📄 ৭. জিহাদের বিরোধিতা এবং ইংরেজ উপনিবেশের সমর্থন
আহমেদ রেযার যুগ ছিল ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের যুগ। ফেতনা-ফেসাদ ঘাত-প্রতিঘাত মুসলিম জাতিকে গ্রাস করেছিল। তাদের শাসন অবসান ঘটেছিল। ব্রিটিশরা মুসলিমদের নির্মূল করতে চেষ্টা করেছিল। মুসলিম আলেমগণকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ মুসলিম জনগণ চরমপন্থা ও জুলুমের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তাদের বন্দী করা হয়েছিল এবং কালাপানিতে অন্যান্য কারাগারে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল ও তারা মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক অবস্থান হারিয়ে ফেলেছিল। বৃটিশ উপনিবেশিকরা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলিমদের অস্তিত্বই মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তাদের এ যুগে যদি কোনো একদল লোক তাদের বিরুদ্ধে গলা চড়িয়ে প্রতিবাদ করতো এবং সর্বশক্তি ও সাহস নিয়ে তাদেরকে প্রতিরোধ করতো, তবে তাদেরকেই ওয়াহহাবী [৯৪] বলা হতো।
যারা জিহাদের আদর্শকে তুলে ধরেছিল, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তাদেরকে কালা পানির শান্তি ভোগ করতে হয়েছিল। তারা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশকে মানতে পারেনি। সে যুগের ওয়াহাবীরা চেয়েছিল যে, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হোক। একসঙ্গে প্রতিরোধ ও যুক্ত করা, এক পতাকার নিচে একত্রিত হওয়া ও বৃটিশ উপনিবেশের অবসান ঘটানোর জন্য সেই সময়ে প্রয়োজন ছিল ঐক্য ও বোঝাপড়ার, কিন্তু উপনিবেশীরা তা চাইত না। তারা মুসলিমদেরকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইত। তারা মুসলিমদের একে অপরের বিরোধী দেখাতে চাইত। এ লক্ষ্য অর্জনে তাদের কিছু লোকের প্রয়োজন ছিল যারা তাদের (ব্রিটিশদের) অনুচর হিসেবে কাজ করবে এবং মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি ও বিরোধ ঘটাবে এবং তাদেরকে একে অপরের বিরূদ্ধে লাগার জন্য উসকে দেবে। তারা তাদের ঐক্যকে ধবংস করবে এবং তাদের শক্তি ও অবস্থাকে দুর্বল করে দেবে। এ উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা কিছু লোককে বাছাই করল এবং তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করল। যাদের মধ্যে ছিল গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী এবং জনাব বেরেলভীর বিরোধিদের মতে, জনাব আহমাদ রেযা খান বেরেলভীর নাম ছিল সেই তালিকায় সবার শীর্ষে। [৯৫]
গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর কর্মকাণ্ড কারো নিকট লুকায়িত নেই। কিন্তু আহমাদ রেযা সাহেবের বিষয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আহমাদ রেযা ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী ওয়াহাবীদেরকে তার গালাগালি, বিদ্বেষ, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হাসি তামাশার লক্ষ্যস্থল বানিয়েছিল। যে সকল ওয়াহাবীরা ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদরত ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশিকরা তাদের গ্রামগুলোর উপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়েছিল। [৯৬] শুধু বাংলাতেই এক লক্ষ ওয়াহাবী আলেম ও সাধারণ মানুষকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল। [৯৭]
এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ইংরেজি লেখক তার বইতে লিখেছে: (ভারতে) আমাদের শাসনের ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে আমাদের কোনো বিপদ ছিল না। যদি কোনো বিপদ থেকেই থাকে, তবে তা হলো একটা ক্ষুদ্র মুসলিম দল ওয়াহাবীদের পক্ষ হতে, কারণ একমাত্র তারাই সেই দল, যারা আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করছিল। [৯৮]
১৮৫৭ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে, ওয়াহাবীগণের প্রধান প্রধান ব্যক্তিদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল তাদের জন্য খুবই কঠিন। এ সময়ে ব্রিটিশরা তাদের উপর যে ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছিল, ভারতীয় ইতিহাস এর সাক্ষী হয়ে আছে। ওয়াহাবীগণের প্রধান প্রধান আলেমগণ যারা বন্দীত্ব ও কারাবরণের যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন, তারা হলেন- ১. মাওলানা জাফর থানিশ্রী ২. মাওলানা আব্দুর রহিম ৩. মাওলানা আব্দুল গাফফার ৪. মাওলানা ইয়াহইয়া আলী সাদিকপুরী ৫. মাওলানা আহমাদুল্লাহ এবং তাদের সবার শায়খ, ৬. মাওলানা নাযির হুসাইন মুহাদ্দিস দেহলবী (রহমাতুল্লাহ আলাইহিম)।
