📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৫. বেরেলভীর বাচনভঙ্গি

📄 ৫. বেরেলভীর বাচনভঙ্গি


তার বিরোধিরা ছোট-খাট কোনো বিষয়েও যদি তার বিরোধিতা করতো, তাহলে সে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতো। এ ব্যাপারে সে কোনো বাছ-বিচার করতো না। সে খুব রূঢ় ভাষা ব্যবহার করতো। যে সকল শব্দের দ্বারা সে তার বিরোধিদের সম্বোধন করতো, সেগুলোর মধ্যে ছিল 'কুকুর', 'শুয়োরের বাচ্চা/শুয়োর', ইবলিস, কাযযাব, কাফির, ফাজির', মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) এবং অনুরূপ আরো অনেক শব্দ। সে কোনো ভয় বা অনুশোচনা ছাড়াই এ শব্দগুলো ব্যবহার করতো। তার কোনো বই এ ধরনের বাচনভঙ্গী থেকে মুক্ত নয়।

তার 'মধুর বাণী' পূর্বেই কিছু উল্লেখ করেছি। নমুনা হিসেবে তার লিখনী হতে অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করবো যা পাঠকদেরকে তার কথা বলার ভঙ্গিমা বুঝতে সাহায্য করবে। সে দেওবন্দীদের সম্পর্কে লিখেছে: [৮১] তোমাদের ইমাম ও শিক্ষকদের কথা অনুযায়ী একজন মহিলা যেনা করতে সক্ষম। সুতরাং তোমাদের ইলাহর যেনা করার সক্ষমতা থাকা দরকার। দেওবন্দীরা তাকে বলেছে, কিভাবে তুমি উলুহিয়্যাহর দাবী করতে পারো অথচ আমরা যা করতে সক্ষম তা করতে তুমি সক্ষম নও। তখন সে তাদেরকে বলে, তাহলে তো তোমাদের ইলাহর একটি লজ্জাস্থান থাকার দরকার, তাছাড়া কিভাবে সহবাস করবে? [৮২] (আল ইয়াযু বিল্লাহ!)

চিন্তা করুন, লেখার এ ধরন কি একজন দীনের আলেমের জন্য উপযোগী হতে পারে? তার উপর আবার মুজাদ্দিদ হওয়ার দাবি!! 'দীনের সম্মানে' এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের প্রমাণ কোনো হাদীস হতে পাওয়া যায়?! যদি তাকে 'দীনী আলেম' বলার জন্য নাছোড়বান্দা হও, তবে বলতে পার, কিন্তু তাকে 'মুজাদ্দিদে দীন' বলতে অন্তত তোমার কিছুটা হলেও ইতঃস্তত করা উচিত।

এ সম্পর্কিত বিষয়ের একটি উদাহরণ হলো যখন বেরেলভী সাহেব কোনো এক ব্যক্তির নিকট জ্ঞানার্জনের জন্য গেল। শিক্ষক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তার পেশা কী? সে উত্তরে বলেছিল ওয়াহাবীদের পথভ্রষ্টতা ও কুফর উন্মোচন করাই তার কাজ। তার শিক্ষক বললেন যে, এ ধরনের আচরণ ভাল নয়। সে সেস্থান ত্যাগ করে চলে গেল [৮৩] এবং তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাল, কারণ তিনি তাওহীদপন্থিদের কাফির ঘোষণা দেওয়া করা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন।

ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বদা সে জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক অভিব্যক্তির শব্দ ব্যবহার করতো। অর্থহীন শব্দাবলি ও বাক্যাংশ ব্যবহারের দ্বারা সে বোঝাতে চাইত যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা প্রশাখায় তার অনেক দক্ষতা রয়েছে। কারণ এখানে (ভারতীয় উপমহাদেশে) দীনী আলেমদের যাকে বোঝা যতো কঠিন, যার কথা যত অবোধ্য, সে ততোবেশী 'উচ্চ শ্রেণির আলিম' বলে গণ্য হয়। তার এক অনুসারী লিখেছে যে, আহমাদ রেযার কথা বোঝার জন্য তাকেও জ্ঞানের সাগর হওয়া প্রয়োজন। [৮৪] তার ভাষায় বুৎপত্তি ও সাবলিলতার ঘাটতি ছিল। ফলে সে বক্তব্য দেওয়া থেকে নিজেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিত। ঈদে মিলাদুন্নবী অথবা তার 'আল রাসুল শাহ'র উরস উপলক্ষে সে মাঝে মধ্যে কিছু কথা-বার্তা বলতো। [৮৫]

টিকাঃ
৮১. সুবহান আস সাবুহ, আহমাদ রেযা বেরেলভী, পৃ-১৪২।
৮২. প্রাগুক্ত।
৮৩. হায়াতে আলা হযরত, জাফরুদ্দীন বিহারী।
৮৪. আনোয়ার রেযা, পৃ-২৮৪
৮৫. হায়াতে আলা হযরত, জাফরুদ্দীন বিহারী

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৬. বেরেলভীর রচনাবলি ও লিখনী

📄 ৬. বেরেলভীর রচনাবলি ও লিখনী


আহমাদ রেযার লিখনীর উল্লেখ করার পূর্বে পাঠকদের এ ঘটনার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই যে, বেরেলভী ফিরকার নিকট অতিরঞ্জন অত্যন্ত প্রিয়। আর অতিরঞ্জনের সময় মিথ্যা বর্ণনা ব্যবহার করা তাদের সহজাত অভ্যাস। তার রচনাবলি সম্পর্কেও তারা ব্যাপকভাবে এটি ব্যবহার করেছে এবং তার শত শত বই গণনা করেছে চোখ বন্ধ করে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো এর বিপরীত। তাদের স্ববিরোধি কথা বার্তার কিছু নমুনা নিচে দেওয়া হলো -

তার বর্ণনাকারীদের একজন লিখেছে, "আহমাদ রেযার রচনাবলির সংখ্যা ২০০-এর কাছাকাছি। [৮৬] আরেক বর্ণনায় ৩৫০'র কাছাকাছি বলা হয়েছে। [৮৭] অপর বর্ণনায়, প্রায় ৪৪০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [৮৮] আরো এক ব্যক্তি বলেছেন যে, তা ৫০০ কে ছাড়িয়ে যাবে। [৮৯] কেউ কেউ বলেন যে, সেগুলো সংখ্যায় ৬০০ এর অধিক। [৯০] অপর এক ব্যক্তি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে এবং বলেছে যে, তা সংখ্যায় এক হাজারেরও বেশি। [৯১]

কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো তার বইয়ের সংখ্যা, যাকে বই বলা যেতে পারে, তা ১০টির বেশি নয়। সম্ভবত এটিকেও তারা অতিরঞ্জিত করেছে। বেরেলভী আসলে কোন কিতাবই লিখেননি, বরং তিনি কিছু মানুষের জানতে চাওয়া প্রশ্নের উত্তর ও ব্যখ্যা লিখেছেন, সেটিও করতেন তার নিকটে এই কর্মে নিয়োজিত থাকা কিছু ব্যক্তির সাহায্যে। তারা ফিকহের কিতাবগুলো থেকে মানুষদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে সেগুলো একত্রিত করে দিতেন। কখনো কখনো উত্তর না পেয়ে, প্রশ্নগুলো অন্য শহরে পাঠানো হতো, কেননা তাদের নিকটে কিছু কিতাব আছে যেখানে এর উত্তর পাওয়া যেতে পারে, সেখানে তার সহযোগিরা উত্তরগুলো খুঁজে বের করে লিপিবদ্ধ করে বেরেলভীর নিকটে পাঠাতেন, বেরেলভী সেগুলো কোন প্রকার যাচাই বাছাই ছাড়াই একস্থানে একত্রিত করতেন, ফলে তার এই লেখার মধ্যে অনেক জটিলতা, অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্য বিষয় পাওয়া যায়। এজন্য পাঠক তার এই লেখা পড়তে যেয়ে হয়রান হয়ে যেত, বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যেত। যারা প্রশ্ন করেছে তাদের নিকটে উত্তরগুলো পাঠানোর আগেই বেরেলভী সেগুলো একটি উপযুক্ত নাম ও অন্য কোন তারিখ দিয়ে তারপর পাঠাতেন। আর এটাকেই বই হিসেবে মুদ্রণ করতেন। কখনো কখনো এমন হত, যিনি ফাতোয়া চেয়েছেন তার নিকটে উক্ত ফাতোয়া পৌঁছানোর আগেই পুস্তিকা বা রিসালাহ হিসেবে মুদ্রণ হয়ে যেত। আর এটা তার অভ্যাস ছিল। তার ফাতোয়াসম্মূহের মধ্যে সাধারণত থাকতো একনিষ্ঠ তাওহীদপন্থি, কিতাব ও সুন্নাতের অনুসারীদের খণ্ডন। এজন্য অধিকাংশ সময়ই পাঠকমহল দেখতেন তার লেখনির মধ্যে থাকতো বিতর্কিত ও কল্পকাহীনি সম্পন্ন লেখা। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিরোধীতায় যেসকল নাম দিয়ে লিখতেন। যেমন, ১। নাবী-রাসূলগণ ও সালেহীন ব্যক্তিরা কি গায়েব জানে? ২। নাবী-রাসূলগণ কি অন্য মানুষের মত মাটির নাকি নূরের? তাদের মৃত্যুর পরে তারা কি দুনিয়ার জীবনের মত জীবিত? সেখান থেকে তারা গায়েবের খবর রাখে কি না। তাদের স্বাধিনতা ও শক্তি আছে কিনা। তাদের কবরে বরকত হাসিল করা যাবে কিনা, তাদের মূর্তি ও ভাষ্কর্য্য তৈরি করা যাবে কি না ইত্যাদি মাসআলা।

আর এজন্য বলা যায় বেরেলভী কোন কিতাব লিখেনি। যদিও এসকল ফাতোয়ার বিরাট অংশ তার নিজের গবেষণা না তবুও তার হাতের আঙ্গুলগুলো এই সকল বিষয়ের ফাতোয়াগুলো নাড়াচাড়া করছে। সারমর্মের দিক থেকে একিভূত হয়েছে।

আমরা উপরে যা বললাম সেগুলোর প্রমাণ নিচের কথাগুলোর মাধ্যমে পেশ করছি।
(১) বেরেলভীরা বলে বেরেলভীর কিতাব হাজারেরও উপরে এটি প্রমাণ বিহীন কথা। কেননা কিতাব শব্দটিতে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত হয় তা তার মূদ্রিত ফাতোয়াগুলো ছোট বড় দিয়ে আট খণ্ড। আর এছাড়া বাকিগুলো বিভিন্ন পুস্তিকা, প্রবন্ধ যেগুলোকে কিতাব বলা যায় না। আবার ঐ সকল ফাতোয়ার কিতাবগুলোকেও কোন কিতাব বলা যায় না। কেননা ঐ আট খণ্ডে এই পুস্তিকা ও রিসালাহগুলোই একত্রিত করা হয়েছে। আপনি মনযোগ দিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন পুস্তিকা ও রিসালাগুলোর বিশাল অংশ এই আট খন্ডে রয়েছে, যদিও সব পুস্তিকাগুলো নেওয়া হয়নি। যেমন, আট খণ্ডের মধ্যে প্রথম খণ্ড হলো আল ফাতাওয়া আল রিদ্বাইয়া এর মধ্যে ৩১ টি পুস্তিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা আমরা একবার দেখে গুনে ফেলেছি। এসকল পুস্তিকার নামগুলো হলো,
১. আল জুদ ওয়াল হুলু ২. তানবিরুল কনদীল ৩. আখার মাসাইল ৪. আন নামিক্বাতুল আনক্বা ৫. রহবুস সাআহ ৬. হিবাতুল হামীর ৭. মাসাইলে আখর ৮. ফাছলুল বি'র ৯. বারিকুন নূর ১০. ইরতিফাউ'ল হাজব ১১. আত তারসুল মু'দাল ১২. আত জ্বলাবাতুল বাদিআ'হ ১৩. বারাকাতুস সামাই ১৪. আত্মাউন নাবী ১৫. আন নূর ওয়ানাওয়ারক ১৬. সামউন নাদর ১৭. হুসনুত তাআম্মুম ১৮. বাবুল আক্বাইদ ১৯. ক্বাওয়ানিনুল উলামা ২০. আল জাদ্দুস সাঈদ ২১. মাজাল্লিশ শুমআ ২২. তিবইয়ানুল উদ্বু ২৩. আদদিক্বাতু ওয়াত তিবইয়ান ২৪. আন নাহয়ু ওয়ান নামীর ২৫. আযুফরু লি কওলি যাফারিন ২৬. আল মাত্মারুস সাঈদ ২৭. লামউল আহকাম ২৮. আল মুআল্লিমুত ত্বারাজ ২৯. নাব্বাহুল ক্বওম ৩০. আজলীল আ'লাম ৩১. আল আহকাম ওয়াল ই'লাল।
এই সকল পুস্তিকা কোনটি মাত্র ৬ পৃষ্ঠা যেমন তানবীরুল ক্বানদীল। আবার কোনটি মাত্র ৭ পৃষ্ঠা যেমন ত্বিবইয়ানুল উদ্বু। আবার কোনটি মাত্র ৮ পৃষ্ঠা যেমন লামঊ'ল আহকাম এবং হিবাতুল হামীর। এই হলো এদের আসল চেহারা, এই হলো বেরেলভীর বিশাল কিতাবের সংখ্যা যার কিছু সংখ্যা আমি উল্লেখ করলাম।

