📄 সাহাবীগণ সম্পর্কে তাদের বাড়াবাড়ি
আম্বিয়াগণ ছাড়াও এমনকি সাহাবাগণও জান্নাত-জাহান্নামের মালিক। মাওযু (জাল ও বানোয়াট) হাদীস থেকে সাহায্য নিয়ে বেরেলভীদের আহমাদ রেযা সাহেব লিখেছে,
"বিচার দিবসে আল্লাহ তা'আলা পূর্বে ও পরে আগত সকলকে একত্রিত করবেন। আরশের দু'পাশে দু'টি নূরের মিম্বার আনা হবে এবং স্থাপন করা হবে। দু'জন লোক (ফেরেশতা) তাতে আরোহন করবে। ডানপাশের জন ডাক দিয়ে বলবে, 'হে সৃষ্টিকুল! যে আমাকে চিনেছে সেতো চিনেছে, কিন্তু যে চিনতে পারেনি, (সে শুনে রাখ) আমি হলাম জান্নাতের দায়িত্বশীল (ফেরেশতা) 'রিদওয়ান'। আল্লাহ আমাকে আদেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জান্নাতের চাবিসমূহ অর্পণ করি এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সেগুলো আবু বাকর ও উমার (রাঃ)-এর নিকট হস্তান্তর করতে আদেশ করেছেন যাতে তাঁরা তাঁদের বন্ধুদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারে। আমার কথা শোনো এবং আমার সাক্ষী হও।
অতঃপর বামপাশের জন ডেকে বলবে, হে সৃষ্টিকুল! যে আমাকে চিনেছে সেতো চিনেছে, কিন্তু যে চিনতে পারেনি, (সে শুনে রাখ) আমি হলাম জাহান্নামের দারোয়ান (ফেরেশতা) মালিক। আল্লাহ আমাকে আদেশ দিয়েছেন যে, আমি যেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জাহান্নামের চাবিসমূহ অর্পণ করি এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সেগুলো আবু বাকর ও উমার (রাঃ)'র নিকট হস্তান্তর করতে আদেশ করেছেন যাতে তাঁরা তাঁদের শত্রুদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাতে পারেন। আমার কথা শোনো এবং আমার সাক্ষী হও। " [১৮৬]
শিয়াদের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে এবং তাকিয়ার পর্দা উন্মোচন করে আলী (রাঃ) সম্পর্কে সে বলেছে, "আলী (রা) জাহান্নামের বন্টনকারী। অর্থাৎ তিনি তার বন্ধুদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার শত্রুদের জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।" [১৮৭]
টিকাঃ
১৮৬. আল আমান ওয়াল আলা, আহমাদ রেযা, পৃ-৫৭।
১৮৭. প্রাগুক্ত, পৃ-৫৮।
📄 আব্দুল কাদের জিলানী সম্পর্কে তাদের বাড়াবাড়ি
জনাব আহমাদ রেযা বেরেলভী শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর মর্যাদার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে বলেন, তিনি সাহায্য প্রার্থনাকারীদের সাহায্যকারী ও আশ্রয় প্রার্থনা কারীদের আশ্রয়কারী। তিনি তার ব্যাপারে আরো বলেন,
“(তিনি) দুনিয়ার কার্যাবলির কর্তৃত্ব, অনুমতি প্রাপ্ত এবং পরিচালনার অধিকারী।" [১৮৮] আরো বলেন,
“হে গাওস আপনি জীবন দানকারী, আপনি মৃত্যুদানকারী নবী হচ্ছে বন্টনকারী, আপনি পৌঁছানে ওয়ালা। [১৮৯] এবং তাকে আহ্বান করে সে আরো বলেছে
