📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 তাদের আকীদাসমূহ

📄 তাদের আকীদাসমূহ


বেরেলভীদের সুনির্দিষ্ট কিছু বিশেষ আকীদা-বিশ্বাস রয়েছে যেগুলো তাদেরকে সাধারণভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের হানাফী মাযহাবের অনুসারী ও অন্যান্য ফিরকা থেকে আলাদা করেছে। তাদের অনেক আকীদা বিশ্বাস শিয়াদের আকীদার অনুরূপ। এটা বলা অযৌক্তিক হবে না যে, বেরেলভীয়্যাহ (ফিরকা) আহলুস সুন্নাহর চেয়ে শিয়াদেরই অধিক নিকটবর্তী, তবে বলা যাচ্ছে না কে কার দ্বারা প্রভাবিত। আমরা তাদের আকীদাসমূহ বর্ণনা করার পূর্বে পাঠকের সামনে দুটো বিষয় উল্লেখ করতে চাই।

ক. যে সকল আকীদা-বিশ্বাস বেরেলভীগণ অবলম্বন করেছে এবং যেগুলো ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলো এমনই কাল্পনিক, অন্ধ তাকলীদী (অনুসরণীয়), কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও অবাস্তব-উদ্ভট আকীদা বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছে, যেগুলো বিভিন্ন সময়ে সুফীগণের ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও সরল বিশ্বাসী লোকদের মাঝে সুবিদিত ছিল। আর ইসলামী হুকুম আহকামের সাথে এগুলোর কোনোই সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সেগুলো ইহুদী-খ্রিষ্টান ও কাফের-মুশরিকদের থেকে অতি সংগোপনে মুসলিমদের মাঝে প্রবেশ করেছে।

যুগে যুগে মুসলিম আলিম ও মুজতাহিদগণ এ সকল মিথ্যা-বাতিল আকীদা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের মাঝে এমন সব আকীদা বিশ্বাস রয়েছে যেগুলো ইসলাম-পূর্ব জাহেলী যুগের সাথে সম্পর্কিত এবং সেগুলোর খণ্ডন কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণীতেই পাওয়া যায়।

অতীব দুঃখের বিষয় যে, কিছু লোক বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, এসকল অনৈসলামী আকীদা এবং জাহিলিয়‍্যাতের আকীদায় বিশ্বাস করা ফরয এবং এগুলো ইসলামের মৌলিক আকীদা বিশ্বাসের মধ্যে গণ্য, যেখানে আল্লাহ তা'আলা ও রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেগুলোকে মিথ্যা বলে ঘোষণা করেছেন।

উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের নিকট কাকুতি মিনতি করে প্রার্থনা করা বা অভাব-অভিযোগ পেশ করা, নবী রাসূলগণের মানবত্বকে অস্বীকার করা, এ বিশ্বাস রাখা যে, কোনো ব্যক্তির গায়েবের জ্ঞান রয়েছে এবং নবী রাসূল ও ওলীগণকে আল্লাহর ক্ষমতায় শরীক করা যেগুলো কেবল আল্লাহ তা'আলার জন্যই খাস এবং এরকম আরো অন্যান্য বিশ্বাস যেগুলো সামনের অনুচ্ছেদসমূহে আমরা উল্লেখ করব (ইনশা আল্লাহ)। এখানে যা বোঝানো হচ্ছে তা হলো, এসকল বিকৃত, কুফরী এবং কাল্পনিক উদ্ভট কিচ্ছা-কাহিনীসমূহকে আকীদার নামে নামকরণ করা হয়েছে, এমনকি যদিও এ বিকৃতি, এ বিদআতসমূহ, মুশরিকদের রীতি-রেওয়াজ এবং জাহিলিয়্যাতের কুসংস্কারসমূহ, ধ্যান-ধারণা ও আকীদা-বিশ্বাসসমূহ জনাব আহমাদ রেযা বেরেলভী সাহেবের ও তার অনুসারীদের সম্মুখে উপস্থিত ছিল। কিন্তু তারা এ সবগুলোকে একটি একক রূপ দান করেছে এবং কুরআন-সুন্নাহর অর্থ বিকৃতির সাহায্যে এবং জাল-জয়ীফ হাদীসকে ব্যবহার করে সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার অপচেষ্টা করেছে।

