📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১. বেরেলভীদের শিক্ষা

📄 ১. বেরেলভীদের শিক্ষা


বেরেলভীদের শিক্ষা: যেহেতু বেরেলভীদের সুনির্দিষ্ট কিছু বিশেষ আকীদা-বিশ্বাস রয়েছে, তাই তাদের বিশেষ বিশেষ শিক্ষা রয়েছে যেগুলো যুক্তি-তর্ক, জীবিকা উপার্জন এবং পানাহারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

বেরেলভী মোল্লারা নতুনভাবে প্রণীত বিদআতী মাসয়ালা-মাসায়িল ও নতুন নতুন বিদআত প্রবর্তন করেছে এবং ধর্মকে এমন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে যাতে কোনো রকম প্রাথমিক বিনিয়োগের প্রয়োজন না পড়ে।

(১) বেরেলভীগণ কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছে এবং নিজেদেরকে সেগুলোর রক্ষক বানিয়েছে।

(২) মানতের নামে অজ্ঞ-জাহিল জনসাধারণ তাদেরকে রাশি রাশি অর্থ-সম্পদের ভাণ্ডার দান করেছে। তারা এসব সঞ্চয় করা শুরু করল এবং ধনী ও সম্পদশালীদের মধ্যে পরিগণিত হতে আরম্ভ করল। এ সকল লোকেরা যারা দরিদ্রদের রক্ত চুষে নেয় এবং যারা মানত হিসেবে প্রদত্ত সম্পদের উপর জীবন ধারণ করে, তারাই ধর্ম ব্যবসায়ী এবং দুনিয়াদার।

কোনো সমাজকে ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী সমাজ বলা যায় না, ততক্ষণ তারা আল্লাহর তাওহীদ (একত্ব) সম্পর্কে অবহিত না থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানে শালীনতাবোধ ও সম্ভ্রম বর্জিত শিরক-বিদআতের এসব আখড়াসমূহ এবং এগুলোর রক্ষকরা বহাল থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামী (শাসন) ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারে না।

এ সকল লোভী পীর ও মাশায়েখ, যাদের দৃষ্টি থাকে তাদের মুরীদগণের পকেটের দিকে, তারা যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষকে অপর মানুষের দাসত্বের নসীহত করতে থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সমাজ তাওহীদের মহিমা ও গৌরবের সাথে পরিচিত হবে না এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো সমাজের উপর তাওহীদের দাবি প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নাস্তিকতা-ধর্মহীনতা ও ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।

নাস্তিকতা-ধর্মহীনতা এবং ধর্মীয় অজ্ঞতাকে রুখতে হলে মানবজাতির দাসত্বের শৃংখল ছিন্নভিন্ন করে দিতে হবে এবং সমাজের লোকেদের কাছে তাওহীদ প্রচার-প্রসার করতে হবে।

(৩) হায় আল্লাহ! কাওয়ালীর নামে ঢাক-ঢোলের তালে তালে নাচা, নাচার সময় মৃতদের নিকট সকাতর প্রার্থনা করা ও অনৈতিক কর্ম করা এবং সবুজ গিলাফের প্রান্তসমূহ ধরার সময় যাচনা করা এবং একে কবরের উপর চড়ানো, হাস্যকর ও মিথ্যা (বানোয়াট) কিচ্ছা-কাহিনীসমূহকে কারামত নামে চালানো এবং খানাপিনার জন্য উরসের মত বিদআতী প্রথার প্রবর্তন তারা করেছে!! যখন যুব প্রজন্ম ভাবে যে, এটাই ধর্ম তখন তারা কুফরীর ও ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতার জালের শিকারে পরিণত হয়।

(৪) পরিত্যক্ত হোক এ সকল মোল্লা ও পীরেরা যারা ধর্মের নামে দুনিয়াবী ব্যবসায় নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখে এবং ধর্মের সীমালংঘন করে। কবরপূজার এ লজ্জা, এ সকল বাৎসরিক উৎসব ও মেলা, একাদশী, কুলখানী, চল্লিশা পালন ইসলামের সাথে এসকল কর্মের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই। এসব কেবল দুনিয়ার ধন-সম্পদ কামাইয়ের হীন উপায় মাত্র। কিন্তু এ সকল বাতিনী পীর মাশায়েখদেরকে কে বোঝাবে!

এসকল লোকেরা সাধারণ মানুষদের চোখ বেঁধে দেয় যাতে তারা দেখতে না পায় এবং দুনিয়াতে তাদেরকে অসম্মানিত করে এবং তাদের আখিরাতও ধ্বংস করে।

(৫) যারা তাদেরকে এ সকল কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখতে চায় তাদেরকে এরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে এবং ওয়াহাবী ও ওলীগণের অসম্মানকারী বলে ডাকে। তাদের কিতাবাদি পড়া এবং তাদের সঙ্গে উঠা-বসা করা কে তারা অপরাধ বলে গণ্য করে, উদ্দেশ্য হলো লোকেরা যেন তাদের বক্তব্য ও উপদেশ দ্বারা প্রভাবিত হতে না পারে এবং সঠিক পথ চিনতে না পারে এবং তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়!

