📄 ৪. ওলী আউলিয়াদের ক্ষমতা ও শক্তি
ওলী আউলিয়াদের ক্ষমতা ও শক্তি বর্ণনা করার জন্য তারা যেসব কাহিনী তৈরি করেছে, তার মধ্যে আশ্চর্যকর একটি কাহিনী হলো, জনৈক ব্যক্তি বায়েজিদ বোস্তামীর কাছে উপস্থিত হয়ে দেখলো যে, বায়েজিদ বোস্তামী আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তখন সেই ব্যক্তি বললো, হে ওস্তাদ! এটা কী? তখন বায়েজিদ বোস্তামী বললো, আমি আরশে গিয়েছিলাম এবং এক পা দিয়ে জমীনকে ভাঁজ করেছিলাম। তখন আমি দেখলাম যে, ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন মুখ খুলে থাকে, তেমন আরশ রবের খোজে মুখ খোলে রয়েছে। আমি আশ্চর্য হয়ে চিৎকার করে বললাম, এটি তো এক আশ্চর্যকর বিষয়! দয়াময় আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, তিনি আরশের ওপরে রয়েছেন। তাই আমি তোমার কাছে তাঁর খোজে এসেছি। কিন্তু আমি তোমাকে এই অবস্থাতে দেখছি। তখন আরশ উত্তর দিলো। তারপর আল্লাহ তা'আলা আমার হয়ে আরশকে বললেন যে, হে আরশ! তুমি যদি আমাকে পেতে চাও, তাহলে আমাকে বায়েজিদের অন্তরে তালাশ করো।
তাদের তৈরি করা কথার মধ্যে আরো রয়েছে যে, হিংস্র পশুরা তাদেরকে ভয় করে ও তাদের আনুগত্য করে। আর তাদের বিষয়ে এমন জ্ঞান রয়েছে, যার মাধ্যমে অন্তরে কী ঘটছে তা তারা জানতে পারে। বেরেলভী একটি কাল্পনিক কাহিনী বর্ণনা করে। সেটি হলো, দুইজন আলেম কোনো এক আল্লাহর ওলীর কাছে উপস্থিত হলেন এবং সেই ওলীর পিছনে সালাত আদায় করলেন। ওলী সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করল, কিন্তু ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করল না এবং তাজবীদের কায়েদাতে হরফগুলো তার মাখরাজ অনুযায়ী উচ্চারণ করল না। তখন এই ওলীর বিষয়ে তাদের অন্তরে ভাবনা আসলো, যেই ওলী তাজবীদের কায়েদাগুলো জানে না। তাদের অন্তরে যা হচ্ছিল ওলী সবই জানতে পারছিল, কিন্তু সে নিশ্চুপ ছিল। তারপর সেই দুই আলেম গোসল করার জন্য নদীতে গেলেন এবং তাদের কাপড়গুলো খুলে নদীর এক পাশে রাখলেন। তারপর এক সিংহ এসে সেই কাপড়গুলো একত্রিত করে তার ওপর বসে পড়লো। তারপর সেই দুই আলেম সেই সিংহের চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন, যাতে তারা সেখান থেকে বের হতে পারে। কিন্তু সেই সিংহ চলে যায় না। এই খবর ওলীর কাছে পৌঁছালে সে দ্রুত সিংহের কাছে আসলো। তারপর তার কান ধরে ডান গালে একটি থাপ্পড় দিলো, তারপর মুখমন্ডল ঘুরিয়ে বাম গালে আরেকটি থাপ্পড় দিলো। তারপর তাকে বললো যে, তুমি আমাদের মেহমানদের ক্ষতি করার সাহস করেছো? এখান থেকে চলে যাও। তখন সে পালিয়ে গেল। তারপর ওলী দুই আলেমকে বললো, আপনারা জিহ্বাকে ঠিক করেছেন (এতে সে তাদের তাজবীদ ও কিরাআতের দিকে ইঙ্গিত করল), আর আমরা অন্তরকে ঠিক করেছি। এটি হলো, সেই দুই আলেম মনে মনে যা ভেবেছিল তার জন্য ওলীর পক্ষ থেকে প্রতিউত্তর।