খ. দ্বিতীয় বিষয়টি যা আমরা এখানে ব্যাখ্যা করতে চাই তা হলো আমরা এ অধ্যায়ে কেবল সেই সকল বেরেলভী আকীদাসমূহ উল্লেখ করব যেগুলো জনাব আহমাদ রেযা বেরেলভী, তার সহযোগীরা এবং তার দলের সুপরিচিত ব্যক্তিগণ তাদের কিতাবাদিতে লিখেছে। যাদেরকে তাদের মতে মর্যাদাসম্পন্ন বা বিশ্বস্ত বলে গণ্য করা হয় না, কিংবা যারা বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, এমনকি যদিও তাদের লেখাগুলো ও বাড়াবাড়ি-অতিরঞ্জনে পূর্ণ, আমরা সেসকল লোকদের থেকে কোনো উদ্ধৃতি দেব না, যাতে আমাদের অবস্থানের মধ্যে কোনো দুর্বলতা অগোচরে প্রবেশ করতে না পারে।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট আশ্রয় চাওয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করা

📄 ১. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট আশ্রয় চাওয়া ও সাহায্য প্রার্থনা করা


বেরেলভীরা এমনকিছু বলে যা ইসলামে নেই, বরং ইসলাম সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছে। যেমন-তারা বলে,

"আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছে যাদেরকে সৃষ্টির রোগ ও সমস্যা দূরীকরণের জন্য আল্লাহ বিশেষভাবে বাছাই করেছেন। লোকেরা তাদের সমস্যা এবং বিচার-আচার তাদের নিকট নিয়ে যাবে।" [১৪৪]

"আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নিকট সাহায্য চাওয়া ও আশ্রয় প্রার্থনা করা জায়েয বা বৈধ এবং পছন্দনীয়। অহংকারী কিংবা একগুয়ে ব্যতীত কেউ এর বিরোধিতা করবে না।" [১৪৫]

"যার কাছে সাহায্য চাওয়া হবে বা আশ্রয় প্রার্থনা করা হবে সে জীবিত হোক বা মৃত উভয়ই সমান। তারা নবী হোক বা রাসূল হোক বা আউলিয়া হোক কোন পার্থক্য নেই। কেননা তারা সেগুলো (প্রয়োজন পূরণ করা, বিপদ দূর করা, রোগ মুক্ত করা, দুঃখ কষ্ট দূর করা) দেয়ার মালিক।

বেরেলভী বলে, “নবী, রাসূল, আউলিয়া, আলিমগণ এবং নেককারগণের নিকট সাহায্য চাওয়া বা তাদের কাছে দুআ করা জায়েয। [১৪৬] তিনি আরো বলেন, আল্লাহর রসূল বিপদ আপদ দূরকারী ও অনুগ্রহকারী।”

সে আরও লিখেছে: "জিবরাঈল আলাইহিস সালাম হলেন দুঃখ-কষ্ট দূরকারী; তাহলে হুজুরে আকদাস (রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বিপদ-মুসীবত দূরকারী ও রোগের আরোগ্যদাতা হিসেবে গ্রহণ করতে কে দ্বিধা করে যখন তিনি জিবরাঈলের বিপদও দূর করে দেন।” [১৪৭]

শুধু রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ই স্রষ্টাসুলভ ক্ষমতার মালিক নন, উপরন্তু আলী (রাঃ)-ও সকল ক্ষমতার মালিক। আরবী কবিতা দিয়ে যুক্তি পেশ করেছে,

"আলী মুর্তজাকে ডাক, কারামতের প্রকাশ, তুমি তাকে পাবে এভাবে যে বিপদে সাহায্য করে সকল দুঃশ্চিন্তা এবং দুঃখ-কষ্ট নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তার বেলায়েতের দ্বারা, হে আলী, হে আলী!” [১৪৮]

শায়খ আব্দুল কাদের জীলানীরও অনুরূপ বিপদ দূর করা, রোগের আরোগ্যদান করা, সাহায্য করার ক্ষমতা আছে। তার উপর মিথ্যা ও অপবাদ আরোপ করে বেরেলভী ভদ্রলোক তার থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছে,

“যে দুঃখ-কষ্টে আমাকে আহ্বান করে, তার দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে এবং দুঃখ-কষ্টে যে আমার নাম ধরে ডাকে তার দুঃখ কষ্ট ম্লান হয়ে যাবে এবং যে ব্যক্তি যেকোনো প্রয়োজনে তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে এবং আমাকে ওসীলা বানায়, তার প্রয়োজন পূরণ হবে।” [১৪৯]