"হে আল্লাহর ছায়া আব্দুল কাদের আপনি বান্দাদের আশ্রয়স্থল হে আব্দুল কাদের আমারা ফকীর ও আপনার মুখাপেক্ষী আপনি হচ্ছেন সম্মান ও মুকুটের অধিকারী। আপনি আল্লাহর হে আব্দুল কাদীর।" [১৯০]
অন্যত্র সে লিখেছে,
"হে আব্দুল কাদের! হে এমন ব্যক্তি যিনি কল্যাণ করেন, যিনি চাওয়া ছাড়াই দয়া করে দান করেন। হে সওয়াব (পুরস্কার) ও অনুগ্রহের মালিক, আপনি সুউচ্চ ও সুমহান। আমাদের প্রতি দয়া করুন এবং তার দুআ শুনুন যে দুআ করছে। হে আব্দুল কাদির, আপনি আমাদের আশা পূরণ করুন! " [১৯১]
অপর এক স্থানে সে লিখেছে,
"আব্দুল কাদের আরশের উপর তাঁর বিছানা বিছিয়েছেন এবং তিনি আরশকে জমীনে নামিয়ে নিয়ে এসেছেন। " [১৯২]
এদের শিরকী আকীদা প্রমাণ করতে আব্দুল কাদের জীলানীর উপর মিথ্যারোপ করে বলে যে, আব্দুল কাদের জিলানী বলেছেন,
"আল্লাহ আমাকে সকল ওলীর প্রধান বানিয়েছেন, সকল অবস্থায় আমার নির্দেশ বাস্তবায়িত হয়।
হে আমার মুরীদগণ! শত্রুদের ব্যাপারে ভয় পেয়ো না। আমি হলাম এমন ব্যক্তি যে বিরোধিদের হত্যা করি। আসমান জমীনে আমার শাসন কর্তৃত্ব রয়েছে।
আমার উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহর পূরো রাজ্য আমার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমার সকল অবস্থা যেকোনো ত্রুটি হতে মুক্ত।
সব সময় গোটা পৃথিবী আমার চোখের সামনে থাকে। আমি জিলানী, মুহীউদ্দীন আমার নাম, পাহাড়ের উপর রয়েছে আমার চিহ্ন। " [১৯৩]
"বিশ্বের লোকদের সকল কর্তৃত্ব ও আধিপত্য রয়েছে আমার অধিকারে, আমি যাকে ইচ্ছা দেই, যার থেকে ইচ্ছা আটকে রাখি। " [১৯৪]
অপর একটি মিথ্যাচার বিশ্লেষণ করুন! জনাব বেরেলভী শায়খ জিলানীর প্রতি মিথ্যারোপ করে বলে যে, তিনি বলেছেন, "সকল মানুষের অন্তর আমার হাতের মুঠোয়। যদি আমি চাই তবে তাদেরকে আমার দিকে ঘুরিয়ে দিই, আর যদি চাই তবে (আমার দিক থেকে) ফিরিয়ে দিই।" [১৯৫]
বেরেলভীর এক অনুসারীর আকীদা লক্ষ্য করুন! "তাশবিয়াত (সাদৃশ্য)-এর অধিকার লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত রয়েছে, গাওস আল-গাওস [১৯৬] (আব্দুল কাদীর) একজন পুরুষকে একটি নারীতে রূপান্তরিত করতে পারে।"
এ লাইন দুটির ব্যাখ্যা শুনুন এক বেরেলভীর মুখে: "শায়খ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দী যিনি সোহরাওয়ার্দী তরীকার একজন ইমাম, তার মা নিজেকে গাওসুস সাকালাইন এর পিতার নিকট পেশ করেছিল এবং বলেছিল, হুজুর দুআ করুন যেন আমার একটি ছেলে হয়। তিনি লাওহে মাহফুজে দেখলেন এবং সেখানে দেখতে পেলেন যে, সেখানে একটি কন্যার কথা লেখা আছে এবং (তিনি) বললেন, 'তোমার একটি মেয়ে হবে'। এ শুনে তিনি ফিরে গেলেন। ফেরার পথে তার হুজুর গাওসুল আযম (শায়খ জিলানী) এর সাথে সাক্ষাত হলো। তাঁর প্রশ্ন করার পরে সে মহিলা পুরো ঘটনা বর্ণনা করল। হুজুর বললেন, 'যাও, তোমার একটি ছেলে হবে'। কিন্তু প্রসবের সময় দেখা গেল একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করল। সে এ অভিযোগ নিয়ে গাওসের দরবারে গেলেন এবং বললেন, 'হুজুর, আমি একটি ছেলে চেয়েছিলাম আর পেলাম একটি মেয়ে? তিনি বললেন, 'তাকে এখানে নিয়ে এসো'। (অতঃপর) কাপড় সরিয়ে তিনি বললেন, 'দেখো, সে মেয়ে না ছেলে।' যখন সে তাকাল দেখল যে সে একটি ছেলে! আর সে-ই ছিলেন শায়খ সোহরাওয়ার্দী আলাইহি রাহমাহ। তাঁর পবিত্র বর্ণনায় এসেছে যে, তাঁর (সোহরাওয়ার্দীর) স্তন ছিল মেয়েদের মত। " [১৯৭]