(২) ওমুক হাজার হাজার কিতাব লিখেছে, দুই হাজার বা আরো বেশি কিতাব লিখেছে এগুলো মুখে বলা খুব সহজ, যা বলতে কোন পরিশ্রম করা লাগে না, কোন কষ্ট করা লাগে না। কিন্তু এটা প্রমাণ করা অনেক কঠিন। এমনই হলো এরা। বেরেলভী নিজেই উল্লেখ করেছে সে মাত্র ১১ টা পুস্তিকা রচনা করেছে আর ঐ সময়ই সেটি ২০০ কিতাব হয়ে গিয়েছিল। তার ছেলে ওহাবীদের বিরুদ্ধে তার কিতাবের তাআ'লীক করে সেগুলোর সংখ্যা ৪০০ তে গিয়ে পৌঁছে ছিল। এর মধ্যে ছিল ১২ টি বিশাল ফাতওয়া। [৯২] এরপরে তার ছাত্র ও খলিফা আলবাহারী ৩৫০ খানা পুস্তিকা সেখানে যুক্ত করে ফলে এগুলো সব আলাদা আলাদা কিতাব গণ্য করেও সর্বোচ্চ ৫৪৮ টি কিতাব হয়।

তাদের হাস্যকর দাবী ও মজার বিষয় স্পষ্ট করার জন্য নিম্নে তাদের গননাকৃত কিছু কিতাবের নাম দেওয়া হলো।
হাশিয়াতু সহীহিল বুখারী, হাশিয়াতু সহীহ মুসলিম, হাশিয়াতুন নাসাঈ, হাশিয়াতু ইবনি মাজাহ, হাশিয়াতুত তাক্বরিব, হাশিয়াতু মুসনাদি ইমামিল আযাম, হাশিয়াতু মুসনাদিল ইমাম আহমাদ, হাশিয়াতুত তাহাবী, হাশিয়াতু খাছাইছি কুবরা, হাশিয়াতু কাংযিল উম্মাল, হাশিয়াতু কিতাবি আসমাই ওয়াস সিফাত, হাশিয়াতুল ইছাবা, হাশিয়াতু মাউদ্বু আতিন কাবীর, হাশিয়াতু শামসিন বাঝিগাত, হাশিয়াতু উমদাতুল ক্বারী, হাশিয়াতু ফাতহিল বারী, হাশিয়াতু নাছবির রাইয়া, হাশিয়াতু ফাইদ্বিল ক্বদ্বীর, হাশিয়াতু আশআতিল লুমআত, হাশিয়াতু মাজমাঈ বিহারিল আনওয়ার, হাশিয়াতু তাহযিবুত তাহযিব, হাশিয়াতু মুসামারাতিন ওয়া মুসাইরাহ, হাশিয়াতু তুহফাতুল ইখওয়ান, হাশিয়াতু মিফতাহিস সাআদাহ, হাশিয়াতু কাশফুল গুম্মাহ, হাশিয়াতু মিযানিশ শারীয়া ইত্যাদ।

এসকল কিতাব যা তারা উল্লেখ করাকে সবগুলো বেরেলভী পাঠাগারে আছে, যেগুলোর কোনটিতে তিনি হয়তো চোখ বুলিয়েছেন, অথবা এক বা দুই পৃষ্ঠা টিকা লিখেছেন ব্যস সেটিকেই তারা তার কিতাব বলে গণ্য করেছে। এর জন্য এগুলোর কোন পুস্তিকাও বের হয়নি। যদি এত সহজ বিষয় হত তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিই দাবি করে বলতো আমার হাজারের উপরে কিতাব আছে। আমাদের উদাহরণ স্বরূপ যে সকল কিতাব যেমন আল ফিরাক্ব ওয়াল আদইয়ান, আরুদুদ আ'লা ফিরাকিল বাতিলাতিল মুনহারিফা আন ছিরাতিল মুসতাক্বীম, ওয়াঝ জাইগাতু আন জাদ্দাতিছ ছাওয়াব। যদি তারা এগুলো একটু দেখতো ও সামান্য সমালোচনা করতো তাহলে তারা বলতো ৫ হাজারের উপরে কিতাব রয়েছে। কেননা আমি তাদের দাবী করা ৩০০ এর অধিক কিতাব পড়েছি এবং এর প্রত্যেকটি কিতাবে আমি টিকা লিখেছি তাহলে ওগুলো কি আমার কিতাব? এই হলো তাদের অবস্থা, তাহলে এত গর্ব কি নিয়ে?

