📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১৫. শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহিমাহুল্লাহর নাতী শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহু

📄 ১৫. শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহিমাহুল্লাহর নাতী শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহু


আহলে হাদীসদের আন্দোলনের পথপ্রদর্শক, নেতা, বীর মুজাহিদ, নিখুত আলেম, শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহিমাহুল্লাহর নাতী শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহু, যিনি ব্রিটিশ উপনিবেশিকতা ও মুসলিম দেশ দখলকারী শিখদের বিরুদ্ধে জিহাদের পতাকা বহন করেছিলেন, যেই শিখরা কুফরী করেছিল ও মুসলমানদের রক্তকে বৈধ মনে করেছিল।

তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের ভূখণ্ডের একটি অংশে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্টার জন্য ইসলামের পতাকা বহন করেছিলেন, যাতে করে বিশুদ্ধ ইসলামী আইন সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা যায় এবং তিনি প্রকৃত ইসলামী দাওয়াতকে পুনরায় নবায়ন করেন এবং সঠিক সালাফী পথকে পুনরুজ্জীবিত করেন। যার কন্ঠস্বর শতাব্দী আগে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, বিভিন্ন ধরনের বিদআত ও কুসংস্কারের অধীনে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, পশ্চাতের খারাপ পথগুলোর মাধ্যমে যা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। এমনকি কবরের ইবাদত শুরু হয়েছিল, কবরের দিকে ও কবরের ওপরে সিজদাহ করা শুরু হয়েছিল, মাসজিদগুলো হিদায়াত ও দিক নির্দেশনা থেকে বিরান হয়ে গিয়েছিল, সেগুলো মুসল্লী শূন্য হয়ে পড়েছিল। পক্ষান্তরে তাদের উপাসনালয় আবাদ হতে থাকে ও সেগুলোর উন্নতি হতে থাকে। আর একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইবাদতকে বর্জন করা হয়েছিল, আল্লাহ তা'আলার হুদূদ ও শরীআতকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার ওপরে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল বিভিন্ন মানুষের কথা এবং সূফী ও জাহেলদের কাজকর্ম। হিদায়াতের বিনিময়ে গোমরাহীকে ক্রয় করা হয়েছিল এবং আলোর বিনিময়ে অন্ধকারকে ক্রয় করা হয়েছিল।

এমন পরিস্থিতিতে শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহ দাঁড়ালেন, তার কলম, জবান, হাত ও অস্ত্র দিয়ে তাদের প্রতিরোধ করলেন ও সংগ্রাম করলেন। তিনি একটি কিতাব রচনা করলেন এবং সেটি শিক্ষা দিতে, ব্যাখ্যা করতে ও স্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে শুরু করলেন। তিনি মানুষকে তার আলো দিয়ে হিদায়াতের দিকে আহবান করতেন ও তারা রেশমী পর্দায় আবৃত থাকার পরে তিনি তাদেরকে তার শিক্ষা মেনে চলার আহবান জানিয়েছিলেন, যেই পর্দার পিছনে ছিল কবরের বরকত হাসিল করা, সেটি চুম্বন করা, শপথ বা কসম করা। তিনি আল্লাহ তা'আলার কিতাবের আলোকে একটি কিতাব রচনা করলেন, যার নাম দিলেন 'তাকবিয়াতুল ঈমান'। এর মাধ্যমে তিনি মানুষদেরকে এক আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করা ও বিশুদ্ধ তাওহীদের দিকে আহবান করেন এবং শিরক পরিহার করা ও আল্লাহ ছাড়া অন্য মাশাইখ ও কবরবাসীর নিকটে সাহায্য চাওয়াকে বর্জন করার জন্য আহবান করেন। আর তিনি মানুষকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকতে এবং তাঁর নামে শপথ করা থেকে বিরত রেখেছিলেন এবং তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার কিতাবের দিকে এবং যিনি সেই কিতাব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন সেই রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে আহবান করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি বাপ দাদাদের ও মাযহাবের অন্ধ তাকলীদ বর্জন করার দিকে আহবান করেছিলেন।