এই সম্প্রদায়ের কিতাবগুলোতে এই ধরনের কত বেশিই না কল্পকাহিনী রয়েছে! আর হাস্যকর ও দুঃখজনক ঘটনা বহু রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে বেরেলভী বর্ণনা করেছে যে, আমার ওস্তাদ আহমাদের দুটি স্ত্রী ছিল। আর সে আব্দুল আযীয দাব্বাগের মুরীদ ছিল। একবার সে আমার ওস্তাদকে বললো যে, তোমার এক স্ত্রী জাগ্রত থাকাবস্থাতে তুমি কেন আরেক স্ত্রীর সাথে সহবাস ও মেলামেশা করলে? তখন সে বললো, হে আমার ওস্তাদ! সে তো জাগ্রত ছিল না, বরং সে ঘুমন্ত ছিল। তখন আব্দুল আযীয দাব্বাগ বললো, সে ঘুমিয়ে থাকার ভাব করেছিল, কিন্তু আসলে সে ঘুমিয়ে ছিল না। তখন সে বললো, হে আমার ওস্তাদ! আপনি কিভাবে এটা জানতে পারলেন? তখন তার শাইখ বললো, সেখানে তৃতীয় আরেকটি খাট ছিল কি? সে বললো, হ্যাঁ, সেখানে আরেকটি খাট ছিল। তখন তার শাইখ বললো, আমি সেই খাটের ওপরই ছিলাম।
এই ধরনের কল্পকাহিনী থেকে আল্লাহ তা'আলার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এর চেয়েও কি বড় ও নোংরা কল্পকাহিনী থাকতে পারে? শাইখ তার মুরীদ ও স্ত্রীদের মাঝে একই ঘরে ঘুমায়? এর চেয়েও বড় কথা হলো, শাইখ মুরীদের নড়াচড়াও দেখে, এমনকি স্ত্রীর সাথে সহবাস কারিও দেখে এবং আরেক স্ত্রীকে দেখে যে, সে তার স্বামী সহবাসের দিকে তাকিয়ে আছে! এটি কি দীন ও শরীআত হতে পারে? এটিই যদি দীন হয়, তাহলে কোনটি নাস্তিকতা, পাপাচার ও ফাসেকী তা আমাদের জানা নেই। আর আমরা জানি না যে, কোনটি লজ্জা আর কোনটি নৈতিকতা, যেটি উদীয়মান প্রজন্মকে শিক্ষা দেওয়া হয়, যেমন দৃষ্টি নত করা এবং অসার কথাবার্তা থেকে দূরে থাকা। বেরেলভী সম্প্রদায়ের দাবী অনুযায়ী যদি আল্লাহর ওলীরা এই কাজগুলো সম্পর্কে জানে, এই ধরনের অশ্লীল কাজগুলো করে, শরীআতের হারাম বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দেয়, মাহরাম নয় এমন মহিলাদের মাঝে ঘুমায়, স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে, তারপর সেগুলো নির্লজ্জতা ও অসম্মান করে সেগুলো আবার বর্ণনা করে, যে তারা একান্তে তা দেখেছে ও পর্যবেক্ষণ করেছে, এগুলোই যদি ওলী হওয়ার প্রমাণ হয় এবং এগুলোই যদি কারামত হয়, তাহলে এমন ওলী ও কারামত থেকে সালাম জানাই।
তারপর এই ঘটনার ওপর টীকা লিখা হয়েছে, যেই ঘটনা সেই শায়খের প্রবৃত্তির স্বাদ মেটানোর জন্য ও তা বর্ণনা করার জন্যই শুধু বানানো হয়েছে। সম্মানীত টিকাকার এর টিকাতে লেখেন, ঘটনাটি থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শাইখ তার মুরীদ থেকে এমন অবস্থাতেও পৃথক হয় না, যেমনটি আশ-শারানী তার 'আল মীযান' কিতাবে বর্ণনা করেছে যে, ফকীহ ও সূফীদের সকল ইমামই তাদের মুকাল্লিদদেরকে সুপারিশ করবে। আর তাদের মুরীদের রুহ ফিরিয়ে দেওয়ার সময়, মুনকার নাকীরের প্রশ্নের সময়, হাশর, নাশর হিসাব, মীযান এবং সিরাতের সময়েও তারা তাদের দিকে লক্ষ রাখবে। কোনো অবস্থাতেই তারা তাদের মুরীদদের থেকে উদাসীন হয় না।
