📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৮. আহমাদ রেযার মৃত্যু

📄 ৮. আহমাদ রেযার মৃত্যু


সে বক্ষব্যাধী রোগে মারা যায়। তার মৃত্যুর পূর্বে সে অনেকগুলো ওসীয়ত করে যায়, যা ওসীয়ত শরীফ নামে একটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। আহমাদ রেযা তার মৃত্যুর পূর্বে বলে, সকল ফরযের মধ্যে বড় ফরয হলো আমার দীন ও মাযহাবের উপর কায়েম থাকা যা আমার কিতাবসমূহে পাওয়া যাবে। [১১৭]

সে আরো বলে: “হে প্রিয় ভাইয়েরা! আমি কতদিন তোমাদের মাঝে অবস্থান করবো, আমি জানিনা। তোমরা হলো মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিষ্পাপ মেষ। তোমরা চারিপাশ দিয়ে নেকড়ে দ্বারা পরিবেষ্টিত, যারা তোমাদেরকে (যার উপর তোমরা রয়েছ, তা থেকে) পথভ্রষ্ট করতে চায়। আর তোমাদেরকে দুঃখ- কষ্টের সময় গ্রাস করতে চায়। তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাক এবং তাদের থেকে দূরে থাক - যেমন দেওবন্দীগণ ও তারা ব্যতীত অন্যান্যরাও।” [১১৮]

তার ওসীয়তনামার শেষে সে লিখেছে: যদি তোমাদের ইচ্ছা হয়, তবে নিম্নোক্ত জিনিসগুলো হতে কিছু জিনিস মানতের সময় সপ্তাহে দুইবার করে আমার নিকট পাঠিও। গৃহে উৎপন্ন হিমশীতল ঠাণ্ডা বরফ (অথবা যদি সম্ভব হয়) মহিষের দুধ হলে ভাল হয়, বিরিয়ানী, পোলাও, গোল্ডের শামী কাবাব, প্যারাঠি (তেল বা ঘি'-এ ভাজা পিঠা) এবং মাখন, ফিরনী, মসুরীর ডাল, আদা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস, গোস্তের কাচরী [গোল্ডের পুর দেওয়া ভাজা পিঠা], আপেলের রস, ডালিমের রস, সোডা বোতল, হিমশীতল দুধ।

যদি পার এগুলোর মধ্যে হতে প্রতিদিন একটি করে যোগাড় কর, অথবা যা সহজ হয় তাই কর।" আর পাদটীকায় উল্লেখ করা হয়েছে, “ছোট মাওলানা বললেন, আপনি পুনরায় হিমশীতল দুধের কথা উল্লেখ করলেন। 'হুজুর! আপনি ইতোমধ্যেই এটি উল্লেখ করেছেন।' তাই তিনি (আহমাদ রেযা) বললেন, “ওটা আবার লিখ। ইনশা আল্লাহ আমার রব আমাকে কেবল বরফই (বা তুষার) প্রদান করবেন।” এবং সে রকমই ঘটেছিল, দাফনের সময় এক ব্যক্তি বাড়িতে উৎপন্ন হিমশীতল দুধ এনেছিল। [১১৯]

বেরেলভী ফিরকার আহমাদ রেযা ২৫শে সফর, ১৩৪০ হিজরী (১৯২১ খ্রি.) সালে ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে। [১২০] মনে হয়, জনাব বেরেলভীর জানাযায় লোকের উল্লেখযোগ্য লোক সমাগম হয়নি। যাহোক, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছিনা, কারণ কোনো প্রমাণ ব্যতীত কোনোকিছু উল্লেখ করা আমাদের লেখার পদ্ধতি বিরুদ্ধ (কাজ) বলে আমরা মনে করি। যাহোক, আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্য- প্রমাণ থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তার তীব্র/ বিদ্রূপাত্মক ভাষা, ছোট-খাট বিষয়ে তার কুফরী ফতোয়া জারী করা এবং তার ব্রিটিশ বিরোধিতার ঘাটতির কারণে লোক জন তার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল।