ওয়াহাবী মুজাহিদগণের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার একটি আদেশ প্রদান করা হয়েছিল। [৯৯] তাদের বাড়ি ঘর সমান করে দেওয়া হয়েছিল এবং এমনকি তাদের পারিবারিক কবরস্থান পর্যন্ত উল্টে দেওয়া হয়েছিল। [১০০] তাদের বাড়িঘরের উপর বুলডোজার চালানো হয়েছিল। [১০১] ওয়াহাবী আলেমদের গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। এ বিষয়ে শায়খ সাইয়্যেদ নাযির হুসাইন এর গ্রেফতার খুবই বিখ্যাত। [১০২]
ব্রিটিশ উপনিবেশকরা তাদের সুপরিচিত “ভাগ কর এবং শাসন কর” (Divide and Rule) পলিসি ব্যবহার করে এ ওয়াহবীগণের বিরুদ্ধে আহমাদ রেযা বেরেলভীকে ব্যবহার করেছিল; উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মাঝে দলাদলি, বিভক্তি ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি এবং তাদের ঐক্যকে চিরতরে ধ্বংস করা। যখন ব্রিটিশ উপনিবেশকদের বিরোধিরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে নিয়োজিত ছিল। ঠিক তখনই আহমাদ রেযা বেরেলভী মুসলিম নেতাদের মধ্যে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো না কোনো ভাবে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, তাদের নামোল্লেখ করে তাদেরকে তাকফীর (কাফির ঘোষণা) করে।
ওয়াহাবীগণ ছাড়াও যে সকল গ্রুপ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে মুসলিমদের মধ্য থেকে জামায়াতে ওলামায়ে হিন্দ, মাজলিস ইহরার, তেহরিক খিলাফাত, মুসলিম লীগ এবং হিন্দুদের মধ্য থেকে আযাদ হিন্দু ফৌজ এবং গান্ধির কংগ্রেস উল্লেখযোগ্য ছিল। জনাব বেরেলভী স্বাধীনতা আন্দোলনের গ্রুপগুলো থেকে শুধু যে দূরে ছিল, তা-ই নয় সে তাদের এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে তাকফীর (কাফির) ঘোষণা করেছিল, তাদেরকে গালাগাল করা ও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল এবং তাদের সাথে যোগ দেওয়াকে না- জায়েয ফতোয়া দিয়েছিল।
জনাব বেরেলভী তেহরীক খিলাফাহ এর সময়ে মারা যায় কিন্তু তার পরে তার অনুসারীরা মিশনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং তারা ওয়াহাবী ছাড়াও মুসলিম লীগেরও বিরোধিতা করেছিল এবং মুসলিম লীগের খ্যাত ব্যক্তিবর্গকে কাফির (মুরতাদ) ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করেছিল এবং ব্রিটিশদের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছিল। আহমাদ রেযার নেতৃত্বে বেরেলভীয়াহ আকাবিরগণ এ সকল আন্দোলন হতে মুসলিমদের দূরে সরিয়ে রাখতে অনড় ছিল এবং মারাত্মকভাবে জিহাদের বিরোধিতা করেছিল। যখন শরীয়াতের ভিত্তিতে স্বাধীনতার জিহাদ এ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল ছিল যে, ভারত ছিল দারুল হারব এবং মুসলিম মিল্লাতের আকাবিরগণ ভারতকে ইতিমধ্যে 'দারুল হরব' ঘোষণা করেছিলেন, তখন আহমাদ রেযা বেরেলভী এ ফতোয়ার ভিত্তিতে জিহাদকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছিল যে, সে ফতোয়া দিয়েছিল যে, ভারত (ছিল) 'দারুল ইসলাম'। আর এ বিষয়ে সে একটি ২০ পৃষ্ঠার ছোট পুস্তিকা লিখেছিল যার নাম, ইলাম আল ইলাম বান হিন্দুস্তান দারুল ইসলাম। বেরেলভী এ পুস্তিকার শুরুতে যার উপর জোর দিয়েছিল তা হলো ওয়াহাবীরা কাফির এবং মুরতাদ, তাদেরকে (ওয়াহাবীদেরকে) ক্ষমা করা না জায়েয। এমনকি তাদের কাছে জিযিয়া নেওয়ার পরে ও অনুরূপভাবে তাদের আশ্রয়দান, তাদেরকে বিয়ে করা, তাদের জবেহ করা (প্রাণী) খাওয়া তাদের (পেছনে) সালাত আদায় করা জায়েয নয়, এমনকি তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা অথবা ব্যবসায়ীক লেনদেন করাও জায়েয নয় বরং তাদের নারীদের দাসী বানানো উচিত এবং তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট (একঘরে) করা উচিত। পরিপ্রেক্ষিতে সে লিখেছে - কাতালাহুমুল্লাহু আন্না ইউফাকুন অর্থ “আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, তারা কোথায় ফিরে মরছে?” (সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৪) [১০০]
