📄 ২৮. শাইখ ইমাম মহান আলেম কাসেম নানুতুভী
দেওবন্দী আলেমদের মধ্যে সর্বপ্রথম যাকে কাফের বলে ঘোষণা করা হয়, তিনি হলেন শাইখ দেওবন্দ আল-কাবীর, যিনি ভারতীয় উপমহাদেশে, বরং প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বের মধ্যে 'দারুল উলুম দেওবন্দ' নামে সবচেয়ে বড় হানাফী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সম্পর্কে শাইখ আব্দুল হাই আল-হাসানী বলেন, 'শাইখ ইমাম মহান আলেম কাসেম নানুতৃভী হলেন একজন রব্বানী আলেম। তিনি সেই যুগে সবচেয়ে বড় দুনিয়া বিমুখ মানুষ ছিলেন। আর তিনি সবচেয়ে বেশি ইবাদতগুজার, সবচেয়ে বেশি আল্লাহর যিকিরকারী মানুষ ছিলেন। আর তিনি শুধু বাহ্যিকভাবে পাগড়ি, চাদর দিয়ে আলেমদের পোশাক পরা ও ফকীহ সাজা থেকে অনেক দূরে ছিলেন। সেই যুগে তিনি ফাতওয়া দিতেন না এবং প্রসিদ্ধও ছিলেন না। বরং তিনি সর্বদাই আল্লাহ তা'আলার যিকিরে নিমগ্ন ছিলেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছে জ্ঞান ও সত্যের দ্বার উন্মুক্ত হয়। তারপর শাইখ ইমদাদুল্লাহ তাঁকে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং শাইখ ইমদাদুল্লাহ এভাবে তাঁর প্রশংসা করেন যে, কাসিমের মতো এই যুগে আর কেউ নেই। খ্রিস্টান ও আর্যদের বিরুদ্ধে বিতর্কের ক্ষেত্রে তাঁর খুবই সুন্দর অবদান ছিল। তিনি ১২৯৭ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন (নুঝহাতুল খাওয়াতির, ৭/৩৮৩-৩৮৪)।'
বেরেলভীরা এই শাইখকেও কাফের বলেছে, যেই শাইখ হলেন তাঁর যুগে হানাফীদের ইমাম, 'দেওবন্দী' নামে পরিচিত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। এই শায়খের সম্পর্কে বেরেলভী তাঁর দুর্বল আরবীতে বলে, 'কাসেমীরা 'তাহযীরুন নাস' কিতাবের লেখক কাসেম নানুতৃভী এর দিকে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে। সেই কিতাবে তিনি বলেন যে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে অথবা তাঁর পরবর্তীতে কোনো নতুন নবী আসতো, তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশেষ নবী হওয়াটা বাতিল হতো না। বরং সাধারণ মানুষরা মনে করতো যে, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী। যদিও জ্ঞানীদের নিকটে এই বিষয়ে মূলগতভাবে কোনো ফযীলত নেই।' নানূতৃভী হলো মুহাম্মাদ আলী কানপূরী, তিনি 'হাকীমুল উম্মাহ আল-মুহাম্মাদীয়া' নামক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। সুতরাং আমি সেই সত্তার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, যিনি অন্তর ও দৃষ্টিসমূহের পরিবর্তনকারী। এক, পরাক্রমশালী, সর্বজয়ী ও মহাক্ষমাশীল আল্লাহ তা'আলার শক্তি ছাড়া আর কোনো শক্তি নেই। এরা সকলেই হলো অবাধ্য, অভিশপ্ত ও ধর্মত্যাগী (হিসামুল হারামাইন আলা মানহারিল কুফরী ওয়াল মাইন, বেরেলভী, ১৯ পৃ.)।'