আবার আল্লাহ তা'আলার কালেমাকে উঁচু করার জন্য ও একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করার তিনি তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানের দিকেও আহবান করেছিলেন, যেই ইসলামী রাষ্ট্রে আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী ফায়সালা করা হবে। তিনি, তাঁর পরিবার ও তার ছাত্ররা জিহাদের ময়দানের দিকে ছুটে চলেছেন। তিনি ও তারা আল্লাহ তা'আলার রাস্তাতে লড়াই করেছেন, সারা দিনব্যাপী তারা বর্শা ও তরবারী নিয়ে নিজেদেরকে উন্মোচিত করেছেন এবং সারা দিনব্যাপী তারা আল্লাহ তা'আলার কিতাব কুরআন মাজীদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ শিক্ষা দিয়েছিলেন। তারপর যখন রাত চলে আসতো, তখন তারা বিছানা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতেন (অর্থাৎ রাত ব্যাপী ইবাদত করতেন)। আর যখন সকাল হতো, তখন তারা আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় লড়াই করতেন, তারা শত্রুদেরকে হত্যা করতেন এবং নিজেরাও নিহত হতেন। তারা রাত জেগে ইবাদত করতেন আর দিনের বেলাতে সিয়াম পালন করতেন। তারা আল্লাহ তা'আলার এই বাণীর সত্যায়ণ করেছেন, যেখানে আল্লাহ তা'আলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য আছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, অতঃপর তারা মারে ও মরে তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে এ সম্পর্কে তাদের হক ওয়াদা রয়েছে। আর নিজ প্রতিজ্ঞা পালনে আল্লাহর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কে আছে? সুতরাং তোমরা যে ক্রয় বিক্রয় করেছ তার জন্য আনন্দিত হও। আর সেটাই তো মহাসাফল্য (সূরা আত তাওবাহ ৯ : ১১১)।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১৬. উপমহাদেশের সালাফী ও আহলুল হাদীসদের ইমাম শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ

📄 ১৬. উপমহাদেশের সালাফী ও আহলুল হাদীসদের ইমাম শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ


শাহ ইসমাইল শহীদ রহিমাহুল্লাহর পরে বেরেলভীরা তাঁর দাওয়াত ও জিহাদের উত্তরাধিকারী হাদীস বিশারদ ও মহৎ আলেম, তাঁর যুগে সাহায্যপ্রাপ্ত দলের সম্মানিত শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাকে কাফের বলেছিল, যিনি ভারত পাকিস্থান উপমহাদেশে সুন্নাহর পতাকা বহন করেছিলেন। তিনি অজ্ঞতা ও গোমরাহীর মেঘ দূর করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করেছিলেন, শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দীস দেহলভীর আসনে বসেছিলেন, তাঁর নির্দেশাবলী সংশোধন ও পরিমার্জিত করেছিলেন। কট্রোরপন্থীরা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিমুখ হওয়ার পরে এবং সেগুলো থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নেওয়ার পরে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি ভারতীয়দের আকাঙ্ক্ষাকে নবায়ন করেছিলেন এবং হাদীসের প্রতি আমল পরিত্যাগ করার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে তিনি হাদীস অনুযায়ী আমল করাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তিনি এই উপমহাদেশে হাদীসের প্রসারের জন্য নিজে সক্রিয় ছিলেন এবং তার ছাত্রদেরকেও সক্রিয় করেছিলেন। তার খ্যাতি দিগ দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, এমনকি মিশরের একজন আলেম সায়্যেদ রশীদ রেযা বলেন, এই যুগে আমাদের ভাই, ভারতীয় আলেমদের যদি উলুমুল হাদীসের বিষয়ে মনোযোগ না থাকতো, তাহলে প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তা বিলুপ্ত হয়ে যেতো।

এগুলো লেখার পরে তিনি বলেন, এমনকি কট্রোরপন্থী মুকাল্লিদরা এই হাদীসের কিতাবগুলো বর্ণনা করার সময় সেগুলোর মাধ্যমে বরকত হাসিল করা ও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করা ছাড়া আর কোনো ফায়েদা আছে বলে মনে করতো না। বেরেলভী ও তার অনুসারীরা এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ইমামকে কাফের বলেছিল, যেমনভাবে তার অনুসারীরা সালাফী আহলুল হাদীসদের অনুসারীদেরকে কাফের বলেছিল, বিশেষ করে প্রথম ইমামকে তারা কাফের বলেছিল। বেরেলভী যখনই সেই ইমামের কোনো তিরস্কার করার সুযোগ পেয়েছে, তখনই তাকে তিরস্কার করেছে, কোনোভাবে আঘাত করার সুযোগ পেলেই আঘাত করেছে। আর সে তার দাবী অনুযায়ী ইমামের কাফের হওয়ার বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র কিতাবই লিখেছে, যার নাম দিয়েছে, 'আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ আলা কুফরিয়‍্যাতি আবীল ওয়াহাবিয়‍্যাহ'।