আহমাদ রেযার আসল চেহারা উন্মোচনের জন্য এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাটিই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে তার প্রতারণা প্রকাশ হয়ে পড়েছে কিভাবে সে মুজাহিদগণের বিরোধিতা করেছিল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের শক্তিশালী করেছিল এবং মুসলিমদেরকে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কিভাবে সে মুসলিমদের এবং তাদের দীনের শত্রুদের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
তুর্কী সালতানাত ভেঙ্গে যাওয়ার পর যখন সারা বিশ্বব্যাপী মুসলিমগণ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর উচ্চ করেছিল এবং মাওলানা মুহাম্মদ আলী জাওহার এর নেতৃত্বাধীনে মুসলিম খিলাফত, নিরাপত্তা ও সংবিধানের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, ঠিক সে সময় আহমাদ রেযা ব্রিটিশদের জন্য লাভজনক কাজে ব্যস্ত এবং সর্বদা লেগেছিল।
নিঃসন্দেহে, খিলাফত আন্দোলন ব্রিটিশদেরকে তাদের প্রতারণার জন্য শান্তি প্রদানে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। সকল মুসলিম একই পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল। আলেমগণ এবং সাধারণ মুসলিমগণ উভয়েই এ আন্দোলনে সমর্থন ছিল। একজন বেরেলভী লেখক ও এটা স্বীকার করেছে এবং লিখেছে, “১৯১৮ সালে ১ম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হলো। জার্মানী ও তাদের মিত্র তুর্কি ও অষ্ট্রিয়া পরাজিত হলো। ভারতীয় স্বাধীনতার বিষেয়ে তখন তুরস্ক থেকে একটি চুক্তি হয়। কিন্তু ব্রিটিশরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। তাই তারা তাদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ মনে করছিল যে, কোনোভাবে ব্রিটিশদের তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য শান্তি পাওয়া উচিত। তাই তারা মুসলিমদের অনুপ্রাণিত করেছিল যে, খিলাফত রক্ষা করা ফরয ও অবশ্যই কর্তব্য। ফলে এর উপর ভিত্তি করে খিলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুসলিমদের মাঝে একটি বিরাট ঝড় উঠে।” [১০৪]
আর কার্যত ১৯১৯ সালে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও আলিমগণের নেতৃত্বে শুরু হয়ে খিলাফত আন্দোলনে ব্রিটিশদের বন্দীদশা ও শৃংখাবদ্ধতার বিরুদ্ধে লোকদের অনুপ্রাণিত করে চলছিল। এভাবে তাদের উৎসাহ খিলাফত আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসানকে অবশ্যম্ভবী করে তুলেছিল। আহলে হাদীস আলেমে দীন ইমামুল হিন্দ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ এ ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছেন। [১০৫]
বেরেলভী মতাদর্শের ইমাম ও তাদের মুজাদ্দিদ ব্রিটিশবিরোধী এ আন্দোলনের প্রভাব এবং এর ফলাফল অনুভব করেছিল এবং তাদের (ব্রিটিশদের) সাথে তার বন্ধুত্বের প্রমাণ দিয়েছিল। আর এ আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সে দাওয়াম আল আইশ নামে আরেকটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা রচনা করেছিল। এর মধ্যে সে বলেছিল যে, শারঈ খিলাফতের জন্য পূর্বশর্ত হলো খলীফা হতে হবে কুরাইশ বংশ হতে, ভারতীয়দের তুর্কীদের সহায়তার করার প্রয়োজন নেই, কারণ তারা কুরাইশ নয়। এর ভিত্তিতে সে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশকদের শক্তির কারণ হয়েছিল।
আহমদ রেযা খান সাহেব এ আন্দোলনের সম্ভ্রান্ত মুসলিম ব্যক্তিবর্গের সমালোচনা করে লিখেছিল: "তুর্কিদের পক্ষ অবলম্বন করা প্রতারণার ফাঁদ ছাড়া কিছুই নয়। আসল উদ্দেশ্য হলো, 'খিলাফত' 'খিলাফত' করে চিৎকার করা, জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে (পক্ষে) নেওয়া, চাঁদা সংগ্রহ এবং গঙ্গা ও যমুনার পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করা।” [১০৬]
জনাব বেরেলভী সাহেব 'অসহযোগ আন্দোলন'-এর ও বিরোধিতা করেছিল কারণ সে ভেবেছিল যে, এটা ব্রিটিশদের পতনের একটি কারণ হতে পারে। অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের পুরোপুরি বয়কট (বর্জন) করা- তাদের কোনো ট্যাক্স বা কর না দেওয়া, ব্রিটিশ কর্তৃক চালিত সরকারী অফিসে চাকুরী না করা। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা- যাতে তারা ভারতীয় ভূমি হতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এ উদ্দেশ্যে ১৯২০ খৃষ্টাব্দে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং তারা নড়াচড়া আরম্ভ করে। গান্ধী ছাড়াও, আহমাদ রেযা এ আন্দোলনের ক্ষতি করতে চেষ্টা করেছিল এবং একটি পুস্তিকা রচনা করেছিল। আর এতে সে এ (আন্দোলনে)'র কঠোর সমালোচনা করেছিল এবং এ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের উপর 'কুফরী'র ফতোয়া জারী করেছিল।
