📄 ১৬. কুরআন পাঠের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা
তাই তারা সবাই একসাথে কোনো ধনী-সম্পদশালীর বাড়িতে জমায়েত হয়, কুরআন খতম করে এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করে (পৌঁছায়)। ধনী লোকটি খুশী হয় যে, কিছু টাকা-পয়সা ব্যয় করে মৃত ব্যক্তি (যার জন্য এ আয়োজন করা হয়) (পাপ থেকে) মুক্ত হয় (বা নাজাত/মুক্তি লাভ করে)। আর এ লোকগুলো খুশী হয় যে, কিছু সময় ব্যয় করার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন প্রকার খাবার-দাবার পায় এবং তাদের পকেটও ভর্তি হয়। কিন্তু হানাফী ফিকাহবিদগণ পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, "যে ব্যক্তি মজুরীর বিনিময়ে কুরআন খতম করে, সে (নিজেই) কোনো সওয়াব লাভ করবে না, তাহলে কিভাবে সে তা (সওয়াব) মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছাবে (যার জন্য খতম পড়া হচ্ছে)?”
আল্লামা আইনী বলেন: “যে এভাবে কুরআন খতমের জন্য অর্থ/ মজুরী গ্রহণ করে এবং যে দেয়, তারা উভয়ে পাপী। এভাবে এটি জায়েয নয়।”
এটি করা কোনো মাযহাবেই জায়েয নয়। এ আমলের জন্য কোনোই সওয়াব নেই। "
ইমাম শাফিঈ উল্লেখ করেছেন: “অর্থের বিনিময়ে কুরআন পাঠ এবং মৃতব্যক্তিকে এর সওয়াব প্রদান কারো থেকেই প্রমাণিত নয়। যখন কেউ অর্থের বিনিময়ে তেলাওয়াত করে, তখন সে নিজেই এর সওয়াব পায় না। সুতরাং মৃত ব্যক্তিকে সে কিভাবে তা দান করবে?” আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَشْتَرُوا بِنَايَتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَإِيَّيَ فَاتَّقُونِ
“সামান্য অর্থের বিনিময়ে আমার আয়াতকে বিক্রি করো না।” (সূরা আল বাকারা ২: ৪১) মুফাসসিরগণ বলেন: "এর অর্থ এর জন্য বিনিময়ে কোনো অর্থ-কড়ি গ্রহণ করোনা।"
"শরহে আকীদা আত তাহাবীয়্যাহ"-তে উল্লেখ করা হয়েছে: "সালফে সালেহীনদের কারো থেকেই এটা প্রমাণিত নয় যে, কিছু লোক অর্থের বিনিময়ে কুরআন খতম করবে এবং তারপর এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করা (পৌঁছানো) হবে; এ ভাবে মৃত ব্যক্তির নিকট কোনো সওয়াব পৌঁছে না। এটা হলো তেমনই যেমন কোনো ব্যক্তি কাউকে নফল সালাত পড়ার জন্য টাকা দেয় এবং সে এর সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তিকে দান করে। এর মধ্যে কোনো ফায়দা নেই। যদি কোনো ব্যক্তি ওয়াসীয়াত করে যায় যে, তার সম্পদের একটি অংশ সেসব মজুরী হিসেবে দান করতে হবে যারা তাদের কুরআন তিলাওয়াতের (খতমের) সওয়াব তাকে প্রদান করবে, তবে সেই ওয়াসীয়াত বাতিল। "
টিকাঃ
[৩৮৭] শারহুদ দিরায়াহ, মাহমুদ বিন আহমাদ আল হানাফী।
[৩৮৮] আল বিদায়া শরহে হিদায়া, ৩য় খণ্ড, পৃ-২৫৫।
[৩৮৯] মাজমুআ' রাসাইল, ইবনু আবেদীন শামী, পৃ-১৭৩-১৭৪।
[৩৯০] প্রাগুক্ত, পৃ-১৭৫।
[৩৯১] শরহে আকীদা আত তাহাবী, আবিল ইয্য হানাফী, পৃ-৫১৭।
📄 ১৭. কবর যিয়ারত ও বরকত হাসিল (তাবাররুকাত) করা
যেকোনোভাবে ব্যক্তিগত আশা-আকাংখা পূরণের সাথে এই বিদআতটির সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু দীন ও শরীয়াতের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বেরেলভীগণ অর্থ-সম্পদ কামানোর উপায় হিসেবে "তাবাররুকাত” (বরকত হাসিল) -এর একটি বিদআত চালু করেছে যেন জুব্বা ও পাগড়ী প্রদর্শনীর মাধ্যমে পার্থিব সম্পদ আহরণ করা যায়।