বেরেলভীর সেই একই মুরীদ অপর একটি ঘটনা বর্ণনা করেছে যার সারসংক্ষেপ হলো, এক ব্যক্তির তাকদীরে মৃত্যু লেখা ছিল, শায়খ জিলানী তার তাকদীর পরিবর্তন করে দেন এবং তাকে নির্ধারিত সময়ে মৃত্যুবরণ করা হতে রক্ষা করেন।" [১৯৮]
জনাব বেরেলভী তার বইতে উদ্ধৃত করেছে, “আমাদের শায়খ সাইয়্যেদুনা আব্দুল কাদির তাঁর মজলিসে ভূমি হতে উর্ধ্বে বায়ুর উপর প্রেমোন্মত্ত হয়ে বসতেন এবং বলতেন: 'ততক্ষণ পর্যন্ত সুর্য উদিত হয় না, যতক্ষণ না আমাকে সালাম দেয়। যখন নতুন বছর আগমন করে, সে আমাকে সালাম দেয় এবং আমাকে জানিয়ে দেয় তাতে (সেবছরে) কী কী ঘটবে। যখন নতুন সপ্তাহের আগমন ঘটে, তা আমাকে সালাম দেয় এবং তাতে কী কী ঘটবে তা আমাকে জানিয়ে দেয় এবং যখন নতুন দিনের আগমন ঘটে, তা আমাকে সালাম দেয় এবং তাতে কী কী ঘটতে যাচ্ছে তা আমাকে জানিয়ে দেয়।" [১৯৯]
টিকাঃ
১৮৮. হাদায়িকু বাখশীশ, বেরেলভী, পৃ. ১২৫-১২৬।
১৮৯. প্রাগুক্ত, পৃ- ১২৫-১২৬
১৯০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৬।
১৯১. প্রাগুক্ত, পৃ-১৭৯
১৯২. প্রাগুক্ত, পৃ-১৮৪।
১৯৩. আল যমযমাতুল কামারিয়া পৃ- ৩৫।
১৯৪. খালিসুল ইতিকাদ, বেরেলভী, পৃ-৪৯।
১৯৫. হিক্যায়াত, রিযভীয়্যাহ, বরকতী বেরেলভী কর্তৃক 'মালফুযাত' এ বর্ণিত, পৃ-১২০।
১৯৬. গাওস' বা আল গাওস: গাওস অর্থ সাহায্য, ত্রাণ, উদ্ধার, মুক্তি। গাওসুল আযম' বলতে বোঝায় সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী বা সবচেয়ে বড় ত্রাণকর্তা। আর এ গুণটি আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। মহান সাহায্যকারীতো কেবল মহান আল্লাহ।
১৯৭. প্রাগুক্ত, পৃ-২৭।
১৯৮. বাগই ফেরদৌস, আইয়ুব আলী রিযভী বেরেলভী, পৃ-২৭, ভারতে প্রকাশিত।
১৯৯. আল আমান ওয়াল আলা, বেরেলভী।
📄 সুফীবাদী পীরদের সম্পর্কে তাদের বাড়াবাড়ি
আর এ সকল ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব শুধু শায়খ জিলানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্রষ্টার এ সকল গুণাবলিতে সুফীবাদের সকল ওলী ও পীরদের শরীকানা (অংশীদারিত্ব) রয়েছে। এসব গুণাবলির দ্বারাই তাদের বর্ণনা দেয়া হয় এবং তারা এসবের মালিকও।
