📄 ১৭. তাকবীয়াতুল ঈমান
আর তার কিতাব 'তাকবীয়াতুল ঈমান' সম্পর্কে তারা বলে যে, এটি ঈমান শক্তিশালী করার কিতাব নয়, বরং এটি হলো ঈমান হারানোর কিতাব। আর সে বলে যে, ওয়াহাবী ধর্মের মিথ্যা কুরআনই (অর্থাৎ সেই কিতাবটি) হলো ঈমান হারানোর কিতাব (আল আমনু ওয়াল উলা, ৭২ পৃ.)। সে আরো বলে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেহলভীর নিকটে 'তাকবীয়াতুল ঈমান' নামে নতুন কুরআন পাঠিয়েছে (আল আমনু ওয়াল উলা, ১৯৫পৃ.)।
আর ইসমাইল শহীদ দেহলভীর লেখনী যেমন 'তাকবীয়াতুল ঈমান', 'তানবীরুল আইনাইন', 'ইযাহুল হাক', 'আস সিরাতুল মুস্তাকিম' এগুলো সম্পর্কে সে বলে যে, 'এই সবগুলোই হলো কুফরী কিতাব। এগুলো হলো পেশাবের মতো অপবিত্র। কেউ যদি এমনটি বিশ্বাস না করে, তাহলে তার কী হবে? সে যিনদীক হয়ে যাবে (দামানি বাগিন, ১৩৪ পৃ.)।'
তারপর সে এতেও পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হয়নি এবং তার স্বভাব ও মেজাজ অনুযায়ী একেও যথেষ্ট মনে করেনি। তারপর সে বলে যে, তাকবীয়াতুল ঈমান বইটা পড়া হলো মদ খাওয়া ও যেনা করার চেয়েও বড় হারাম কাজ (আল আতাআন নাববীয়্যাহ ফীল ফাতওয়ার রিযভীয়্যাহ, ৬/১৮৩)।
আর এটি সুবিদিত যে, এই রাগ ও ক্রোধের কারণ হলো, তাকবীয়াতুল ঈমান মানুষের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করেছে, তাদেরকে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ ও তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ এর সঠিক বিশ্বাসের দিকে অনুপ্রাণিত করেছে, আর শিরক থেকে তাদেরকে বিরত রেখেছে। আর নিশ্চয় শিরক হলো সবচেয়ে বড় যুলম। আর কবর থেকে বরকত হাসিল করা, মৃতদের মাধ্যমে ওয়াসিলা তালাশ করা এবং যারা কোনো উপকার বা অপকার করার মালিক নয় এবং যারা খেজুরের বিচির আবরণেরও মালিক নয়, তাদের নিকট রোগের আরোগ্য চাওয়া থেকে মানুষদেরকে এই কিতাব বিরত রেখেছে।
আর বেরেলভী তার অনুসারীদের সকলের থেকে এটি ভালোভাবে জানতো যে, যে কেউ এই ছোট, কিন্তু অনন্য দরকারী বইটি পড়বে, যেই বই হিকমাতপূর্ণ কুরআনের আয়াত ও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত হাদীস দিয়ে পরিপূর্ণ, সেই ব্যক্তি অবশ্যই প্রভাবিত হবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
মুমিন তো তারাই, আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কম্পিত হয় এবং তার আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রবের উপরই নির্ভর করে (সূরা আল আনফাল ৮:২)।
মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
আর রাসূলের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যখন তারা শুনে, তখন তারা যে সত্য জানে তার জন্য আপনি তাদের চোখ অশ্রু বিগলিত দেখবেন। তারা বলে, হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত করুন (সূরা আল মায়েদা ৫: ৮৩)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিক নির্দেশনা ও শিক্ষার পরে মুমিনদের আর কোনো ইখতিয়ার থাকে না, কেননা মুমিনরা জানে যে,
﴿وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا﴾
আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো (সূরা আল আহযাব ৩৩: ৩৬)।
তারা আরো জানে যে,
﴿وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا﴾
আর কারো নিকট সৎ পথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস (সূরা আন নিসা ৪: ১১৫)।
আর তাদের এটিও অবগতিতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে আদেশ করেছেন,
﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا﴾
রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাকো (সূরা আল হাশর ৫৯: ৭)।
কেননা ইসমাঈল শহীদ দেহলভী রহিমাহুল্লাহ তার মহান কিতাব 'তাকবীয়াতুল ঈমান' এ আল্লাহ তা'আলার কিতাবের ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের একটি অংশ একত্রিত করেছিলেন এবং সেগুলোকে মানুষজনের ভাষাতে অনুবাদ করেছিলেন যাতে করে তাদের বোঝা সহজ হয়। বেরেলভী দেখলো যে, যদি মানুষজন কুরআন ও সুন্নাহ বুঝে ফেলে, তাহলে তো কবরপুজারীদের বিনা পুঁজিতে লাভজনক ব্যবসা আর থাকবে না। ফলে তার ও তার অনুসারীদের জন্য আবশ্যক হয়ে গেল এই মহান বীরকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা, যিনি তাওহীদের আলো দিয়ে শিরকের অন্ধকারকে দূর করতে চেয়েছিলেন এবং তিনি সুন্নাহর আলোতে অজ্ঞতার মেঘকে দূর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা আল্লাহ তা'আলার বাণী ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী দিয়ে পরিপূর্ণ কিতাবকে গালিগালাজ করতো এবং এই কিতাব পড়াকে মদ খাওয়া ও ব্যভিচার করার চাইতেও বড় হারাম কাজ মনে করতো। কেননা কোনো ধরনের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই তাদের যে রিযিক আসতো এই কিতাব তাদের সেই রিযিক বন্ধ করে দিয়েছিল। এ জন্য তারা ইসমাইল শহীদ রহিমাহুল্লাহকে কাফের বলেছে এবং তার প্রতিনিধি উত্তরাধিকারী সকলের শাইখ সায়্যেদ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহকেও তারা কাফের বলেছে। কারণ তিনি সমগ্র দিল্লী, তার আশপাশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী দিয়ে আলোকিত করেছিলেন। আর ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা তাঁর নিকট আসতে শুরু করে। ফলে তিনি আমাদের আকাঙ্খার স্থান, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের ছাত্রদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেন। তার খ্যাতি অনারবদের ছাড়িয়ে আরবদের কাছে পৌছেছিল। ফলে দূর ও কাছের সকল স্থান থেকে লোকজন তাঁর নিকট আসতে থাকে।
📄 ১৮. শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে
শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে সেই যুগের শাইখুল মুহাদ্দিসীন এবং আহলুস সুন্নাহর ইমাম শাইখ হুসাইন ইবনু মুহসিন আল-আনসারী রহিমাহুল্লাহ একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন, যখন তার নিকট নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,
'আমি নাযীর হুসাইন দেহলভী সম্পর্কে যা জানি, বিশ্বাস করি ও যা যাচাই করেছি, সে অনুযায়ী তিনি হলেন তার যুগের অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব, যুগের গুরুত্বপূর্ণ আলেমের একজন। বরং তাঁর জ্ঞান, ধৈর্য ও তাকওয়ার দিক থেকে ভারত অঞ্চলে তার মতো দ্বিতীয় আর কেউ নেই। তিনি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার দিকে মানুষদেরকে দিক নির্দেশনা দানকারী এবং কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষাদানকারীদের একজন। বরং তিনি হলেন ভারতে এই যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম। অধিকাংশরাই তার ছাত্র। তার আকীদা সালাফদের আকীদা, কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সূর্য দেখতে পেলে শনি গ্রহ তো তোমার কোনো উপকারে আসবে না সুতরাং অধিক নিন্দাকারী হিংসুক ও লাঞ্ছিত দুষ্টদের কথাকে পরিত্যাগ করো। কেননা হিংসার শাস্তি তার কাছেই ফিরে আসবে ও তার ওপরই আপতিত হবে। আল্লাহ তা'আলা তার নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন তার জন্য কি তারা হিংসা করে? সুতরাং যে ব্যক্তি ইমামকে গালি দিবে, যিনি সর্বোত্তম মানুষ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের দিকে দিক নির্দেশনা দেন, সেই ব্যক্তি স্পষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কবি কতই না সুন্দর কথা বলেছেন! যে,
