📄 বেরেলভীদের আকীদা: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাজির-নাযির ছিলেন’
বেরেলভীদের আকীদা-বিশ্বাস, যুক্তি; বুদ্ধি ও মানুষের বোধগম্যতাকে অতিক্রম করে যায়। বেরেলভীদের আকীদাসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো, বেরেলভীর অনুসারীরা (সাধারণত) বলে থাকে যে,
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বত্র হাজির (উপস্থিত) ও নাযির (দর্শনকারী) এবং স্বশরীরে একই সাথে একাধিক স্থানে উপস্থিত থাকতে পারেন।'
এ আকীদা শুধু কুরআন ও সুন্নাহর সম্পূর্ণ বিরোধিতার উপরই ভিত্তিশীল নয়, বরং তা জ্ঞান, শিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞা-বর্জিতও বটে। ইসলামী শরীয়াত এমন মিথ্যা ও হিন্দুয়ানী আকীদা- বিশ্বাস হতে মুক্ত ও পবিত্র।
বেরেলভীদের বিশ্বাস হলো, “কোনো স্থান ও সময়ই "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (এর উপস্থিতি) হতে মুক্ত নয়।"
সে লিখেছে, “জগৎসমূহের মালিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মহান ক্ষমতা ও নবুয়াতী নূরের পক্ষে অস্বাভাবিক নয় যে, একই সময়ে পূর্ব ও পশ্চিমে, উত্তর ও দক্ষিণে, উপরে নীচে, সকল দিকে ও দূরবর্তী শত্রুদের অবস্থান স্থলেও তাঁর পবিত্র স্বত্ত্বা অথবা তাঁর মিছালীরূপে পবিত্র শরীরসহ উপস্থিত থেকে তাঁর বিশ্বস্ত ওলীদেরকে তাঁর চেহারার সৌন্দর্য্যের যিয়ারত (দর্শন) এবং তাঁর সম্মানিত হেফাযতের রহমত বরকত প্রদান করতে পারেন।"
অর্থাৎ এটি অসম্ভব ব্যাপার নয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই সময়ে অসংখ্য স্থানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেন। এ আকীদা কুরআন ও সুন্নাহ, ইসলামী শরীয়াত, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীসমূহ হতে এবং বুদ্ধি-বিবেচনা হতেও বহু দূরবর্তী। হ্যাঁ, যদি এটা শরীয়াতে অসম্ভব বিষয় না হতো এবং বেরেলভী মতবাদের ইমাম জনাব আহমাদ রেযা সাহেব বেরেলভীর নিজের আবিষ্কৃত দর্শন না হতো, তবে সেটা হতো আলাদা বিষয়।
অপর বেরেলভী অনুসারী উদ্ধৃত করেছে, “আল্লাহর ওলীগণ একই সময়ে বহু স্থানে উপস্থিত থাকতে পারেন এবং তারা একই সময়ে বহু দেহ ধারণ করতে পারেন।”
অর্থাৎ আল্লাহর ওলীগণের পক্ষে যদি এটা করা সম্ভব হয়, তবে “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর পক্ষে এটা কেন অসম্ভব হবে?
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাঁর সাহাবাগণের রুহসমূহকে সাথে নিয়ে সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়ানোর ক্ষমতা আছে। অনেক আল্লাহর ওলীগণ তাঁকে দেখেছেন।”
দাবি ও তার প্রমাণ একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে! দাবি হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীগণসহ একই সময়ে বহু স্থানে উপস্থিত হতে পারেন এবং দলীল হলো, 'অনেক ওলীগণ তাকে দেখেছেন।'
আবার বলা হচ্ছে: "তাঁর উম্মতের আমল দেখা-শোনা করা, তাদের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের বালা-মুসিবত দূর হওয়ার উদ্দেশ্যে দুআ করা, পৃথিবীর চতুদিকে ঘুরে বেড়ানো, এতে বরকত প্রদান করা এবং যদি কোনো নেককার ব্যক্তি মারা যায় তার জানাযায় উপস্থিত হওয়া- এসবগুলো হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কর্ম।”
এখন শুনুন নেককারগণের সম্পর্কে আহমাদ রেযা কী বলে: "তাকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, 'আউলিয়াদের জন্য একই সময়ে কয়েকস্থানে উপস্থিত থাকা সম্ভব কি-না। সে উত্তর দিল, 'যদি তারা ইচ্ছা করেন, তবে দশ হাজার শহরের দশ হাজার স্থান হতে আহ্বান কবুল করতে পারেন (আহ্বানে সাড়া দিতে পারেন)।"
সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর সম্পর্কে লিখেছে: "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রূহ মুবারক বিশ্বের সকল মুসলিমের বাড়িতে হাজির আছে।”
কে জানে কোথা হতে বেরেলভীরা এই হীন শিক্ষা অবলম্বন করেছে?