তাই আহমাদ রেযার ছেলে বলেছে, “নিঃসন্দেহে সকল শায়খ, আউলিয়া, আলেম তাদের অনুসারীদের জন্য সুপারিশ করে (মধ্যস্থতা করে) এবং যখন তাদের অনুসারীগণের রূহ কবয করা হয়, যখন মুনকার নাকীর তাদের প্রশ্ন করে (কবরে), যখন সে পুনরুত্থিত হবে (কিয়ামাত) দিবসে, যখন তার আমালনামা খোলা হবে (হাশরে), যখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে ও হিসাব নেয়া হবে, যখন তার আমাল ওজন করা হবে, যখন সে পুলসিরাতের উপর হাটবে, প্রতিমুহূর্তে এবং সার্বক্ষণিক তাঁরা (শায়খরা) তাদের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। কোনো স্থানেই তার থেকে অমনেযোগী হবে না (তাকে ভুলে যাবে না)। সকল ইমাম তাদের অনুসারীদের জন্য সুপারিশ করবে (তাদের মধ্যস্থতা করে পাপের জন্য অনুনয় বিনয় করবে) এবং পৃথিবীতে কবরে এবং আখিরাতে সর্বদা তারা তাদের প্রতি নজর রাখে এবং তাদেরকে ক্ষতি হতে রক্ষা করে তারা পুলসিরাত পার না হওয়া পর্যন্ত।" [২০০]
"আসমান হতে জমীন পর্যন্ত আবদালের রাজত্ব এবং আরশ হতে ফার্শ (ভূমির তলদেশ) পর্যন্ত 'আরিফের রাজত্ব।” [২০১]
আহমাদ রেযা নিজে বলেছে, "আউলিয়াগণের মাধ্যমে (মধ্যস্থতায়) সৃষ্টিজগতের শৃংখলা কায়েম (প্রতিষ্ঠিত) আছে।” [২০২]
এছাড়াও “সম্মানিত ওলীরা মৃতকে জীবিত করতে পারে, জন্মান্ধ এবং কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করতে পারে এবং এক পদক্ষেপে গোটা পৃথিবী অতিক্রম করতে সক্ষম। " [২০৩]
"গাওস সদা সর্বদা বিরাজমান (উপস্থিত), তিনি ছাড়া আসমান জমীন প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না। " [২০৪]
বেরেলভী সাহেবের এক অনুসারী লিখেছে, "আউলিয়াগণ তাদের মুরীদগণকে সাহায্য করেন এবং তাদের শত্রুদের ধ্বংস করেন।” [২০৫]
বেরেলভীদের বিখ্যাত মুফতী আহমাদ ইয়ার গুজরাটি লিখেছে, "আউলিয়াগণ তাদের প্রভুর নিকট হতে এ ক্ষমতা পেয়েছে যে, তারা নিক্ষিপ্ত তীরকে ফিরিয়ে আনতে পারেন। " [২০৬]
একই মুফতী সাহেব লিখেছে, "আউলিয়াগণ কবরে মাছি তাড়ানোর ক্ষমতাই শুধু রাখেন না, বরং তারা বিশ্বজাহানকেও উল্টে দিতে পারেন। কিন্তু তারা (সেদিকে) খুব একটা খেয়াল দেন না।” [২০৭]
বেরেলভীদের আরেক নেতা লিখেছে, "অনেক আউলিয়া স্পষ্ট আসন্ন মৃত্যুর সম্পর্কে অবগত। [২০৮]
আরেক বেরেলভী সাহেব বলেছে, “আউলিয়াদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাদের মৃত্যুর পরে বেড়ে যায়।” [২০৯]
এ হলো গায়রুল্লাহ সম্পর্কে তাদের আকীদা। তারা তাদের দুআ ও অভাব-অভিযোগে অন্যদেরকে শরীক করে এবং আল্লাহর গুণাবলি ও ক্ষমতা তাঁর কিছু সৃষ্টির মাঝে বন্টন করে, যেখানে ইসলামী শরীয়াতে মুখাপেক্ষীহীনতা (স্বয়ংসম্পূর্ণতা) ও সকল সাহায্য দান একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। বেরেলভীগণ এ সকল গুণাবলি তাদের আউলিয়াগণের মাঝে বন্টন করে দিয়েছে যা খ্রিষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামের উপর আরোপ করেছিল, ইহুদীরা উযায়র আলাইহিস সালামের উপর এবং মক্কার মুশরিকরা লাত, হোবল, উয্যা, মানাত এবং অন্যান্যদের উপর আরোপ করেছিল।
অফু লিকুম ওয়ালিমা তা'বুদুন - অর্থ “ধিক তোমাদের প্রতি এবং তোমরা যাদের ইবাদত কর, তাদের প্রতি!”
