📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১০. বেরেলভীদের নেতৃবর্গ

📄 ১০. বেরেলভীদের নেতৃবর্গ


বেরেলভীদের কিছু বড় বড় ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে আমরা এ অধ্যায়টি শেষ করতে চাই, যারা বেরেলভী মতবাদ গঠন, প্রতিষ্ঠা ও এ মতবাদকে শক্তিশালী করতে এবং এ মতবাদের আকীদা, বিশ্বাস, মূলনীতি গঠন করতে সাহায্য করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

(১) নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী। তার জন্ম জানুয়ারী ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি জনাব বেরেলভী সাহেবের সমসাময়িক ছিলেন। সেও জনাব বেরেলভী সাহেবের মত তাওহীদ ও সুন্নাহর বিরোধিতা এবং শিরক ও বিদআতের সমর্থন করেছিল এবং সে শরীয়াত বিরোধী অনুষ্ঠান ও রসম রেওয়াকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তার একটি মাদরাসা ছিল যাকে 'মাদরাসা আহলুস সুন্নাহ' বলা হতো। অতঃপর তা 'জামিয়াহ নাঈমিয়াহ' তে পরিবর্তিত হয়েছিল। এ মাদরাসা হতে পাশ করা ছাত্রদেরকে 'নাঈমী' বলে ডাকা হয়। তার রচনাবলির একটি হলো, 'খাজাইন আল আরফান", আহমাদ রেযা খানের কুরআনের তরজমার সাথে প্রকাশিত হয়েছিল। 'আত তাইয়েবুল বয়ান, যা শাহ ইসমাইল শহীদের 'তাকভীয়াতুল ঈমান' এর জবাবে লিখিত [১৪০] এবং আল কালিমাতুল উলিয়্যা উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বেরেলভীগণ তাকে 'সদরুল ফাযিল' উপাধিতে ভূষিত করে।

(২) আমজাদ আলী, যিনি ভারতের আযমগড় জেলায় ১৩২০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং জৌনপুরের 'মাদরাসা ই হানাফিয়্যাহ'-তে পড়াশোনা করেন। জনাব আমজাদ আলী কিছু সময়ের জন্য আহমাদ রেযার তত্ত্বাবধানেও ছিলেন। সে আহমাদ রেযার মতবাদ প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করে। তার বই "বাহারে শরীয়াত" বেরেলভী ফিকহের প্রামান্য গ্রন্থ, যাতে আহমাদ রেযার মতাদর্শের আলোকে ব্যাখ্যাকৃত ফতোয়া রয়েছে। তিনি ১৩৬৭ হিজরী, ১৯৪৮ সনে মারা যান।

(৩) সৈয়দ দীদার আলী। যিনি ১২৭০ হিজরীতে নওয়াবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আহমাদ আলীর নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১২৯৩ হিজরীতে তার শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তিনি স্থায়ীভাবে লাহোরে চলে যান। তার সম্পর্কে বলা হয় যে, মাওলানা দীদার আলী লাহোরকে ওয়াহাবী এবং দেওবন্দী ফিতনা হতে রক্ষা করেন। তিনি ১৯৩৫ খ্রি. মৃত্যুবরণ করেন। [১৪১] তার কর্মের মধ্যে "তাফসীর মিযান-আল-আদিয়‍্যান" এবং "আলামাতে ওয়াহাবীয়্যাহ" ছিল উল্লেখযোগ্য।

(৪) হাশমত আলী। তিনি লাক্ষ্মৌ এ জন্ম নেন। তার বাবা ছিলেন সাইয়্যেদ 'আইন আল-কাদাহ'-এর মুরীদগণের অন্যতম। তিনি জনাব বেরেলভীর মাদরাসাহ 'মানজারে ইসলামে' পড়ালেখা করেন। তিনি আমজাদ আলীর অধীনেও লেখাপড়া করেন এবং ১৩৪০ হিজরীতে তার পড়ালেখা শেষ করেন। তিনি আহমাদ রেযার ছেলের নিকট হতে সনদ লাভ করেন এবং অতঃপর আহমাদ রেযার আকীদা বিশ্বাস প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। আহমাদ রেযার ছেলে তাকে "গাইযুল [১৪২] মুনাফিকীন" উপাধি দেন। ১৩৮০ হিজরীতে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অতঃপর 'বীলী ভেট' এ মৃত্যু করেন। [১৪৩]

(৫) আহমাদ ইয়ার নাঈমী। সে বাদাইয়্যুন এ ১৯০৬ খ্রি. জন্মগ্রহণ করে। সে প্রাথমিকভাবে দেওবন্দী মাদরাসা 'আল মাদরাসাতুল ইসলামিয়্যাহ'-তে লেখাপড়া করেন। অতঃপর সে নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদীর নিকট গমন করে এবং তার নিকট থেকে লেখাপড়া শেষ করেন। অনেক শহর ঘুরে বেড়ানোর পরে সে অবশেষে গুজরাটে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে 'জামেয়া গাউসিয়া' নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার বই 'জা আল-হাক্ব'-এ জনাব বেরেলভীর মতবাদ জোরালোভাবে সমর্থন করেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধিতার উপর জোর দেন। জনাব আহমাদ ইয়ার সাহেব আহমাদ রেযা খানের 'কুরআনের তরজমা'-এর জন্য নূর আল ইরফান একটি হাশিয়া লিখেন, যেখানে সে কুরআনের অনেক আয়াতের তা'বীল করে এবং অর্থের বিকৃতি সাধন করে। এ ধরনের নামের আরো একটি বই আছে। সে ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

এ হলো বেরেলভী মতাদর্শের নেতৃবৃন্দ (আকাবীগণ) যারা এ মাযহাবের মূলনীতি ও বিধি বিধানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছে। এরাই আহমাদ রেযা কর্তৃক রোপিত চারা গাছের লালন-পালন ও পরিপুষ্টি সাধনের কাজ আঞ্জাম দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে তাদের আকীদা-বিশ্বাসসমূহের (বিস্তারিত) ব্যাখ্যা করব।

টিকাঃ
১৪০. এ বইয়ের খণ্ডনে একই মুরাদাবাদের আহলুল হাদীসের আলেম মাও: আযিযুদ্দীন মুরাদাবাদী কর্তৃক লিখিত তার বই "আকমালুল বয়স ফী তা'ঈদ তাকবীয়াতুল ঈমান-এ নাঈমুদ্দীনের এর দাবিসমূহকে মিথ্যা প্রমাণ করেন।
১৪১. (প্রাগুক্ত, পৃ-৯৪; তাযকীরাহ উলামা-এ আহলুস সুন্নাহ)
১৪২. [রাগ, ক্রোধ]
১৪৩. [তাযকীরাহ উলামায়ে আহলুস সুন্নাহ, মাহমুদ বেরেলভী. পৃ-৮২, কানপুর]

ফন্ট সাইজ
15px
17px