📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৩. কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে হানাফী ফকীহদের মত

📄 ৩. কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে হানাফী ফকীহদের মত


৩. কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে হানাফী ফকীহদের মত হানাফী মাযহাবের ইমামগণ কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে যা বলেছেন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আল হাসান আশ শাইবানী ইমাম আবু হানীফা হতে বর্ণনা করেছেন, আবু হানীফার নিকট তার শায়খ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন: নিশ্চয় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, “কবরকে পাকা করতে নিষেধ করেছেন।”

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আল হাসান আশ শাইবানীকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কবরকে পাকা করা না-জায়েয (নিষিদ্ধ) কি-না। তিনি 'হ্যাঁ' সূচক জবাব দিয়েছিলেন।”

ইমাম সারাখসী তার আল-মাবসুত কিতাবে বলেন: "কবরের নিজস্ব মাটি ছাড়া বাড়তি কিছু (মাটি, সিমেন্ট, পাথর) দ্বারা কবর মজবুত করোনা, কারণ এর নিষেধাজ্ঞা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে প্রমাণিত।"

কাজী খাঁন তাঁর “ফতোয়া”-তে বলেন: “কবরসমূহকে মজবুত করা উচিত নয় এবং এগুলোর উপর গম্বুজ বা কোনো ভবন নির্মাণ করা উচিত নয় কারণ আবু হানীফা হতে এর নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে।”

ইমাম কাসানী বলেন: “কবরসমূহকে মজবুত করা নিন্দনীয় এবং ইমাম আবু হানীফা কবরসমূহের উপর গম্বুজ বা অনুরূপ কোনো সৌধ নির্মাণ করাকে নিন্দনীয় (মাকরূহ) মনে করতেন। এতে সম্পদের অপচয় রয়েছে। কিন্তু কবরের উপর পানি ছিটানোয় কোনো দোষ নেই; কিন্তু আবু ইউসুফ হতে কবরের উপর পানি ছিটানোও মাকরূহ বর্ণিত হয়েছে। কারণ এর কারণে কবর মজবুত হয়।”

অনুরূপ কথাই বর্ণিত আছে হানাফী ফিকহের সর্বজন মান্য কিতাবসমূহে। যেমন- বাহরুর রায়েক (২য় খণ্ড, পৃ-২০৯), বাদায়ে' ওয়াস সানায়ে' (১ম খণ্ড, পৃ-৩২০), ফতহুল কাদীর (১ম খণ্ড, পৃ-৪৭২), রদ্দুল মুহতার আলা দুররুল মুখতার, (১ম খণ্ড, পৃ-২০১), ফতোয়া হিন্দিয়া (১ম খণ্ড, পৃ-১২২) ও ফতোয়া বাযযাযিয়া (৪র্থ খণ্ড, পৃ-৮১) ও কানযুদ দাকায়েক (পৃ-৫০) এবং অন্যান্য।

কাজী ইবরাহীম হানাফী বলেন: যে সকল গম্বুজ কবরের উপর নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো সমান করে দেওয়া ওয়াজিব। কারণ তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতা এবং অবাধ্যতা করে সেগুলো নির্মাণ করেছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবাধ্যতা করে যে সকল নির্মাণ কার্য সম্পাদন করা হয়েছে, তা সমান করে (মাটির সাথে মিশিয়ে) দেয়া 'মসজিদে যিরার' সমান করে দেওয়ার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "ইহুদী ও খৃষ্টানদের প্রতি লা'নত, তারা তাদের নবীগণের কবরকে মসজিদ (সিজদার স্থান) বানিয়েছে।" (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হা/৪৩৫-৪৩৬; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ, হা/৫৩১; সুনানে নাসাঈ, হা/২০৫১)।

এ হলো কুরআন সুন্নাহর এবং হানাফী ফিকহের পরিষ্কার বক্তব্য। কিন্তু বেরেলভীগণ জোরেশোরে প্রচার করে যে, কবর বাঁধাই করা এবং এর উপর গম্বুজ/সৌধ নির্মাণ করা জরুরী।

জনাব আহমাদ রেযা খান বেরেলভী বলে: "গম্বুজ নির্মাণ এবং অনুরূপ অবকাঠামো নির্মাণ জরুরী যেন সাধারণ কবরসমূহ হতে মুবারক কবরসমূহকে আলাদা করা যায় এবং লোকেরা সেগুলোর প্রতি সম্মান-মর্যাদা দেয় এবং তাজিম করে। "