আমাদের আলোচনার পূর্ণতার জন্য আমরা তাদের পরস্পর বিরোধী কথাগুলো উল্লেখ করছি যা তারা কিতাব গণনার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছে।
১. বেরেলভীর দাবি তার কিতাব ২০০ টি
২. তার খলিফা ও ছাত্রের দাবি তার কিতাব ৩৫০ টি
৩. তার ছেলের দাবি তার কিতাব ৪০০টি
৪. আনওয়ারুর রিদ্বার লেখকের দাবি, তার কিতাব ৫৪৮টি
৫. আল বাহারীর দাবী তার কিতাব ৬০০ বা ১০০০টি।

(৩) বেরেলভীর জীবদ্দশা থেকে আজ পর্যন্ত তার নামে যত রিসালাহ বা পুস্তিকা দাবি করা হয়ে থাকে সেগুলো মুদ্রণ করলে ২৫০০ এর বেশি হবে না, যা আনওয়ারুর রিদ্বার লেখক উল্লেখ করেছে। আর এসব পুস্তিকা তার ঐ ফাতোয়া যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

(৪) আমরা আহমাদ রেযা খান বেরেলভীর লেখালেখি ও রচনাবলি সম্পর্কে বেরেলভীদের মিথ্যাচার ও বাড়াবড়ি উপরে উল্লেখ করলাম। এমনকি হযরত বুরহানুল মিল্লাতি ওয়াদ দীন মাওলানা আল মুফতি মুহাম্মাদ বুরহানুল হক আল কাদিরী, আর রিদ্বাবী, আল মুফতিউল আযম আল জাবাল পুরী লিখেছেন, হযরত বেরেলভী একজন মুজাদ্দীদ ছিলেন তার প্রমাণ হলো, তিনি এমন সব ফাতাওয়া লিখেছেন যা পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কারো কিতাবে পাওয়া যায় না। আর তার ফাতাওয়াগুলো বড় বড় ১২ টি খণ্ডের মধ্যে একত্রিত করা হয়েছে। আর এক এক খণ্ডের পৃষ্ঠা সংখ্যা হাজারেরও উপরে।

আমরা একটু মনযোগ দিয়ে দৃঢ়দৃষ্টিতে এই ফাতওয়ার কতটা মুল্যবান তা পাঠকের নজরে এই স্পষ্ট মিথ্যুক ও নোংরা দলের মিথ্যা সমূহ দেখেছি। লক্ষ্য করুন, মুফতি সাহেব লিখলেন, তার ফাতাওয়ার কিতাবগুলো বড় বড় ১২ টি খণ্ডের মধ্যে একত্রিত করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো আজ পর্যন্ত আট খণ্ডের বেশি মূদ্রিত হয়নি, যার মধ্যে একটি খণ্ড বড় বাকিগুলো সবই ছোট। তিনি আরো লিখেছেন, এগুলোর এক একটির পৃষ্ঠা সংখ্যা নাকি হাজারেরও উপরে, অথচ এর যেটি সবচেয়ে বড় খন্ড সেটির পৃষ্ঠা সংখ্যা হলো ৬২৪ টি আর বাকি গুলোর পৃষ্ঠা সংখ্যা হলো ৫০০, ৬০০ পৃষ্ঠা করে। আবার একটির পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র ৩২৫টি, এর একটিরও পৃষ্ঠা সংখ্যা হাজারের সংখ্যাতে পৌঁছায়নি। আমরা এই ফের্কার লেখালেখি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করে যা দেখালাম তা হলো, এই ফের্কা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, মিথ্যা, বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের উপরে।

(৫) এই সকল ফাতাওয়ার লেখক হলেন, বেরেলভীর অসংখ্য সাহায্য ও সহযোগিতাকারী, তার অনুসারী ও ছাত্রগণ। এমনকি আলবাহারী বেরেলভীর জিবনীতে উল্লেখ করেছেন, যখন তার কাছে কোন ফাতওয়া আসতো তখন তিনি লেখকদের মাঝে ভাগ করে দিতেন, এর উত্তর লেখার জন্য। যেমনটি বেরেলভী নিজেই তার একটি চিঠিতে সমসাময়িক একজনের কাছে লিখেছিলেন, আমি তোমাদের নিকটে এমন একজন ব্যক্তিকে পাঠিয়েছি, যিনি আমার মাদ্রাসার একজন শিক্ষক ও আমার ফাতওয়া লেখার সাহায্যকারী।

তিনি আরো একটি চিঠিতে লিখেছেন, আমার নিকটে কিছু তাফসীরে বর্ণনা পৌঁছেছে, আমার বাকিগুলোও প্রয়োজন, আমাকে বলবে তাফসীরে রুহুল মাআনী কি? কে এই আলুসী আল বাগদাদী? আমি তাকে চিনিনা, তোমার নিকটে এই বিষয়ে কোন কিতাব বা তার জীবনী থাকলে আমাকে জানাবে। হাওয়ামিশুল মাদরাকের বর্ণনাগুলোও আমার দরকার।

আরো একটি চিঠিতে লিখেছেন, খেযাবের মাসআলার পূর্ণ বর্ণনা আমার লাগবে, নিম্নের কিতাবগুলো থেকে, যদি তোমার নিকটে কিতাবগুলো থাকে তাহলে তো খুবই ভাল, আর যদি না থাকে তাহলে গ্রন্থাগারে যেয়ে নিয়ে আসবে, কিতাবগুলো হলো, আত তাতারখানিয়‍্যা, যাদুল মাআদ, আকদুল ফারীদ লিইবিন আব্দির রববিহ, নুঝহাতুল মাজালিস, ছাররাহ, কামুস, তাজুল উরুস, খালিকু ঝামাখশারী, মাগরিবু মাত্বরাণী, মিছবাহুল মুনীর, মুখতারুছ ছহহাহ, নিহাতু ইবনিল আসীর, মাজমাউল বিহার, মিরক্বাত, ইশআতুল লুমআত, ফাতহুল বারী, উমদাতুল ক্বারী, ইরশাদুস সারী, শরহু মুসলিম লিন নববী, শারহু শারঈ শামাইলে তিরমিযি, শারহু শারআতিল ইসলাম, শারহু মাশারিক্বীল আনওয়ার, তাইসির, আস সিরাজুল মুনীর, শারহুল জামীইস সাগীর। [৯৩]

এই সকল কিছু প্রমাণ করে সে নিজে কোন ফাতওয়া লিখেনি, বরং তার সাহায্য ও সহযোগিতাকারীরা এই সকল ফাতাওয়া লিখে তাকে দিত, তখন তিনি তা নিজের নামে প্রশ্নকারীর নিকট পাঠাতেন।

