📄 ১৫. খাদ্যের বিষয়
মৃতের ওয়ারিশদের নিকট হতে মৃত্যুর তৃতীয় দিনে, সপ্তম দিনে, ১০ম দিনে ও অন্যান্য দিন উপলক্ষ্যে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করা বিদআত। কারণ তা ইসলামের সুদীর্ঘ সোনালী যুগের কারো থেকে প্রমাণিত নয়। না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে এসবের কোনো দলীল প্রমাণ আছে, আর না সাহাবীদের থেকে, আর না তাবেঈ ইমাম, মুহাদ্দিস ও ফকীহদের কারো থেকে। নিশ্চয় এটা হারাম ও নিষিদ্ধ হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে, যদিও তারা দাবি করে তারা হানাফী। আসলে এসকল লোকেরা হানাফী নয়, কারণ তাদের দাবি মিথ্যা, তারা হানাফী ফিকহের অনুসরণ তারা করে না, তাদের নিজস্ব ফিকাহ রয়েছে তারা যার অনুসরণ করে। মূলত তারা হানাফী মাযহাব হতে বের হয়ে গেছে। অথচ মুকাল্লিদ কখনো ইমামের কথার বিরোধীতা করে না এবং মাযহাব থেকেও বের হয় না। এসব বিষয়ে হানাফী ফকীহদের মতামত হলো: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ইসলাম নিয়ে এসেছেন তাতে এগুলো নেই, বরং তা এসেছে অগ্নিপূজক, খ্রিষ্টান ও হিন্দুদের নিকট থেকে।
হানাফী ফিকহের ইমাম মোল্লা আলী কারী আল হানাফী বলেন, "আমাদের মাযহাবের আলেমগণের মাঝে ইজমা (ঐক্যমত) হয়েছে যে, ৩য়া বা ৭মী (পালন/উদযাপন) জায়েয নয়। "
ইবনু বায্যায আল হানাফী বলেন: “৩য়া এবং ৭মী ইত্যাদি (পালন) মাকরূহ। অনুরূপ কল্যাণ (সওয়াব) লাভের উদ্দেশ্যে খাওয়া-দাওয়ার জন্য কোনো দিন নির্ধারণ করা এবং খতম দেওয়া (বা দেওয়ানো উভয়ই) মাকরূহ। "
কিন্তু বেরেলভীগণ কোনো লোকের মৃত্যুর পর তার কবরে 'কুল (খানী)' এবং এছাড়াও অন্যান্য বিষয়গুলো উদ্যাপন করা বাধ্যতামূলক মনে করে এবং সওয়াবের জন্য নিজেদের খানা-পিনার আয়োজন করে।
১১শী (যাকে তারা 'এগারো শরীফ' বলে) সম্পর্কে বেরেলভীদের আকীদা হলো: "যদি ১১শ দিনে নির্দিষ্ট অংকের (অর্থ) দ্বারা ফাতিহা অনুষ্ঠান কায়েম করা হয়, তবে বাড়িতে বরকত নাযিল হবে।" 'ইয়াযিদা মাজালিস' বইতে লেখা হয়েছে যে, “হযরত গাওস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - এর দ্বাদশ দিবসের অর্থাৎ মিলাদের (জন্মের) ১২শ দিবসের নিয়মিত উদযাপনকারী ছিলেন। একদিন মালিক স্বপ্নে তাকে বলেন: হে আব্দুল কাদির! তুমি ১২শ দিবসে আমাকে স্মরণ করেছো, আমি তোমাকে একাদশী (১১ শরীফ) দিলাম। অর্থাৎ লোকজন তোমাকে একাদশী বা ১১ শরীফে তোমাকে স্মরন করবে। এ হলো মালিকের দান হতে একটি দান/অনুগ্রহ।
এ হলো একাদশী (তাদের ১১ শরীফ) এবং 'ইয়াযিদাহ মাজালিস' হতে তার 'কীর্তিমান' দলীল। কে জানে, অনুগ্রহ লাভের জন্য কতগুলো দিন তারা নির্ধারণ করেছে! বেরেলভীদের মাঝে বৃহস্পতিবারের (হালুয়া) রুটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত, কারণ "বৃহস্পতিবারে নেককারগণের রূহ তাদের বাড়িতে ফিরে আসে এবং দরজায় দাঁড়ায় এবং করুণ আর্তনাদের সাথে কান্নাকাটি করে (বলে): হে আমার আহলে বাইত (পরিবার-পরিজন)! হে আমার প্রিয়জন! দান-সদকার মাধ্যমে আমার প্রতি অনুগ্রহ কর।' তাই বৃহস্পতিবারের মৃতদের রূহ তার বাড়িতে আসে এবং দেখে তার পক্ষ হতে দান-সদকা করা হচ্ছে কি-না।"