বেরেলভী তার 'মালফুযাত' কিতাবে আরো একটি ঘটনা বর্ণনা করেছে, যার মাধ্যমে কবরে বিভিন্ন উৎসব ও উরস করার ফায়েদা স্পষ্ট হয় এবং মানুষের দৃষ্টি ও মনোযোগ আরো বেশি আকৃষ্ট হয়। সায়্যেদ আহমাদ বাদাভী কবীরের কবরে তার জন্মদিনে তিনদিনব্যাপী উৎসব ও উরস অনুষ্ঠিত হতো। মানুষজন বাৎসরিকভাবে সেখানে জমায়েত হতো। যারা নিয়মিতভাবে সেখানে উপস্থিত হতো, তাদের মধ্যে আব্দুল ওয়াহাব আশ-শারানীও ছিল। সায়্যেদ আহমেদ বাদাভীর মীলাদের অনুষ্ঠানে একবার আব্দুল ওয়াহাব আশ-শারানী উপস্থিত হলো, তখন লোকজন খুবই ভিড় করছিল। এমন সময় এক ব্যবসায়ীর দাসীর দিকে তার দৃষ্টি পড়লো। সেই দাসীটি তার অন্তরে ধরে গেল এবং সে তাকে নিজের করে নিল। তারপর সে কবরের কাছে গেল। তখন সায়্যেদ বাদাভী তাকে ডাক দিয়ে বললো, হে আব্দুল ওয়াহাব! সেই মহিলাটিকে কি তোমার পছন্দ হয়েছে? সে বললো, হ্যাঁ। কোনো মুরীদের জন্য তার কোনো গোপন কথা তার শায়খের নিকট গোপন রাখা উচিত নয়। তখন সায়্যেদ বাদাভী বললো, তুমি সুন্দর বলেছো। সেই মেয়েটিকে আমি তোমার নিকট হাদীয়া দিলাম। তখন শারানী আশ্চর্য হলো যে, কিভাবে সায়্যেদ বাদাভী সেই দাসীকে হাদিয়া দিতে পারে, অথচ সেই মহিলাটি এক ব্যবসায়ীর দাসী? কিছু সময় পরে সেই ব্যবসায়ী উপস্থিত হয়ে দাসীটিকে মাজহারের জন্য মানত হিসেবে দিয়ে দিলো। তখন কবরের খাদেমের কাছে ইলহাম করা হলো যে, সে যেন এই মহিলাকে আব্দুল ওয়াহাবের জন্য হাদিয়া দেয়। তখন আব্দুল ওয়াহাব শারানী দিশেহারা হয়ে গেল। তারপর সায়্যেদ বাদাভী তাকে ডেকে বললো, হে আব্দুল ওয়াহাব! সে তো আর ব্যবসায়ীর নেই। সুতরাং তুমি তাকে নিয়ে অমুক ঘরে যাও। আর সেখানে গিয়ে তোমার প্রয়োজন পূরণ করো।
📄 ৫. বেরেলভী ওলী আউলিয়াদের গায়েব সম্পর্কে
বেরেলভী ওলী আউলিয়াদের গায়েব সম্পর্কে জানা এবং সকল বিষয়ে তাদের শক্তি ও ক্ষমতা থাকা, এমনকি তাদের মৃত্যুর পরেও তাদের শক্তি ও ক্ষমতা থাকাকে প্রমাণ করতে চেয়েছে। কিন্তু সে এর পক্ষে মিথ্যা কাহিনী ও নোংরা যৌন চাহিদা সম্পৃক্ত ঘটনা ছাড়া আর কোনো দলীল প্রমাণ পায়নি। এগুলো হলো দাবী ও এগুলোই হলো প্রমাণ।
আরো অদ্ভুত ব্যাপার হলো, শাইখ শুধু একাই অদৃশ্য সম্পর্কে জানে, সাধারণ মানুষের অন্তরে এবং বিশেষভাবে তার মুরীদদের অন্তরে যা কিছু হয় সে সম্পর্কে জানে, বিষয়টি এমন নয়, বরং শায়খের মুরীদরাও তা জানে। তারা সেগুলো জানে শায়খের পা মোবারকে চুমা দিয়ে ও যেই জমীনে শায়খের পা স্পর্শ করেছে সেই জমীনকে চুমা দেওয়ার মাধ্যমে। এর দলীল হলো একটি ঘটনা, যা বেরেলভী নিজেই বর্ণনা করেছে।
বেরেলভী বলে যে, হযরত সায়্যেদ মুহাম্মাদ ছিল বিশিষ্ট পণ্ডিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের একজন। একদা সে রাস্তা দিয়ে হাটছিল। এমন সময় সে হযরত নাসিরুদ্দীন মাহমূদ শারাগ দেহলভীকে তার বাহনে দেখলো। সায়্যেদ মুহাম্মাদ তার নিকটে তাড়াতাড়ি এসে তার হাঁটুতে চুমা দিলো। তখন শাইখ বললো, তুমি আরো নিচে যাও। তখন সায়্যেদ মুহাম্মাদ তার পায়ে চুমা দিলো। তারপর শাইখ তাকে বললো, আরো নিচে যাও। তখন সে ঘোড়ার খুরে চুমা দিলো। শাইখ বললো