📄 ১৮. নবী রাসূল ও ওলীদের কবর থেকে বরকত হাসিল করা
বেরেলভী আহমাদ রেযা বলে: "আউলিয়াগণের তাবাররুকাত আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্যতম। সেগুলোকে সম্মান করা ওয়াজিব। "
আবার, "যে ব্যক্তি কল্যাণকর তাবাররুকাত প্রত্যাখ্যান/ অস্বীকার করে তবে সে ব্যক্তি কুরআন ও হাদীস প্রত্যাখ্যানকারী/ অস্বীকারকারী এবং সে গণ্ড-মুর্খ, বোধশক্তি রহিত, পথভ্রষ্ট এবং পাপী। "
এবং "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সম্মান করারই একটি অংশ হলো সেসকল বস্তুর মর্যাদা/সম্মান করা যা তাঁর বলে জানা যায়। "
সুতরাং যেকোনো বস্তুকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর প্রতি সম্বন্ধিত করা যেতে পারে এবং তখন এর যিয়ারত এবং (এর নামে) দান-সদকা ভিক্ষা ও নযর-নিয়ায সংগ্রহ করা যেতে পারে। সে তাবাররুকের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি-না তা যাচাই করার কোনো প্রয়োজন নেই! জনাব বেরেলভী ব্যাখ্যা করেছেন: "এর জন্য সনদের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি কোনো জিনিস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বলে বরণ করা হয়, তবে তার অতি ভক্তি করা দীনের নিদর্শনের অন্যতম।"
সম্মান ও তাজিম প্রদর্শনের পদ্ধতি কী হবে? জনাব আহমাদ রেযা বলে: "হাত দ্বারা (এর উপর) মোছা এবং দরজা, দেয়াল এবং 'তাবাররুকাত' চুম্বন করা, এমনকি যদিও এ সকল কাঠামোসমূহ সেই মুবারক সময়ে বর্তমান ছিল না, (তবুও) ........ এবং এর প্রমাণ? একজন মাজনুন (পাগল) ........ কোনো এক ব্যক্তির কী চমৎকার উক্তি
(কবিতা)
'আমি লায়লার শহরের চারপাশে ঘুরে বেড়াই এবং কখনো এ দেয়ালে চুমা খাই, কখনো সে দেয়ালে চুমা খাই।'
আর তা শহরের প্রতি প্রেমের জন্য নয়, বরং তা শহরের অধিবাসী (প্রেমিকা)-এর জন্য। "
এছাড়া, (তাদের মতে) "সৎকর্মশীল বান্দাদের কবর যিয়ারতের সময় (মাজারের) দরজার চৌকাঠে চুম্বন করাও জায়েয।”
টিকাঃ
[৩৯৩] মুকাদ্দিমা রিসালাহ বদরুল আনোয়ার ফী মাজমু'আ রাসাইল, আলা হযরত, ২য় খণ্ড, পৃ-৫১৭।
[৩৯৪] বদরুল আনোয়ার, আহমাদ রেযা, পৃ-৪৩।
[৩৯৫] প্রাগুক্ত, পৃ-২১।
[৩৯৬] প্রাগুক্ত, ৪র্থ অধ্যায়, পৃ-৪৩।
[৩৯৭] রিসাল ইবরুল মাকান ফী মাজমু'আ রাসাইল, ২য় খণ্ড, পৃ-১৪১।
[৩৯৮] প্রাগুক্ত, পৃ-১৫৯।
📄 ১৯. ছবি ও মূর্তির মাধ্যমে বরকত হাসিল করা
বেরেলভীদের নিকট মদীনায় (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কবরে) ও নেককার লোকদের কবরে চুম্বন করা ছাড়াও কবরের চিত্র এবং গম্বুজের চিত্রে চুমু খাওয়াও জরুরী। বেরেলভী সাহেব বলে: "দীনের আলিমগণ কাগজের উপর সাইয়্যেদুল বাশার (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর পবিত্র পদযুগল এর চিত্র অংকন করা, সেগুলো চুম্বন করা, সেগুলো চোখে বুলানো এবং সেগুলো মাথায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।”
এবং "দীনের আলিমগণ এসকল ছবির মাধ্যমে রোগমুক্তি ও প্রয়োজন পূরণের জন্য ওয়াসীলা (মধ্যস্থতা) কামনা করেন।”