টিকাঃ
৮৬. [মুকাদ্দামাহ আল দাউলাহ আল মাক্কিয়াহ]
৮৭. [প্রাগুক্ত]
৮৮. (আল মুজমাল আল মাদাদ তালিফাত আল মুজাদ্দিদ, জাফর বিহারী)
৮৯. (প্রাগুক্ত)
৯০. [হায়াত আল বেরেলভী, পৃ-১৩]
৯১. [মান হুয়া আহমাদ রেযা, পৃ-২৫]
৯২. তার কিতাবের সংখ্যার বিশালতা সম্পর্কে আমরা আলোচনা করেছি।
৯৩. হায়াতু আলা হযরত পৃ ২৮১।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৭. জিহাদের বিরোধিতা এবং ইংরেজ উপনিবেশের সমর্থন

📄 ৭. জিহাদের বিরোধিতা এবং ইংরেজ উপনিবেশের সমর্থন


আহমেদ রেযার যুগ ছিল ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের যুগ। ফেতনা-ফেসাদ ঘাত-প্রতিঘাত মুসলিম জাতিকে গ্রাস করেছিল। তাদের শাসন অবসান ঘটেছিল। ব্রিটিশরা মুসলিমদের নির্মূল করতে চেষ্টা করেছিল। মুসলিম আলেমগণকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাবার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ মুসলিম জনগণ চরমপন্থা ও জুলুমের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তাদের বন্দী করা হয়েছিল এবং কালাপানিতে অন্যান্য কারাগারে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল ও তারা মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক অবস্থান হারিয়ে ফেলেছিল। বৃটিশ উপনিবেশিকরা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মুসলিমদের অস্তিত্বই মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তাদের এ যুগে যদি কোনো একদল লোক তাদের বিরুদ্ধে গলা চড়িয়ে প্রতিবাদ করতো এবং সর্বশক্তি ও সাহস নিয়ে তাদেরকে প্রতিরোধ করতো, তবে তাদেরকেই ওয়াহহাবী [৯৪] বলা হতো।

যারা জিহাদের আদর্শকে তুলে ধরেছিল, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তাদেরকে কালা পানির শান্তি ভোগ করতে হয়েছিল। তারা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ উপনিবেশকে মানতে পারেনি। সে যুগের ওয়াহাবীরা চেয়েছিল যে, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হোক। একসঙ্গে প্রতিরোধ ও যুক্ত করা, এক পতাকার নিচে একত্রিত হওয়া ও বৃটিশ উপনিবেশের অবসান ঘটানোর জন্য সেই সময়ে প্রয়োজন ছিল ঐক্য ও বোঝাপড়ার, কিন্তু উপনিবেশীরা তা চাইত না। তারা মুসলিমদেরকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইত। তারা মুসলিমদের একে অপরের বিরোধী দেখাতে চাইত। এ লক্ষ্য অর্জনে তাদের কিছু লোকের প্রয়োজন ছিল যারা তাদের (ব্রিটিশদের) অনুচর হিসেবে কাজ করবে এবং মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি ও বিরোধ ঘটাবে এবং তাদেরকে একে অপরের বিরূদ্ধে লাগার জন্য উসকে দেবে। তারা তাদের ঐক্যকে ধবংস করবে এবং তাদের শক্তি ও অবস্থাকে দুর্বল করে দেবে। এ উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা কিছু লোককে বাছাই করল এবং তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করল। যাদের মধ্যে ছিল গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী এবং জনাব বেরেলভীর বিরোধিদের মতে, জনাব আহমাদ রেযা খান বেরেলভীর নাম ছিল সেই তালিকায় সবার শীর্ষে। [৯৫]

গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর কর্মকাণ্ড কারো নিকট লুকায়িত নেই। কিন্তু আহমাদ রেযা সাহেবের বিষয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আহমাদ রেযা ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী ওয়াহাবীদেরকে তার গালাগালি, বিদ্বেষ, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হাসি তামাশার লক্ষ্যস্থল বানিয়েছিল। যে সকল ওয়াহাবীরা ব্রিটিশ উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদরত ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ উপনিবেশিকরা তাদের গ্রামগুলোর উপর দিয়ে বুলডোজার চালিয়েছিল। [৯৬] শুধু বাংলাতেই এক লক্ষ ওয়াহাবী আলেম ও সাধারণ মানুষকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল। [৯৭]

এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ইংরেজি লেখক তার বইতে লিখেছে: (ভারতে) আমাদের শাসনের ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে আমাদের কোনো বিপদ ছিল না। যদি কোনো বিপদ থেকেই থাকে, তবে তা হলো একটা ক্ষুদ্র মুসলিম দল ওয়াহাবীদের পক্ষ হতে, কারণ একমাত্র তারাই সেই দল, যারা আমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করছিল। [৯৮]

১৮৫৭ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে, ওয়াহাবীগণের প্রধান প্রধান ব্যক্তিদেরকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল তাদের জন্য খুবই কঠিন। এ সময়ে ব্রিটিশরা তাদের উপর যে ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছিল, ভারতীয় ইতিহাস এর সাক্ষী হয়ে আছে। ওয়াহাবীগণের প্রধান প্রধান আলেমগণ যারা বন্দীত্ব ও কারাবরণের যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন, তারা হলেন- ১. মাওলানা জাফর থানিশ্রী ২. মাওলানা আব্দুর রহিম ৩. মাওলানা আব্দুল গাফফার ৪. মাওলানা ইয়াহইয়া আলী সাদিকপুরী ৫. মাওলানা আহমাদুল্লাহ এবং তাদের সবার শায়খ, ৬. মাওলানা নাযির হুসাইন মুহাদ্দিস দেহলবী (রহমাতুল্লাহ আলাইহিম)।

ওয়াহাবী মুজাহিদগণের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার একটি আদেশ প্রদান করা হয়েছিল। [৯৯] তাদের বাড়ি ঘর সমান করে দেওয়া হয়েছিল এবং এমনকি তাদের পারিবারিক কবরস্থান পর্যন্ত উল্টে দেওয়া হয়েছিল। [১০০] তাদের বাড়িঘরের উপর বুলডোজার চালানো হয়েছিল। [১০১] ওয়াহাবী আলেমদের গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। এ বিষয়ে শায়খ সাইয়্যেদ নাযির হুসাইন এর গ্রেফতার খুবই বিখ্যাত। [১০২]