সে আরো বলে যে, কাসেমীরা, আল্লাহ তা'আলা তাদের ওপর লানত করুন, তারা হলো অভিশপ্ত, চিরন্তন ধর্মত্যাগী (ফতোয়া রিযভীয়্যাহ, ৬/৫৯)।' বেরেলভীর এক অনুসারী বলে যে, 'তাহযীরুন নাস' কিতাবটি মুরতাদ, নিকৃষ্ট নানূতৃভীর কিতাব, যে ব্যক্তি দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেছিল (তাজানুবু আহলিস সুন্নাহ, ১৭৩)।'
📄 ২৯. রশীদ আহমাদ গাংগুহী
পক্ষান্তরে দেওবন্দের একজন নেতা ও তাঁদেরই একজন শাইখ সায়্যেদ আল- হাসানী নানূতৃভী সম্পর্কে লিখেছেন যে, 'শাইখ ইমাম আল্লামাহ মুহাদ্দীস রশীদ আহমাদ ইবনে হিদায়াহ আহমাদ ইবনে পীর বাখশ ইবনে গোলাম হাসান ইবনে গোলাম আলী ইবনে আলী আকবর ইবনে কাযী মুহাম্মাদ আসলাম আল-আনসারী আল-হানাফী রামপূরী জানজুহী হলেন একজন মুহাক্কি আলেম এবং বিশিষ্ট গবেষক। সততা, চারিত্রিক নিষ্কলুষত, তাওয়াক্কুল, জ্ঞানার্জন, বীরত্ব, ঝুঁকি নেওয়ার সাহসিকতা, ধর্মে দৃঢ়তা, মতের ওপর অটলতার ক্ষেত্রে তাঁর যুগে তাঁর সমতুল্য আর কেউ ছিল না (নুঝহাতুল খাওয়াতির, ৮/১৪৮)।' তাঁর সম্পর্কে বেরেলভী ও তাঁর অনুসারীরা বলে যে, ইসলামের নামে নিজেদেরকে গোপনকারী কাফেররা হলো রশীদ আহমাদ গাংগুহী ও আলী হযরত সামাদীর অনুসারী মিথ্যাবাদী ওয়াহাবীরা। ইসমাইল শহীদ দেহলভী যেই মতাদর্শের ওপর ছিল রশীদ আহমাদ ও আলী হযরত তারই অনুসরণ করেছে। আর আমি একটি স্বতন্ত্র কিতাবে তাঁর বাজে কথার জবাব দিয়েছি, সেই কিতাবের নাম দিয়েছি 'সুবহানাস সুব্বহ আন আইবি কাযিবিম মাকবৃহ'। তারপর পোস্টের মাধ্যমে তাঁর নিকটে এই কিতাব পাঠিয়েছি। তারপর এগার বছর থেকে এর উত্তর আসছে! তারা এটা প্রচার করেছে যে, সে নাকি এর জবাব লিখেছে এবং ছাপানোর জন্য তা পাঠিয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা বিশ্বাস ঘাতকদের ষড়যন্ত্রকে সফল করেন না। তারপর তারা উঠেও দাঁড়াতে পারেনি, আবার প্রতিশোধও নিতে পারেনি। এখন যে ব্যক্তি দূরদর্শিতা হারিয়ে গেছে আল্লাহ তা'আলা তাকে অন্ধ করে দিয়েছেন, সুতরাং তার থেকে কিভাবে জবাব আসবে। মৃত ব্যক্তি কি মাটির ভিতর থেকে বিতর্ক করতে পারে?