এক বেরেলভী লেখক দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছে যে, মুসলিমগণ আহমাদ রেযার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। [১২১] আবার, তার 'খিলাফত'-এর বিরোধিতার কারণে তার ভক্ত ও মুরীদগণ তার সম্পর্কে হতাশ হয়ে গিয়েছিল। [১২২]

যখন বেরেলভীদের ইমাম ও মুজাদ্দিদ (এর কথা) আসে তখন তার ভক্ত মুরীদরা যেকোনো একভাবে অতিরঞ্জন এবং বাড়াবাড়ি করে। এমনকি যদি তার জানাযা অন্যান্য দীনি আলেমদের মতো হতো, তবে তাদের বই পুস্তক এ ধরনের (ঘটনার) অতিরঞ্জনে পরিপূর্ণ থাকতো। কিন্তু তারা এর প্রতি কোনো রকম মনোযোগ দেয়নি। যাহোক, তার জানাযার ব্যাপারেও তারা বাড়াবাড়ি করতে ছাড়েনি কেবল লোকদের উপস্থিতি ('র বিষয়টি) বাদে।

টিকাঃ
১১৭. [ওয়াসীয়াত শরীফ, পৃ-১০]
১১৮. হায়াতে আলা হযরত বেরেলভী, বাস্তাওয়ী, পৃ-১০৫
১১৯. (ওয়াসীয়াত শরীফ, পৃ-১০৮:১০৯)
১২০. [বাস্তাওয়ী, পৃ-১১১]
১২১. [মুকাদ্দিমা, " দাওয়াম আল আইশ", মাসুদ আহমেদ, পৃ-৮]
১২২. [প্রাগুক্ত]
১২৩. [আনওয়ার রেযা, পৃ-২৭২; প্রাগুক্ত রূহু কী দুনিয়া, মুকাদ্দিমা, পৃ-২২]

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৯. তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন

📄 ৯. তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন


যদিও তেমন কিছুই না, তবুও এখানে অনেক কল্পিত কাহিনী আছে, যারা কল্পকাহিনীর দাস তারা কল্পকাহিনী আবিষ্কার করা ছাড়া আর কি করবে? এক ভদ্রলোক লিখেছে, যখন আহমাদ রেযার লাশের খাটিয়া উঠানো হলো তখন কিছু লোক দেখেছিল যে, কিছু ফেরেশতা তা তাদের কাঁধে উঠিয়ে নিলো। [১২৩]

তারা তার সম্পর্কে আরো বলে থাকে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল সাহাবীদেরকে নিয়ে বেরেলভীর আসার অপেক্ষায় বসে ছিলেন, যখন তাকে তার ও সাহাবীদের চুপ করে থাকার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো তখন তিনি বললেন আমরা বেরেলভী আসার অপেক্ষা করছি। এর থেকেও তারা বাড়িয়ে বলে, বেরেলভীর গোসলের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুগন্ধি হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন।