যেন এটা মনে করবেন না যে, বেরেলভীদের ইমাম জনাব আহমাদ রেযা বেরেলভীর স্রষ্টার এ সকল গুণাবলিতে কোনো অংশীদারিত্ব নেই! অন্যান্য আউলিয়াগণের মত সে (আহমাদ রেযা) নিজেও ছিলেন দাতা, আরোগ্যদানকারী, গাওস, সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, প্রয়োজন পূরণকারী এবং দুঃখ-কষ্ট দূরকারী!! তার এক মুরীদ তার পীর আহমাদ রেযা সম্পর্কে, তার গুণাবলি তার বই 'মাদায়ে'হ আলা হযরত'-এ লিখেছে, "
"ইয়া সাইয়্যেদী আমার মুরশীদ, ইয়া আমার মালিকী, ইয়া শাফী' (আরোগ্যদাতা)
হে দস্তগীর, হে সাইয়্যেদী আহমাদ রেযা,
(আপনি) অন্ধকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন,
বধিরকে শ্রবণশক্তি দান করেছিলেন,
নবীর দীনকে আলোকিত করেছিলেন,
হে সাইয়্যেদী আহমাদ রেযা
আত্মার অসুস্থতা ও উম্মাহর আত্মার জন্য আপনার দরজা ছিল আরোগ্যের দরবার,
হে সাইয়্যেদী আহমাদ রেযা।” [২১০]
একই ভক্ত আহমাদ রেযার সামনে অভিযোগ পেশ করছে এবং তার সামনে তার কাপড় বিছিয়ে দিচ্ছে এবং তাকে এভাবে ডাকছে, "হে আমার মালিক, হে আমার দাতা... (আশাকরি) আমি এক টুকরা পাব, অনেকদিন ধরেই তোমার এ কুকুর আশা করছে, হে প্রিয়, নিজ দয়ায় তাকে গ্রহণ কর, এই হতভাগা তোমার জন্য একটি চাদর 'নজরানা' হিসেবে এনেছে এ রিন্ডী দাসের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দাও যদিও সে মন্দ, একজন চোর (সর্বোপরি) সে তোমার কুকুর।" [২১১] অপর বেরেলভী মুরীদ লিখেছে, "কিয়ামত দিবসে আশ্রয়ের/নিরাপত্তার জন্য কী উপায় করেছ? (যখন) আহলুস সুন্নাহর ইমাম কর্তৃত্বের (ক্ষমতার) অধিকারী হবে?” [২১২]
"কার নিকট আমি আবেদন করব? পরম প্রভু ও মালিক ... আমি তোমার কাছে প্রশ্ন করি, তুমি ছাড়া আমার সাহায্যকারী কে আছে
সুন্নাতে আলা হযরত, আমি যা প্রার্থনা করেছি সর্বদা তা পেয়েছি, এবার কেন দেরী হচ্ছে? হে আমার দাতা প্রাচুর্য্যের অধিকারী, রিযিকদাতা,
সুন্নাতে আলা হযরত।
যখন আমি হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছি, তোমার ভিখারী অভাবে (রয়েছে)
এখন দয়া কর, হে আমার সাহায্যকারী
সুন্নাতে আলা হযরত।” [২১৩]
(আরো শুনুন)
"তিনি হলেন এমন ব্যক্তি যিনি অসহায় ব্যক্তিদের দুআ শুনেন, যার প্রয়োজন রয়েছে তাকে তিনিই দান করেন,
আমার তারকাসমূহ (ভাগ্যরাশিফল) কেন সর্বোচ্চ উচ্চতায় থাকবে না?
এখানে আছেন আমার মালিক এবং সেখানে রয়েছে আহমাদ রেযা,
আমি আমার (বদ) আমলের (কর্মের) ওজনকে কেন ভয় করব? (মীযানকে কেন ডরাব?)