জেনে রেখো! যে ব্যক্তি আমার হিংসা করে তাকে বলে দাও, তুমি কি জানো যে, তুমি কার সাথে খারাপ আচরণ করেছো? তুমি আল্লাহর রাজত্বে আল্লাহর সাথে খারাপ আচরণ করেছো। কেননা আল্লাহ তা'আলা আমাকে যা দিয়েছেন তার ওপর তুমি সন্তুষ্ট হতে পারোনি।
হে আল্লাহ! আপনি এই ইমাম, মহান আলেম, মুহাদ্দীস, আল্লামার সম্মান ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দিন এবং তাঁর শত্রু ও বিরোধীদেরকে লাঞ্ছিত করুন, তাদের কাউ কেউ আপনি রেহাই দিয়েন না। সায়্যেদ নাযীর হুসাইন রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে আমি এটিই জানি এবং এমনই বিশ্বাস করি। আর আল্লাহ তা'আলা গোপন বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত।'
সায়্যেদ আবুল হাসান আলী আল-হাসানী আন-নাদাবী রহিমাহুল্লাহর পিতা শাইখ আব্দুল হাই আল হাসানী রহিমাহুল্লাহ তার কিতাবে যা লিখেছেন আমরা এখানে তার বর্ণনা করতে চাই, যদিও এতে আলোচনাটা একটু লম্বা হয়ে যাবে:
'মহান আলেম, মুহাদ্দীস, আল্লামাহ শাইখ নাযীর হুসাইন আল হুসাইনী আল বিহারী আদ দেহলভী রহিমাহুল্লাহ, যার মর্যাদা, জ্ঞান ও হাদীসের ওপর যার দক্ষতার বিষয়ে সকলেই একমত।' এভাবে তিনি এক পর্যায়ে লিখেছেন:
তিনি দারস প্রদান করা, উপদেশ দেওয়া ও ফাতওয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থান করেছেন। তিনি প্রতিটি জ্ঞান ও শাখাতে কিতাবের দারস দিয়েছেন, বিশেষ করে ফিকহ ও উসূল বিষয়ে। হানাফী ফিকহের প্রতি তার প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কুরআন ও হাদীসের প্রতি ভালোবাসা অনেক বেশি জোরদার হয়। ফলে তিনি কুরআন ও হাদীসের সাথে ফিকহ ছাড়া অন্য সবগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়াকে পরিত্যাগ করেন।
আমি ১৩১২ হিজরীতে তার দারসে উপস্থিত হই। আমি তাকে কুরআন ও হাদীসের ইমাম হিসেবে পেয়েছি। তিনি ছিলেন উত্তম আকীদার অধিকারী, দিন রাত শিক্ষাদানে নিবেদিতপ্রাণ, প্রচুর সালাত আদায়কারী, কুরআন তেলাওয়াকারী। এছাড়াও তিনি ছিলেন বিনয়ী ও অধিক কান্না করতেন। এগুলো বিপরীত যারা, তাদের প্রতি তিনি ছিলেন কঠোর। তিনি সহনশীল ছিলেন, রসিকতা করতেন এবং অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। আল্লাহর জন্য তিনি কোনো নিন্দুকের নিন্দা পরোয়া করতেন না। আল্লাহ তা'আলা তাকে দীর্ঘ জীবন দান করেছেন। তিনি তার জ্ঞান দিয়ে বহু আরব ও অনারবকে উপকৃত করেছেন। ভারতে তিনিই হাদীসের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিতে পরিণত হন।
তাকে রহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার জন্য অনেকবার কষ্ট দেওয়া হয়েছে। আর মানুষজন তাকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং ভারতের শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপবাদ দিয়েছে। ব্রিটিশরা তাকে আশি বা একাশি সালে গ্রেফতার করে এবং তারা তাকে পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি নামক শহরে স্থানান্তরিত করে। তিনি পুরো একবছর কারাগারে ছিলেন। তারপর তারা তাকে মুক্ত করে দেয়। তারপর তিনি আবার দিল্লীতে ফিরে আসেন এবং দারস দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন, যেটি