শুধু বৃহস্পতিবারেই রূহগুলো আসে এবং দান-সদকা করার জন্য বলে, তা-ই নয়, বরং "রূহসমূহ ঈদের দিনে, মহিমান্বিত জুমার দিনে, আশুরার দিনে এবং (শবে) বারাআতের রাতেও আসে এবং দান-সদকা কামনা করে।"
টিকাঃ
[৩৮০] মিরকাত শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ, ৫ম খণ্ড, পৃ.-৪৮৬।
[৩৮১] কিছু ভাড়াটে দিয়ে কুরআন পাঠ (ও মৃত ব্যক্তির উপর তার সওয়াব পৌঁছানো)।
[৩৮২] ফতোয়া বায্যাযিয়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৮১।
[৩৮৩] মালিক: লেখক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বুঝিয়েছে।
[৩৮৪] জা আল-হাক্ব, ১ম খণ্ড, পৃ-২৭০।
[৩৮৫] রিসালাহ ইতিয়্যান আল আরওয়াহ দার মাজমু'আহ, ২য় খণ্ড, পৃ-২৯; জা আল-হাক্ব, ১ম খণ্ড, পৃ-২৬২।
[৩৮৬] রিসালাহ ইতিয়্যান আল আরওয়াহ দার মাজমু'আহ, পৃ-৭০।
📄 ১৬. কুরআন পাঠের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা
তাই তারা সবাই একসাথে কোনো ধনী-সম্পদশালীর বাড়িতে জমায়েত হয়, কুরআন খতম করে এবং এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করে (পৌঁছায়)। ধনী লোকটি খুশী হয় যে, কিছু টাকা-পয়সা ব্যয় করে মৃত ব্যক্তি (যার জন্য এ আয়োজন করা হয়) (পাপ থেকে) মুক্ত হয় (বা নাজাত/মুক্তি লাভ করে)। আর এ লোকগুলো খুশী হয় যে, কিছু সময় ব্যয় করার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন প্রকার খাবার-দাবার পায় এবং তাদের পকেটও ভর্তি হয়। কিন্তু হানাফী ফিকাহবিদগণ পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, "যে ব্যক্তি মজুরীর বিনিময়ে কুরআন খতম করে, সে (নিজেই) কোনো সওয়াব লাভ করবে না, তাহলে কিভাবে সে তা (সওয়াব) মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছাবে (যার জন্য খতম পড়া হচ্ছে)?”
আল্লামা আইনী বলেন: “যে এভাবে কুরআন খতমের জন্য অর্থ/ মজুরী গ্রহণ করে এবং যে দেয়, তারা উভয়ে পাপী। এভাবে এটি জায়েয নয়।”
এটি করা কোনো মাযহাবেই জায়েয নয়। এ আমলের জন্য কোনোই সওয়াব নেই। "
ইমাম শাফিঈ উল্লেখ করেছেন: “অর্থের বিনিময়ে কুরআন পাঠ এবং মৃতব্যক্তিকে এর সওয়াব প্রদান কারো থেকেই প্রমাণিত নয়। যখন কেউ অর্থের বিনিময়ে তেলাওয়াত করে, তখন সে নিজেই এর সওয়াব পায় না। সুতরাং মৃত ব্যক্তিকে সে কিভাবে তা দান করবে?” আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَشْتَرُوا بِنَايَتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَإِيَّيَ فَاتَّقُونِ
“সামান্য অর্থের বিনিময়ে আমার আয়াতকে বিক্রি করো না।” (সূরা আল বাকারা ২: ৪১) মুফাসসিরগণ বলেন: "এর অর্থ এর জন্য বিনিময়ে কোনো অর্থ-কড়ি গ্রহণ করোনা।"
"শরহে আকীদা আত তাহাবীয়্যাহ"-তে উল্লেখ করা হয়েছে: "সালফে সালেহীনদের কারো থেকেই এটা প্রমাণিত নয় যে, কিছু লোক অর্থের বিনিময়ে কুরআন খতম করবে এবং তারপর এর সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করা (পৌঁছানো) হবে; এ ভাবে মৃত ব্যক্তির নিকট কোনো সওয়াব পৌঁছে না। এটা হলো তেমনই যেমন কোনো ব্যক্তি কাউকে নফল সালাত পড়ার জন্য টাকা দেয় এবং সে এর সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তিকে দান করে। এর মধ্যে কোনো ফায়দা নেই। যদি কোনো ব্যক্তি ওয়াসীয়াত করে যায় যে, তার সম্পদের একটি অংশ সেসব মজুরী হিসেবে দান করতে হবে যারা তাদের কুরআন তিলাওয়াতের (খতমের) সওয়াব তাকে প্রদান করবে, তবে সেই ওয়াসীয়াত বাতিল। "