এমনকি কাযায়ে হাজত' এর জন্য তাদের রয়েছে 'সালাতুল গাউসিয়া'। এর পদ্ধতি হলো- “প্রতি রাক'আতে সূরা ইখলাস ১১ বার, দরুদ ও সালাম ১১ বার, তারপর বাগদাদের দিকে ১১টি 'জনাব শিমালী কদম' ফেলবে এবং প্রতি কদমে আমার নাম নিতে হবে এবং তার প্রয়োজনের কথা বলবে এবং এ পংক্তিটি আবৃত্তি করবে।”

"আমাকে কি কোনো দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করতে পারে যখন তুমি আমার সাহসের কারণ? এবং দুনিয়াতে কোনো ক্ষতি আমাকে স্পর্শ করতে পারে কি যখন তুমি আমার সাহায্যকারী?” [১৫০]

একথা লেখার পর আহমাদ ইয়ার গুজরাটি লিখেছে যে, এখন জানা গেল যে, যারা মরে গেছে তাদের কাছ থেকে সাহায্য কামনা করা জায়েয এবং উপকারী। জনাব বেরেলভী মাঝে মাঝেই এ পংক্তিগুলো আবৃতি করতো। [১৫১]

আল্লাহর ছায়া হে আব্দুর কাদের
আল্লাহর অংশ হে আব্দুল কাদের
দয়া কর দয়া কর দয়াময় আব্দুল কাদের
আমাদের বিপদ আপদ দূর করে দাও আব্দুল কাদের।

যেমন বেরেলভী লিখেছে, মুসলিমদের আশ্রয়স্থল হলেন আব্দুল কাদের।

বেরেলভী আরো লিখেছে, “ আমি যখনই সাহায্য প্রার্থনা করেছি বা আশ্রয় চেয়েছি কেবল আব্দুল কাদেরের নিকটই প্রার্থনা করেছি বা আশ্রয় চেয়েছি, তখন 'ইয়া গাউস' ই বলি, কিন্তু একদিন অন্য একজন ওলী (মাহবুবে ইলাহী) কে আহ্বান করার ইচ্ছা করেছিলাম, কিন্তু আমার জিহবা তা উচ্চারণ করতে পারেনি, কেবল 'ইয়া গাওস' শব্দটিই আমার মুখ থেকে বের হয়েছে।” [১৫২]

অর্থাৎ সে এমনকি আল্লাহকে ডাকতে পারত না, হে আল্লাহ! সাহায্য করুন' বলতে পারত না! বরং সে সর্বদা বলতো, 'হে গাওস'- আমাকে সাহায্য করুন!'

তাদের সাথে আহমাদ জারুকও দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে পারতো তাই বেরেলভী বুযুর্গগণ তাদের বইতে একটি আরবী কবিতা বর্ণনা করেছে,

"আমি আমার মুরীদগণের বিচ্ছিন্নতার একত্রকারী, যখন তাকে দুর্দশা দুঃখ-কষ্ট পীড়া দেয়, যদি সে দুঃখ-দুর্দশায়, 'হে জারুক'! বলে ডাকে তখন আমি দ্রুত তার কাছে চলে আসি।" [১৫৩]

অনুরূপ ইবনু আলওয়ান এসব ক্ষমতার মালিক, তাই বলা হয় যে, "কারো কোনো জিনিস হারিয়ে গেলে সে যদি চায় যে আল্লাহ তাকে সেটা ফিরিয়ে দিক, তবে সে কোনো উচ্চ স্থানে যাবে এবং কিবলা মুখী হবে অতঃপর সূরা ফাতিহাহ পাঠ করবে এবং এর সওয়াব নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং অতঃপর সাইয়্যেদ আহমাদ বিন আলওয়ানের উপর বশিয়ে দিবে, অতঃপর দুআ করবে-

'হে আমার নেতা, আহমাদ বিন আলওয়ান! তুমি যদি আমার (হারানো) জিনিস আমাকে ফিরিয়ে না দাও, তবে তোমাকে আউলিয়ার দপ্তর থেকেই আমি সরিয়ে দেব।" [১৫৪]

সাইয়্যেদ মুহাম্মদ হানাফী দূর থেকে শুনতে ও গায়েবীভাবে মুরীদকে সাহায্য করতে পারে। জনাব বেরেলভী লিখেছে,