ব্রিটিশ উপনিবেশকরা তাদের সুপরিচিত “ভাগ কর এবং শাসন কর” (Divide and Rule) পলিসি ব্যবহার করে এ ওয়াহবীগণের বিরুদ্ধে আহমাদ রেযা বেরেলভীকে ব্যবহার করেছিল; উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের মাঝে দলাদলি, বিভক্তি ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি এবং তাদের ঐক্যকে চিরতরে ধ্বংস করা। যখন ব্রিটিশ উপনিবেশকদের বিরোধিরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে নিয়োজিত ছিল। ঠিক তখনই আহমাদ রেযা বেরেলভী মুসলিম নেতাদের মধ্যে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে কোনো না কোনো ভাবে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, তাদের নামোল্লেখ করে তাদেরকে তাকফীর (কাফির ঘোষণা) করে।

ওয়াহাবীগণ ছাড়াও যে সকল গ্রুপ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে মুসলিমদের মধ্য থেকে জামায়াতে ওলামায়ে হিন্দ, মাজলিস ইহরার, তেহরিক খিলাফাত, মুসলিম লীগ এবং হিন্দুদের মধ্য থেকে আযাদ হিন্দু ফৌজ এবং গান্ধির কংগ্রেস উল্লেখযোগ্য ছিল। জনাব বেরেলভী স্বাধীনতা আন্দোলনের গ্রুপগুলো থেকে শুধু যে দূরে ছিল, তা-ই নয় সে তাদের এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে তাকফীর (কাফির) ঘোষণা করেছিল, তাদেরকে গালাগাল করা ও তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল এবং তাদের সাথে যোগ দেওয়াকে না- জায়েয ফতোয়া দিয়েছিল।

জনাব বেরেলভী তেহরীক খিলাফাহ এর সময়ে মারা যায় কিন্তু তার পরে তার অনুসারীরা মিশনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং তারা ওয়াহাবী ছাড়াও মুসলিম লীগেরও বিরোধিতা করেছিল এবং মুসলিম লীগের খ্যাত ব্যক্তিবর্গকে কাফির (মুরতাদ) ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করেছিল এবং ব্রিটিশদের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছিল। আহমাদ রেযার নেতৃত্বে বেরেলভীয়াহ আকাবিরগণ এ সকল আন্দোলন হতে মুসলিমদের দূরে সরিয়ে রাখতে অনড় ছিল এবং মারাত্মকভাবে জিহাদের বিরোধিতা করেছিল। যখন শরীয়াতের ভিত্তিতে স্বাধীনতার জিহাদ এ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল ছিল যে, ভারত ছিল দারুল হারব এবং মুসলিম মিল্লাতের আকাবিরগণ ভারতকে ইতিমধ্যে 'দারুল হরব' ঘোষণা করেছিলেন, তখন আহমাদ রেযা বেরেলভী এ ফতোয়ার ভিত্তিতে জিহাদকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছিল যে, সে ফতোয়া দিয়েছিল যে, ভারত (ছিল) 'দারুল ইসলাম'। আর এ বিষয়ে সে একটি ২০ পৃষ্ঠার ছোট পুস্তিকা লিখেছিল যার নাম, ইলাম আল ইলাম বান হিন্দুস্তান দারুল ইসলাম। বেরেলভী এ পুস্তিকার শুরুতে যার উপর জোর দিয়েছিল তা হলো ওয়াহাবীরা কাফির এবং মুরতাদ, তাদেরকে (ওয়াহাবীদেরকে) ক্ষমা করা না জায়েয। এমনকি তাদের কাছে জিযিয়া নেওয়ার পরে ও অনুরূপভাবে তাদের আশ্রয়দান, তাদেরকে বিয়ে করা, তাদের জবেহ করা (প্রাণী) খাওয়া তাদের (পেছনে) সালাত আদায় করা জায়েয নয়, এমনকি তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা অথবা ব্যবসায়ীক লেনদেন করাও জায়েয নয় বরং তাদের নারীদের দাসী বানানো উচিত এবং তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট (একঘরে) করা উচিত। পরিপ্রেক্ষিতে সে লিখেছে - কাতালাহুমুল্লাহু আন্না ইউফাকুন অর্থ “আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, তারা কোথায় ফিরে মরছে?” (সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৪) [১০০]

আহমাদ রেযার আসল চেহারা উন্মোচনের জন্য এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাটিই যথেষ্ট। এর মাধ্যমে তার প্রতারণা প্রকাশ হয়ে পড়েছে কিভাবে সে মুজাহিদগণের বিরোধিতা করেছিল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের শক্তিশালী করেছিল এবং মুসলিমদেরকে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কিভাবে সে মুসলিমদের এবং তাদের দীনের শত্রুদের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

তুর্কী সালতানাত ভেঙ্গে যাওয়ার পর যখন সারা বিশ্বব্যাপী মুসলিমগণ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর উচ্চ করেছিল এবং মাওলানা মুহাম্মদ আলী জাওহার এর নেতৃত্বাধীনে মুসলিম খিলাফত, নিরাপত্তা ও সংবিধানের জন্য ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, ঠিক সে সময় আহমাদ রেযা ব্রিটিশদের জন্য লাভজনক কাজে ব্যস্ত এবং সর্বদা লেগেছিল।

নিঃসন্দেহে, খিলাফত আন্দোলন ব্রিটিশদেরকে তাদের প্রতারণার জন্য শান্তি প্রদানে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। সকল মুসলিম একই পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল। আলেমগণ এবং সাধারণ মুসলিমগণ উভয়েই এ আন্দোলনে সমর্থন ছিল। একজন বেরেলভী লেখক ও এটা স্বীকার করেছে এবং লিখেছে, “১৯১৮ সালে ১ম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হলো। জার্মানী ও তাদের মিত্র তুর্কি ও অষ্ট্রিয়া পরাজিত হলো। ভারতীয় স্বাধীনতার বিষেয়ে তখন তুরস্ক থেকে একটি চুক্তি হয়। কিন্তু ব্রিটিশরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। তাই তারা তাদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ মনে করছিল যে, কোনোভাবে ব্রিটিশদের তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য শান্তি পাওয়া উচিত। তাই তারা মুসলিমদের অনুপ্রাণিত করেছিল যে, খিলাফত রক্ষা করা ফরয ও অবশ্যই কর্তব্য। ফলে এর উপর ভিত্তি করে খিলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুসলিমদের মাঝে একটি বিরাট ঝড় উঠে।” [১০৪]