আমাকে রক্ষা করার জন্য আমার রক্ষককে যখন ওজন করা হবে?” [২১৪]
অপর এক বেরেলভী কবির আকীদা,
"আমার তরী বিপদাপন্ন, আমায় সাহায্য করুন, আহমাদ রেযা,
চারিপাশ থেকে একসাথে বিপদ ঘনিয়ে আসছে, হে আমার বিপদে উদ্ধারকারী, আহমাদ রেযা,
আমার প্রসারিত হাতের সম্মান রক্ষা করুন, হে আমার প্রয়োজনপূরণকারী, আহমাদ রেযা,
আমার থলে পূর্ণ করে দাও, হে আমার দাতা, আমি তোমার দরজার ভিখারী, আহমাদ রেযা।” [২১৫]
অপর এক বেরেলভী কবি এ কবিতায় তার আকীদা ঘোষণা করছে,
“হে গাওস ও আউলিয়াগণের কুতুব, আহমাদ রেযা, আপনি আমায় বিপদ থেকে উদ্ধারকারী, আহমাদ রেযা
আপনারই (প্রতি) আশা উভয় জগতে, হ্যাঁ, আমাকে সাহায্য করুন, শাহ আহমাদ রেযা,
আমি আপনার এবং আপনি হলেন আমার, আহমাদ রেযা। [২১৬]
হে পাঠক! এগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করুন। এসকল আকীদা কি কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহকে বিদ্রূপের শামিল নয়? তাদের আকীদা এবং কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে কি কোনো মিল আছে? এ থেকে কি পরিষ্কার নয় যে, তাদের উদ্দেশ্য হলো শিরকী আকীদা ও ইসলাম-পূর্ব (জাহিলিয়্যাতের) ধ্যান-ধারণার ব্যাপক প্রচার-প্রসার? মক্কার মুশরিকদের আকীদা-বিশ্বাস কি এর চেয়ে বেশি খারাপ ছিল?
এ সম্পর্কে 'ওয়াকতে আছর' 'ফরীদ দাহর' (তুলনাহীন) ভারতীয় উপমহাদেশের খ্যাত মুফাসসির ও মুহাদ্দিস নওয়াব হাসান খাঁন-এর তাফসীর 'ফতহুল বায়ান' থেকে একটি অংশ উল্লেখ করাকে যথাযথ হবে বলে আমরা অনুভব করছি। নওয়াব হাসান খাঁন তার "তাফসীর ফাতহুল বায়ানে" এ আয়াত "বলুন (হে মুহাম্মদ) আমার নিজের কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা আমি রাখি না, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত”-এর তাফসীরে লিখেছেন-
"এ আয়াতে কারীমাতে এ সকল লোকদের জন্য মারাত্মক হুমকি রয়েছে যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিপদের সময় আহ্বান করার আকীদা পোষণ করে, কারণ (এ আয়াত) স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, বিপদে-আপদে একমাত্র আল্লাহই সাহায্য করার ক্ষমতা রাখেন। তিনি সেই মহান স্বত্তা যিনি রাসূলগণকে ও নেককারগণকে সাহায্য করেন। এ আয়াতেও আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর উম্মাতকে পরিষ্কার ভাষায় এ কথা বলতে যে, তিনি কোনো রকম উপকার বা ক্ষতির ক্ষমতা রাখেন না, এমনকি তাঁর নিজেরও না। কুরআন বলছে যে এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর ক্ষতি বা উপকার করার কোনো ক্ষমতা নেই, তাহলে কিভাবে তিনি 'মুখতারে কুল' (সবকিছুর মালিক) হতে পারেন?
আর যদি 'খাতামুন নাবিয়্যিন' সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর স্রষ্টাসুলভ ক্ষমতা না থেকে থাকে, তবে সৃষ্টির অন্যান্যদেরকে কিভাবে প্রয়োজনপূরণকারী ও বিপদে উদ্ধারকর্তা মনে করা যেতে পারে? এ ধরনের লোকদের দেখে আশ্চর্যই হতে হয় যারা তাদের সামনে হাত তুলে এবং তাদের নিকট প্রার্থনা করে এবং তাদের কে তাদের বিপদ-আপদে আহ্বান করে যখন তারা একমন মাটির নিচে অবস্থান করে (তাদের কবরে)!
তারা কেন এ শিরক পরিত্যাগ করে না এবং তারা কেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শিক্ষার উপরে চিন্তা-গবেষণা করে না? কখন তারা এ আয়াতের সঠিক তাফসীর জানবে, “বল (হে মুহাম্মদ) তিনি আল্লাহ একক।” (সূরা ইখলাস ১১২:১)? কখন তারা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্' এর সঠিক অর্থ অনুধাবন করবে?
তার উপর আবার যারা জ্ঞান-বুদ্ধির দাবি করে, তাদের বক্তা ও আলিমগণ, যাদেরকে লোকেরা তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা কেন তাদেরকে এসব শিরকী আকীদা-বিশ্বাস ও জাহিলিয়্যাতের চিন্তা-ধারা থেকে বারণ করে না? কেন তারা তাদের মুখে মোহর মেরে রেখেছে?