"সাইয়্যেদ মুহাম্মদ শামসুদ্দীন আল হানাফী তার ব্যক্তিগত কামরায় উযু করছিলেন। হঠাৎ তিনি তার একটি সেণ্ডেল তুলে নিয়ে শূন্যে নিক্ষেপ করলেন এবং এটা অদৃশ্য হয়ে গেল। এমনকি যদিও তার সেই কামরায় কোথাও যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না। সে তার (অপর) সেণ্ডেলটি তার মুরীদকে দিয়ে একে সংরক্ষণ করতে বললেন যতক্ষণ প্রথম সেণ্ডেলটি ফিরে না আসে। অনেকদিন পর একটি লোক কিছু হাদিয়াসহ সেই সেণ্ডেলটি 'শাম' থেকে নিয়ে এল। বলল,

“আল্লাহ (মুহাম্মদ হানাফী) কে উত্তম পুরস্কার দান করুন। যখন একটি চোর আমার বুকের উপর চড়ে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, আমি মনে মনে বললাম, 'হে সাইয়্যেদী মুহাম্মদ হানাফী,' এবং ঠিক সে সময় এই সেণ্ডেলটি কোথা হতে জানি এলো এবং তার বুকে আঘাত করল, আর সে ব্যথায় পড়ে গেল।” [১৫৫]

অনুরূপ সাইয়্যেদ আহমাদ বাদাবীও লোকদের সাহায্য করে এবং তাদের সমস্যা ও দুঃখ কষ্ট দূর করে। যখন কেউ বিপদে পড়ে, তখন সে যেন বলে, “হে আমার মালিক, আহমাদ বাদাবী, আমাকে রক্ষা (সাহায্য) করো।” [১৫৬]

সাইয়্যেদ বাদাবীর নিজের থেকে বর্ণিত, "যার কোনো কিছু প্রয়োজন হয়, সে যেন আমার কবরের নিকট যায় এবং তার প্রয়োজন আমার কাছে চায়, তবে আমি তার প্রয়োজন পূরণ করব।” [১৫৭]

অনুরূপ আবু ইমরান মূসাও বলেন, "যখন তার কোনো মুরীদ তাকে আহ্বান করে, তখন সে তার জবাব দেয়, এমনকি যদিও সে শত বছরের রাস্তা কিংবা তার চেয়েও বেশি দূরত্বে অবস্থান করে।” [১৫৮]

এ ব্যাপারে বেরেলভী নিজের আকীদা প্রকাশ করেছে এবং লিখেছে, “কোনো ব্যক্তি কোনো নবী, রাসূল অথবা, ওলীর সাথে সম্পৃক্ত থাকে তখন তিনি (নবী, রাসূল বা ওলী) তার ডাকে উপস্থিত হন এবং তার প্রয়োজন সহজ করণে সাহায্য করেন।" [১৫৯]

সুফীবাদের সাথে সম্পৃক্ত আলিমগণেরও মুশকিল আসানের ক্ষমতা রয়েছে। জনাব আহমাদ রেযা লিখেছেন: "সুফী শায়খরা তাদের অনুসারী ও মুরীদগণের সুদিনে ও দুর্দিনে তাদের উপর নজর রাখে (হেফাজত করে)।" [১৬০]

কবরবাসীদের নিকট সাহায্য কামনা করার আকীদা উল্লেখ করার সময় জনাব বেরেলভী লিখেছে, “যখনই তুমি তোমার কাজে 'মেহতির' (সমস্যা)-এ পড়বে, তখনই কবরে শায়িত ওলীগণের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে।” [১৬১]

কবর যিয়ারতের মাহাত্ম্য বর্ণনা করার সময় আহমাদ রেযার এক অনুসারী লিখেছে, “কবর যিয়ারতের উপকারীতা রয়েছে, নেককার মৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করা যেতে পারে।" [১৬২]

সে আরো বলেছে, “কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্য হলো, কবরবাসীদের কাছ থেকে উপকার লাভ করা।" [১৬৩]

মূসা কাজিমের কবরের সম্পর্কে সে উল্লেখ করেছে, “ মূসা কাজিমের কবর একটি রোগ নিরাময়কারী ঔষধ।” [১৬৪]

অনুরূপ মুহাম্মদ বিন ফারগাল সম্পর্কে সে বলেছে যে, “যেকোনো প্রয়োজনে তার কবরের নিকট গিয়ে চাইলে সে তার প্রয়োজন পূরণ করবে।" [১৬৫]

আহমাদ রেযা বেরেলভী নিজে মুহাম্মদ বিন ফারগাল কে উদ্ধৃত করেছে যে, তিনি বলতেন, "আমি তাদের মধ্যকার একজন যারা তাদের কবরসমূহ অধিকার করে। সুতরাং যখনই কারো কোনো প্রয়োজন হয়, সে যেন আমার দিকে আমার মুখের কাছে আসে এবং তার প্রয়োজন প্রার্থনা করে, আমি তা পূরণ করব।" [১৬৬]