বেরেলভীর এক অনুসারী লিখেছে: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর মুবারক দর্শন (যিয়ারত) বিশ্বে সব সময় প্রতি মুহূর্তে সংঘটিত বিষয় এবং তিনি সালাতের জামাআতে, কোরআন তিলাওয়াতে, মিলাদে এবং না'ত খাওয়ানী এবং বিশেষভাবে নেককার দের জানাযায় সশরীরে উপস্থিত থাকেন।”
বেরেলভীর সেই একই অনুসারী পুনরায় লিখেছে: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদমের সৃষ্টি, তাঁকে সম্মাননা প্রদান, তাঁর ভুলের জন্য জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া, অতঃপর তাঁর তাওবা কবুল হওয়া ও পরবর্তী ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং তিনি ইবলিসের সৃষ্টি ও অন্যান্য ঘটনাবলি দেখেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর চিরন্তন তাওয়াজ্জুহ (মনোযোগ) যখনই আদম (আ.) থেকে সরে গিয়েছিল, তখনই তাঁর থেকে বিস্মৃতি এবং তার ফলাফল সংঘটিত হয়েছিল।”
অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনকি দুনিয়ায় প্রেরিত হওয়ার পূর্বেও তিনি হাজির ও নাযির ছিলেন!
“ওলীগণ প্রায়ই জাগ্রত অবস্থায় তাদের চর্মচোখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। ”
অন্যত্র সে লিখেছে, “অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের সালাতের ভেতরও দেখে থাকেন। "
আরো শুনুন। সে লিখেছে, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পবিত্র রূহ এবং দেহ মুবারকসহ (তাঁর কবরে) জীবিত এবং নিঃসন্দেহে পৃথিবীর চারিপাশে এবং ফেরেশতাদের জগতের চারিপাশে তিনি ঘুরে বেড়ান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মৃত্যুর পূর্বে যে আকৃতিতে ছিলেন, এখনও সেই একই আকৃতিতে বিদ্যমান রয়েছেন এবং তাঁর কোনো কিছুই পরিবর্তন হয়নি। আসলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিরী (বা মানবীয়) দৃষ্টি হতে অন্তরীণ (আত্মগোপন করে) রয়েছেন যেমন ফেরেশতারা গোপন রয়েছে যদিও তারা সশরীরে জীবিত। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দর্শন দানের মাধ্যমে আল্লাহ কাউকে সম্মান ও অনুগ্রহ করতে চান, তখন তিনি তাঁর থেকে হিজাব (পর্দা) সরিয়ে দেন, ফলে সেই ব্যক্তি সেই আকৃতিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে দেখে যে আকৃতিতে তিনি এখন আছেন। ”
জনাব আহমাদ রেযা বেরেলভী বলেছে, "যে কৃষ্ণ কানহিয়া একজন কাফির ছিল এবং একই সময়ে সে যদি শত শত স্থানে আবির্ভূত (হাজির) হতে পারে এবং যদি ফাতাহ মুহাম্মদ একই সময়ে অনেক স্থানে উপস্থিত (হাজির) হয়, তবে তাতে বিস্ময়ের কী আছে? তুমি কি ধারণা করছ যে, শায়খ একই সময়ে এক স্থানে থাকতেন এবং অন্য স্থানেও থাকতেন, এ (ঘটনা) গুলো কেবল উপমা? আউযুবিল্লাহ! কিন্তু শায়খ নিজে সেই সকল স্থানে (বাস্তবিকই) উপস্থিত থাকতেন। গুপ্ত রহস্যাদি জাহিরী জ্ঞানের বাইরে। কাশফ ও বিবেক-বুদ্ধির তুলনা করা অনুচিত। "
সুবহানাল্লাহ! কোনো আয়াতে বা হাদীসে তাদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। দলীল হলো যদি কৃষ্ণ (হিন্দু দেবতা) কাফের হয়ে শত শত স্থানে উপস্থিত থাকতে পারে, তবে আল্লাহর ওলীরা কেন কয়েকস্থানে উপস্থিত থাকতে পারবে না? অদ্ভুতভাবে যুক্তি প্রদানের এ পদ্ধতি বেরেলভীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