তারপর যুলম ও বিভ্রান্তিতে তাঁর অবস্থা এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে, সে তাঁর 'কাদ রআইতুহা বি খত্তিহি ওয়া খতিমিহি বি আইনাইয়্যা ওয়া তবাতু মিরারান বি মাবই ওয়া গয়রিহা মাআ রদ্দিহা' নামক ফাতওয়াতে সে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, যে ব্যক্তি কাজের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলাকে মিথ্যারোপ করে এবং স্পষ্টভাবে বলে যে, আল্লাহ তা'আলা মিথ্যা বলেছেন, আর এই ভয়ংকর কাজটি তার থেকে সংঘটিত হয়, তার ফাসেকীর দিকে তোমরা নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করো না, বিভ্রান্তির দিকে সম্পৃক্ত করা তো দূরের কথা, আর কুফরীর দিকে সম্পৃক্ত করা তো আরো দূরের কথা। অনেক ইমামই এমনটি বলেছেন। আর তাঁর বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কথা যে, সে তাঁর ব্যাখ্যাতে ভুলকারী। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা ছাড়া সত্যিকার কোনো মাবুদ নেই, তিনি যথাসম্ভব এই মিথ্যারোপের খারাপ পরিণতি থেকে অবকাশ দেন। কিভাবে কাজের মাধ্যমে এমন মিথ্যারোপ করা হলো! যারা চলে গেছে তাদের জন্য এটিই ছিল আল্লাহ তা'আলার বিধান। এদেরকে আল্লাহ তা'আলা বধির করে দিয়েছেন, তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে তাঁদেরকে অন্ধ করে দিয়েছেন। মহান সুউচ্চ আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই। এদেরই অন্তর্ভুক্ত হলো ওয়াহাবী শয়তানরা, তারা হলো রাফেযীদের একটি শয়তানী দল। তারা অভিশপ্ত শয়তান ইবলীসের অনুসারী। এছাড়াও তারা মিথ্যাবাদী কানকূহীর অনুসারী (হিসামুল হারামাইন, ২১ পৃ.)।'
সে আরো বলে যে, 'এই ব্যক্তিকে জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, জাহান্নামের আগুন তাঁকে পুড়াবে, আর তাঁকে বলা হবে যে, স্বাদ আস্বাদন করো, নিশ্চয় তুমি ছিলেন সম্মানীত ও পথপ্রদর্শক (খালেসুল ইতেকাদ, বেরেলভী, ৬২)।' সে আরো বলে যে, রশীদ আহমাদের কাফের হওয়ার বিষয়ে যে ব্যক্তি দ্বিধা করবে, তার কাফের হওয়ার বিষয়েও কোনো সন্দেহ থাকবে না (ফাতওয়া ইফরিকিয়্যাহ, বেরেলভী, ১২৪)।' তাঁর দলের আরেকজন ব্যক্তি বলে যে, 'নিশ্চয় রশীদ আহমাদ মুরতাদ।' একই পৃষ্ঠাতে সে চারবার এই কথার পুনরাবৃত্তি করে (তাজানুবু আহলিস সুন্নাহ, ২৪৫ পৃ.)। বেরেলভী বলে যে, কানকূহীর কিতাব 'বারাহিন কাতিয়াহ' এই কিতাবটি পেশাবের চেয়েও অপবিত্র, কুফরী কথা দিয়ে পরিপূর্ণ। যে ব্যক্তি এমনটি বলে না, সে যিনদীক (সুবহানাস সাবূহ, ১৩৪ পৃ.)।'
📄 ৩০. ইমাম আশরাফ আলী থানভী রহিমাহুল্লাহ