তাই এ উদ্দেশ্যে লিখা আল মাহাজ্জাতুল মুতামানাহ ফী আয়াতিল মুমতাহানাহ নামক পুস্তিকা, যা তার ফতোয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে সে নিশ্চিত করেছে যে, “এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলো ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করা।” [১০৭]
একই বইয়ে জিহাদের বিরুদ্ধে সে লিখেছে: “হিন্দ এর (ভারতের) মুসলিমদের জন্য জিহাদ ফরয নয়। [১০৮] ফলে যে ব্যক্তি এর ফরযিয়াতের উপর ঐকমত্য পোষণ করে সে মুসলিমদের বিরোধী এবং তাদের ক্ষতি করতে চায়।" [১০৯]
সে আরও লিখেছে: “হুসেইন (রাঃ)-এর জিহাদ দ্বারা যুক্তি দেওয়া সঠিক নয়। কারণ তাঁর উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এ সময়ের শাসকদের আর যুদ্ধ ফরয নয়, যতক্ষণ তার কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা না থাকে। তাই আমাদের উপর জিহাদ কিভাবে ফরয হতে পারে যখন আমরা ব্রিটিশদের মোকাবেলা করতে অসমর্থ?” [১১০]
জিহাদ হতে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরোধিতা করা হতে মুসলিমদেরকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে সে লিখেছে, "আল্লাহ তা'আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর তোমাদের নিজেদের দায়িত্ব। যদি তোমরা সঠিক পথে থাক তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন; তখন তিনি তোমরা যা আমল করতে তা তোমাদের জানিয়ে দেবেন। (সূরা মায়িদাহ-৫:১০৫)" [১১১]
অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমের ব্যক্তিগতভাবে আত্মসংশোধন করা উচিত এবং সম্মিলিত জিহাদের কোনো প্রয়োজন নেই। এ বইয়ের শেষাংশে ব্রিটিশদের বিরোধী নেতৃবৃন্দ ও 'অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থকদের সকলের উপর সে কুফরী ফতোয়া জারী করে। [১১২] তার বই, দাওয়াম আল আইশ এ জিহাদকে নস্যাৎ করার ফতোয়া দিয়েছিল, যেখানে সে লিখেছে: ভারতীয় মুসলিমদের উপর কোনো জিহাদ ও কিতালের হুকুম নাই। [১১৩]
যা হোক, আহমাদ রেযা সাহেবের ব্যাপারে এটাই স্বাভাবিক যে, সে ইংরেজদের দালাল এবং সে ব্রিটিশ বিরোধী যে কোনো আন্দোলনের বিরোধিতা করতো। বেরেলভী আহমাদ রেযার এক মুরীদ লিখেছে, "মুসলিমরা আহমাদ রেযার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে গিয়েছিল।" [১১৪] অপর একজন লেখক লিখেছে: "খলিফার বিষয়ে তার ভিন্নমত ছিল। তার খিলাফত বিরোধিতার কারণে মৃত্যুর নিকটবর্তী সময়ে মুসলিমরা তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করছিল এবং তার ভক্ত ও মুরীদরা তার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। [১১৫]
যাহোক, ঠিক যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মুসলিমদের একতাবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই আহমাদ রেযা সাহেব তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করছিল। এমনকি যদি তাকে ব্রিটিশদের দালাল নাও বলা হয়, তখনও এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, তার সকল কার্যক্রম ছিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে এবং ইংরেজদের পক্ষে। কারণ সে শুধু মুসলিমদের বিরোধিতাই করেনি এবং সে ব্রিটিশদের সমর্থক হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল।
ফ্রান্সিস রবিনস আহমাদ রেযা সম্পর্কে লিখেছে: "আহমাদ রেযা বেরেলভী ব্রিটিশদের একজন সমর্থক ছিল। সে ১ম বিশ্ব যুদ্ধেও ইংরেজ শাসনকে সমর্থন করেছিল। অনুরূপভাবে, ১৯২১ সালে খিলাফত আন্দোলনের সময় সে ব্রিটিশদের একজন মদদদাতা ছিল এবং সে বেরেলীতে উলামাদের একটি সভার আয়োজন করেছিল, যারা ছিল অসহযোগ আন্দোলনের বিরোধী।" [১১৬]
টিকাঃ
৯৪. ওয়াহাবী: ওয়াহাবী শব্দটি আহলে হাদীসকে বোঝাতে সর্বপ্রথম ব্রিটিশরাই এটি ব্যবহার করেছিল যাতে তারা তাদের (আহলে হাদীসের) মানহানি করতে পারে। ওয়াহাবী শব্দটি একজন বিদ্রোহীর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হত, নিঃসন্দেহে ওয়াহাবীগণ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ছিল।
৯৫. [বেরেলভী ফতোয়া, তাকফীরী আকসানী, আইনাহ সাদাকাত, মুকাদ্দিমা আশ শিহাবুস সাকিব, মুকাদ্দিমা বাসাইল চামদপুরী, ফাযিল বেরেলভী ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য।]
৯৬. [তাজকিরাহ সাদেক, আব্দুর রহিম]