সাইয়্যেদ বাদাবীকে উদ্ধৃত করার পর সে লিখেছে যে, (তিনি বলেন), 'আমার ও তোমার মাঝে রয়েছে কেবল এই কয়েক মুঠো মাটি এবং যে লোকটিকে এই মাটি তার সঙ্গী-সাথীদের থেকে গোপন করে রাখে, সে তো কোনো পুরুষই নয়।” [১৬৭]

টিকাঃ
১৪৪. আল আমান ওয়াল আলা, আহমাদ রেযা খান বেরেলভী, পৃ-২৯, দারুত তাবলীগ, লাহোর।
১৪৫. রিসালা হায়াত আল মাউত ফী ফতোয়া রিযভিয়‍্যাহ, আহমাদ রেযা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৩০০, পাকিস্তান
১৪৬. প্রাগুক্ত।
১৪৭. মালফুযাত, পৃ-৯৯, লাহোর।
১৪৮. আল আমান ওয়াল আলা, পৃ-১৩।
১৪৯. বারকাতুল ইসতিমরায, বেরেলভী, রিসালা রিযভিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ-১৮১; এবং ফতোয়া আফ্রিকা, বেরেলভী।
১৫০. জা-আল হাক্ব, মুফতী বেরেলভী আহমদ ইয়ার খাঁন, পৃ-২০০।
১৫১. হাদায়িক বাকশীশ, পৃ-১৮৪।
১৫২. মালফুযাত, পৃ-৩০৭।
১৫৩. হায়াত আল মাউত ফী ফতোয়া রিযভিয়‍্যাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৩০০; এবং “জা-আল হাক্ক, পৃ-১৯৯।
১৫৪. জা-আল হাক্ক, পৃ-১৯৯।
১৫৫. মাজমুআ রাসাইল রিযভিয়্যাহ, বেরেলভী, ১ম খণ্ড, পৃ-১৮০, করাচি
১৫৬. প্রাগুক্ত
১৫৭. প্রাগুক্ত, পৃ-১৮১।
১৫৮. মাজমুআ রাসাইল রিযভিয়্যাহ, বেরেলভী, ১ম খণ্ড, পৃ-১৮২, করাচি।
১৫৯. ফতোয়া আফ্রিকা, বেরেলভী, পৃ-১৩৫।
১৬০. হায়াত ওয়াল মাউত ফী ফতোয়া রিজভীয়্যাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-২৮৯।
১৬১. আল আমান ওয়াল আলা, পৃ-৪৪।
১৬২. ফতোয়া কুয়ুদ, মুহাম্মদ উসমান বেরেলভী, পৃ-৩৯।
১৬৩. প্রাগুক্ত, পৃ-৪৩।
১৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ-৫।
১৬৫. আনওয়ারুল ইনতিবাহ ফী মাজমু' রাসায়েল রিজভীয়্যাহ, আহমাদ রেযা, ১ম খণ্ড পৃ-১৮২।
১৬৬. প্রাগুক্ত, পৃ-১৮২।
১৬৭. প্রাগুক্ত, পৃ-১৮১।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 কুরআন থেকে তাদের আকীদার খণ্ডন

📄 কুরআন থেকে তাদের আকীদার খণ্ডন


একদিকে এ হলো বেরেলভীদের আকীদাসমূহ এবং অপরদিকে রয়েছে কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীসের শিক্ষা। আপনি এগুলো তুলনা করতে পারেন যাতে সত্য প্রকাশিত হতে পারে যে, কুরআনে উল্লেখিত তাওহীদ বলতে কী বোঝায় এবং এদের আকীদাসমূহ কী কী। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
"আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং একমাত্র আপনার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি।” (সূরা আল ফাতিহা ১ : ৫)

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكِ وَمَا لَهُ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٍ
“(হে নবী) তুমি বল, তোমরা আহ্বান কর তাদেরকে যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে (মা'বুদ) মনে করতে, তারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অণু পরিমাণ কিছুর মালিক নয় এবং এতদুভয়ে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের কেউ তার সহায়কও নয়।" (সূরা সাবা ৩৪: ২২)

