, তার মুখ থেকে এমন কথা!
আরো মানুষকে এমন কথা বলতে শুনেছি। আসলে প্রয়োজনীয় দ্বীনী ইলম না থাকায় মানুষ এ ধরনের কথা বলে থাকে।
হয়ত তাদের ধারণা, সব ধর্মের মানুষের সাথে যেহেতু ভালো আচরণ করতে হবে, তাই সকলের ধর্ম ও আদর্শের বিষয়েও উদার (?) হতে হবে। তার ধর্ম ও বিশ্বাসকেও সঠিক বলতে হবে।
একটু ভেবে দেখি, আদর্শের ক্ষেত্রে কি কোনো উদারতা চলে। শিরকের সাথে কি কোনো আপস চলে?
এটা কি সম্ভব, যে আল্লাহর সাথে কাউকে (বা হাজার দেবতাকে) শরীক করে তাকেও সঠিক বলব!!
আচ্ছা, বিষয়টি যদি এমনই হয় যে, কে কী আমল করছে সেটাই আসল বিষয়। তাহলেও একজন অমুসলিম কখনোই নাজাত পেতে পারে না। কারণ, সে সবচেয়ে বড় আমলেই তো ত্রুটি করছে। সে তো আল্লাহর সাথে শরীক করছে। আর আল্লাহ তাআলার স্পষ্ট ঘোষণা-
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاء وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَا لَّا بَعِيدًا:
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করাকে ক্ষমা করবেন না। এর নিচের যে কোনোও গুনাহ যার ক্ষেত্রে চান ক্ষমা করে দেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করে সে সঠিক পথ থেকে বহু দূরে সরে যায়। -সূরা নিসা ৪ : ১১৬
আচ্ছা, আল্লাহর সাথে শরীক করা, আল্লাহর দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করা, আল্লাহর কিতাবকে প্রত্যাখ্যান করা কি সবচেয়ে বড় অন্যায় নয়! আল্লাহর সৃষ্টি হয়ে, আল্লাহর যমিনে বসবাস করে, তার দেওয়া রিযিক ভক্ষণ করে যে আল্লাহকে অস্বীকার করে, সে কি সবচেয়ে বড় অপরাধী নয়! এত বড় বড় অন্যায় কাজ কেন আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়?
হাঁ, অমুসলিমের যত অধিকার আছে আমি তা আদায় করব। তার সাথে ভালো আচরণ করব। প্রতিবেশি হলে প্রতিবেশির হক আদায় করব। তার প্রতি জুলুম করব না। কিন্তু এর অর্থ তো এই নয় যে, তার শিরকি-কুফরিকেও সঠিক বলব। যে কোনো ধর্মের অনুসরণকে বৈধ বলব। তাদের শিরকি-কুফরি আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করব। তাদের বিশ্বাস ও দর্শনকে ভালো চোখে দেখব! (নাউযুবিল্লাহ)
আল্লাহ আমাদের সকল প্রকার ভ্রান্ত চিন্তা থেকে হেফাযত করুন। আল্লাহ তাআলার এ সুস্পষ্ট ঘোষণা স্মরণ রাখার তাওফিক দিন-
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট (গ্রহণযোগ্য) দ্বীন কেবল ইসলামই।... -সূরা আলে ইমরান ৩ : ১৯
স্মরণ রাখি এই আয়াতও-
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
তরজমা : যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনোও দ্বীন অবলম্বন করতে চাবে, তার থেকে সে দ্বীন কবুল করা হবে না এবং আখেরাতে যারা মহাক্ষতিগ্রস্ত সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। -সূরা আলে ইমরান ৩ : ৮৫
আরো স্মরণ রাখি রাসূলের এই বাণীও-
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَا يَسْمَعُ بِي أَحَدٌ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ يَهُودِيُّ، وَلَا نَصْرَانِي ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنُ بِالَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ، إِلَّا كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ
ঐ সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ। এই উম্মতের যে কেউ-সে ইহুদী হোক বা নাসারা- আমার রিসালাতের সংবাদ পাওয়ার পরও আমার প্রতি ঈমান না এনে মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৪০)