তিনি কারাগারে যাওয়ার আগে করতেন। তারপর তিনি ১৩০০ হিজরীতে হিজাযে গমন করেন। সেখানে তারা শাইখকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে বের হওয়ার অপবাদ দেয়, আরো অপবাদ দেয় যে, তিনি নাকি বলেছেন যে, শুকুরের চর্বি হালাল, কোনো ব্যক্তির জন্য তার ফুফু বা খালাকে বিবাহ করা জায়েয, ব্যবসায়িক সম্পদে কোনো যাকাত নেই, অথচ এগুলো থেকে শাইখ সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তারপর তারা এই ঘটনাটি মক্কার গভর্নরকে জানায়, তখন গভর্নর তাকে গেফতার করেন, সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ও এক রাত-একদিন তাকে বন্দি করে রাখা হয়। তারপর গভর্নর তাকে মুক্ত করে দেন। তারপর শাইখ যখন আবার ভারতে ফিরে আসেন, তখন তারা তাকে বিদআতী বলেছে এবং কাফের বলেছে, যেমনভাবে সালাফগণের যুগে মুজতাহিদ ইমামগণের অনেককে মানুষজন কাফের বলেছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এর জন্য যথাযথ বদলা দিবেন। তাকওয়া, দীনদারিতা, দুনিয়া বিমুখতা, জ্ঞান, আমল, পরিতুষ্ট হওয়া, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, আল্লাহর ওপর ভরসা করা, মানুষদের থেকে অমুখাপেক্ষী হওয়া, সত্যবাদিতা, হক কথা বলা, আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করা, আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা, এগুলোর ক্ষেত্রে শাইখ ছিলেন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন ও উজ্জল নিয়ামত। আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে কুরআন ও হাদীসের কিছু জ্ঞান দান করেছেন, তারা সকলেই শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহর মর্যাদা সম্পর্কে একমত (নুঝহাতুল খাওয়াতির, ৪৯৮ পৃ.)।'
📄 ১৯. শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহর ছাত্রবৃন্দ
তার ছাত্ররা বিভিন্ন স্তরের ছিল। তাদের মধ্যে কিছু ছাত্র ছিল সুপরিচিতি আলেম। সম্ভবত তাদের সংখ্যা এক হাজার হবে। আবার কিছু বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে কিছু ছাত্র এই প্রথম স্তরের ছাত্রদের মতোই ছিল। আর কিছু ছাত্র ছিল দ্বিতীয় স্তরের নিচের পর্যায়ের। এই দুই স্তরের ছাত্রদের সংখ্যা হাজার হাজার। ভারতে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্ররা হলো, তার সন্তান সায়্যেদ শরীফ হুসাইন রহিমাহুল্লাহ, যিনি নাযীর হুসাইনের জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেছেন, শাইখ আব্দুল্লাহ আল-গজনভী এবং তার মুত্তাকী সন্তানরা: মুহাম্মাদ, আব্দুল জাব্বার, আব্দুল ওয়াহিদ, আব্দুল্লাহ।
তার ছাত্রদের মধ্যে আরো রয়েছে, শাইখ মুহাম্মাদ বাশীর আল-উমারী আস- সাহসাওয়ানী, সায়্যেদ আমীর হাসান, তার সন্তান আমীর আহমাদ আল হুসাইনী আস-সাহসাওয়ানী, শাইখ মুহাদ্দিস আব্দুল মান্না আল-ওয়াযির আবাদী, 'ইশাআতুস সুন্নাহ' কিতাবের লেখক শাইখ মুহাম্মাদ হুসাইন আল বাত্তালাবী, আল্লামাহ আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহীম আল-গাজিফৌরী, সায়্যেদ মুস্তফা ইবনু ইউসূফ আশ-শরীফ আল-হাসানী, সায়্যেদ আমীর আলী ইবনু মুয়াজ্জাম আলী আল-হুসাইনী আবাদী, কাযী মোল্লা মুহাম্মাদ ইবনু কাযী মুহাম্মাদ ইবনু হাসান আল-বাশাওয়ারী, শাইখ গোলাম রাসূল আল-কালাভী, আওনুল মাবুদের লেখক মুহাদ্দিস শামসুল হক ইবনু আমীর আলী আদ- দিয়ানভী, শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনু ইদরীস আল-হাসানী আস-সানাসী আল- মাগরিবী, শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু নাসির ইবনুল মুবাররক আন নাজদী, শাইখ সাদ ইবনু হামদ ইবনু আতীক আন নাজদী, এছাড়া রয়েছে অস্যংখ ছাত্র।