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ
"তোমরা তাদেরকে আহ্বান করলে তারা তোমাদের আহ্বান শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের আহ্বানে সাড়া দিবে না। তোমরা তাদেরকে যে শরীক করেছো তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞের ন্যায় কেউই তোমাকে অবহিত করতে পারে না।” (সূরা ফাতির ৩৫: ১৪)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
قُلْ أَرَعَيْتُمْ شُرَكَاءَكُمُ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّমَوَاتِ أَمْ ءَاتَيْنَهُمْ কিতাবاً فَهُمْ عَلَى بَيِّنَتٍ مِّنْهُ بَلْ إِن يَعِدُ الظَّالِمُونَ بَعْضُهُم بَعْضًا إِلَّا غُرُورًا
“বল, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো সেই সব শরীক (দেব- দেবীর) কথা ভেবে দেখেছো কি? তারা পৃথিবীতে কিছু সৃষ্টি করে থাকলে আমাকে দেখাও; অথবা আকাশমণ্ডলীতে (সৃষ্টিতে) তাদের কোনো অংশ আছে কি.? না কি আমি তাদেরকে এমন কোনো কিতাব দিয়েছি যার প্রমাণের উপর এরা নির্ভর করে? বস্তুত যালিমরা একে অপরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে।” (ফাতির ৩৫: ৪০)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ نَصْرَكُمْ وَلَا أَنفُسَهُمْ يَنصুরُونَ وَإِن تَدْعُوهُمْ إِلَى الْهُدَى لَا يَسْمَعُوا وَتَرَنَهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ وَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ
আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের কে ডাকো, তারা তোমাদের সাহায্য করার কোনো ক্ষমতা রাখেনা এবং তারা নিজেদেরকেও সাহায্য করতে পারে না। তাদেরকে যদি সঠিক পথের দিকে ডাক, তারা শোনে না, তুমি দেখ যে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আসলে তারা কিছুই দেখতে পায় না।” (সূরা আল আ'রাফ ৭: ১৯৭)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
لَهُ دَعْوَةُ الْحَقِّ وَالَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِهِ لَا يَسْتَجِيبُونَ لَهُم بِشَيْءٍ إِلَّا كَبَاسِطِ كَفَّيْهِ إِلَى الْمَاءِ لِيَبْلُغَ فَاهُ وَمَا هُوَ بِبَالِغِهِ، وَمَا دُعَاءُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ
"সত্যের আহ্বান তাঁরই; যারা তাঁকে ছাড়া আহ্বান করে অপরকে, তাদেরকে তারা কোনোই সাড়া দেয় না; তাদের দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মত, যে তার মুখে পানি পৌঁছবে এই আশায় তার হস্তদ্বয় প্রসারিত করে এমন পানির দিকে যা তার মুখে পৌঁছবার নয়, কাফিরদের আহ্বান নিষ্ফল।” (সূরা আর রা'দ ১৩: ১৪)

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَمَا أَنتُم بِمُعْجِزِينَ فِي الْأَرْضِ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِن وَلِي وَلَا نَصِيرِ
“তোমরা পৃথিবীতে (আল্লাহকে) ব্যর্থ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, সাহায্যকারীও নেই।" (সূরা আশ শুরা ৪২ : ৩১)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, মুশরিকদের এবং যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে ডাকে, তাদেরকে প্রশ্ন করেন যাতে তারা জবাব দিতে পারে। যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلْ أَفَرَءَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ، قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ
"তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বল, তোমরা কি ভেবে দেখেছো যে, আল্লাহ আমার অনিষ্ট চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের কে ডাকো তারা কি সেই অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা, তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি সে অনুগ্রহকে বন্ধ করতে পারবে? বল, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা তাঁর উপরই নির্ভর করে।" (সূরা আয যুমার ৩৯: ৩৮)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
أَمْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَءِلَهُ مَّعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
"কে তিনি, যিনি (নিরুপায়ের) আর্তের আহ্বানে সাড়া দেন, যখন সে তাঁকে ডাকে এবং বিপদ-আপদ দূরীভূত করেন এবং কে তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেন? আল্লাহর সাথে অন্য কোনো মা'বুদ আছে কি? তোমরা অতি সামান্যই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো।" (সূরা আন নামল ২৭: ৬২)

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ عِبَادُ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُواْ لَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাকো, তারা তো তোমাদেরই ন্যায় বান্দা, সুতরাং তোমরা তাদেরকে ডাকতে থাকো, যদি তোমরা (তোমাদের দাবিতে) সত্যবাদী হও তবে তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দিক।” (সূরা আল আ'রাফ ৭:১৯৪)