যে, তুমি আরো নিচে যাও। তখন সায়্যেদ মুহাম্মাদ একটু পিছনে এসে সেই যমীনকে চুমা দিলো, যেখানে সেই ঘোড়ার পা স্পর্শ করেছিল। তখন মানুষজন আশ্চর্য হয়ে বললো যে, এমন সম্মানীত সায়েদ মুহাম্মাদ শায়খের হাঁটুতে চুমা দিলো, কিন্তু তাতেও সে সন্তুষ্ট হলো না। তারপর সে তার পায়ে চুমা দিলো, কিন্তু তাতেও সে সন্তুষ্ট হলো না। তারপর সে তার ঘোড়ার খুরে চুমা দিলো, কিন্তু তাতেও সে সন্তুষ্ট হলো না, এমনকি শেষ পর্যন্ত সে তার সামনের যমীনে চুমা দিলো! তখন সায়্যেদ মুহাম্মাদ বললো, এই চুমাগুলোর কারণে আমার শাইখ আমাকে কী দিয়েছে তা মানুষজন জানে না। আমি যখন তার হাঁটুতে চুমা দিয়েছিলাম, তখন আমার সামনে মানবতার জগত উন্মোচিত হয়েছিল। তারপর যখন তার পায়ে চুমা দিয়েছিলাম, তখন আমার সামনে ঊর্ধ্বজগত উন্মোচিত হয়েছিল। তারপর যখন ঘোড়ার খুরে চুমা দিয়েছিলাম, তখন আমার জন্য প্রতাপশালীর জগত উন্মোচিত হয়েছিল। তারপর যখন যমীনে চুমা দিয়েছিলাম, তখন আমার সামনে মাবুদ আল্লাহ তা'আলার জগত উন্মোচিত হয়েছিল।
📄 ৬. নবীগণের মতো ওলীরাও তাদের কবরে জীবিত
তারা বলেছে যে, নবীগণের মতো ওলীরাও তাদের কবরে জীবিত রয়েছে। চোখ ধাধানোর মতো শুধু কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মুহূর্তের জন্যই শুধু তাদের মৃত্যু আসে। তারপর তাদেরকে নিকটে তাদের রূহ ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা তাদের শরীর নিয়ে পার্থিব জীবনযাপনের মতো জীবিত থাকে। সেখান থেকে তারা শুনতে পারে, উত্তর দিতে পারে, তারা দাঁড়াতে পারে ও বসতে পারে। তারা ঘুমায় এবং জাগ্রত হয়।
যদি এই সম্প্রদায়কে বলা হয় যে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে এর পক্ষে দলীল নিয়ে আসো। তখন তারা বলে যে, 'শাইখ আহমাদ ইবনু রিফাঈ প্রতি বছর হাজীদেরকে দিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম প্রেরণ করতো। যখন সে নিজেই যিয়ারত করলো, তখন সে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো: আমার রূহ অনেক দূরে থাকাবস্থাতে আমি তা (সালাম) প্রেরণ করতাম। যমীন তা গ্রহণ করতো, সেই হলো আমার প্রতিনিধি, এটি হলো সুযোগ, যেখানে আমি উপস্থিত হয়েছি। সুতরাং আপনি আপনার দুই হাতকে বাড়িয়ে দিন, যাতে করে আমার দুই ঠোট মর্যাদাবান হয়ে যায়।' বলা হয়ে থাকে যে, তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত কবর থেকে বেরিয়ে আসে, আর সে তাতে চুমা দেয়।
ওলীরা এমনই হয়। এর দলীল হলো, 'আব্দুল ওয়াহাব শারানী নিয়মিতভাবে সায়্যেদ আহমাদ বাদাভী কবীরের উরসে উপস্থিত হতো। একবার উপস্থিত হতে দুইদিন দেরী হলো। তখন হযরতের কবরের পাশে যারা থাকতো, তারা দেখলো যে, হযরত সায়্যেদ বাদাভী বারবার তার পর্দা উঠিয়ে তার মুরীদ আব্দুল ওয়াহাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে যে, সে উপস্থিত হয়েছে নাকি এখনো উপস্থিত হয়নি? যখন আব্দুল ওয়াহাব উপস্থিত হলো, তখন হযরতের কবরের পাশে থাকা লোকজন