আর কার্যত ১৯১৯ সালে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও আলিমগণের নেতৃত্বে শুরু হয়ে খিলাফত আন্দোলনে ব্রিটিশদের বন্দীদশা ও শৃংখাবদ্ধতার বিরুদ্ধে লোকদের অনুপ্রাণিত করে চলছিল। এভাবে তাদের উৎসাহ খিলাফত আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসানকে অবশ্যম্ভবী করে তুলেছিল। আহলে হাদীস আলেমে দীন ইমামুল হিন্দ মাওলানা আবুল কালাম আযাদ এ ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছেন। [১০৫]

বেরেলভী মতাদর্শের ইমাম ও তাদের মুজাদ্দিদ ব্রিটিশবিরোধী এ আন্দোলনের প্রভাব এবং এর ফলাফল অনুভব করেছিল এবং তাদের (ব্রিটিশদের) সাথে তার বন্ধুত্বের প্রমাণ দিয়েছিল। আর এ আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সে দাওয়াম আল আইশ নামে আরেকটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা রচনা করেছিল। এর মধ্যে সে বলেছিল যে, শারঈ খিলাফতের জন্য পূর্বশর্ত হলো খলীফা হতে হবে কুরাইশ বংশ হতে, ভারতীয়দের তুর্কীদের সহায়তার করার প্রয়োজন নেই, কারণ তারা কুরাইশ নয়। এর ভিত্তিতে সে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশকদের শক্তির কারণ হয়েছিল।

আহমদ রেযা খান সাহেব এ আন্দোলনের সম্ভ্রান্ত মুসলিম ব্যক্তিবর্গের সমালোচনা করে লিখেছিল: "তুর্কিদের পক্ষ অবলম্বন করা প্রতারণার ফাঁদ ছাড়া কিছুই নয়। আসল উদ্দেশ্য হলো, 'খিলাফত' 'খিলাফত' করে চিৎকার করা, জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে (পক্ষে) নেওয়া, চাঁদা সংগ্রহ এবং গঙ্গা ও যমুনার পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করা।” [১০৬]

জনাব বেরেলভী সাহেব 'অসহযোগ আন্দোলন'-এর ও বিরোধিতা করেছিল কারণ সে ভেবেছিল যে, এটা ব্রিটিশদের পতনের একটি কারণ হতে পারে। অসহযোগ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের পুরোপুরি বয়কট (বর্জন) করা- তাদের কোনো ট্যাক্স বা কর না দেওয়া, ব্রিটিশ কর্তৃক চালিত সরকারী অফিসে চাকুরী না করা। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা- যাতে তারা ভারতীয় ভূমি হতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এ উদ্দেশ্যে ১৯২০ খৃষ্টাব্দে মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং তারা নড়াচড়া আরম্ভ করে। গান্ধী ছাড়াও, আহমাদ রেযা এ আন্দোলনের ক্ষতি করতে চেষ্টা করেছিল এবং একটি পুস্তিকা রচনা করেছিল। আর এতে সে এ (আন্দোলনে)'র কঠোর সমালোচনা করেছিল এবং এ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের উপর 'কুফরী'র ফতোয়া জারী করেছিল।

তাই এ উদ্দেশ্যে লিখা আল মাহাজ্জাতুল মুতামানাহ ফী আয়াতিল মুমতাহানাহ নামক পুস্তিকা, যা তার ফতোয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেখানে সে নিশ্চিত করেছে যে, “এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলো ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করা।” [১০৭]

একই বইয়ে জিহাদের বিরুদ্ধে সে লিখেছে: “হিন্দ এর (ভারতের) মুসলিমদের জন্য জিহাদ ফরয নয়। [১০৮] ফলে যে ব্যক্তি এর ফরযিয়াতের উপর ঐকমত্য পোষণ করে সে মুসলিমদের বিরোধী এবং তাদের ক্ষতি করতে চায়।" [১০৯]

সে আরও লিখেছে: “হুসেইন (রাঃ)-এর জিহাদ দ্বারা যুক্তি দেওয়া সঠিক নয়। কারণ তাঁর উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এ সময়ের শাসকদের আর যুদ্ধ ফরয নয়, যতক্ষণ তার কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা না থাকে। তাই আমাদের উপর জিহাদ কিভাবে ফরয হতে পারে যখন আমরা ব্রিটিশদের মোকাবেলা করতে অসমর্থ?” [১১০]

জিহাদ হতে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরোধিতা করা হতে মুসলিমদেরকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে সে লিখেছে, "আল্লাহ তা'আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর তোমাদের নিজেদের দায়িত্ব। যদি তোমরা সঠিক পথে থাক তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন; তখন তিনি তোমরা যা আমল করতে তা তোমাদের জানিয়ে দেবেন। (সূরা মায়িদাহ-৫:১০৫)" [১১১]

অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমের ব্যক্তিগতভাবে আত্মসংশোধন করা উচিত এবং সম্মিলিত জিহাদের কোনো প্রয়োজন নেই। এ বইয়ের শেষাংশে ব্রিটিশদের বিরোধী নেতৃবৃন্দ ও 'অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থকদের সকলের উপর সে কুফরী ফতোয়া জারী করে। [১১২] তার বই, দাওয়াম আল আইশ এ জিহাদকে নস্যাৎ করার ফতোয়া দিয়েছিল, যেখানে সে লিখেছে: ভারতীয় মুসলিমদের উপর কোনো জিহাদ ও কিতালের হুকুম নাই। [১১৩]

যা হোক, আহমাদ রেযা সাহেবের ব্যাপারে এটাই স্বাভাবিক যে, সে ইংরেজদের দালাল এবং সে ব্রিটিশ বিরোধী যে কোনো আন্দোলনের বিরোধিতা করতো। বেরেলভী আহমাদ রেযার এক মুরীদ লিখেছে, "মুসলিমরা আহমাদ রেযার ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে গিয়েছিল।" [১১৪] অপর একজন লেখক লিখেছে: "খলিফার বিষয়ে তার ভিন্নমত ছিল। তার খিলাফত বিরোধিতার কারণে মৃত্যুর নিকটবর্তী সময়ে মুসলিমরা তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করছিল এবং তার ভক্ত ও মুরীদরা তার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। [১১৫]