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
قُلْ مَن رَّبُّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ قُلْ أَفَاتَّخَذْتُم مِّن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ لَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ نَفْعًا وَلَا ضَرًّا قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّورُ أَمْ جَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ خَلَقُوا كَخَلْقِهِ، فَتَشَبَهَ الْخَلْقُ عَلَيْهِمْ قُلِ اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ الْوَاحِدُ الْقَهَّرُ
“বল, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক? বল, (তিনি) আল্লাহ; বল, তবে কি তোমরা অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছো আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে, যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়? বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান অথবা অন্ধকার ও আলো কি এক? তবে কি তারা আল্লাহর এমন শরীক স্থাপন করেছে যারা তাঁর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে যে কারণে সৃষ্টি তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ঘটিয়েছে? বল, আল্লাহ সকল বস্তুর স্রষ্টা; তিনি এক, পরাক্রমশালী।” (সূরা আর রা'দ ১৩: ১৬)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَّاثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانَا مَّরِيدًا
"তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে তারা কেবল নারী প্রতিমাপুঞ্জকেই আহ্বান করে (দেবীদের পূজা) এবং তারা কেবল বিদ্রোহী শয়তানদেরই আহ্বান করে।” (সূরা আন নিসা ৪: ১১৭)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّن يَدْعُوا مِن دُونِ اللَّهِ مَن لَّا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَن دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ
সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না। আর তারা তাদের ডাক সম্বন্ধে অবহিতও নয়।” (সূরা আল আহকাফ ৪৬:৫)

কুরআনের এ সকল আয়াতসমূহ হতে একথা পরিষ্কার যে,
১. কেবল আল্লাহই তাঁর বান্দাদেরকে সাহায্য করতে পারেন,
২. যারা অভাবী ও বিপদগ্রস্ত আল্লাহই তাদের কাজ সহজ করে দিতে পারেন এবং তাদের দুঃখ কষ্ট দূর করে দিতে পারেন।
৩. সকল মালিকানা ও আধিপত্যের এবং ক্ষমতার সীমা কেবল আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত।
৪. এই পুরো সৃষ্টিজগতের শৃংখলা তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন এবং কর্তৃত্বাধীন।
৫. আর সকল নবী-রাসূলগণ তাদের অভাব-অভিযোগ ও বিপদ-আপদে কেবল তাঁরই নিকট সকাতর প্রার্থনা করতেন এবং কেবল তাঁকেই সাজদা করতেন।
৬. 'আল্লাহ বাদে অন্য যে কারো (যেমন- নবী-রাসূলগণের) কাছে দুআ করা এবং অভাব - অভিযোগ পেশ করা জায়েয' - তাদের এ আকীদা পোষণ করা কুরআনের স্পষ্ট ও প্রকাশ্য আয়াতের সম্পূর্ণ বিরোধী।
৭. আল্লাহর নিকট আদম আলাইহিস সালাম এর ক্ষমা প্রার্থনা, নূহ আলাইহিস সালাম কর্তৃক তাঁর সন্তানের ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষার জন্য তাঁর প্রভুর নিকট প্রার্থনা করা, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কর্তৃক তাঁর সন্তানের জন্য আল্লাহর নিকট অনুনয় বিনয় করা, মূসা আলাইহিস সালাম, যিনি দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন, তাঁর সাহায্যের জন্য কেবল আল্লাহকেই ডাকা, ইউনুস আলাইহিস সালাম কর্তৃক ক্ষমা প্রার্থনা ও অনুশোচনার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট মাছের পেট হতে পরিত্রাণ প্রার্থনা করা, আয়ুব আলাইহিস সালাম কর্তৃক কেবল আল্লাহর নিকটই রোগমুক্তি প্রার্থনা করা - এ সকল ঘটনাবলি পরিষ্কার এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যে, আল্লাহ ছাড়া এমন আর কেউ নেই যার বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা আছে।

এসকল সাক্ষ্য-প্রমাণের বিপরীতে বেরেলভীদের আকীদা হলো, যদি কেউ যেকোনো নবী বা রাসূল কিংবা ওলীর সাথে সম্পর্কিত থাকে, তবে তিনি তাকে সাহায্য করতে আসেন। [১৬৮]

আহমাদ রেযার এক অনুসারী লিখেছে, "সকল আউলিয়া একটি স্থানে একত্রিত হয়ে বিশ্বজগৎ এমনভাবে দেখতে থাকে, যেন তা তাদের হাতের তালু এবং তারা নিকট ও দূর (সর্বস্থান) হতে শোনে। অথবা একমুহূর্তের মধ্যে পুরো জগৎ ভ্রমণ করে এবং বহু দূরের অভাবীরও অভাব মোচন (প্রয়োজন পূরণ) করে।" [১৬৯]