টিকাঃ
[৩২৯] কিতাবুল আসার, ইমাম মুহাম্মদ।
[৩৩০] কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মদ, ১ম খণ্ড, পৃ-৪২২।
[৩৩১] আল মাবসুত, ইমাম সারাখসী, ২য় খণ্ড, পৃ-২৬।
[৩৩২] ফতোয়া কাজী খাঁন, ১ম খণ্ড, পৃ-১৯৪।
[৩৩৩] বাদায়ে' ওয়াস সানায়ে', আল্লামা কাসানী, ১ম খণ্ড, পৃ-৩২০।
[৩৩৪] মাজালিসুল আবরার, কাজী ইবরাহীম, পৃ-১২৯।
[৩৩৫] আহকামে শরীয়াত, আল-বেরেলভী, ১ম খণ্ড, পৃ-৭১।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৪. কবরকে কাপড় ও পাগড়ী দিয়ে ঢেকে দেওয়া

📄 ৪. কবরকে কাপড় ও পাগড়ী দিয়ে ঢেকে দেওয়া


৪. কবরকে কাপড় ও পাগড়ী দিয়ে ঢেকে দেওয়া: "যদি লোকেরা একটি কবরের উপর কাপড় দেখে, তবে তাদের মনে করা উচিত এটি কোনো ওলীর কবর এবং একে ঘৃণা করা হতে লোকদের বিরত থাকা উচিত যেন অমনোযোগী কবর যিয়ারতকারীর মনে বিনয় ও সম্মান মর্যাদা জাগ্রত হয় এবং আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি, যে, আউলিয়াগণের রূহ মুবারক তাদের কবরসমূহের নিকট উপস্থিত থাকে। অতএব এটি জায়েয প্রথা এবং এ থেকে নিষেধ করা উচিত নয়। "

সে আরও লিখেছে: “কবরের সম্মানের উদ্দেশ্যে বাতি জ্বালানো জায়েয যদি সেটি কোনো ওলী বা আলিমের কবর হয়, যাতে তার রুহকে সম্মান করা যায় যা পৃথিবীর ধুলিকণাকে সুর্য্যের আলোর মাধ্যমে আলোকিত করে যেন লোকেরা জানতে পারে এটি কোনো নেককার লোকের কবর যাতে তারা এ থেকে উপকার লাভ করতে পারে। "

টিকাঃ
[৩৩৬] আহকামে শরীয়াত, আল-বেরেলভী, ১ম খণ্ড, পৃ-৭১-৭২।
[৩৩৭] বারিক আল মানার বিশুমুউল মাজার, ফতোয়া রিযভীয়‍্যাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-১৪৪-১৪৫।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৫. কবরে মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালানো

📄 ৫. কবরে মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালানো


৫. কবরে মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালানো: অপর বেরেলভী আলিম লিখেছে: "যদি কোথাও একজন ওলীর কবর থাকে, তবে তার রূহের সম্মানের জন্য এবং এ কবর যে একজন ওলীর তা ঘোষণা করার জন্য এর নিকট বাতি জ্বালানো জায়েয যাতে লোকেরা এর ফায়েয থেকে উপকৃত হতে পারে।”

এ হলো বেরেলভী আকাবীরগণের ফতোয়া। কিন্তু হাদীসে এর পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লানত করেছেন সেই সকল নারীদেরকে যারা কবর যিয়ারত করে এবং সেই সকল লোকদেরকে যারা কবরসমূহের উপর (গম্বুজ) নির্মাণ করে এবং তাদেরকে যারা কবরের উপর বাতি/মোমবাতি জ্বালায়।” [যঈফ: আবু দাউদ, হা/৩২৩৬; নাসাঈ, হা/২০৪৩; তিরমিযী, হা/৩২০।]

টিকাঃ
[৩৩৮] জা আল-হাক্ব, আহমদ ইয়ার গুজরাটী, পৃ-৩০০।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৬. হানাফী ফিকহের শিক্ষা

📄 ৬. হানাফী ফিকহের শিক্ষা


৬. হানাফী ফিকহের শিক্ষা: মোল্লা আলী কারী হানাফী লিখেছেন: "কবরের উপর বাতি জ্বালানোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে কারণ তা সম্পদের অপচয় এবং কারণ এতে জাহান্নামের আগুনের নিদর্শন (চিহ্ন) রয়েছে এবং এতে রয়েছে কবরকে সম্মান প্রদর্শন।"