তাদের আকীদা জাহেলী যুগের লোকদের আকীদার চেয়েও মন্দ। তারা তো কেবল তাদের মা'বুদদেরকে (যাদেরকে তারা আহ্বান করতো) আল্লাহর নিকট তাদের জন্য সুপারিশকারী বলে মনে করতো। কিন্তু এ সকল লোকেরা আল্লাহর পরিবর্তে রুবুবিয়াতের সকল ক্ষমতা তাদের আউলিয়াদেরকে দিয়ে রেখেছে। তাদের পীরদের নিকট যখন তারা সরাসরি সাহায্য প্রার্থনা করে তখন তারা বিন্দুমাত্রও ভয় করে না।
শয়তান এদের মনে তার কু চিন্তা-ধারার বীজ বপণ করেছে। তারা অবিরামভাবে শয়তানের অনুসরণ করে যাচ্ছে এবং এমনকি তারা তা জানেও না। তারা মনে করছে তারা সুপথেই রয়েছে- কিন্তু তারা কেবল শয়তানের চক্ষুই জুড়াচ্ছে এবং তার (শয়তানের) আনন্দের সামান জোগাড় করছে। [২১৭]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ এর বক্তব্য উল্লেখ করে শেষ করব। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন,
বায়েজিদ বোস্তামী বলেছেলেন, “মাখলুক তথা সৃষ্টি কর্তৃক অপর মাখলুকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা ঠিক তেমনই, যেমন ডুবন্ত ব্যক্তির অপর কোনো ডুবন্ত ব্যক্তির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা।” শাইখ আবূ আব্দুল্লাহ আল কুরাশী বলেন,
“মাখলুক তথা সৃষ্টি কর্তৃক অপর মাখলুকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা ঠিক তেমনই, যেমন বন্দী ব্যক্তির অপর কোনো বন্দী ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা করা। আবার মূসা (আ.) তাঁর দুআয় বলেছিলেন,
اللهم لك الحمد واليك المشتكي وأنت المستعان وبك المستغاث وعليك توكلت ولا حول ولا قوة إلا بك.
হে আল্লাহ সকল প্রশংসা আপনারই। আপনার নিকটই সমস্ত আবেদন। আপনিই সাহায্যকারী। আপনার নিকটই আশ্রয় চাই। আপনার উপরই ভরষা করি। আপনি ছাড়া কারো কোন শক্তি ও ক্ষমতা নেই।
ফলে, সালফে সালেহীনদের কারো থেকেই এ কথা বর্ণিত হয়নি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা জায়েয। [২১৮]
টিকাঃ
২০০. আল ইসতিমদাদুল হাওয়ামিশ পৃ-৩৫-৩৬।
২০১. প্রাগুক্ত, পৃ-৩৪।
২০২. আল আমান ওয়াল আলা, পৃ-৩৪।
২০৩. হাকাইয়াত রিজভীয়া, পৃ.-৪৪
২০৪. রাসূল আল কালাম, দিদার আলী বেরেলভী, পৃ-২৯ লাহোর থেকে প্রকাশিত।
২০৫. প্রাগুক্ত, পৃ-১২৯।
২০৬. জা-আল হাক্ব, আহমাদ ইয়ার।
২০৭. প্রাগুক্ত, পৃ-২-৩।
২০৮. বাহারে শরীয়াত, আমজাদ আলী, ১ম খণ্ড, পৃ-৬।
২০৯. ফতোয়া না'ঈমিয়া, পৃ-২৪৯।
২১০. মাদায়ে'হ আলা হযরত, আউয়ুব রিযভী, পৃ-৫।
২১১. মাদায়ে'হ আলা হযরত, আউয়ুব রিযভী, পৃ. ৪-৫।
২১২. বাগ-ই ফেরদৌস, আউয়ুব রিযভী, পৃ-৪।
২১৩. মাদায়ে'হ আলা হযরত, পৃ-২৩।
২১৪. প্রাগুক্ত, পৃ-৫৪।
২১৫. মাগমাতুর রূহ, ইসমাঈল রিভী, পৃ-৪৪-৪৫।
২১৬. প্রাগুক্ত, নূর আহমদ আজমী, পৃ. ৪৭-৪৮।
২১৭. ফতহুল বায়ান, নওয়াব হাসান খাঁন, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-২১৫।
২১৮. ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু' ফতোয়া ১/১১২।