একদিকে এ হলো তাদের আকীদা এবং অন্যদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচাত ভাই ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে বলছেন,
"ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়ল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন একদা আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পেছনে ছিলাম।
فقال: يا غلام إني أعلمك كلمات احفظ الله يحفظك احفظ الله تجده تجاهك إذا سألت فاسأل الله وإذا استعنت فاستعن بالله واعلم أن الأمة لو اجتمعت على أن ينفعوك بشيء لم ينفعوك إلا بشيء قد كتبه الله لك ولو اجتمعوا على أن يضروك بشيء لم يضروك إلا بشيء قد كتبه الله عليك رفعت الأقلام وجفت الصحف.

তিনি বললেন, হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি- তুমি আল্লাহকে (বিধান) হেফাযত করবে, তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে, তুমি আল্লাহকে নিকটে পাবে। তোমার কোনো কিছু চাইতে হলে আল্লাহর নিকটই চাইবে, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করবে। আর জেনে রাখ, সমস্ত উম্মাতও যদি একত্রিত হয়ে তোমার কোনো কল্যাণ করতে চায়, তবে আল্লাহ তোমার জন্য যেটুকু লিখে রেখেছেন, তা ব্যতীত কোনো কল্যাণই করতে পারবে না। আর যদি তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায়, তবে আল্লাহ যতটুকু তোমার জন্য লিখে রেখেছেন, তা ব্যতীত কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। কলমসমূহ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, দফতরসমূহ শুকিয়ে গেছে। (তিরমিযী, তাহকীক আলবানী হা/২৫১৬, বঙ্গানুবাদ তিরমিযী হা/২৪৫৬, তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ)।"

কিন্তু জনাব বেরেলভী বলছে, “যখন দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হবে তখন কবরবাসীর নিকট সাহায্য কামনা কর।” [১৭০]

সর্বোপরি, জনাব বেরেলভী সাহেব শুধু কুরআনের আয়াতেরই বিরোধিতা করেননি, বরং যারা মুজাহিদী শক্তি নিয়ে শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হয় এবং যারা এ সকল সুস্পষ্ট আয়াতের অনুসরণ করে ও এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, অভাবী ও দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের আহ্বান একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই শোনেন, তাদের প্রয়োজন পূরণ করেন এবং কেবল তিনিই এককভাবে কারো প্রয়োজন পূরণে ও দুঃখ- দুর্দশা দূরীকরণে সক্ষম, এ বেরেলেভী খান সাহেব (আহমাদ রেযা) তাদের বিরোধী হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, গালমন্দ করে এবং অসন্তুষ্টির সাথে (তাদের বিরুদ্ধে) লিখে যে, “আমাদের যুগে এমন কতিপয় লোক রয়েছে যারা আউলিয়াগণের থেকে সাহায্য চাওয়াকে অবিশ্বাস করে এবং বলে, 'তারা যা বলে সে ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞান নেই, তারা কেবল নিজেরা আন্দাজ-অনুমান করে।” [১৭১]

এ ধরনের লোকদের ব্যাপারেই আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ ءَابَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ ءَابَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ
"আর যখন তাদেরকে বলা হয়, 'তোমরা অনুসরণ কর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন', তারা বলে, 'বরং আমরা অনুসরণ করব আমাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে যার উপর পেয়েছি'। যদি তাদের পিতৃ-পুরুষরা কিছু না বুঝে এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত না হয়, তাহলেও কি?” (সূরা আল বাকারা ২: ১৭০)

আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ
"আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে।” (সূরা আল বাকারা ২: ১৮৬)

আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
আর তোমাদের রব বলেছেন, ' তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহঙ্কারবশত আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সূরা গাফির (মু'মিন) ৪০ : ৬০)

টিকাঃ
১৬৮. ফতোয়া আফ্রিকা, বেরেলভী, পৃ-১৩৫
১৬৯. জা-আল হাক্ব, আহমাদ ইয়ার খান, পৃ-১৩৮-১৩৯।
১৭০. আল-আমান ওয়াল আলা, পৃ-৪৬।
১৭১. রিসালা আল হায়াত ওয়াল মাউত ফী ফতোয়া রিযভিয়‍্যাহ, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-৩০১-৩০২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px