তাকে বললো যে, হযরত কবর থেকে বারবার তার পর্দা উঠিয়ে আব্দুল ওয়াহাব উপস্থিত হয়েছে কিনা তা জিজ্ঞেস করছিল। তখন আব্দুল ওয়াহাব বললো যে, হযরত কি তার মাযারে আমার উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারে? তখন তারা বললো যে, কেনই বা তারা জানবে না, অথচ সে নিজেই বলেছে যে, যে ব্যক্তি তার বাড়ি থেকে আমার যিয়ারতের জন্য চায়, তার বাড়ি যত দূরেই হোক না কেন, আমার কবরের কাছে উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তার ইচ্ছাটা আমি জানি। আর সে যে বোঝা বহন করে, সেই সবগুলোরই আমি জিম্মেদার হয়ে যাই।
এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, দুই আপন ভাই আল্লাহর রাস্তাতে নিহত হয়েছিল। তাদের তৃতীয় আরেকটি ভাই ছিল। যখন সেই ভাইয়ের বিবাহের দিন আসলো, সেদিন সেই দুই ভাইও উপস্থিত হলো। তাদের উপস্থিতি দেখে তৃতীয় ভাই আশ্চর্য হলো। তখন তারা দুজনে বললো যে, আমাদেরকে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে পাঠানো হয়েছে। তারপর তারাই সেই বিবাহের দায়িত্ব গ্রহণ করলো। এবং বিবাহের পরে আবার তারা ফিরে গেল।
আমাদের নিকটে আরো একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, 'সায়্যেদ আবু সাঈদ খাজ্জাজ বলেছে যে, আমি একবার পবিত্র মক্কাতে ছিলাম। এমন সময় বানূ শায়বার দরজার কাছে এক যুবককে মৃত অবস্থাতে দেখলাম। সেই যুবক আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকলো, আর বললো যে, হে আবূ সাঈদ! তুমি কি জানো না যে, আল্লাহর প্রিয়জনরা জীবিত। আর যদি তারা মারা যায়, তাহলে শুধু তারা এক জগত থেকে আরেক জগতে স্থানান্তরিত হয় মাত্র।
অনুরূপভাবে আরো একটি ঘটনা হলো, সায়্যেদ হযরত আবূ সাঈদ বলেছে, এক দরিদ্র ব্যক্তি মারা গিয়েছিল। আমি তাকে নিয়ে তার কবরে নামলাম। তারপর তার কাফন খুলে তার মাথাটা মাটির ওপর রাখলাম, যাতে করে আল্লাহ তা'আলা তার দরিদ্রতাতে তার ওপর রহম করেন। তখন দরিদ্র ব্যক্তিটি তার দুই চোখ খুলে বললো, হে আবূ সাঈদ! যিনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন তার সামনে তুমি আমাকে লাঞ্ছিত করলে? আমি অবাক হয়ে বললাম, হে সায়্যেদ! মৃত্যুর পরেও জীবিত থাকে? তখন সে আমাকে বললো, আমি জীবিত, আর আল্লাহ প্রিয়জনেরা সকলেই জীবিত, যাতে করে আমার এই সম্মান দিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।
এই ধরনের ঘটনা আরো কতই না রয়েছে! সেগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে, 'এক মহিলা মৃত্যুবরণ করলো। তারপর তাকে কাফন পরিয়ে দাফন করা হলো। তারপর স্বপ্নে তার ছেলের সাথে তার সাক্ষাত হলো। সে বললো যে, আমার কাফন জীর্ণ হয়ে গেছে, এজন্য আমি এটি নিয়ে আমার সঙ্গীদের কাছে যেতে লজ্জা করছি। তাই আজ থেকে তৃতীয় দিনে আমাদের সাথে অমুক ব্যক্তি মিলিত হবে। যখন সেই ব্যক্তিকে কাফন পরানো হবে, তখন তুমি তার কাফনের সাথে নতুন সুন্দর একটি কাফন দিও। সকাল হলে ছেলেটি সেই