বেরেলভী ইমামের এক অনুসারী লিখেছে, "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদম (আ:) এর সময় হতে তাঁর শারীরিকভাবে অস্তিত্বলাভ করা (জন্মগ্রহণ করা) পর্যন্ত হাজির (উপস্থিত) ছিলেন। "
টিকাঃ
[৩০৪] তাসকীন আল খাওয়াতির ফী আসআলাহ আল হাজির ওয়া নাযির, আহমাদ সাইয়্যিদ কাজমী, পৃ-৮৫。
[৩০৫] প্রাগুক্ত, পৃ-১৮。
[৩০৬] জাআল হাক্ব, পৃ-১৫০。
[৩০৭] প্রাগুক্ত, ১৫৪。
[৩০৮] জাআল-হাক্ব, গুজরাটি বেরেলভী, পৃ-১৫৪。
[৩০৯] মালফুযাত, পৃ-১১৩。
[৩১০] খালিসুল ইতিকাদ, পৃ-৪০。
[৩১১] জা-আল-হাক্ব, পৃ-১৫৬。
[৩১২] প্রাগুক্ত, পৃ-১৫৫。
[৩১৩] তাসকীন আল খাওয়াতির, পৃ-১৮。
[৩১৪] প্রাগুক্ত, পৃ-১৮。
[৩১৫] তালকীন আল খাওয়াতির, পৃ-১৮。
[৩১৬] ফতোয়া রিজভীয়্যাহ, বেরেলভী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ- ১৪২; প্রাগুক্ত মালফুযাত, পৃ-১১৪。
[৩১৭] জা আল-হাক্ব, পৃ-১৬৩।
📄 হাজির নাযির’ প্রসঙ্গ খণ্ডনে কুরআন ও বাস্তব ঘটনাবলি
আল্লাহর বাণীর সাথে এ বেরেলভীদের আকীদা তুলনা করুন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَمَا كُنتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِي إِذْ قَضَيْنَا إِلَى مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ ۞ وَلَكِنَّا أَنشَأْنَا قُرُونَا فَتَطَاوَلَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ وَمَا كُنتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ تَتْلُوا عَلَيْهِمْ ءَايَتِنَا وَلَكِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ ۞ وَمَا كُنتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَكِن رَّحْمَةً مِّن رَّبِّكَ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَهُم مِّن نَّذِيرٍ مِّن قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
"আর (হে নবী) আমি যখন মূসাকে বিধান দিয়েছিলাম তখন তুমি (তুর পাহাড়ের) পশ্চিম পার্শে উপস্থিত ছিলে না। আর তুমি প্রত্যক্ষদর্শীদের অন্তর্ভুক্তও ছিলে না। কিন্তু আমি অনেক প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তাদের উপর বহু যুগ অতিবাহিত হয়েছিল। তুমি তো মাদইয়ানবাসীদের মধ্যে অবস্থানকারী ছিলে না যে, তাদের নিকট আমার আয়াতগুলো তুমি তিলাওয়াত করবে। কিন্তু আমিই রাসূল প্রেরণকারী। আর যখন আমি (মূসাকে) ডেকেছিলাম তখন তুমি তূর পর্বতের পাশে উপস্থিত ছিলে না। কিন্তু তোমার রবের পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ জানানো হয়েছে, যাতে তুমি এমন কওমকে সতর্ক করতে পার, যাদের কাছে তোমার পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসেনি। সম্ভবত তারা উপদেশ গ্রহণ করবে।" (সূরা আল কাসাস ২৮: ৪৪-৪৬)
মারইয়ামের ঘটনা বর্ণনা করার পর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন,
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يُلْقُونَ أَقْلَمَهُمْ أَيُّهُمْ يَكْفُلُ مَرْيَمَ وَمَا كُنتَ لَدَيْهِمْ إِذْ يَخْتَصِمُونَ
"এটি গায়েবের সংবাদসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা আমি তোমার প্রতি ওহী পাঠাচ্ছি। আর তুমি তাদের নিকট ছিলে না, যখন তারা তাদের কলম নিক্ষেপ করছিল, তাদের মধ্যে কে মারইয়ামের দায়িত্ব নেবে? আর তুমি তাদের নিকট ছিলে না, যখন তারা বিতর্ক করছিল।” (সূরা আলে ইমরান ৩: ৪৪)
تِلْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهَا إِلَيْكَ مَا كُنتَ تَعْلَمُهَا أَنتَ وَلَا قَوْমُكَ مِن قَبْلِ هَذَا فَاصْبِرْ إِنَّ الْعَاقِبَةَ لِلْمُتَّقِينَ
“এগুলো গায়েবের সংবাদ, আমি তোমাকে ওহীর মাধ্যমে তা জানাচ্ছি। ইতঃপূর্বে তা না তুমি জানতে এবং না তোমার কওম। সুতরাং তুমি সবর কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য।” (সূরা হুদ ১১: ৪৯)
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ وَمَا كُنتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ
“এগুলো গায়েবের সংবাদ, যা আমি তোমার কাছে ওহী করছি। তুমি তো তাদের নিকট ছিলে না যখন তারা তাদের সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিল অথচ তারা ষড়যন্ত্র করছিল।” (সূরা ইউসুফ ১২: ১০২)
আল্লাহ মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভ্রমণ সম্পর্কে বলেন-
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَا الَّذِي بَرَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ ءَايَتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
"পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। "(সূরা আল ইসরা ১৭:১)
অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাজির-নাযির হতেন তবে, মাসজিদুল হারাম হতে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমনের তাঁর কোনো প্রয়োজন ছিল না। তিনি সেখানে উপস্থিতই থাকতেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ، لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّم_ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
"যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছেন যখন কাফিররা তাকে বের করে দিল, সে ছিল দু'জনের দ্বিতীয়জন। যখন তারা উভয়ে পাহাড়ের একটি গুহায় অবস্থান করছিল, সে তার সঙ্গীকে বলল, 'তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন'। অতঃপর আল্লাহ তার উপর তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাকে এমন এক সৈন্য বাহিনী দ্বারা সাহায্য করলেন যাদেরকে তোমরা দেখনি এবং তিনি কাফিরদের বাণী অতি নিচু করে দিলেন। আর আল্লাহর বাণীই সুউচ্চ। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।” (সূরা আত তাওবা ৯ : ৪০)
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِবَدْرٍ وَأَنتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে বদরে সাহায্য করেছেন অথচ তোমরা ছিলে হীনবল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায়, তোমরা শোকরগুজার হবে।" (সূরা আলে ইমরান ৩: ১২৩)
إِذْ أَنتُم بِالْعُدْوَةِ الدُّنْيَا وَهُم بِالْعُدْوَةِ الْقُصْوَى وَالرَّكْبُ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَلَوْ تَوَاعَدتُّمْ لَاخْتَلَفْتُمْ فِي الْمِيعَادِ وَلَكِن لِيَقْضِيَ اللَّهُ أَمْرًا كَانَ مَفْعُولًا لِيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَنْ بَيِّنَةِ وَيَحْيَى مَنْ حَيَّ عَنْ بَيِّنَةٍ وَإِنَّ اللَّهَ لَسَمِيعُ عَلِيمٌ