৯৭. ["ওয়াহাবী ট্রায়াল্স" (ওয়াহাবীদের বিচার") দ্রষ্টব্য]
৯৮. (ইণ্ডিয়ান মুসলিম্স, পৃ-৩২)
৯৯. [ওয়াহাবী তেহরীক, পৃ-২৯২]
১০০. [তাযকিরাহ সাদিক]
১০১. [প্রাগুক্ত]
১০২. [ওয়াহাবী তেহরীক, পৃ-৩১৫]
১০০. ইলাম আল ইলাম বান হিন্দুস্তান দারুল ইসলাম, পৃ-১৯-২০ দ্র.
১০৪. (মুকাদ্দিমা দাওয়াম আল আইশ, মাসুদ আহমেদ, পৃ-১৫)
১০৫. (প্রাগুক্ত, পৃ-১৮)
১০৬. (দাওয়াম আল আইশ, পৃ--২৩; অন্য সূত্র অস্পষ্ট)
১০৭. (المحجة المؤتمنة في أية الممتحنة , আহমাদ রেযা, পৃ-১৫৫)
১০৮. (একই ফতোয়া দিয়েছে গোলাম আহমদ কাদিয়ানী)
১০৯. (: 20- المحجة المؤتمنة في اية الممتحنة)
১১০. (প্রাগুক্ত, পৃ-২১০)
১১১. [প্রাগুক্ত, পৃ-২০৬]
১১২. [প্রাগুক্ত, পৃ-২১১]
১১৩. (দাওয়াম আল আইশ, পৃ-৪৬)
১১৪. (মুকাদ্দিমা, দাওয়াম আল আইশ, পৃ-১৮)
১১৫. [কিতাবীদ দুনইয়া মুকালা হাসান নিজামী, পৃ-২; মুকাদ্দিমা, দাওয়াম আল আইশ, পৃ-১৮]
১১৬. (Indian Muslims, p-443, Cambridge University)
📄 ৮. আহমাদ রেযার মৃত্যু
সে বক্ষব্যাধী রোগে মারা যায়। তার মৃত্যুর পূর্বে সে অনেকগুলো ওসীয়ত করে যায়, যা ওসীয়ত শরীফ নামে একটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। আহমাদ রেযা তার মৃত্যুর পূর্বে বলে, সকল ফরযের মধ্যে বড় ফরয হলো আমার দীন ও মাযহাবের উপর কায়েম থাকা যা আমার কিতাবসমূহে পাওয়া যাবে। [১১৭]
সে আরো বলে: “হে প্রিয় ভাইয়েরা! আমি কতদিন তোমাদের মাঝে অবস্থান করবো, আমি জানিনা। তোমরা হলো মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিষ্পাপ মেষ। তোমরা চারিপাশ দিয়ে নেকড়ে দ্বারা পরিবেষ্টিত, যারা তোমাদেরকে (যার উপর তোমরা রয়েছ, তা থেকে) পথভ্রষ্ট করতে চায়। আর তোমাদেরকে দুঃখ- কষ্টের সময় গ্রাস করতে চায়। তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাক এবং তাদের থেকে দূরে থাক - যেমন দেওবন্দীগণ ও তারা ব্যতীত অন্যান্যরাও।” [১১৮]
তার ওসীয়তনামার শেষে সে লিখেছে: যদি তোমাদের ইচ্ছা হয়, তবে নিম্নোক্ত জিনিসগুলো হতে কিছু জিনিস মানতের সময় সপ্তাহে দুইবার করে আমার নিকট পাঠিও। গৃহে উৎপন্ন হিমশীতল ঠাণ্ডা বরফ (অথবা যদি সম্ভব হয়) মহিষের দুধ হলে ভাল হয়, বিরিয়ানী, পোলাও, গোল্ডের শামী কাবাব, প্যারাঠি (তেল বা ঘি'-এ ভাজা পিঠা) এবং মাখন, ফিরনী, মসুরীর ডাল, আদা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস, গোস্তের কাচরী [গোল্ডের পুর দেওয়া ভাজা পিঠা], আপেলের রস, ডালিমের রস, সোডা বোতল, হিমশীতল দুধ।
যদি পার এগুলোর মধ্যে হতে প্রতিদিন একটি করে যোগাড় কর, অথবা যা সহজ হয় তাই কর।" আর পাদটীকায় উল্লেখ করা হয়েছে, “ছোট মাওলানা বললেন, আপনি পুনরায় হিমশীতল দুধের কথা উল্লেখ করলেন। 'হুজুর! আপনি ইতোমধ্যেই এটি উল্লেখ করেছেন।' তাই তিনি (আহমাদ রেযা) বললেন, “ওটা আবার লিখ। ইনশা আল্লাহ আমার রব আমাকে কেবল বরফই (বা তুষার) প্রদান করবেন।” এবং সে রকমই ঘটেছিল, দাফনের সময় এক ব্যক্তি বাড়িতে উৎপন্ন হিমশীতল দুধ এনেছিল। [১১৯]
বেরেলভী ফিরকার আহমাদ রেযা ২৫শে সফর, ১৩৪০ হিজরী (১৯২১ খ্রি.) সালে ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে। [১২০] মনে হয়, জনাব বেরেলভীর জানাযায় লোকের উল্লেখযোগ্য লোক সমাগম হয়নি। যাহোক, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছিনা, কারণ কোনো প্রমাণ ব্যতীত কোনোকিছু উল্লেখ করা আমাদের লেখার পদ্ধতি বিরুদ্ধ (কাজ) বলে আমরা মনে করি। যাহোক, আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্য- প্রমাণ থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তার তীব্র/ বিদ্রূপাত্মক ভাষা, ছোট-খাট বিষয়ে তার কুফরী ফতোয়া জারী করা এবং তার ব্রিটিশ বিরোধিতার ঘাটতির কারণে লোক জন তার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল।
এক বেরেলভী লেখক দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছে যে, মুসলিমগণ আহমাদ রেযার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। [১২১] আবার, তার 'খিলাফত'-এর বিরোধিতার কারণে তার ভক্ত ও মুরীদগণ তার সম্পর্কে হতাশ হয়ে গিয়েছিল। [১২২]
যখন বেরেলভীদের ইমাম ও মুজাদ্দিদ (এর কথা) আসে তখন তার ভক্ত মুরীদরা যেকোনো একভাবে অতিরঞ্জন এবং বাড়াবাড়ি করে। এমনকি যদি তার জানাযা অন্যান্য দীনি আলেমদের মতো হতো, তবে তাদের বই পুস্তক এ ধরনের (ঘটনার) অতিরঞ্জনে পরিপূর্ণ থাকতো। কিন্তু তারা এর প্রতি কোনো রকম মনোযোগ দেয়নি। যাহোক, তার জানাযার ব্যাপারেও তারা বাড়াবাড়ি করতে ছাড়েনি কেবল লোকদের উপস্থিতি ('র বিষয়টি) বাদে।