ব্যক্তির খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো যে, সেই ব্যক্তি সুস্থ রয়েছে, তার কোনো অসুস্থতা নেই। কিন্তু তৃতীয় দিনে ছেলের নিকটে খবর আসলো যে, সেই ব্যক্তি মারা গেছে। তখন ছেলে অতি দ্রুত তার জন্য মূল্যবান নতুন একটি কাফন নিয়ে আসলো এবং তার কাফনের সাথে সেই মূল্যবান নতুন কাফনটিকেও দিয়ে দিলো এবং বললো যে, এটি আমার মায়ের নিকটে পৌঁছিয়ে দিও। তারপর রাতে ঘুমের সময় তার মা উপস্থিত হয়ে বললো যে, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন, কেননা তুমি আমার জন্য নতুন কাফন পাঠিয়েছো।
আরো একটি ঘটনা বর্ণনা করাতে কোনো সমস্যা নেই, যেখানে মৃত ব্যক্তির এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছে বেরেলভীর এক অনুসারী। ঘটনাটি হলো, 'ভারতের জৈনপুরে এক ধার্মিক মহিলা মারা যায়। আর জৈনপুরেরই এক খারাপ ব্যক্তি মদীনাতে মারা যায় এবং তাকে বাকীউল গারকাদে দাফন করা হয়। তারপর ধার্মিক মহিলাটিকে জৈনপুর থেকে বাকীউল গারকাদে স্থানান্তর করা হয়, আর সেই ব্যক্তির লাশ বাকিউল গারকাদ থেকে জৈনপুরে সেই মহিলার কবরে স্থানান্তর করা হয়। আর এই ঘটনা মানুষজন তাদের স্বচক্ষে দেখেছে।
টিকাঃ
৪২৫. মালফুযাত লিল বেরেলভীয়্যাহ, ৯৫ পৃ.
৪২৬. মাওআয়িযু নাঈমিয়্যাহ, ২৬ পৃ.
📄 ৭. মৃতদেরকে জীবিত করার ক্ষমতা
আর মৃতদেরকে জীবিত করাতে তাদের ক্ষমতা থাকাটাও তাদের পূর্ববর্তী উপকথাতে রয়েছে এবং তারা তাদের পিতৃপুরুষদেরকে এগুলো বিশ্বাসী অবস্থাতে পেয়েছে। সেই ঘটনাগুলো হলো, 'সায়্যেদ হযরত আহমাদ একবার রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছিল। পথিমধ্যে সে দেখলো যে, একটি হাতি মরে আছে, আর মানুষজন তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সে তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো যে, কী হয়েছে? তারা বললো, হাতিটি মারা গেছে। তখন সে বললো যে, এর সূড় ঠিক রয়েছে, চোখ দুটিই ঠিক রয়েছে। অনুরূপভাবে তার দুই হাত ও দুই পাও ঠিক রয়েছে, তাহলে সে কিভাবে মারা যেতে পারে? এই কথা বলার সাথে সাথেই হাতিটি নড়াচড়া করে জীবিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
অনুরূপভাবে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, 'শাইখ জীলানী একবার এক চিলের দিকে রাগের দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। এতেই সেই চিল মরে পড়ে গিয়েছিল। তারপর শাইখ জীলানী সেই চিলকে স্পর্শ করার সাথে সাথে সে আবার জীবিত হয়ে উড়ে যায়।
এই সম্প্রদায়ের লোকদের আশ্চর্যকর বিষয় হলো, তারা এমন কল্পকাহিনী বর্ণনা করে, যেগুলো বিবেক গ্রহণ করে না এবং মানুষের চিন্তা ভাবনা সেগুলোকে অবজ্ঞা করে। সেসব ঘটনাগুলোর মধ্যে আছে, 'আল্লাহর দুই ওলী নদীর দুই পাশে বসবাস করতো। একবার একজন এক ধরনের দুগ্ধজাত খাবার রান্না করে অপর জনের কাছে পাঠাতে চাইলো। তাই সে তার খাদেমকে বললো যে, তুমি এই খাবার নিয়ে আমার সেই বন্ধুর কাছে যাও। তখন