সে তার ভাঙা আরবীতে বলে যে, 'হে মুনাফিক, মুরতাদ ও ফাসিক লোকেরা! তোমাদের নেতা দাবী করে যে, তোমাদের একে অপরের প্রশংসার মতো হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করা। তোমাদের মতে, এর চেয়েও কম হলো, তোমাদের মুখ থেকে বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, আর তোমাদের অন্তর যা গোপন রেখেছে তা আরো ভয়াবহ। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের বিদ্বেষকে প্রকাশ করে দিবেন। শয়তান তোমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছে। ফলে সে তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার স্মরণ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মান থেকে ভুলিয়ে রেখেছে। আর তোমাদের লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়ে কুরআন স্পষ্টভাবেই বলেছে। শয়তান তার বিভ্রান্তি দিয়ে তার আনুগত্যকে তোমাদের ওপর আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তার বিভ্রান্তির মধ্যে তোমাদেরকে প্রদক্ষিণ করাচ্ছে। ফলে তোমাদের ঈমান হারানোতেই সে তোমাদেরকে ঈমান বৃদ্ধি করা বলে মনে করাচ্ছে। তোমরা যার ওপর রয়েছে এভাবেই মুমিনদেরকে আল্লাহ তা'আলা ছেড়ে দিবেন না, যতক্ষণ না তিনি ভালো থেকে খারাপ পৃথক করেন, আর তোমাদের কুফরীর বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা উদাসীন নন ('আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ আলা কুফরিয়‍্যাতি আবীল ওয়াহাবিয়‍্যাহ', ৭৮ পৃ.)।'

তারপর প্রশ্নকারীর প্রশ্নে প্রতি উত্তরে সে বলে, 'ওয়াহাবীরা, যারা মুকাল্লিদ নয় এবং তাদের ইমাম, বিভিন্ন দিক থেকে এবং ফকীহগণ ও বিশিষ্ট ফাতাওয়া প্রদানকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী যার কাফের হওয়াটা নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের ওপর কুফরীর এই বিধান প্রমাণিত হয়েছে, তা বলবত থাকবে, আর তাওহীদের কালেমা তাদের কোনো উপকারে আসবে না এবং তাদের থেকে কুফরীও দূর হবে না। তারা ও তাদের ইমাম তার 'তাকবীয়াতুল ঈমান' কিতাবে এটি স্বীকার করেছে, যেটিকে তারা কুরআনের মতো মনে করে, যেটি হলো তাদের স্পষ্ট ও প্রকাশ্য কুফরী ('আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ আলা কুফরিয়‍্যাতি আবীল ওয়াহাবিয়‍্যাহ', ১০ পৃ.)।'

আর সে শহীদ দেহলভী রহিমাহুল্লাহর কিতাব 'তানবীরুল আইনাইন' থেকে দেহলভী রহিমাহুল্লাহর কথা বর্ণনা করে, যাতে তিনি বলেন, হায়! যদি আমি জানতে পারতাম যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হওয়া বর্ণনাগুলো, যেগুলো স্পষ্টভাবে কোনো ইমামের বিপরীতকে প্রমাণ করে, সেই বর্ণনাগুলোর দিকে ফিরার সক্ষমতা থাকার পরেও কিভাবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির তাকলীদ করা জায়েয হতে পারে? যদি তার ইমামের কথা পরিত্যাগ না করে, তাহলে তাতে শিরকের দাগ থাকবে, একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির আনুগত্য করা বলে গণ্য হবে, যেখানে সে তার কথাকেই আঁকড়ে ধরে থাকবে, যদিও কুরআন ও সুন্নাহর দলীল দিয়ে তার বিপরীতটি প্রমাণিত হয়।'