টিকাঃ
১১৭. [ওয়াসীয়াত শরীফ, পৃ-১০]
১১৮. হায়াতে আলা হযরত বেরেলভী, বাস্তাওয়ী, পৃ-১০৫
১১৯. (ওয়াসীয়াত শরীফ, পৃ-১০৮:১০৯)
১২০. [বাস্তাওয়ী, পৃ-১১১]
১২১. [মুকাদ্দিমা, " দাওয়াম আল আইশ", মাসুদ আহমেদ, পৃ-৮]
১২২. [প্রাগুক্ত]
১২৩. [আনওয়ার রেযা, পৃ-২৭২; প্রাগুক্ত রূহু কী দুনিয়া, মুকাদ্দিমা, পৃ-২২]
📄 ৯. তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন
যদিও তেমন কিছুই না, তবুও এখানে অনেক কল্পিত কাহিনী আছে, যারা কল্পকাহিনীর দাস তারা কল্পকাহিনী আবিষ্কার করা ছাড়া আর কি করবে? এক ভদ্রলোক লিখেছে, যখন আহমাদ রেযার লাশের খাটিয়া উঠানো হলো তখন কিছু লোক দেখেছিল যে, কিছু ফেরেশতা তা তাদের কাঁধে উঠিয়ে নিলো। [১২৩]
তারা তার সম্পর্কে আরো বলে থাকে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল সাহাবীদেরকে নিয়ে বেরেলভীর আসার অপেক্ষায় বসে ছিলেন, যখন তাকে তার ও সাহাবীদের চুপ করে থাকার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো তখন তিনি বললেন আমরা বেরেলভী আসার অপেক্ষা করছি। এর থেকেও তারা বাড়িয়ে বলে, বেরেলভীর গোসলের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুগন্ধি হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন।
তাদের বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনগুলো উল্লেখ করতে গিয়ে আরো কিছুর তালিকা দিতে হচ্ছে:
১. আমি কিছু পীরদের বলতে শুনেছি যে, আহমাদ রেযাকে দেখার পর তাদের সাহাবীদেরকে দেখার আকাংখা কমে গেছে। [১২৪] "বিগত দুই দশকের মধ্যে এমন আলিম (অর্থাৎ আহমাদ রেযার মত) কেউ দেখেনি। [১২৫]
২. তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ ক্ষমতা ও কারামতের কোনো সীমা ছিল না। আহমাদ রেযা সাহেব তার জ্ঞান ও মতামতের নির্ভুলতা ব্যাপারে ছিলেন অদ্বিতীয়। [১২৬]
৩. "আহমাদ রেযা ধর্মীয় জীবন ও শিক্ষার পুনুরুজ্জীবন দান করেছিলেন।" [১২৭]
৪. ফতোয়া রিভীয়াহ-তে এমন হাজারও প্রসঙ্গ রয়েছে যা আলেমগণ (কখনো) শুনেননি। [১২৮]
৫. "যদি আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ "ফতওয়া রিষ্ট্রীয়াহ” কিতাবটি দেখতেন তবে তিনি এর লেখককে তাঁর সাথীদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করতেন। [১২৯]
৬. "আহমাদ রেযা তার যুগের ইমাম আবু হানীফা ছিলেন।" [১৩০]
৭. "আহমাদ রেযা তার অন্তরে আবু হানীফার কিয়াসী বুদ্ধিমত্তা, আবু বকর রাজির বিচক্ষণতা এবং কাজী খানের স্মৃতি ধারণ করেছিলেন।" [১৩১]
৮. "আহমাদ রেযা, সত্যের ক্ষেত্রে সিদ্দিকে আকবার (আবু বকর (রা)) এর প্রতিচ্ছবি ছিলেন, মিথ্যাকে আলাদা করার ক্ষেত্রে তিনি ফারুকে আযম (ওমর ফারুক(রা))-এর বিস্ময়কর অনুলিপি ছিলেন; দানশীলতা ও দয়ার ক্ষেত্রে তিনি যুন্নুরাইন (উসমান (রা))-এর ছায়া ছিলেন এবং মিথ্যা বিলুপ্তিকরণে তিনি হায়দার (আলী (রা))-এর তরবারী ছিলেন।” [১৩২]
৯. আহমাদ রেযা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুজিযাসমূহের মধ্য হতে একটি মুজিযা ছিলেন। [১৩৩]
১০. 'আহমাদ রেযা দুনিয়ায় আল্লাহর হুজ্জাত ছিলেন।
এ সকল অতিরঞ্জিত দাবিসমূহ থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, খাঁন সাহেব বেরেলভী'র ভক্ত মুরীদরা তাকে পবিত্র বলে ঘোষণা করতে চেয়েছে এবং তা করতে গিয়ে তারা একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছে।
আমরা পূর্ববর্তী পাতাগুলোতে উল্লেখ করেছি যে, বেরেলভীগণ বিশ্বাস করতো যে, তাদের আহমাদ রেযা ভুল থেকে 'মাহফুজ' (রক্ষিত) (অর্থাৎ ভুলের উর্ধ্বে) এবং পাপ হতে পবিত্র (মা'সুম); আর নিঃসন্দেহে এটা নবীগণের জন্য খাস এবং আর অন্য কোনো ব্যক্তি মা'সুম - এ কথা বিশ্বাস করা 'খতমে নবুয়াত' অস্বীকার করার শামিল। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথ দেখান এবং এ ধরনের আকীদা থেকে মুক্ত রাখুন। আমীন।
কিছু মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি/অতিরঞ্জনের উল্লেখ করার পর আরও কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা এ আলোচনা শেষ করতে চাই। বলা হয়েছে যে, যখন জনাব আহমাদ রেযার বয়স সাড়ে তিন বছর, তখন সে একটি বাজার অতিক্রম করছিল। সে কেবল একটি বড় কুর্তা পরিহিত ছিল। কিছু তাওয়াইফ (বাইজী/নর্তকী) তার দিকে আসছিল। সে তার কুর্তা উঁচু করল এবং এ দিয়ে তার চোখ ঢাকল। তাওয়াইফ বলল: “হে ক্ষুদে শিশু! তুমি তোমার চোখ ঢেকেছো ঠিকই কিন্তু তোমার সতর খুলে ফেলেছ। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে বেরেলভীদের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, যখন দৃষ্টি ভ্রষ্ট হয়, তখন ক্বলবও ভ্রষ্ট হয়। যখন ক্বলব ভ্রষ্ট হয় (কেবল তখনই) সতর ভ্রষ্ট হতে পারে।" [১৩৪]