অনুরূপভাবে একদলের শাইখ এবং হানাফী দেওবন্দীদের ইমাম আশরাফ আলীকে সে কাফের বলেছে। অথচ আশরাফ আলীর সম্পর্কে সায়্যেদ আবুল হাসান আলী আন-নাদভী তাঁর পিতার কিতাবে বলেছেন যে, 'যেসকল রব্বানী মহান আলেমদের উপদেশ ও লেখনীর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা অনেককে উপকৃত করেছেন তাঁদের মধ্যে আশরাফ আলী অন্যতম। তাঁর মাজলিশী আলোচনার কিতাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং তার সংখ্যা চারশোতে পৌছেছে। আকীদা ও আমলের সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর কিতাব, মাজলিশ ও উপদেশ বিরাট উপকার করেছে। হাজার হাজার মুসলমান সেগুলো থেকে উপকৃত হয়েছে। কাফের, বিদআতী এবং প্রবৃত্তির অনুসারীদের সাথে দীর্ঘকাল মেলামেশার কারণে মুসলিমদের জীবনে, তাঁদের বাড়িতে, তাঁদের সুখ দুঃখের মধ্যে যেসব যেসব প্রচলিত রীতি নীতি ও জাহেলী রসম রেওয়াজ প্রবেশ করেছিল, সেগুলোকে তিনি বর্জন করেছিলেন, আর সেগুলোর সংখ্যা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কেউ জানে না। ধর্মীয় জীবনে চলার পথ সহজ করা, মাধ্যম থেকে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সংশোধন করা, আবরণ থেকে মূল জিনিসকে পৃথক করার ক্ষেত্রে তাঁর বিরাট অবদান ছিল (নুঝহাতুল খাওয়াতির, ৫৮ পৃ.)।'
এই ধরনের মহান আলেমের সম্পর্কে বেরেলেভী বলে যে, 'এই শয়তানী ওয়াহাবী নেতাদের মধ্যে গাংগুহীর অনুসারীদের মধ্যে আরেকজন রয়েছে, তাঁর নাম হলো আশরাফ আলী, যে ব্যক্তি একটি কিতাব লিখেছে, যেটি চার পৃষ্ঠাও হবে না। সেই কিতাবে সে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়েব সম্পর্কে যেই জ্ঞান ছিল, তা প্রতিটি শিশু, পাগল এমনকি প্রতিটি পশু প্রাণীরও ছিল।' তাঁর এই অভিশপ্ত কথাটি যদি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্তাতে গায়েব বিষয় সম্পর্কে প্রযোজ্য হয়, যেমনটি যায়েদ বলে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো এর মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য কী? কিছু গায়েবী বিষয় নাকি সকল গায়েবী? এখানে যদি শুধু কিছু গায়েবী বিষয়কে উদ্দেশ্য করা হয়, তাহলে এর মাধ্যমে রিসালাত থাকার পরে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আর কীই বা বিশেষত্ব থাকে। কেননা এমন গায়েবী বিষয়ের জ্ঞান তো যায়েদ ও আমরেরও আছে, বরং প্রতিটি শিশু ও পাগলেরও রয়েছে, এমনকি সকল পশু প্রাণীরও রয়েছে। আর যদি এটি দিয়ে সকল গায়েবী বিষয়কে উদ্দেশ্য করা হয়, যাতে কোনো ব্যক্তিই এর থেকে পৃথক নয়, তাহলে দলীল ও বিবেক উভয়ের মাধ্যমেই তার এই বক্তব্য বাতিল। আমি বলছি যে, তুমি আল্লাহ তা'আলার মোহর মেরে দেওয়ার নিদর্শন দেখো যে, কিভাবে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অমুক অমুককে সমান করেছে। কিভাবে তাঁর নিকটে গোপন থাকলো যে, যদি ধরে নেওয়া হয় আর এটিই অকাট্য জ্ঞান যে, যায়েদ ও আমরের জ্ঞান এবং এই শাইখদের মহান ব্যক্তিদের জ্ঞান, আল্লাহর নবীদের জ্ঞানের নিকট পৌছবে না, নবী ছাড়া অন্যদের নিকটে যেই জ্ঞান পৌছেছে সেগুলো নবীদের জানানোর মাধ্যমেই তারা সেই জ্ঞান পেয়েছে। তুমি কি তোমার রবের কথা