তাদের বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনগুলো উল্লেখ করতে গিয়ে আরো কিছুর তালিকা দিতে হচ্ছে:
১. আমি কিছু পীরদের বলতে শুনেছি যে, আহমাদ রেযাকে দেখার পর তাদের সাহাবীদেরকে দেখার আকাংখা কমে গেছে। [১২৪] "বিগত দুই দশকের মধ্যে এমন আলিম (অর্থাৎ আহমাদ রেযার মত) কেউ দেখেনি। [১২৫]
২. তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ ক্ষমতা ও কারামতের কোনো সীমা ছিল না। আহমাদ রেযা সাহেব তার জ্ঞান ও মতামতের নির্ভুলতা ব্যাপারে ছিলেন অদ্বিতীয়। [১২৬]
৩. "আহমাদ রেযা ধর্মীয় জীবন ও শিক্ষার পুনুরুজ্জীবন দান করেছিলেন।" [১২৭]
৪. ফতোয়া রিভীয়াহ-তে এমন হাজারও প্রসঙ্গ রয়েছে যা আলেমগণ (কখনো) শুনেননি। [১২৮]
৫. "যদি আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ "ফতওয়া রিষ্ট্রীয়াহ” কিতাবটি দেখতেন তবে তিনি এর লেখককে তাঁর সাথীদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করতেন। [১২৯]
৬. "আহমাদ রেযা তার যুগের ইমাম আবু হানীফা ছিলেন।" [১৩০]
৭. "আহমাদ রেযা তার অন্তরে আবু হানীফার কিয়াসী বুদ্ধিমত্তা, আবু বকর রাজির বিচক্ষণতা এবং কাজী খানের স্মৃতি ধারণ করেছিলেন।" [১৩১]
৮. "আহমাদ রেযা, সত্যের ক্ষেত্রে সিদ্দিকে আকবার (আবু বকর (রা)) এর প্রতিচ্ছবি ছিলেন, মিথ্যাকে আলাদা করার ক্ষেত্রে তিনি ফারুকে আযম (ওমর ফারুক(রা))-এর বিস্ময়কর অনুলিপি ছিলেন; দানশীলতা ও দয়ার ক্ষেত্রে তিনি যুন্নুরাইন (উসমান (রা))-এর ছায়া ছিলেন এবং মিথ্যা বিলুপ্তিকরণে তিনি হায়দার (আলী (রা))-এর তরবারী ছিলেন।” [১৩২]
৯. আহমাদ রেযা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুজিযাসমূহের মধ্য হতে একটি মুজিযা ছিলেন। [১৩৩]
১০. 'আহমাদ রেযা দুনিয়ায় আল্লাহর হুজ্জাত ছিলেন।

এ সকল অতিরঞ্জিত দাবিসমূহ থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, খাঁন সাহেব বেরেলভী'র ভক্ত মুরীদরা তাকে পবিত্র বলে ঘোষণা করতে চেয়েছে এবং তা করতে গিয়ে তারা একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছে।

আমরা পূর্ববর্তী পাতাগুলোতে উল্লেখ করেছি যে, বেরেলভীগণ বিশ্বাস করতো যে, তাদের আহমাদ রেযা ভুল থেকে 'মাহফুজ' (রক্ষিত) (অর্থাৎ ভুলের উর্ধ্বে) এবং পাপ হতে পবিত্র (মা'সুম); আর নিঃসন্দেহে এটা নবীগণের জন্য খাস এবং আর অন্য কোনো ব্যক্তি মা'সুম - এ কথা বিশ্বাস করা 'খতমে নবুয়াত' অস্বীকার করার শামিল। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথ দেখান এবং এ ধরনের আকীদা থেকে মুক্ত রাখুন। আমীন।

কিছু মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি/অতিরঞ্জনের উল্লেখ করার পর আরও কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা এ আলোচনা শেষ করতে চাই। বলা হয়েছে যে, যখন জনাব আহমাদ রেযার বয়স সাড়ে তিন বছর, তখন সে একটি বাজার অতিক্রম করছিল। সে কেবল একটি বড় কুর্তা পরিহিত ছিল। কিছু তাওয়াইফ (বাইজী/নর্তকী) তার দিকে আসছিল। সে তার কুর্তা উঁচু করল এবং এ দিয়ে তার চোখ ঢাকল। তাওয়াইফ বলল: “হে ক্ষুদে শিশু! তুমি তোমার চোখ ঢেকেছো ঠিকই কিন্তু তোমার সতর খুলে ফেলেছ। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে বেরেলভীদের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, যখন দৃষ্টি ভ্রষ্ট হয়, তখন ক্বলবও ভ্রষ্ট হয়। যখন ক্বলব ভ্রষ্ট হয় (কেবল তখনই) সতর ভ্রষ্ট হতে পারে।" [১৩৪]

এখন কে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে যে, সাড়ে তিন বছর বয়সে তার দিকে আগত সাথীরা যে নর্তকী ছিল তা সে কিভাবে জেনেছিল এবং ছোট শিশু, যে এখনও সতর ঢাকা-ই শুরু করেনি, সে কিভাবে দৃষ্টির 'ভ্রষ্ট হওয়া' এবং কলবের জন্য সতরের 'ভ্রষ্টতার কারণ হওয়া' সম্পর্কে জেনেছিল? কিন্তু মিথ্যা বলার জন্য কোনো বুদ্ধি-জ্ঞানের দরকার পড়ে না।