টিকাঃ
[৩৮৭] শারহুদ দিরায়াহ, মাহমুদ বিন আহমাদ আল হানাফী।
[৩৮৮] আল বিদায়া শরহে হিদায়া, ৩য় খণ্ড, পৃ-২৫৫।
[৩৮৯] মাজমুআ' রাসাইল, ইবনু আবেদীন শামী, পৃ-১৭৩-১৭৪।
[৩৯০] প্রাগুক্ত, পৃ-১৭৫।
[৩৯১] শরহে আকীদা আত তাহাবী, আবিল ইয্য হানাফী, পৃ-৫১৭।
📄 ১৭. কবর যিয়ারত ও বরকত হাসিল (তাবাররুকাত) করা
যেকোনোভাবে ব্যক্তিগত আশা-আকাংখা পূরণের সাথে এই বিদআতটির সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু দীন ও শরীয়াতের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বেরেলভীগণ অর্থ-সম্পদ কামানোর উপায় হিসেবে "তাবাররুকাত” (বরকত হাসিল) -এর একটি বিদআত চালু করেছে যেন জুব্বা ও পাগড়ী প্রদর্শনীর মাধ্যমে পার্থিব সম্পদ আহরণ করা যায়।
📄 ১৮. নবী রাসূল ও ওলীদের কবর থেকে বরকত হাসিল করা
বেরেলভী আহমাদ রেযা বলে: "আউলিয়াগণের তাবাররুকাত আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্যতম। সেগুলোকে সম্মান করা ওয়াজিব। "
আবার, "যে ব্যক্তি কল্যাণকর তাবাররুকাত প্রত্যাখ্যান/ অস্বীকার করে তবে সে ব্যক্তি কুরআন ও হাদীস প্রত্যাখ্যানকারী/ অস্বীকারকারী এবং সে গণ্ড-মুর্খ, বোধশক্তি রহিত, পথভ্রষ্ট এবং পাপী। "
এবং "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সম্মান করারই একটি অংশ হলো সেসকল বস্তুর মর্যাদা/সম্মান করা যা তাঁর বলে জানা যায়। "
সুতরাং যেকোনো বস্তুকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর প্রতি সম্বন্ধিত করা যেতে পারে এবং তখন এর যিয়ারত এবং (এর নামে) দান-সদকা ভিক্ষা ও নযর-নিয়ায সংগ্রহ করা যেতে পারে। সে তাবাররুকের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি-না তা যাচাই করার কোনো প্রয়োজন নেই! জনাব বেরেলভী ব্যাখ্যা করেছেন: "এর জন্য সনদের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি কোনো জিনিস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বলে বরণ করা হয়, তবে তার অতি ভক্তি করা দীনের নিদর্শনের অন্যতম।"
সম্মান ও তাজিম প্রদর্শনের পদ্ধতি কী হবে? জনাব আহমাদ রেযা বলে: "হাত দ্বারা (এর উপর) মোছা এবং দরজা, দেয়াল এবং 'তাবাররুকাত' চুম্বন করা, এমনকি যদিও এ সকল কাঠামোসমূহ সেই মুবারক সময়ে বর্তমান ছিল না, (তবুও) ........ এবং এর প্রমাণ? একজন মাজনুন (পাগল) ........ কোনো এক ব্যক্তির কী চমৎকার উক্তি
(কবিতা)
'আমি লায়লার শহরের চারপাশে ঘুরে বেড়াই এবং কখনো এ দেয়ালে চুমা খাই, কখনো সে দেয়ালে চুমা খাই।'
আর তা শহরের প্রতি প্রেমের জন্য নয়, বরং তা শহরের অধিবাসী (প্রেমিকা)-এর জন্য। "
এছাড়া, (তাদের মতে) "সৎকর্মশীল বান্দাদের কবর যিয়ারতের সময় (মাজারের) দরজার চৌকাঠে চুম্বন করাও জায়েয।”
টিকাঃ
[৩৯৩] মুকাদ্দিমা রিসালাহ বদরুল আনোয়ার ফী মাজমু'আ রাসাইল, আলা হযরত, ২য় খণ্ড, পৃ-৫১৭।
[৩৯৪] বদরুল আনোয়ার, আহমাদ রেযা, পৃ-৪৩।
[৩৯৫] প্রাগুক্ত, পৃ-২১।
[৩৯৬] প্রাগুক্ত, ৪র্থ অধ্যায়, পৃ-৪৩।
[৩৯৭] রিসাল ইবরুল মাকান ফী মাজমু'আ রাসাইল, ২য় খণ্ড, পৃ-১৪১।
[৩৯৮] প্রাগুক্ত, পৃ-১৫৯।