শোননি, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, ﴿وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَجْتَبِي مِنْ رُسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ﴾ অনুরূপভাবে গায়েব সম্পর্কে তোমাদেরকে অবহিত করা আল্লাহর নিয়ম নয়; তবে আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন (সূরা আলে ইমরান: ১৭৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, ﴿عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا (২৬) إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا﴾ তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ তাঁর রাসূলের সামনে এবং পিছনে প্রহরী নিয়োজিত করেন (সূরা আল জিন: ২৬-২৭)। খেয়াল করো, কিভাবে সে কুরআন পরিত্যাগ করেছে (হিসামুল হারামাইন, ২৭-২৯)।
এভাবে বলতে বলতে সে বলে যে, এই পাপাচারের দিকে খেয়াল করো, কিভাবে একটি পাপ আরেকটি পাপকে টেনে আনে, বিশ্বজগতের রব আল্লাহর নিকটে আমরা আশ্রয় প্রার্থনা করছি। সারকথা হলো, এই সবগুলো দলের সকলেই কাফের, মুরতাদ এবং মুসলিমদের ঐক্যমতে তারা ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছে। যে ব্যক্তি তাঁদের কাফের হওয়া ও তাঁদের শাস্তি হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ করবে, সেও কাফের হয়ে যাবে। 'আশ শিফাউশ শারীফ' কিতাবে সে বলে যে, যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মের দাবীদার তাকে যে ব্যক্তি কাফের বলে না, অথবা কাফের বলতে দ্বিধা করে, অথবা তাঁদের কাফের হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ করে, তাকেও আমরা কাফের বলে আখ্যায়িত করি। সে 'বাহরুর রাইক' নামক কিতাবসহ অন্যান্য কিতাবে বলে যে, যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির অনুসারীদের কথাকে ভালো বলবে অথবা এমন অর্থে কথা বলবে, তাহলে প্রবক্তার কথা যদি কুফরীমূলক হয়, তাহলে যে ব্যক্তি তাঁর কথাকে ভালো বললো, সেও কাফের হয়ে যাবে। ইমাম ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ তাঁর 'আল-ইলামু ফী ফাসলিল কুফরী আল-মুত্তাফাকি আলাইহি বাইনা আয়িম্মাতিনাল আলাম' নামক কিতাবে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কুফরীমূলক শব্দ উচ্চারণ করবে, সে কাফের হয়ে যাবে। আর প্রত্যেক যে ব্যক্তি তাঁর সেই কথাকে ভালো বলবে অথবা তাতে সন্তুষ্ট থাকবে সেও কাফের হয়ে যাবে। সুতরাং হে পানি ও মাটি সাবধান, সাবধান। কারণ দীন হলো সবেচেয় সম্মানীয়, যাকে সকল কিছুর ওপর প্রাধান্য দিতে হয়। আর কাফেরকে সম্মান করা যায় না। আর পথভ্রষ্টতা থেকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয়। আর মন্দ জিনিস শুধু মন্দই নিয়ে আসে। আর নিশ্চয় দাজ্জাল হলো প্রতীক্ষিত অনিষ্ট। আর তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা হবে অনেক বেশি। আর তাঁর বিস্ময়কর বিষয়গুলো অধিক স্পষ্ট ও অনেক বেশি। আর কিয়ামত অধিক ভয়াবহ ও তিক্ততর। সুতরাং তোমরা আল্লাহ অভিমুখী হও। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই। আমরা এই স্থানে বিশদ আলোচনা করলাম, কেননা এই বিষয়ে সতর্ক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় (হিসামুল হারামাইন, ৩১ পৃ.)।'