"আহমাদ রেযার পাণ্ডিত্যের ভয়ে ইউরোপের জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা এবং এশিয়ার দার্শনিকগণ থর থর করে কাঁপতেন।" [১৩৫] “আহমাদ রেযা তার বিস্ময়কর স্মৃতি শক্তির মাধ্যমে ১৪ শত বছর পর্যন্ত সকল কিতাবাদি মুখস্থ করেছিল। তার মহান খ্যাতির বর্ণনা করার মত ভাষা খুঁজে পেতে ভাষাবিদরাও অক্ষম ছিল।" [১৩৬] "যখন আহমাদ রেযা হজ্জ করতে যান, মাসজিদে খাইফে তাকে মাগফিরাতের (ক্ষমার) সুসংবাদ প্রদান করা হয়।” [১৩৭]

তিনি ছিলেন মুজাদ্দিদ, সাইয়্যিদ, ইমাম, মুরশিদ, মালেকি, শাফেঈ, তার দরজা রোগমুক্তির দরজা, তিনি চোখসমূহের জোত্যি, কর্ণসমূহের শ্রবণ, তিনি আল্লাহর নূরের চেরাগ, মুছত্বফার সুন্দর আয়না, আল্লাহর সিংহ এছাড়াও আরো অনেক বাড়াবাড়ি রয়েছে। যেমন- তিনি প্রয়োজন পূরণকারী, বিপদ দূরকারী, মুশকিল আসানকারি, কাওসারের পানি দানকারী, কবর, পুনরুথথান ও হাশরের সাথি, তিনি গাওস, কুতুবুল আওলিয়া, তিনি মুসত্মফা ও খিযিরের খলিফা, হেদায়াতের সাগর, তিনি সব কিছু ও রিযিক দেনেওয়ালা।

এ হলো জনাব বেরেলভী এবং তার অনুসারীরা এবং এ হলো তাদের শিক্ষা যা তারা বিস্তারিতভাবে লিখে প্রচার-প্রসার করে থাকে। অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে তাদের কোনো জুড়ি নাই। যারা আসে, মনে হয় তারা প্রত্যেকেই যারা চলে যায় (মৃত্যুবরণ করে) তাদেরকে শিরকে পরিপূর্ণ এ ধরনের নোংরামির দ্বারা সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করে। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত দান করুন।

আবার, "আমার হৃদয় হলো একটি হৃদয় (পাত্র) এবং যদি যেকোনো জ্ঞানের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, তৎক্ষণাৎ তার একটি জবাব চলে আসে। [১৩৮] একবার বেরেলভী খান সাহেবের পীর সাহেব তার নিরাপত্তার জন্য দুটি কুকুর সংগ্রহ করেন। তখন সে (আহমাদ রেযা) তার দুই ছেলেকে তার পীর সাহেবের নিকট নিয়ে আসে এবং বলে যে, "আমি আপনার নিকট সুন্দর ও ভাল জাতের দুটি কুকুর নিয়ে এসেছি। দয়া করে তাদের গ্রহণ করুন।” [১৩৯]

সুতরাং এ হলো আহমাদ রেযা খান সাহেবের ব্যক্তিত্বের দুটি রূপ। একদিকে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ইমাম, গাউস, কুতুব এবং বিপদ দূরকারী ইত্যাদি উপাধিসহ; আবার অপরদিকে সে একটি নীচু শ্রেণির নোংরা প্রাণীর (কুকুরের) সাথে নিজের তুলনা করে গর্ববোধ করে।