এখন কে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করবে যে, সাড়ে তিন বছর বয়সে তার দিকে আগত সাথীরা যে নর্তকী ছিল তা সে কিভাবে জেনেছিল এবং ছোট শিশু, যে এখনও সতর ঢাকা-ই শুরু করেনি, সে কিভাবে দৃষ্টির 'ভ্রষ্ট হওয়া' এবং কলবের জন্য সতরের 'ভ্রষ্টতার কারণ হওয়া' সম্পর্কে জেনেছিল? কিন্তু মিথ্যা বলার জন্য কোনো বুদ্ধি-জ্ঞানের দরকার পড়ে না।
"আহমাদ রেযার পাণ্ডিত্যের ভয়ে ইউরোপের জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা এবং এশিয়ার দার্শনিকগণ থর থর করে কাঁপতেন।" [১৩৫] “আহমাদ রেযা তার বিস্ময়কর স্মৃতি শক্তির মাধ্যমে ১৪ শত বছর পর্যন্ত সকল কিতাবাদি মুখস্থ করেছিল। তার মহান খ্যাতির বর্ণনা করার মত ভাষা খুঁজে পেতে ভাষাবিদরাও অক্ষম ছিল।" [১৩৬] "যখন আহমাদ রেযা হজ্জ করতে যান, মাসজিদে খাইফে তাকে মাগফিরাতের (ক্ষমার) সুসংবাদ প্রদান করা হয়।” [১৩৭]
তিনি ছিলেন মুজাদ্দিদ, সাইয়্যিদ, ইমাম, মুরশিদ, মালেকি, শাফেঈ, তার দরজা রোগমুক্তির দরজা, তিনি চোখসমূহের জোত্যি, কর্ণসমূহের শ্রবণ, তিনি আল্লাহর নূরের চেরাগ, মুছত্বফার সুন্দর আয়না, আল্লাহর সিংহ এছাড়াও আরো অনেক বাড়াবাড়ি রয়েছে। যেমন- তিনি প্রয়োজন পূরণকারী, বিপদ দূরকারী, মুশকিল আসানকারি, কাওসারের পানি দানকারী, কবর, পুনরুথথান ও হাশরের সাথি, তিনি গাওস, কুতুবুল আওলিয়া, তিনি মুসত্মফা ও খিযিরের খলিফা, হেদায়াতের সাগর, তিনি সব কিছু ও রিযিক দেনেওয়ালা।
এ হলো জনাব বেরেলভী এবং তার অনুসারীরা এবং এ হলো তাদের শিক্ষা যা তারা বিস্তারিতভাবে লিখে প্রচার-প্রসার করে থাকে। অতিরঞ্জনের ক্ষেত্রে তাদের কোনো জুড়ি নাই। যারা আসে, মনে হয় তারা প্রত্যেকেই যারা চলে যায় (মৃত্যুবরণ করে) তাদেরকে শিরকে পরিপূর্ণ এ ধরনের নোংরামির দ্বারা সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করে। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত দান করুন।
আবার, "আমার হৃদয় হলো একটি হৃদয় (পাত্র) এবং যদি যেকোনো জ্ঞানের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়, তৎক্ষণাৎ তার একটি জবাব চলে আসে। [১৩৮] একবার বেরেলভী খান সাহেবের পীর সাহেব তার নিরাপত্তার জন্য দুটি কুকুর সংগ্রহ করেন। তখন সে (আহমাদ রেযা) তার দুই ছেলেকে তার পীর সাহেবের নিকট নিয়ে আসে এবং বলে যে, "আমি আপনার নিকট সুন্দর ও ভাল জাতের দুটি কুকুর নিয়ে এসেছি। দয়া করে তাদের গ্রহণ করুন।” [১৩৯]
সুতরাং এ হলো আহমাদ রেযা খান সাহেবের ব্যক্তিত্বের দুটি রূপ। একদিকে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ইমাম, গাউস, কুতুব এবং বিপদ দূরকারী ইত্যাদি উপাধিসহ; আবার অপরদিকে সে একটি নীচু শ্রেণির নোংরা প্রাণীর (কুকুরের) সাথে নিজের তুলনা করে গর্ববোধ করে।
টিকাঃ
১২৪. [ওযাসীয়াত শরীফ, তারতীব হুসনাইন রেযা, পৃ-২৪]
১২৫. [প্রাগুক্ত]
১২৬. [শারহ আল হাকুক, মুকাদ্দিমাহ, পৃ-৮]
১২৭. [প্রাগুক্ত, পৃ-৭]
১২৮. [বাহারে শরীয়াত, '১ম খণ্ড, পৃ-৩]
১২৯. (মুকাদ্দিমা, ফাতওয়া রিযভীয়াহ, ১১ খণ্ড, পৃ-৪)
১৩০. (মুকাদ্দিমা, ফতোয়াহ রিযভিয়্যাহ, ৫ম খণ্ড)
১৩১. [আনওয়ার রাজা, পৃ-২১০]
১৩২. [প্রাগুক্ত, পৃ-৩৬২]
১৩৩. [প্রাগুক্ত, পৃ-২৯০]
১৩৪. [সাওয়ানেহ আলা হযরত, বদরুদ্দীন, পৃ-১১০; আনোয়ার রেযা]
১৩৫. (রূহু কী দুনিয়া, পৃ-২৬)
১৩৬. [ আনোয়ার রেযা, পৃ-২৬৫]
১৩৭. [হায়াতে আলা হযরত জাফরুদ্দীন বিহারী, পৃ-১২; আনওয়ার রেযা, পৃ-২৩৫]
১৩৮. [মুকাদ্দিমা শারহুল হুকুক]
১৩৯. [আনোয়ার রেযা, পৃ-২৩৮]
📄 ১০. বেরেলভীদের নেতৃবর্গ
বেরেলভীদের কিছু বড় বড় ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে আমরা এ অধ্যায়টি শেষ করতে চাই, যারা বেরেলভী মতবাদ গঠন, প্রতিষ্ঠা ও এ মতবাদকে শক্তিশালী করতে এবং এ মতবাদের আকীদা, বিশ্বাস, মূলনীতি গঠন করতে সাহায্য করে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