টিকাঃ
[৩২৫] ফতোয়া রিযভীয়্যাহ, আহমাদ রেযা বেরেলভী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৫৪ দ্র.।
[৩২৬] মাহি আদ-দালালাহ ফী ফতোয়া রিযভীয়‍্যাহ, আহমাদ রেযা বেরেলভী, ৫ম খণ্ড, পৃ-৮৯ দ্র.

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ২. কবর পাকা করা ও তার উপর গম্বুজ নির্মাণ করা

📄 ২. কবর পাকা করা ও তার উপর গম্বুজ নির্মাণ করা


২. কবর পাকা করা ও তার উপর গম্বুজ নির্মাণ করা: আহমদ ইয়ার গুজরাটী লিখেছে: "মৃত ব্যক্তির সম্মানে তাদের কবর পাকা করা বা কবরের উপর নির্মাণকার্য করা শরীয়াতে জায়েয।”

আবার, "আলিম, আউলিয়া এবং নেককারগণের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ জায়েয, যদি তাদের উদ্দেশ্য থাকে লোকদের নিকট তাদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং যাতে কবরবাসীকে লোকেরা হীন মনে না করে।” যেখানে পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞার হাদীস রয়েছে: জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর চিহ্নিত করতে, কবর বাঁধাতে এবং কবরের উপর সৌধ বা গম্বুজ নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম, কিতাবুল জানাইয, হা/৯৭০, তিরমিযী, হা/১০৫২; নাসাঈ, হা/২০২৭-২০৩১ (আলবানী, সহীহ সুনানে নাসাঈ); ইবনু মাজাহ, হা/১৫৫৩)

অনুরূপভাবে, আবুল হায়াজ আল আসাদী বলেন,
আলী ইবনু আবী তালিব আমাকে বলেন, আমি কি তোমাকে এমন কাজে পাঠাব না, যে কাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তা হচ্ছে, কোনো ছবি দেখলে চুর্ণ-বিচূর্ণ না করে ছাড়বে না, উঁচু কবরকে সমান না করে ছাড়বে না।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জানাইয, হা/৯৬৯, নাসাঈ, হা/২০৩১।)

আমর বিন হারিস সামামাহ হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: আমাদের একসাথী রোমে মৃত্যুবরণ করেন। তাই ফুযালাহ বিন উবায়দ (রাঃ) কবরকে মাটি সমান করে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ নির্দেশ দান করতে শুনেছেন।” (মুসলিম, ৯২ (৯৬); নাসাঈ, হা/২০৩০; আলবানী, সহীহ সুনানে নাসাঈ)।

টিকাঃ
[৩২৭] জা আল-হাক্ব, আহমদ ইয়ার, পৃ-২৮২।
[৩২৮] প্রাগুক্ত, পৃ-২৮৫।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৩. কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে হানাফী ফকীহদের মত

📄 ৩. কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে হানাফী ফকীহদের মত


৩. কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে হানাফী ফকীহদের মত হানাফী মাযহাবের ইমামগণ কবর পাকা করা ও তাতে গম্বুজ নির্মাণ করার ব্যাপারে যা বলেছেন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আল হাসান আশ শাইবানী ইমাম আবু হানীফা হতে বর্ণনা করেছেন, আবু হানীফার নিকট তার শায়খ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন: নিশ্চয় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, “কবরকে পাকা করতে নিষেধ করেছেন।”

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আল হাসান আশ শাইবানীকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কবরকে পাকা করা না-জায়েয (নিষিদ্ধ) কি-না। তিনি 'হ্যাঁ' সূচক জবাব দিয়েছিলেন।”

ইমাম সারাখসী তার আল-মাবসুত কিতাবে বলেন: "কবরের নিজস্ব মাটি ছাড়া বাড়তি কিছু (মাটি, সিমেন্ট, পাথর) দ্বারা কবর মজবুত করোনা, কারণ এর নিষেধাজ্ঞা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে প্রমাণিত।"

কাজী খাঁন তাঁর “ফতোয়া”-তে বলেন: “কবরসমূহকে মজবুত করা উচিত নয় এবং এগুলোর উপর গম্বুজ বা কোনো ভবন নির্মাণ করা উচিত নয় কারণ আবু হানীফা হতে এর নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে।”

ইমাম কাসানী বলেন: “কবরসমূহকে মজবুত করা নিন্দনীয় এবং ইমাম আবু হানীফা কবরসমূহের উপর গম্বুজ বা অনুরূপ কোনো সৌধ নির্মাণ করাকে নিন্দনীয় (মাকরূহ) মনে করতেন। এতে সম্পদের অপচয় রয়েছে। কিন্তু কবরের উপর পানি ছিটানোয় কোনো দোষ নেই; কিন্তু আবু ইউসুফ হতে কবরের উপর পানি ছিটানোও মাকরূহ বর্ণিত হয়েছে। কারণ এর কারণে কবর মজবুত হয়।”