টিকাঃ
১২৪. [ওযাসীয়াত শরীফ, তারতীব হুসনাইন রেযা, পৃ-২৪]
১২৫. [প্রাগুক্ত]
১২৬. [শারহ আল হাকুক, মুকাদ্দিমাহ, পৃ-৮]
১২৭. [প্রাগুক্ত, পৃ-৭]
১২৮. [বাহারে শরীয়াত, '১ম খণ্ড, পৃ-৩]
১২৯. (মুকাদ্দিমা, ফাতওয়া রিযভীয়াহ, ১১ খণ্ড, পৃ-৪)
১৩০. (মুকাদ্দিমা, ফতোয়াহ রিযভিয়‍্যাহ, ৫ম খণ্ড)
১৩১. [আনওয়ার রাজা, পৃ-২১০]
১৩২. [প্রাগুক্ত, পৃ-৩৬২]
১৩৩. [প্রাগুক্ত, পৃ-২৯০]
১৩৪. [সাওয়ানেহ আলা হযরত, বদরুদ্দীন, পৃ-১১০; আনোয়ার রেযা]
১৩৫. (রূহু কী দুনিয়া, পৃ-২৬)
১৩৬. [ আনোয়ার রেযা, পৃ-২৬৫]
১৩৭. [হায়াতে আলা হযরত জাফরুদ্দীন বিহারী, পৃ-১২; আনওয়ার রেযা, পৃ-২৩৫]
১৩৮. [মুকাদ্দিমা শারহুল হুকুক]
১৩৯. [আনোয়ার রেযা, পৃ-২৩৮]

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ১০. বেরেলভীদের নেতৃবর্গ

📄 ১০. বেরেলভীদের নেতৃবর্গ


বেরেলভীদের কিছু বড় বড় ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে আমরা এ অধ্যায়টি শেষ করতে চাই, যারা বেরেলভী মতবাদ গঠন, প্রতিষ্ঠা ও এ মতবাদকে শক্তিশালী করতে এবং এ মতবাদের আকীদা, বিশ্বাস, মূলনীতি গঠন করতে সাহায্য করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

(১) নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী। তার জন্ম জানুয়ারী ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি জনাব বেরেলভী সাহেবের সমসাময়িক ছিলেন। সেও জনাব বেরেলভী সাহেবের মত তাওহীদ ও সুন্নাহর বিরোধিতা এবং শিরক ও বিদআতের সমর্থন করেছিল এবং সে শরীয়াত বিরোধী অনুষ্ঠান ও রসম রেওয়াকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তার একটি মাদরাসা ছিল যাকে 'মাদরাসা আহলুস সুন্নাহ' বলা হতো। অতঃপর তা 'জামিয়াহ নাঈমিয়াহ' তে পরিবর্তিত হয়েছিল। এ মাদরাসা হতে পাশ করা ছাত্রদেরকে 'নাঈমী' বলে ডাকা হয়। তার রচনাবলির একটি হলো, 'খাজাইন আল আরফান", আহমাদ রেযা খানের কুরআনের তরজমার সাথে প্রকাশিত হয়েছিল। 'আত তাইয়েবুল বয়ান, যা শাহ ইসমাইল শহীদের 'তাকভীয়াতুল ঈমান' এর জবাবে লিখিত [১৪০] এবং আল কালিমাতুল উলিয়্যা উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বেরেলভীগণ তাকে 'সদরুল ফাযিল' উপাধিতে ভূষিত করে।

(২) আমজাদ আলী, যিনি ভারতের আযমগড় জেলায় ১৩২০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং জৌনপুরের 'মাদরাসা ই হানাফিয়্যাহ'-তে পড়াশোনা করেন। জনাব আমজাদ আলী কিছু সময়ের জন্য আহমাদ রেযার তত্ত্বাবধানেও ছিলেন। সে আহমাদ রেযার মতবাদ প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করে। তার বই "বাহারে শরীয়াত" বেরেলভী ফিকহের প্রামান্য গ্রন্থ, যাতে আহমাদ রেযার মতাদর্শের আলোকে ব্যাখ্যাকৃত ফতোয়া রয়েছে। তিনি ১৩৬৭ হিজরী, ১৯৪৮ সনে মারা যান।