“যখন তোমরা ছিলে নিকটবর্তী প্রান্তরে, আর তারা ছিল দূরবর্তী প্রান্তরে এবং কাফেলা ছিল তোমাদের চেয়ে নিম্নভূমিতে, আর যদি তোমরা পরস্পর ওয়াদাবদ্ধ হতে, (যুদ্ধে মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে) তাহলে অবশ্যই সে ওয়াদার ক্ষেত্রে তোমরা মতবিরোধ করতে, কিন্তু আল্লাহ (তাদেরকে একত্র করেছেন) যাতে সম্পন্ন করেন এমন কাজ যা হওয়ারই ছিল, যে ধ্বংস হওয়ার সে যাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর ধ্বংস হয়, আর যে জীবিত থাকার সে যাতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর বেঁচে থাকে, আর নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আনফাল ৮: ৪২)
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
"অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার হাতে বাই'আত গ্রহণ করেছিল; অতঃপর তিনি তাদের অন্তরে কি ছিল তা জেনে নিয়েছেন, ফলে তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কৃত করলেন নিকটবর্তী বিজয় দিয়ে।” (সূরা আল ফাতহ ৪৮ : ১৮)
لَقَدْ صَدَقَ اللَّهُ رَسُولَهُ الرُّءْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِن شَاءَ اللَّهُ ءَامِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُءُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ لَا تَخَافُونَ فَعَلِمَ مَا لَمْ تَعْلَمُوا فَجَعَلَ مِن دُونِ ذَلِكَ فَتْحًا قَرِيبًا
"অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে সত্যে পরিণত করে দিয়েছেন। তোমরা ইনশাআল্লাহ নিরাপদে তোমাদের মাথা মুণ্ডন করে এবং চুল কেঁটে নির্ভয়ে আল-মাসজিদুল হারামে অবশ্যই প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ জেনেছেন যা তোমরা জানতে না। সুতরাং এ ছাড়াও তিনি দিলেন এক নিকটবর্তী বিজয়। “(সূরা আল ফাতহ ৪৮: ২৭)
এ সকল আয়াত প্রমাণ করে যে, কোনো এক ব্যক্তির জন্য একই সময়ে একাধিক স্থানে উপস্থিত থাকার আকীদা সঠিক নয়। কুরআনের আয়াতের অর্থ এসকল অনৈসলামী মতবাদের বিরোধিতা করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণের প্রত্যেকের একটি করে সত্তা ছিল। এবং যখন তারা মদীনায় উপস্থিত ছিলেন, তখন বদরে উপস্থিত ছিলেন না, তা না হলে বদরের দিকে যাত্রা করা অর্থহীন হয়ে যায়। অনুরূপভাবে, মক্কা বিজয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা মক্কায় উপস্থিত ছিলেন না (যখন তারা মদীনাতেও উপস্থিত ছিলেন)।
এ সকল আয়াত ছাড়াও বাস্তবতা ও প্রকৃত ঘটনাবলিও তাদের আকীদাকে বাতিল করে দেয়। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হুজরায় অবস্থান করতেন তখন তিনি মসজিদে হাজির থাকতেন না, তাই সাহাবীগণ তাঁর জন্য (মসজিদে) অপেক্ষা করতেন। তিনি যদি সর্বত্র হাজির-নাযির হতেন তবে তাঁর সাহাবীগণের তাঁর জন্য অপেক্ষা করার কোনো অর্থ থাকে না। অনুরূপ, তিনি যখন মদীনায় ছিলেন তখন তিনি হুনায়নে হাজির ছিলেন না। যখন তাবুকে হাজির ছিলেন তখন তিনি মদীনায় হাজির ছিলেন না এবং যখন আরাফায় ছিলেন, তখন তিনি মদীনায় বা মক্কায় হাজির ছিলেন না।
📄 ‘তিনি হাজির-নাযির’- তাদের এ আকীদার আরও বয়ান
এ সকল আয়াত ও স্পষ্ট ও প্রকাশ্য ঘটনাবলিকে পাশ কাটিয়ে বেরেলভীগণ এ আকীদা পোষণ করে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় সকল স্থানে উপস্থিত (হাজির)।