এটিই হলো তার কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। এজন্য তিনি কাফের ('আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ আলা কুফরিয়্যাতি আবীল ওয়াহাবিয়‍্যাহ', ৪৯ পৃ.)। অর্থাৎ শহীদ দেহলভী কাফের হয়ে গেছেন। কারণ তিনি মনে করেন যে, কোনো ইমামের কথার বিপরীত কিছুকে প্রমাণকারী নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের দিকে ফিরে যাওয়া সম্ভব হলে তখন আর নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির তাকলীদ করা জায়েয নয়। আর কোনো ব্যক্তির কথার জন্য সুন্নাহকে পরিত্যাগ করা জায়েয নয়। বেরেলভীর দৃষ্টিতে এটি হলো কুফরী। তাহলে এটি যদি কুফরী হয়, তবে ইসলাম কোনটি তা আমাদের জানা নেই। কতই না আশ্চর্যের বিষয় যে, আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের দিকে আহবান করা হলো কুফরী, আর এই দুটি ছাড়া অন্য কিছুর দিকে আহবান করা হলো ইসলাম।

এই ধরনের কারণের মতো সত্তরটি কারণে বেরেলভী এই মহান ইমাম, মুজাহিদ, সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিতকারী ও বিদআতকে নির্মূলকারী শহীদ রহিমাহুল্লাহকে কাফের বলে আখ্যায়িত করেছে। আর সে তার আরেকটি পুস্তিকাতে বলে, 'তাকে (ইসমাইল শহীদ) ও তার অনুসারী ওয়াহাবীদেরকে কাফের বলা আবশ্যক। কেননা তারা নিজেদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহর দিকে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে। তিনিই ছিলেন তাদের প্রথম শিক্ষক। তিনি কিতাবুত তাওহীদ নামে একটি কিতাব লিখেছিলেন। আর 'তাকবিয়াতুল ঈমান' তো সেই কিতাবেরই উর্দু অনুবাদমাত্র।

সুতরাং তাদের ইমাম হলো, শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর ওয়াহাব নাজদী রহিমাহুল্লাহ। ইসমাইল শহীদ দেহলভী তার মতকে গ্রহণ করেছিলেন এবং তারই কিতাবকে 'তাকবিয়াতুল ঈমান' নামে অনুবাদ করেছিলেন। সুতরাং তাদের প্রথম শিক্ষকের দিকে তাদের সম্পৃক্ত করে তারা হলো ওয়াহাবী, আর দ্বিতীয় শিক্ষকের দিকে সম্পৃক্ত করে তারা হলো ইসমাঈলী। এতেই প্রমাণিত হয় যে, এই ইসমাঈলী ও ওয়াহাবীরা বিভিন্ন দিক থেকে নিশ্চিতভাবে কাফের, তারা সকলেই মুরতাদ, বরং সকলেই কাফের ('আল কাওকাবাতুশ শাহাবিয়্যাহ আলা কুফরিয়‍্যাতি আবীল ওয়াহাবিয়্যাহ', ৬০ পৃ.)।'

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১৭. তাকবীয়াতুল ঈমান

📄 ১৭. তাকবীয়াতুল ঈমান


আর তার কিতাব 'তাকবীয়াতুল ঈমান' সম্পর্কে তারা বলে যে, এটি ঈমান শক্তিশালী করার কিতাব নয়, বরং এটি হলো ঈমান হারানোর কিতাব। আর সে বলে যে, ওয়াহাবী ধর্মের মিথ্যা কুরআনই (অর্থাৎ সেই কিতাবটি) হলো ঈমান হারানোর কিতাব (আল আমনু ওয়াল উলা, ৭২ পৃ.)। সে আরো বলে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেহলভীর নিকটে 'তাকবীয়াতুল ঈমান' নামে নতুন কুরআন পাঠিয়েছে (আল আমনু ওয়াল উলা, ১৯৫পৃ.)।

আর ইসমাইল শহীদ দেহলভীর লেখনী যেমন 'তাকবীয়াতুল ঈমান', 'তানবীরুল আইনাইন', 'ইযাহুল হাক', 'আস সিরাতুল মুস্তাকিম' এগুলো সম্পর্কে সে বলে যে, 'এই সবগুলোই হলো কুফরী কিতাব। এগুলো হলো পেশাবের মতো অপবিত্র। কেউ যদি এমনটি বিশ্বাস না করে, তাহলে তার কী হবে? সে যিনদীক হয়ে যাবে (দামানি বাগিন, ১৩৪ পৃ.)।'