অনুরূপ কথাই বর্ণিত আছে হানাফী ফিকহের সর্বজন মান্য কিতাবসমূহে। যেমন- বাহরুর রায়েক (২য় খণ্ড, পৃ-২০৯), বাদায়ে' ওয়াস সানায়ে' (১ম খণ্ড, পৃ-৩২০), ফতহুল কাদীর (১ম খণ্ড, পৃ-৪৭২), রদ্দুল মুহতার আলা দুররুল মুখতার, (১ম খণ্ড, পৃ-২০১), ফতোয়া হিন্দিয়া (১ম খণ্ড, পৃ-১২২) ও ফতোয়া বাযযাযিয়া (৪র্থ খণ্ড, পৃ-৮১) ও কানযুদ দাকায়েক (পৃ-৫০) এবং অন্যান্য।

কাজী ইবরাহীম হানাফী বলেন: যে সকল গম্বুজ কবরের উপর নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো সমান করে দেওয়া ওয়াজিব। কারণ তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতা এবং অবাধ্যতা করে সেগুলো নির্মাণ করেছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবাধ্যতা করে যে সকল নির্মাণ কার্য সম্পাদন করা হয়েছে, তা সমান করে (মাটির সাথে মিশিয়ে) দেয়া 'মসজিদে যিরার' সমান করে দেওয়ার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "ইহুদী ও খৃষ্টানদের প্রতি লা'নত, তারা তাদের নবীগণের কবরকে মসজিদ (সিজদার স্থান) বানিয়েছে।" (সহীহ বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হা/৪৩৫-৪৩৬; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ, হা/৫৩১; সুনানে নাসাঈ, হা/২০৫১)।

এ হলো কুরআন সুন্নাহর এবং হানাফী ফিকহের পরিষ্কার বক্তব্য। কিন্তু বেরেলভীগণ জোরেশোরে প্রচার করে যে, কবর বাঁধাই করা এবং এর উপর গম্বুজ/সৌধ নির্মাণ করা জরুরী।

জনাব আহমাদ রেযা খান বেরেলভী বলে: "গম্বুজ নির্মাণ এবং অনুরূপ অবকাঠামো নির্মাণ জরুরী যেন সাধারণ কবরসমূহ হতে মুবারক কবরসমূহকে আলাদা করা যায় এবং লোকেরা সেগুলোর প্রতি সম্মান-মর্যাদা দেয় এবং তাজিম করে। "

টিকাঃ
[৩২৯] কিতাবুল আসার, ইমাম মুহাম্মদ।
[৩৩০] কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মদ, ১ম খণ্ড, পৃ-৪২২।
[৩৩১] আল মাবসুত, ইমাম সারাখসী, ২য় খণ্ড, পৃ-২৬।
[৩৩২] ফতোয়া কাজী খাঁন, ১ম খণ্ড, পৃ-১৯৪।
[৩৩৩] বাদায়ে' ওয়াস সানায়ে', আল্লামা কাসানী, ১ম খণ্ড, পৃ-৩২০।
[৩৩৪] মাজালিসুল আবরার, কাজী ইবরাহীম, পৃ-১২৯।
[৩৩৫] আহকামে শরীয়াত, আল-বেরেলভী, ১ম খণ্ড, পৃ-৭১।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৪. কবরকে কাপড় ও পাগড়ী দিয়ে ঢেকে দেওয়া

📄 ৪. কবরকে কাপড় ও পাগড়ী দিয়ে ঢেকে দেওয়া


৪. কবরকে কাপড় ও পাগড়ী দিয়ে ঢেকে দেওয়া: "যদি লোকেরা একটি কবরের উপর কাপড় দেখে, তবে তাদের মনে করা উচিত এটি কোনো ওলীর কবর এবং একে ঘৃণা করা হতে লোকদের বিরত থাকা উচিত যেন অমনোযোগী কবর যিয়ারতকারীর মনে বিনয় ও সম্মান মর্যাদা জাগ্রত হয় এবং আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি, যে, আউলিয়াগণের রূহ মুবারক তাদের কবরসমূহের নিকট উপস্থিত থাকে। অতএব এটি জায়েয প্রথা এবং এ থেকে নিষেধ করা উচিত নয়। "

সে আরও লিখেছে: “কবরের সম্মানের উদ্দেশ্যে বাতি জ্বালানো জায়েয যদি সেটি কোনো ওলী বা আলিমের কবর হয়, যাতে তার রুহকে সম্মান করা যায় যা পৃথিবীর ধুলিকণাকে সুর্য্যের আলোর মাধ্যমে আলোকিত করে যেন লোকেরা জানতে পারে এটি কোনো নেককার লোকের কবর যাতে তারা এ থেকে উপকার লাভ করতে পারে। "

টিকাঃ
[৩৩৬] আহকামে শরীয়াত, আল-বেরেলভী, ১ম খণ্ড, পৃ-৭১-৭২।
[৩৩৭] বারিক আল মানার বিশুমুউল মাজার, ফতোয়া রিযভীয়‍্যাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-১৪৪-১৪৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px