আলেমগণ সুন্দর সুন্দর কবিতার মাধ্যমে তার প্রশংসা করেছেন। শাইখ শামসুল হক তার 'গায়াতুল মাকসূদ' কিতাবের ভূমিকাতে সেগুলো অনুবাদ করেছেন। মৌলভী ফজল হুসাইন আল-মাহদানভী আল-মুজাফফরী তার 'আল হায়াতু বা'দাল মামাত' নামক একটি স্বতন্ত্র কিতাবে সেগুলো বর্ণনা করেছেন। নাযীর হুসাইন রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে উর্দু ভাষাতে এটি একটি বিস্তারিত বই।
দিল্লী শহরে আমি কয়েকদিন তার সাথে ছিলাম। তিনি আমাকে পরিপূর্ণ একটি সনদ দেন, আর ১৩১২ হিজরীতে তিনি তার পবিত্র নিজ হাতে সেই সনদ লিখে দেন। তিনি রহিমাহুল্লাহ ১৩২০ হিজরীর ২০ই রজব সোমবার মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ তা'আলা তার দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করুন। আমীন (নুঝহাতুল খাওয়াতির, ৫০০- ৫০১)।
📄 ২০. শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহকে তাকফীর করার কারণ
নাযীর হুসাইন রহিমাহুল্লার মাদ্রাসাতে বুখারা ও বাগদাদের মাদ্রাসার উজ্জলতা ও সৌন্দর্যতা এসেছে। আর এই শাইখ ও তার ছাত্রদের প্রভাবে ভারতের সমস্ত শহর ও গ্রামে পবিত্র তাকওয়াশীল মানুষদের কাছে হাদীসের অনুযায়ী আমল করা খুবই প্রিয় হয়ে উঠেছে। বেরেলভীদের ব্যবসাতে মন্দা পড়েছে ও তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে অবশ্যই এই শাইখকে অপমান করতে হবে ও শাস্তি দিতে হবে। কারণ এই শাইখ হলেন ফাসাদ সৃষ্টিকারী, শিরক, ভ্রষ্টতা ও গোমরাহীকে বিনষ্টকারী, বিদআত, কুসংস্কার ও কল্পকাহিনীকে বাতিলকারী। ফলে বেরেলভী তার থেকে একটি তীর নিয়ে এই শাইখকের দিকে নিক্ষেপ করলো। সে বললো যে,
'নাযীর হুসাইন হলো নাস্তিকদের ইমাম, যারা গাইরে মুকাল্লিদ তাদের মুজতাহিদ, বিভিন্ন বিদআত ও কল্পকাহিনীর উদ্ভাবক (হাজিযুল বাহরাইন, ২১০ পৃ.)।'
তার মতো ব্যক্তি কি শুধু এই ধরনের অপমান করাতেই পরিতৃপ্ত হতে পারে? কখনোই নয়, সে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছা পর্যন্ত পরিতৃপ্ত হয়নি। সে তার দুর্বল আরবীতে বলে,
নাযীর হুসাইন দেহলভীর দিকে সম্পৃক্তকারীরা হলো মুরতাদ, বিদ্রোহী ও প্রতারক। তাদেরকে প্রতারিত করার জন্য শয়তান তাদের নিকট ওয়াহী করে (হিসামুর হারামইন আলা মানহারিল কুফরী ওয়াল মাইন, ১৯ পৃ.)।
সে আরো বলে যে, 'তোমাদের জন্য এই বিশ্বাস রাখা আবশ্যক যে, যেসব ব্যক্তিদেরকে আমরা কাফের বলে বর্ণনা করেছি, নাযীর হুসাইন দেহলভী তাদেরই একজন কাফের, মুরতাদ। অনুরূপভাবে এটি বিশ্বাস করাও আবশ্যক যে, ওয়াহাবিদের অন্যান্য কিতাবগুলোর সাথে 'মিআরুল হক' নামক তার কিতাবটি একটি স্পষ্ট কুফরী কিতাব এবং পেশাবের চেয়েও সেটি অপবিত্র এবং খারাপ (দামানি বাগিন, ১৩৬ পৃ.)।'
দেহলভীরা যেহেতু কাফের, সুতরাং অবশ্যই তাদের অনুসারী সালাফী আহলুল হাদীসরাও তেমনই। সে বলে, 'গায়রে মুকাল্লিদরা সকলেই খাঁটি শয়তান এবং অভিশপ্ত' (দামানি বাগিন, ১৩৪ পৃ.)। সে তাদের নিন্দা ও অপবাদ দেওয়ার জন্য তার তৈরি করা একটি আরবী কবিতাতে বলে, আর সেটি কতই না নিকৃষ্ট ও নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ কথা:
'কিভাবে হিদায়াতের দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে? অথচ তোমাদের অন্তরে ইসমাঈল (শহীদ দেহলভী) কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আর নিশ্চয় আহলুল হাদীসরা সকলেই কাফের, মুরতাদ (দামানি বাগিন, ১২৫-১২৬ পৃ.)।'