তারপর সে এতেও পরিতৃপ্ত ও সন্তুষ্ট হয়নি এবং তার স্বভাব ও মেজাজ অনুযায়ী একেও যথেষ্ট মনে করেনি। তারপর সে বলে যে, তাকবীয়াতুল ঈমান বইটা পড়া হলো মদ খাওয়া ও যেনা করার চেয়েও বড় হারাম কাজ (আল আতাআন নাববীয়‍্যাহ ফীল ফাতওয়ার রিযভীয়‍্যাহ, ৬/১৮৩)।

আর এটি সুবিদিত যে, এই রাগ ও ক্রোধের কারণ হলো, তাকবীয়াতুল ঈমান মানুষের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করেছে, তাদেরকে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ ও তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ এর সঠিক বিশ্বাসের দিকে অনুপ্রাণিত করেছে, আর শিরক থেকে তাদেরকে বিরত রেখেছে। আর নিশ্চয় শিরক হলো সবচেয়ে বড় যুলম। আর কবর থেকে বরকত হাসিল করা, মৃতদের মাধ্যমে ওয়াসিলা তালাশ করা এবং যারা কোনো উপকার বা অপকার করার মালিক নয় এবং যারা খেজুরের বিচির আবরণেরও মালিক নয়, তাদের নিকট রোগের আরোগ্য চাওয়া থেকে মানুষদেরকে এই কিতাব বিরত রেখেছে।

আর বেরেলভী তার অনুসারীদের সকলের থেকে এটি ভালোভাবে জানতো যে, যে কেউ এই ছোট, কিন্তু অনন্য দরকারী বইটি পড়বে, যেই বই হিকমাতপূর্ণ কুরআনের আয়াত ও নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত হাদীস দিয়ে পরিপূর্ণ, সেই ব্যক্তি অবশ্যই প্রভাবিত হবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,

إِنَّ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

মুমিন তো তারাই, আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কম্পিত হয় এবং তার আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রবের উপরই নির্ভর করে (সূরা আল আনফাল ৮:২)।

মুমিনদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,

وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ

আর রাসূলের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যখন তারা শুনে, তখন তারা যে সত্য জানে তার জন্য আপনি তাদের চোখ অশ্রু বিগলিত দেখবেন। তারা বলে, হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত করুন (সূরা আল মায়েদা ৫: ৮৩)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিক নির্দেশনা ও শিক্ষার পরে মুমিনদের আর কোনো ইখতিয়ার থাকে না, কেননা মুমিনরা জানে যে,

﴿وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا﴾

আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো (সূরা আল আহযাব ৩৩: ৩৬)।

তারা আরো জানে যে,

﴿وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا﴾

আর কারো নিকট সৎ পথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস (সূরা আন নিসা ৪: ১১৫)।

আর তাদের এটিও অবগতিতে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে আদেশ করেছেন,

﴿وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا﴾

রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাকো (সূরা আল হাশর ৫৯: ৭)।

কেননা ইসমাঈল শহীদ দেহলভী রহিমাহুল্লাহ তার মহান কিতাব 'তাকবীয়াতুল ঈমান' এ আল্লাহ তা'আলার কিতাবের ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের একটি অংশ একত্রিত করেছিলেন এবং সেগুলোকে মানুষজনের ভাষাতে অনুবাদ করেছিলেন যাতে করে তাদের বোঝা সহজ হয়। বেরেলভী দেখলো যে, যদি মানুষজন কুরআন ও সুন্নাহ বুঝে ফেলে, তাহলে তো কবরপুজারীদের বিনা পুঁজিতে লাভজনক ব্যবসা আর থাকবে না। ফলে তার ও তার অনুসারীদের জন্য আবশ্যক হয়ে গেল এই মহান বীরকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা, যিনি তাওহীদের আলো দিয়ে শিরকের অন্ধকারকে দূর করতে চেয়েছিলেন এবং তিনি সুন্নাহর আলোতে অজ্ঞতার মেঘকে দূর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা আল্লাহ তা'আলার বাণী ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী দিয়ে পরিপূর্ণ কিতাবকে গালিগালাজ করতো এবং এই কিতাব পড়াকে মদ খাওয়া ও ব্যভিচার করার চাইতেও বড় হারাম কাজ মনে করতো। কেননা কোনো ধরনের কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়াই তাদের যে রিযিক আসতো এই কিতাব তাদের সেই রিযিক বন্ধ করে দিয়েছিল। এ জন্য তারা ইসমাইল শহীদ রহিমাহুল্লাহকে কাফের বলেছে এবং তার প্রতিনিধি উত্তরাধিকারী সকলের শাইখ সায়্যেদ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহকেও তারা কাফের বলেছে। কারণ তিনি সমগ্র দিল্লী, তার আশপাশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী দিয়ে আলোকিত করেছিলেন। আর ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা তাঁর নিকট আসতে শুরু করে। ফলে তিনি আমাদের আকাঙ্খার স্থান, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের ছাত্রদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেন। তার খ্যাতি অনারবদের ছাড়িয়ে আরবদের কাছে পৌছেছিল। ফলে দূর ও কাছের সকল স্থান থেকে লোকজন তাঁর নিকট আসতে থাকে।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১৮. শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে

📄 ১৮. শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে


শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে সেই যুগের শাইখুল মুহাদ্দিসীন এবং আহলুস সুন্নাহর ইমাম শাইখ হুসাইন ইবনু মুহসিন আল-আনসারী রহিমাহুল্লাহ একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন, যখন তার নিকট নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,

'আমি নাযীর হুসাইন দেহলভী সম্পর্কে যা জানি, বিশ্বাস করি ও যা যাচাই করেছি, সে অনুযায়ী তিনি হলেন তার যুগের অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব, যুগের গুরুত্বপূর্ণ আলেমের একজন। বরং তাঁর জ্ঞান, ধৈর্য ও তাকওয়ার দিক থেকে ভারত অঞ্চলে তার মতো দ্বিতীয় আর কেউ নেই। তিনি কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার দিকে মানুষদেরকে দিক নির্দেশনা দানকারী এবং কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষাদানকারীদের একজন। বরং তিনি হলেন ভারতে এই যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম। অধিকাংশরাই তার ছাত্র। তার আকীদা সালাফদের আকীদা, কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সূর্য দেখতে পেলে শনি গ্রহ তো তোমার কোনো উপকারে আসবে না সুতরাং অধিক নিন্দাকারী হিংসুক ও লাঞ্ছিত দুষ্টদের কথাকে পরিত্যাগ করো। কেননা হিংসার শাস্তি তার কাছেই ফিরে আসবে ও তার ওপরই আপতিত হবে। আল্লাহ তা'আলা তার নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন তার জন্য কি তারা হিংসা করে? সুতরাং যে ব্যক্তি ইমামকে গালি দিবে, যিনি সর্বোত্তম মানুষ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের দিকে দিক নির্দেশনা দেন, সেই ব্যক্তি স্পষ্ট ক্ষতির সম্মুখীন হবে। কবি কতই না সুন্দর কথা বলেছেন! যে,

জেনে রেখো! যে ব্যক্তি আমার হিংসা করে তাকে বলে দাও, তুমি কি জানো যে, তুমি কার সাথে খারাপ আচরণ করেছো? তুমি আল্লাহর রাজত্বে আল্লাহর সাথে খারাপ আচরণ করেছো। কেননা আল্লাহ তা'আলা আমাকে যা দিয়েছেন তার ওপর তুমি সন্তুষ্ট হতে পারোনি।

হে আল্লাহ! আপনি এই ইমাম, মহান আলেম, মুহাদ্দীস, আল্লামার সম্মান ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দিন এবং তাঁর শত্রু ও বিরোধীদেরকে লাঞ্ছিত করুন, তাদের কাউ কেউ আপনি রেহাই দিয়েন না। সায়্যেদ নাযীর হুসাইন রহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে আমি এটিই জানি এবং এমনই বিশ্বাস করি। আর আল্লাহ তা'আলা গোপন বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত।'

সায়্যেদ আবুল হাসান আলী আল-হাসানী আন-নাদাবী রহিমাহুল্লাহর পিতা শাইখ আব্দুল হাই আল হাসানী রহিমাহুল্লাহ তার কিতাবে যা লিখেছেন আমরা এখানে তার বর্ণনা করতে চাই, যদিও এতে আলোচনাটা একটু লম্বা হয়ে যাবে:

'মহান আলেম, মুহাদ্দীস, আল্লামাহ শাইখ নাযীর হুসাইন আল হুসাইনী আল বিহারী আদ দেহলভী রহিমাহুল্লাহ, যার মর্যাদা, জ্ঞান ও হাদীসের ওপর যার দক্ষতার বিষয়ে সকলেই একমত।' এভাবে তিনি এক পর্যায়ে লিখেছেন:

তিনি দারস প্রদান করা, উপদেশ দেওয়া ও ফাতওয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থান করেছেন। তিনি প্রতিটি জ্ঞান ও শাখাতে কিতাবের দারস দিয়েছেন, বিশেষ করে ফিকহ ও উসূল বিষয়ে। হানাফী ফিকহের প্রতি তার প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে কুরআন ও হাদীসের প্রতি ভালোবাসা অনেক বেশি জোরদার হয়। ফলে তিনি কুরআন ও হাদীসের সাথে ফিকহ ছাড়া অন্য সবগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়াকে পরিত্যাগ করেন।

আমি ১৩১২ হিজরীতে তার দারসে উপস্থিত হই। আমি তাকে কুরআন ও হাদীসের ইমাম হিসেবে পেয়েছি। তিনি ছিলেন উত্তম আকীদার অধিকারী, দিন রাত শিক্ষাদানে নিবেদিতপ্রাণ, প্রচুর সালাত আদায়কারী, কুরআন তেলাওয়াকারী। এছাড়াও তিনি ছিলেন বিনয়ী ও অধিক কান্না করতেন। এগুলো বিপরীত যারা, তাদের প্রতি তিনি ছিলেন কঠোর। তিনি সহনশীল ছিলেন, রসিকতা করতেন এবং অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। আল্লাহর জন্য তিনি কোনো নিন্দুকের নিন্দা পরোয়া করতেন না। আল্লাহ তা'আলা তাকে দীর্ঘ জীবন দান করেছেন। তিনি তার জ্ঞান দিয়ে বহু আরব ও অনারবকে উপকৃত করেছেন। ভারতে তিনিই হাদীসের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিতে পরিণত হন।

তাকে রহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার জন্য অনেকবার কষ্ট দেওয়া হয়েছে। আর মানুষজন তাকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং ভারতের শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপবাদ দিয়েছে। ব্রিটিশরা তাকে আশি বা একাশি সালে গ্রেফতার করে এবং তারা তাকে পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি নামক শহরে স্থানান্তরিত করে। তিনি পুরো একবছর কারাগারে ছিলেন। তারপর তারা তাকে মুক্ত করে দেয়। তারপর তিনি আবার দিল্লীতে ফিরে আসেন এবং দারস দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন, যেটি তিনি কারাগারে যাওয়ার আগে করতেন। তারপর তিনি ১৩০০ হিজরীতে হিজাযে গমন করেন। সেখানে তারা শাইখকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে বের হওয়ার অপবাদ দেয়, আরো অপবাদ দেয় যে, তিনি নাকি বলেছেন যে, শুকুরের চর্বি হালাল, কোনো ব্যক্তির জন্য তার ফুফু বা খালাকে বিবাহ করা জায়েয, ব্যবসায়িক সম্পদে কোনো যাকাত নেই, অথচ এগুলো থেকে শাইখ সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তারপর তারা এই ঘটনাটি মক্কার গভর্নরকে জানায়, তখন গভর্নর তাকে গেফতার করেন, সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ও এক রাত-একদিন তাকে বন্দি করে রাখা হয়। তারপর গভর্নর তাকে মুক্ত করে দেন। তারপর শাইখ যখন আবার ভারতে ফিরে আসেন, তখন তারা তাকে বিদআতী বলেছে এবং কাফের বলেছে, যেমনভাবে সালাফগণের যুগে মুজতাহিদ ইমামগণের অনেককে মানুষজন কাফের বলেছে। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এর জন্য যথাযথ বদলা দিবেন। তাকওয়া, দীনদারিতা, দুনিয়া বিমুখতা, জ্ঞান, আমল, পরিতুষ্ট হওয়া, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, আল্লাহর ওপর ভরসা করা, মানুষদের থেকে অমুখাপেক্ষী হওয়া, সত্যবাদিতা, হক কথা বলা, আল্লাহ তা'আলাকে ভয় করা, আল্লাহ তা'আলা ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা, এগুলোর ক্ষেত্রে শাইখ ছিলেন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিদর্শন ও উজ্জল নিয়ামত। আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে কুরআন ও হাদীসের কিছু জ্ঞান দান করেছেন, তারা সকলেই শাইখ নাযীর হুসাইন দেহলভী রহিমাহুল্লাহর মর্যাদা সম্পর্কে একমত (নুঝহাতুল খাওয়াতির, ৪৯৮ পৃ.)।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px