সে আরও বলেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহকে জানেন এবং সকল অস্তিত্বশীল বিষয়ের এবং সকল সৃষ্টি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত জ্ঞান তাঁর রয়েছে। অতীত বা ভবিষ্যতের অবস্থাবলির কোনো কিছুই তাঁর থেকে লুকায়িত নয়।”
সে অন্যত্র লিখেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মুবারক চোখে সারা বিশ্ব দেখেন (নাযির)।”
জনাব বেরেলভী লিখেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো কাছ থেকে দূরে নন, আর না তিনি অনবহিত।”
সে আরো লিখেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর জীবন ও মৃত্যুর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই, (তা বোঝা যায়) এ ঘটনা থেকে যে, তিনি তাঁর উম্মাতকে দেখছেন এবং তিনি (তাদের) অবস্থাসমূহ, অভিপ্রায়, পরিকল্পনা এবং তাদের অন্তরের ভীতিকেও চিনতে পারেন এবং এ সবকিছু তাঁর নিকট স্পষ্ট এবং এর মধ্যে কোনো কিছুই গোপন নেই।”
সে অন্যত্র লিখেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাজির ও নাযির। তিনি পৃথিবীতে যা ঘটছে এবং যা ঘটবে, তা তিনি লক্ষ্য করেন। তিনি সকল স্থানে হাজির (উপস্থিত) আছেন এবং তিনি সকল কিছু দেখেন।”
টিকাঃ
[৩১৮] তাসকীন আল খাওয়াতির ফী মাসআলাতিল হাজির ওয়ান নাযির, আহমাদ সাঈদ কাজমী, পৃ-৫。
[৩১৯] প্রাগুক্ত, পৃ-৩৯。
[৩২০] প্রাগুক্ত, পৃ-৯০。
[৩২১] খালিসুল ইতিকাদ, পৃ-৩৯。
[৩২২] প্রাগুক্ত, পৃ-৪৬。
[৩২৩] প্রাগুক্ত, পৃ-৪৬。
📄 তাদের এ আকীদা ধর্ম ও বিবেকের বিরোধী
এ হলো বেরেলভীদের আকীদা ও চিন্তাধারাসমূহ যার ধর্মের বা বিবেক-বুদ্ধির সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
আল্লাহর দীন বিবেক-বুদ্ধি ও প্রকৃতিগত স্বভাবের সাথে পরিপূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُوا إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
"বল, 'এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই'।" (সূরা ইউসুফ ১২: ১০৮)
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَن سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
"আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।" (সূরা আল আনআম ৬: ১৫৩)
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْءَانَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
"তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা- ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?" (সূরা মুহাম্মদ ৪৭ : ২৪)
এমন কেউ আছে কি যে বিবেক-বিবেচনা করবে, যে চিন্তা-ভাবনা করবে এবং এমন কেউ আছে কি যে বিচার-বিবেচনা করবে, যে ফিরে আসবে?
তাদের আকীদা-বিশ্বাস এবং কুরআন-সুন্নাহর মাঝে এত বেশি বৈপরীত্য ও অসঙ্গতির পর, অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগ নেই যে, আল্লাহর শরীয়ত এবং বেরেলভীদের তরীকা এবং আকীদা সম্পূর্ণ আলাদা। এতদুভয়ের মাঝে কোনো মিল নেই। আল্লাহ সকলকে হেদায়েত লাভের তৌফিক দান করুন। আমীন।
শুধু নবীগণ ও ওলীগণই রুবুবিয়াতের এ সিফাতে (গুণাবলিতে) শরীক নয়, বরং বেরেলভীদের আহমাদ রেযা স্বয়ং এ বিষয়ে শরীক। যেমন- তার এক অনুসারী লিখেছে, "আহমাদ রেযা বেরেলভী আজও আমাদের মাঝে হাজির। তিনি আসতে পারেন এবং আমাদের সাহায্য করতে পারেন।"
টিকাঃ
[৩২৪] আনওয়ার রেযা, পৃ-২৪৬।