বেরেলভী আহমাদ রেযা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর পা-এর কাল্পনিক ছবির ফায়দা ব্যাখ্যা করেছে এবং লিখেছে: “যে ব্যক্তির নিকট এ মুবারক চিত্র রয়েছে সে জালিম ও হিংসুক হতে নিরাপদে থাকবে, প্রসব বেদনায় নারীর ডানহাতে এটি রাখবে, তাহলে সহজে প্রসবের কাজ সম্পন্ন হবে এবং তার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কবরের যিয়ারত নসীব হতে পারে। যে সকল সেনাদল এটি রাখবে, তারা পলায়ন করবে না; যে কাফেলা এটি সাথে রাখবে, তাতে লুটতরাজ হবে না; যে জাহাজ এটি সাথে রাখবে, তা ডুববে না; এটি যে সম্পদের সাথে রাখা হবে, তা চুরি হবে না। যেকোনো প্রয়োজনে এর মাধ্যমে ওসীলা (দিয়ে দুআর করার) কামনা করা হলে তা দেয়া হবে এবং যেকোনো আশায় এটিকে সাথে রাখা হলে তা পূরণ হবে। "
এ কুসংস্কার ও জাহিলিয়্যাতের কুসংস্কারের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরনের সকল প্রকার কুসংস্কারের অবসান ঘটিয়েছেন, আর এসকল লোকেরা সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করছে। খাঁন সাহেব বর্ণনা করেছে: "যদি সম্ভব হয়, তবে সেই ময়লা চুম্বন করবে যা মুবারক পায়ের প্রভাবে আর্দ্র হয়ে গিয়েছে, অথবা এর (অংকিত) চিত্র কে চুম্বন করবে। "
আবার "এ চিত্র অংকনের ফায়দার মধ্যে অন্যতম হলো যদি কোনো ব্যক্তির (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর) প্রকৃত কবর যিয়ারত করার সৌভাগ্য না হয়, তবে সে এটি চুম্বন করতে পারবে এবং এটি সাদৃশ্যের দিক দিয়ে প্রকৃত যিয়ারতের সমান হবে। "
এবং “নূর জগতসমূহের মালিক হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - এর মুবারক কবরের চিত্র অংকন দীনী বিষয়কে সম্মান প্রদর্শন করার অন্তর্ভুক্ত। শরীয়াতের দৃষ্টিতে এর সম্মান করা ও ভক্তি করা সহীহ ঈমানের ঈমানী দাবিসমূহের অন্যতম। "
সে চিত্রসমূহের যিয়ারতের আদব সম্পর্কে লিখেছে: “সেগুলো যিয়ারত করার সময় সে (যিয়ারতকারী) মনে মনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর ছবি কল্পনা করবে (তাসাওরে রাসূল) এবং দরূদ পড়া বাড়িয়ে দিবে।"
অন্যত্র সে লিখেছে: “যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর পায়ের (নালাইন শরীফ বা জুতার) চিত্রের উপর (হাত বুলিয়ে) মুছে দেয়, বিচার দিবসে তার জন্য অতিরিক্ত সওয়াব রয়েছে এবং প্রকৃতই সে এ জগতে পরম সুখ, গৌরব, সম্মান ও আনন্দ লাভ করবে। বিচার দিবসের সফলতা লাভের উদ্দেশ্য নিয়ে এটা চুম্বন করবে। যে এর সাথে তার চেহারা (মুখমণ্ডল) ঘষাঘষি করবে, সে অনেক অভূতপূর্ব অনুগ্রহ লাভ করবে।”
এখন আপনি চিন্তা করুন, বেরেলভীদের এ সকল কর্ম ও মূর্তিপূজারীদের কর্মে মাঝে আর কী পার্থক্য অবশিষ্ট রইল?
তারা তাদের নিজেদের হাত দিয়ে চিত্র অংকন করে এবং তারপর তাদের মনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারার ধ্যান করে (তাসাওরে রাসূল) এবং অতঃপর এতে চুম্বন করে, তাদের চোখের উপর রাখে এবং তাদের চেহারায় মোছে এবং সওয়াব ও অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে।
একদিকে তাদের অংকিত ও খোদাই করা চিত্রের প্রতি এমন ভক্তি ও সম্মান রয়েছে, আবার অন্যদিকে তারা আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদার প্রতি অত্যন্ত উদ্ধত ও অশিষ্ট এবং তারা বলে: “খোদাইকৃত মুবারক জুতার চিত্রের উপর 'বিসমিল্লাহ' লেখায় কোনো অসুবিধা নেই।”
টিকাঃ
[৩৯৯] আবরুল মাকাম ফী কিবলাতুল জালাল, বেরেলভী, পৃ-১৪৩।
[৪০০] বদরুল আনোয়ার ফী আদবুল আসার, পৃ-৩৯।
[৪০১] প্রাগুক্ত, পৃ-৪০।
[৪০২] আবরুল মাকান, বেরেলভী, পৃ-১৪৭।
[৪০৩] প্রাগুক্ত, পৃ-১৪৭।
[৪০৪] বদরুল আনোয়ার, পৃ-৫৩।
[৪০৫] প্রাগুক্ত, পৃ-৫৪।
[৪০৬] মাজমুআহ রাসাইল, আহমাদ রেযা, পৃ-১৪৪।
[৪০৭] প্রাগুক্ত, পৃ-৩০৪।