সে আরো বলে যে, যে ব্যক্তি আশরাফ আলীর কাফের হওয়ার বিষয়ে দ্বিধা করে, সে কাফের হয়ে যাবে (ফাতওয়া ইফরিকিয়্যাহ, বেরেলভী, ১২৪ পৃ.)। সে আরো বলে, 'বেহেশতী জেওর কিতাবের লেখক কাফের, আর সেই কিতাবের দিকে ভ্রুক্ষেপ করাও মুসলিমদের জন্য হারাম (ফতোয়া রিযভীয়্যাহ, ৬/৫৬)।' সে আরো বলে যে, 'বেহেশতী জেওর কিতাবের লেখকের অনুসারীরাও মুরতাদ (ফতোয়া রিযভীয়্যাহ, ৬/১০৪)।' আহমাদ রেযাও সেই লেখকের মুরতাদ হওয়ার বিষয়ে ফাতওয়া দিয়েছে। এই বিষয়ের জন্য দেখুন তাঁর কিতাব 'তাজানিবু আহলিস সুন্নাহ' (২৩৭ পৃ.) সহ অন্যান্য কিতাব।
📄 ৩১. আহলুল হাদীস ও দেওবন্দী সবাই ওহাহাবী
তারপর সে সকলকে অর্থাৎ নাদভী, দেওবন্দী, শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহর অনুসারীদেরকে ও আহলুল হাদীস সালাফীদের সকলকে সে ওয়াহাবীদের অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ তাঁর দাবী হলো, এরা সকলেই শিরক, বিদআত ও বিভিন্ন কল্পকাহিনীর বিপরীতে তাঁদের আকীদার ক্ষেত্রে শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহর থেকে দিক নির্দেশনা নিয়ে থাকে। প্রথমত, বেরেলভী ও বেরেলভী মতবাদের অনুসারীরাই তাঁদেরকে এই নামে সম্বোধন করেছিল। আর সাধারণভাবে এই শব্দ দিয়ে এই চার দলকেই উদ্দেশ্য করা হতো। তারপরে তারা তাঁদেরকে নিকৃষ্ট নামে ডাকতে শুরু করে, তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেয়, তাঁদের থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং মিথ্যা ও অনৈতিক বর্ণনা দিয়ে তাঁদেরকে লোকদের মধ্যে অপমান করতে থাকে এবং তারা তাঁদের হুকুম আহকাম ও তাঁদের সাথে লেনদেনের বিধানসমূহ বর্ণনা করতে থাকে। তারা বলেছিল, এমনকি তাঁদের প্রধান নেতা বেরেলভী নিজেই বলেছিল যে, ওয়াহাবীরা ও তাঁদের নেতারা বিভিন্ন দিক থেকে কাফের। মুখে তাঁদের শাহাদাত পাঠ করাটা তাঁদের কুফরীকে নাকোচ করে না (আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ, ১০ পৃ.)।'
সে আরো বলে যে, হাজারো কারণ ও উপায়ে এই দলের কুফরী প্রমাণিত হয়েছে (আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ, ৫৯ পৃ.)। সে আরো বলে যে, ইমামদের অর্থাৎ বেরেলভী সম্প্রদায়ের ইমামদের ইজমার ভিত্তিতে ওয়াহাবীরা সকলেই কাফের মুরতাদ (আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ, ৬০ পৃ.)। সে আরো বলে যে, ওয়াহাবীরা কাফের, মুরতাদ ও মুনাফিক। কারণ মুখে শাহাদাত উচ্চারণ করার মাধ্যমে তারা বাইরে বাইরে ইসলাম প্রকাশ করে মাত্র (আহকামুশ শারীআত, বেরেলভী, ১১২ পৃ.)