(৩) সৈয়দ দীদার আলী। যিনি ১২৭০ হিজরীতে নওয়াবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আহমাদ আলীর নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১২৯৩ হিজরীতে তার শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তিনি স্থায়ীভাবে লাহোরে চলে যান। তার সম্পর্কে বলা হয় যে, মাওলানা দীদার আলী লাহোরকে ওয়াহাবী এবং দেওবন্দী ফিতনা হতে রক্ষা করেন। তিনি ১৯৩৫ খ্রি. মৃত্যুবরণ করেন। [১৪১] তার কর্মের মধ্যে "তাফসীর মিযান-আল-আদিয়‍্যান" এবং "আলামাতে ওয়াহাবীয়্যাহ" ছিল উল্লেখযোগ্য।

(৪) হাশমত আলী। তিনি লাক্ষ্মৌ এ জন্ম নেন। তার বাবা ছিলেন সাইয়্যেদ 'আইন আল-কাদাহ'-এর মুরীদগণের অন্যতম। তিনি জনাব বেরেলভীর মাদরাসাহ 'মানজারে ইসলামে' পড়ালেখা করেন। তিনি আমজাদ আলীর অধীনেও লেখাপড়া করেন এবং ১৩৪০ হিজরীতে তার পড়ালেখা শেষ করেন। তিনি আহমাদ রেযার ছেলের নিকট হতে সনদ লাভ করেন এবং অতঃপর আহমাদ রেযার আকীদা বিশ্বাস প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। আহমাদ রেযার ছেলে তাকে "গাইযুল [১৪২] মুনাফিকীন" উপাধি দেন। ১৩৮০ হিজরীতে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অতঃপর 'বীলী ভেট' এ মৃত্যু করেন। [১৪৩]

(৫) আহমাদ ইয়ার নাঈমী। সে বাদাইয়্যুন এ ১৯০৬ খ্রি. জন্মগ্রহণ করে। সে প্রাথমিকভাবে দেওবন্দী মাদরাসা 'আল মাদরাসাতুল ইসলামিয়্যাহ'-তে লেখাপড়া করেন। অতঃপর সে নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদীর নিকট গমন করে এবং তার নিকট থেকে লেখাপড়া শেষ করেন। অনেক শহর ঘুরে বেড়ানোর পরে সে অবশেষে গুজরাটে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে 'জামেয়া গাউসিয়া' নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার বই 'জা আল-হাক্ব'-এ জনাব বেরেলভীর মতবাদ জোরালোভাবে সমর্থন করেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধিতার উপর জোর দেন। জনাব আহমাদ ইয়ার সাহেব আহমাদ রেযা খানের 'কুরআনের তরজমা'-এর জন্য নূর আল ইরফান একটি হাশিয়া লিখেন, যেখানে সে কুরআনের অনেক আয়াতের তা'বীল করে এবং অর্থের বিকৃতি সাধন করে। এ ধরনের নামের আরো একটি বই আছে। সে ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

এ হলো বেরেলভী মতাদর্শের নেতৃবৃন্দ (আকাবীগণ) যারা এ মাযহাবের মূলনীতি ও বিধি বিধানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছে। এরাই আহমাদ রেযা কর্তৃক রোপিত চারা গাছের লালন-পালন ও পরিপুষ্টি সাধনের কাজ আঞ্জাম দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে তাদের আকীদা-বিশ্বাসসমূহের (বিস্তারিত) ব্যাখ্যা করব।

টিকাঃ
১৪০. এ বইয়ের খণ্ডনে একই মুরাদাবাদের আহলুল হাদীসের আলেম মাও: আযিযুদ্দীন মুরাদাবাদী কর্তৃক লিখিত তার বই "আকমালুল বয়স ফী তা'ঈদ তাকবীয়াতুল ঈমান-এ নাঈমুদ্দীনের এর দাবিসমূহকে মিথ্যা প্রমাণ করেন।
১৪১. (প্রাগুক্ত, পৃ-৯৪; তাযকীরাহ উলামা-এ আহলুস সুন্নাহ)
১৪২. [রাগ, ক্রোধ]
১৪৩. [তাযকীরাহ উলামায়ে আহলুস সুন্নাহ, মাহমুদ বেরেলভী. পৃ-৮২, কানপুর]

ফন্ট সাইজ
15px
17px