কাজী ইবরাহীম কবর পূজারীদের ভিত্তি উল্লেখ করে বলেন: "আজকাল কিছু পথভ্রষ্ট লোকেরা (বেরেলভী ও তার অনুসারী অন্যান্য সুফীরা) কবরে হাজ্জ সম্পাদন করতে শুরু করেছে এবং এর জন্য বিধি-বিধান প্রনয়ণ করেছে। সেই সকল বিষয় যা দীন ও শরীয়াতের বিরুদ্ধে যায়, এদের মধ্যে রয়েছে যেমন- লোকেরা তাদের অসহায়ত্ব ও দীনতা কবরের নিকট প্রকাশ করে এবং তার উপর বাতি জ্বালায়, কবরে চাদর চড়ায়, প্রহরী নিয়োগ করে, সেগুলো চুম্বন করে এবং তাদের নিকট জীবিকা ও সন্তান চায়... এসকল বিষয়ের কোনোটিই আলিমগণের ইজমা অনুসারে জায়েয নয়।"

আহমাদ ইয়ার নিজেও “ফতোয়া আলমগীরী” হতে উদ্ধৃত করেছে: "কবরের উপর বাতি জ্বালানো একটি বিদআত। এটি ভিত্তিহীন।”

অনুরূপভাবে "ফতোয়া বায্যাযিয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে: “কবরস্থানে বাতি নিয়ে যাওয়া বিদআত। এর কোনো ভিত্তি নেই। "

ইবনু আবিদীন শামী বলেন, "কবরে তেল বা বাতি দেওয়ার নযর মানত করা বাতিল। "

আল্লামা হাসকাফী আল হানাফী বলেন: "নযর নিয়ায এবং মানত হিসেবে কবরসমূহের নিকট সাধারণ লোকেরা যা নিয়ে যায় তা নগদ অর্থ হোক কিংবা তেল হোক, এর উপর ফতোয়া হলো, তা বাতিল এবং নিষিদ্ধ। "

ফতোয়া আলমগীরী' তে উল্লেখ করা হয়েছে: "কবরকে আলোকিত করা হলো জাহেলী প্রথার অন্তর্ভুক্ত। "

আল্লামা আলুসী আল-হানাফী বলেন: “কবরসমূহ হতে বাতি এবং মোমবাতি অপসারণ করা ওয়াজিব। এ ধরনের কোনো নযর মানত জায়েয নয়। "

অনুরূপভাবে, “চাদর বা অনুরূপ কিছু দিয়ে কবর ঢেকে দেয়া সঠিক নয়। "

আবার, “এসবই বাতিল। এ থেকে দূরে থাকা উচিত।”

আরো শুনুন, "বাতি জ্বালানো এবং চাদর চড়ানো হারাম।”

আলী (রাঃ) সম্পর্কে হানাফী আলিমগণ বলেন: “যখনই তিনি কোনো কবর অতিক্রম করতেন যা চাদর বা অনুরূপ কোনোকিছু দ্বারা আবৃত/ ঢাকা থাকতো, তিনি তা থেকে নিষেধ করতেন।”

টিকাঃ
[৩৩৯] মিরকাত, মোল্লা আলী কারী, ১ম খণ্ড, পৃ-৪৭০।
[৩৪০] মাজালিসুল আবরার, কাজী ইবরাহীম, পৃ-১১৮।
[৩৪১] জা আল-হাক্ক, পৃ-৩০২।
[৩৪২] রদ্দুল মুহতার, ইবনু আবিদীন শামী, ২য় খণ্ড, পৃ-১৩৯।
[৩৪৩] দুররে মুখতার, হাসকাফী, ২য় খণ্ড, পৃ-১৩৯
[৩৪৪] ফতোয়া আলমগীরী, ১ম খণ্ড, পৃ-১৭৮।
[৩৪৫] রূহুল মা'আনী, ১৫ খণ্ড, পৃ-২১৯।
[৩৪৬] ফতোয়া মাতালিব আল মু'মিনীন।
[৩৪৭] ফতোয়া আজিজিয়্যাহ, পৃ-৯।
[৩৪৮] ফতোয়া শাহ রফীউদ্দীন, পৃ-১৪।
[৩৪৯] মাতালিব আল মু'মিনীন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px