। সে আরো বলে যে, ওয়াহাবীরা ইবলীসের চেয়েও নিকৃষ্ট ও পথভ্রষ্ট। কেননা শয়তান মিথ্যা কথা বলে না, কিন্তু তারা মিথ্যা কথা বলে (আহকামুশ শারীআত, বেরেলভী, ১১৭ পৃ.)। সে আরো বলে যে, আল্লাহ তা'আলা ওয়াহাবীদের ওপর লানত করুন, তাঁদেরকে লাঞ্ছিত করুন এবং তাঁদেরকে জাহান্নামের ইন্ধন বানান (ফাতওয়া ইফরিকাহ, ১২৫ পৃ.)। সে আরো বলে যে, ওয়াহাবীদেরকে আল্লাহ তা'আলা ধ্বংস করুন। তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে? (ফাতওয়া ইফরিকাহ, ১৭২ পৃ.)' সে আরো বলে, ওয়াহাবীরা সর্বনিকৃষ্ট স্তরের (খালেসুল ইতেকাদ, ৪৫ পৃ.)। সে আরো বলে, আল্লাহ তা'আলা ওয়াহাবীদের ভাগ্যে কুফরীকে লিখে দিয়েছেন (ফতোয়া রিযভীয়্যাহ, ৬/১৯৮)।'
যেহেতু ওয়াহাবীরা কাফের মুরতাদ, তাই তাঁদের পিছনে সালাত আদায় করাও জায়েয নয় এবং তাঁদের জানাযার সালাতও আদায় করা জায়েয নয়। এই বিষয়ে বেরেলভী ও তাঁর অনুসারীরা ফাতওয়া দিয়েছে। ওয়াহাবীদের পিছনে সালাত আদায় করা সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তি বেরেলভীকে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন সে বলেছিল, তাঁদের সালাত সালাতেই নয় এবং তাঁদের জামাআত কোনো জামাআত নয় (মালফুযাত, ১০৫ পৃ.)।' ওয়াহাবীরা যেই মাসজিদ নির্মাণ করে, সেই মসজিদের বিধান সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে সে উত্তরে বলে যে, তারা কাফের, আর কাফেরদের মসজিদের বিধান সাধারণ বাড়ির বিধানের মতোই। জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, ওয়াহাবী মুআযযিনের আযানের উত্তর দেওয়া যাবে কি? তখন সে তাঁর উত্তরে বলেছিল যে, না। কারণ তাঁদের সালাতকে সালাত বলে গণ্য করা যাবে না এবং তাঁদের আযানকেও আযান বলে গণ্য করা যাবে না (মালফুযাত, ১০৫ পৃ.)।'
আর মুসলিমদের মসজিদে ওয়াহাবীদেরকে প্রবেশ করার অনুমতিও দেওয়া যাবে না, যেমনটি এই বিষয়টি বেরেলভীর এক প্রতিনিধি ও উত্তরসূরী মুরাদ আবাদী স্পষ্টভাবে বলেছে। সে বলেছে যে, 'নিশ্চয় ওয়াহাবী ও গায়রে মুকাল্লিদদের জন্য মুসলিমদের মসজিদে প্রবেশের কোনো অধিকার নেই। মসজিদে তাঁদের প্রবেশ ফাসাদ সৃষ্টির কারণ। যদি তারা মসজিদে প্রবেশ করা থেকে বিরত না হয়, তাহলে সরকারীভাবে নিষেধাজ্ঞা করে দিতে হবে (ফাতওয়া নাঈমুদ্দীন মুরাদ আবাদী, ৬৪ পৃ.)।' এই পরিষদের আলেমগণের কাফের হওয়ার বিষয়ে সে ফাতওয়া জারি করে, তাতে সে তাঁর দলের প্রবীণদের সাক্ষর নেয়, আর সে সেটিকে 'ইলজামুস সুন্নাহ লি আহলিল ফিতনাহ' নামে প্রকাশ করে। তারপর সে সেটিকে 'মাজমুআতু ফাতওয়াল হারামাইন বি রজফী নাদওয়াতিল মাইন' কিতাবে প্রকাশ করে, যেমনটি এই অধ্যায়ে সায়্যেদ আল-হাসানী সম্পর্কে তাঁর থেকে যেমনটি বর্ণিত হয়েছে। 'আত-তাজানুব' কিতাবের লেখক একদল লোকের বর্ণনা নিয়ে এসেছে, যারা এই পরিষদের আলেমগণকে কাফের বলে ফাতওয়া দিয়েছে (মালফুযাত, বেরেলভী, ৯০ পৃ.)।'