(১) নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী। তার জন্ম জানুয়ারী ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি জনাব বেরেলভী সাহেবের সমসাময়িক ছিলেন। সেও জনাব বেরেলভী সাহেবের মত তাওহীদ ও সুন্নাহর বিরোধিতা এবং শিরক ও বিদআতের সমর্থন করেছিল এবং সে শরীয়াত বিরোধী অনুষ্ঠান ও রসম রেওয়াকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তার একটি মাদরাসা ছিল যাকে 'মাদরাসা আহলুস সুন্নাহ' বলা হতো। অতঃপর তা 'জামিয়াহ নাঈমিয়াহ' তে পরিবর্তিত হয়েছিল। এ মাদরাসা হতে পাশ করা ছাত্রদেরকে 'নাঈমী' বলে ডাকা হয়। তার রচনাবলির একটি হলো, 'খাজাইন আল আরফান", আহমাদ রেযা খানের কুরআনের তরজমার সাথে প্রকাশিত হয়েছিল। 'আত তাইয়েবুল বয়ান, যা শাহ ইসমাইল শহীদের 'তাকভীয়াতুল ঈমান' এর জবাবে লিখিত [১৪০] এবং আল কালিমাতুল উলিয়্যা উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বেরেলভীগণ তাকে 'সদরুল ফাযিল' উপাধিতে ভূষিত করে।
(২) আমজাদ আলী, যিনি ভারতের আযমগড় জেলায় ১৩২০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং জৌনপুরের 'মাদরাসা ই হানাফিয়্যাহ'-তে পড়াশোনা করেন। জনাব আমজাদ আলী কিছু সময়ের জন্য আহমাদ রেযার তত্ত্বাবধানেও ছিলেন। সে আহমাদ রেযার মতবাদ প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করে। তার বই "বাহারে শরীয়াত" বেরেলভী ফিকহের প্রামান্য গ্রন্থ, যাতে আহমাদ রেযার মতাদর্শের আলোকে ব্যাখ্যাকৃত ফতোয়া রয়েছে। তিনি ১৩৬৭ হিজরী, ১৯৪৮ সনে মারা যান।
(৩) সৈয়দ দীদার আলী। যিনি ১২৭০ হিজরীতে নওয়াবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আহমাদ আলীর নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১২৯৩ হিজরীতে তার শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তিনি স্থায়ীভাবে লাহোরে চলে যান। তার সম্পর্কে বলা হয় যে, মাওলানা দীদার আলী লাহোরকে ওয়াহাবী এবং দেওবন্দী ফিতনা হতে রক্ষা করেন। তিনি ১৯৩৫ খ্রি. মৃত্যুবরণ করেন। [১৪১] তার কর্মের মধ্যে "তাফসীর মিযান-আল-আদিয়্যান" এবং "আলামাতে ওয়াহাবীয়্যাহ" ছিল উল্লেখযোগ্য।
(৪) হাশমত আলী। তিনি লাক্ষ্মৌ এ জন্ম নেন। তার বাবা ছিলেন সাইয়্যেদ 'আইন আল-কাদাহ'-এর মুরীদগণের অন্যতম। তিনি জনাব বেরেলভীর মাদরাসাহ 'মানজারে ইসলামে' পড়ালেখা করেন। তিনি আমজাদ আলীর অধীনেও লেখাপড়া করেন এবং ১৩৪০ হিজরীতে তার পড়ালেখা শেষ করেন। তিনি আহমাদ রেযার ছেলের নিকট হতে সনদ লাভ করেন এবং অতঃপর আহমাদ রেযার আকীদা বিশ্বাস প্রচার-প্রসারে আত্মনিয়োগ করেন। আহমাদ রেযার ছেলে তাকে "গাইযুল [১৪২] মুনাফিকীন" উপাধি দেন। ১৩৮০ হিজরীতে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অতঃপর 'বীলী ভেট' এ মৃত্যু করেন। [১৪৩]
(৫) আহমাদ ইয়ার নাঈমী। সে বাদাইয়্যুন এ ১৯০৬ খ্রি. জন্মগ্রহণ করে। সে প্রাথমিকভাবে দেওবন্দী মাদরাসা 'আল মাদরাসাতুল ইসলামিয়্যাহ'-তে লেখাপড়া করেন। অতঃপর সে নাঈমুদ্দীন মুরাদাবাদীর নিকট গমন করে এবং তার নিকট থেকে লেখাপড়া শেষ করেন। অনেক শহর ঘুরে বেড়ানোর পরে সে অবশেষে গুজরাটে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে 'জামেয়া গাউসিয়া' নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার বই 'জা আল-হাক্ব'-এ জনাব বেরেলভীর মতবাদ জোরালোভাবে সমর্থন করেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধিতার উপর জোর দেন। জনাব আহমাদ ইয়ার সাহেব আহমাদ রেযা খানের 'কুরআনের তরজমা'-এর জন্য নূর আল ইরফান একটি হাশিয়া লিখেন, যেখানে সে কুরআনের অনেক আয়াতের তা'বীল করে এবং অর্থের বিকৃতি সাধন করে। এ ধরনের নামের আরো একটি বই আছে। সে ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
এ হলো বেরেলভী মতাদর্শের নেতৃবৃন্দ (আকাবীগণ) যারা এ মাযহাবের মূলনীতি ও বিধি বিধানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছে। এরাই আহমাদ রেযা কর্তৃক রোপিত চারা গাছের লালন-পালন ও পরিপুষ্টি সাধনের কাজ আঞ্জাম দিয়েছে। ইনশাআল্লাহ আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে তাদের আকীদা-বিশ্বাসসমূহের (বিস্তারিত) ব্যাখ্যা করব।
টিকাঃ
১৪০. এ বইয়ের খণ্ডনে একই মুরাদাবাদের আহলুল হাদীসের আলেম মাও: আযিযুদ্দীন মুরাদাবাদী কর্তৃক লিখিত তার বই "আকমালুল বয়স ফী তা'ঈদ তাকবীয়াতুল ঈমান-এ নাঈমুদ্দীনের এর দাবিসমূহকে মিথ্যা প্রমাণ করেন।
১৪১. (প্রাগুক্ত, পৃ-৯৪; তাযকীরাহ উলামা-এ আহলুস সুন্নাহ)
১৪২. [রাগ, ক্রোধ]
১৪৩. [তাযকীরাহ উলামায়ে আহলুস সুন্নাহ, মাহমুদ বেরেলভী. পৃ-৮২, কানপুর]