খাদেম বললো, আমি কিভাবে নদী পার হবো, অথচ আমার কাছে নদী পার হওয়ার মতো নৌকা বা এমন কিছুই নাই। তখন ওলী বললো, তুমি নদীর কাছে গিয়ে তাকে বলো যে, আমি এমন এক ব্যক্তির নিকট থেকে এসেছি, যে এখনো তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করেনি। তখন সেই খাদেম আশ্চর্য হয়ে গেল এবং দিশেহারা হয়ে গেল। কারণ তার শায়খের অনেক সন্তান ছিল। তারপর খাদেম নদীর কাছে এসে তার শাইখ যা বলেছে তাই বললো, এতে নদী বিদীর্ণ হয়ে গেল। আর সেই খাদেম নিরাপদে নদী পার হয়ে গেল। তারপর সে খাবারটি অপর ওলীকে দিল। তখন সেই ওলী খাবার খেয়ে তার জন্য কল্যাণের দুআ করলো। আর বললো, তোমার ওস্তাদকে আমার পক্ষ থেকে সালাম দিও। তখন খাদেম তাকে বললো যে, আমি সেখানে গিয়ে আপনার পক্ষ থেকে তাকে সালাম দিবো? তাহলে কিভাবে আমি সেখানে পৌঁছাবো, অথচ আমার ও তার মাঝে এই নদী রয়েছে? তখন ওলী বললো, তুমি নদীর কাছে গিয়ে বলো যে, আমি এমন এক ব্যক্তির নিকট থেকে আসলাম, যে ত্রিশ বছর ধরে কোনো খাবার খায়নি। এতে তার দিশেহারা আরো বেড়ে গেল। কেননা সে এখনই তাকে খাবার খেতে দেখলো, যেই খাবার সে নিজেই নিয়ে আসলো। তারপর তার চিঠি নদীর কাছে পৌঁছাতেই খাদেমের জন্য নদী বিদীর্ণ হয়ে রাস্তা তৈরি হয়ে গেল।
তারা যেসব আশ্চর্য ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, 'ইয়াহইয়া আল-মুনীরীর এক মুরীদ সাগরে পড়ে গিয়ে প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। তখন খিযির আলাইহিস সালাম উপস্থিত হয়ে তাকে বললেন যে, তোমার হাত আমার হাতের ওপর রাখো, আমি তোমাকে উদ্ধার করবো। তখন মুরীদ সতর্ক হয়ে বললো যে, হে আমার সায়্যেদ! আমার এই হাত তো মুনীরীর হাতের ওপর রয়েছে। সুতরাং কখনোই আমি তার হাত ছেড়ে অন্য হাত ধরবো না। এই কথা বলার সাথে সাথেই খিযির আলাইহিস সালাম অদৃশ্য হয়ে গেল এবং মুনীরী উপস্থিত হলো। এবং সে তার হাত ধরে তাকে ডুবা থেকে উদ্ধার করলো।
এই ধরনের ঘটনাগুলোর মধ্যে আরো রয়েছে, 'বিশর আল-হাফী কখনো জুতা পরতো না, এজন্যই তাকে হাফী নামে নামকরণ করা হয়েছিল। তার সম্মান ও মর্যদার অন্তর্ভুক্ত হলো, যখন সে যেই রাস্তা দিয়ে হাঁটতো, সেই রাস্তাতে পশুরা পেশাব পায়খানা করতো না, যাতে করে হাফীর পা নোংরা হয়ে না যায়। হাফী যেই রাস্তা দিয়ে চলতো, সেই রাস্তাতে কোনো একদিন এক ব্যক্তি পেশাব পায়খানা দেখে বলে উঠলো, 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন'। তাকে এই ধরনের কথা বলার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে সে উত্তর দিলো যে, এটি প্রমাণ করে যে, বিশর আল-হাফী মৃত্যুবরণ করেছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে, লোকটি যা বলেছে তাই সত্য।
টিকাঃ
৪২৭. (হিকায়াতু রিযভীয়্যাহ, ৭১ পৃ.)
৪২৮. বাগিন ফিরদাউস লিল বেরেলভী, ২৭ পৃ.
৪২৯. মালফুযাত লিল বেরেলভীয়্যাহ, ৫৩ পৃ.
৪৩০. মালফুযাত লিল বেরেলভীয়্যাহ, ১৬৪ পৃ.
৪৩১. হিকায়াতু রিযভীয়্যাহ, ১৭২ পৃ.