যাহোক, ঠিক যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মুসলিমদের একতাবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই আহমাদ রেযা সাহেব তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করছিল। এমনকি যদি তাকে ব্রিটিশদের দালাল নাও বলা হয়, তখনও এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, তার সকল কার্যক্রম ছিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে এবং ইংরেজদের পক্ষে। কারণ সে শুধু মুসলিমদের বিরোধিতাই করেনি এবং সে ব্রিটিশদের সমর্থক হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল।

ফ্রান্সিস রবিনস আহমাদ রেযা সম্পর্কে লিখেছে: "আহমাদ রেযা বেরেলভী ব্রিটিশদের একজন সমর্থক ছিল। সে ১ম বিশ্ব যুদ্ধেও ইংরেজ শাসনকে সমর্থন করেছিল। অনুরূপভাবে, ১৯২১ সালে খিলাফত আন্দোলনের সময় সে ব্রিটিশদের একজন মদদদাতা ছিল এবং সে বেরেলীতে উলামাদের একটি সভার আয়োজন করেছিল, যারা ছিল অসহযোগ আন্দোলনের বিরোধী।" [১১৬]

টিকাঃ
৯৪. ওয়াহাবী: ওয়াহাবী শব্দটি আহলে হাদীসকে বোঝাতে সর্বপ্রথম ব্রিটিশরাই এটি ব্যবহার করেছিল যাতে তারা তাদের (আহলে হাদীসের) মানহানি করতে পারে। ওয়াহাবী শব্দটি একজন বিদ্রোহীর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হত, নিঃসন্দেহে ওয়াহাবীগণ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ছিল।
৯৫. [বেরেলভী ফতোয়া, তাকফীরী আকসানী, আইনাহ সাদাকাত, মুকাদ্দিমা আশ শিহাবুস সাকিব, মুকাদ্দিমা বাসাইল চামদপুরী, ফাযিল বেরেলভী ইত্যাদি গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য।]
৯৬. [তাজকিরাহ সাদেক, আব্দুর রহিম]
৯৭. ["ওয়াহাবী ট্রায়াল্স" (ওয়াহাবীদের বিচার") দ্রষ্টব্য]
৯৮. (ইণ্ডিয়ান মুসলিম্স, পৃ-৩২)
৯৯. [ওয়াহাবী তেহরীক, পৃ-২৯২]
১০০. [তাযকিরাহ সাদিক]
১০১. [প্রাগুক্ত]
১০২. [ওয়াহাবী তেহরীক, পৃ-৩১৫]
১০০. ইলাম আল ইলাম বান হিন্দুস্তান দারুল ইসলাম, পৃ-১৯-২০ দ্র.
১০৪. (মুকাদ্দিমা দাওয়াম আল আইশ, মাসুদ আহমেদ, পৃ-১৫)
১০৫. (প্রাগুক্ত, পৃ-১৮)
১০৬. (দাওয়াম আল আইশ, পৃ--২৩; অন্য সূত্র অস্পষ্ট)
১০৭. (المحجة المؤتمنة في أية الممتحنة , আহমাদ রেযা, পৃ-১৫৫)
১০৮. (একই ফতোয়া দিয়েছে গোলাম আহমদ কাদিয়ানী)
১০৯. (: 20- المحجة المؤتمنة في اية الممتحنة)
১১০. (প্রাগুক্ত, পৃ-২১০)
১১১. [প্রাগুক্ত, পৃ-২০৬]
১১২. [প্রাগুক্ত, পৃ-২১১]
১১৩. (দাওয়াম আল আইশ, পৃ-৪৬)
১১৪. (মুকাদ্দিমা, দাওয়াম আল আইশ, পৃ-১৮)
১১৫. [কিতাবীদ দুনইয়া মুকালা হাসান নিজামী, পৃ-২; মুকাদ্দিমা, দাওয়াম আল আইশ, পৃ-১৮]
১১৬. (Indian Muslims, p-443, Cambridge University)

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৮. আহমাদ রেযার মৃত্যু

📄 ৮. আহমাদ রেযার মৃত্যু


সে বক্ষব্যাধী রোগে মারা যায়। তার মৃত্যুর পূর্বে সে অনেকগুলো ওসীয়ত করে যায়, যা ওসীয়ত শরীফ নামে একটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। আহমাদ রেযা তার মৃত্যুর পূর্বে বলে, সকল ফরযের মধ্যে বড় ফরয হলো আমার দীন ও মাযহাবের উপর কায়েম থাকা যা আমার কিতাবসমূহে পাওয়া যাবে। [১১৭]

সে আরো বলে: “হে প্রিয় ভাইয়েরা! আমি কতদিন তোমাদের মাঝে অবস্থান করবো, আমি জানিনা। তোমরা হলো মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিষ্পাপ মেষ। তোমরা চারিপাশ দিয়ে নেকড়ে দ্বারা পরিবেষ্টিত, যারা তোমাদেরকে (যার উপর তোমরা রয়েছ, তা থেকে) পথভ্রষ্ট করতে চায়। আর তোমাদেরকে দুঃখ- কষ্টের সময় গ্রাস করতে চায়। তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাক এবং তাদের থেকে দূরে থাক - যেমন দেওবন্দীগণ ও তারা ব্যতীত অন্যান্যরাও।” [১১৮]

তার ওসীয়তনামার শেষে সে লিখেছে: যদি তোমাদের ইচ্ছা হয়, তবে নিম্নোক্ত জিনিসগুলো হতে কিছু জিনিস মানতের সময় সপ্তাহে দুইবার করে আমার নিকট পাঠিও। গৃহে উৎপন্ন হিমশীতল ঠাণ্ডা বরফ (অথবা যদি সম্ভব হয়) মহিষের দুধ হলে ভাল হয়, বিরিয়ানী, পোলাও, গোল্ডের শামী কাবাব, প্যারাঠি (তেল বা ঘি'-এ ভাজা পিঠা) এবং মাখন, ফিরনী, মসুরীর ডাল, আদা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস, গোস্তের কাচরী [গোল্ডের পুর দেওয়া ভাজা পিঠা], আপেলের রস, ডালিমের রস, সোডা বোতল, হিমশীতল দুধ।

যদি পার এগুলোর মধ্যে হতে প্রতিদিন একটি করে যোগাড় কর, অথবা যা সহজ হয় তাই কর।" আর পাদটীকায় উল্লেখ করা হয়েছে, “ছোট মাওলানা বললেন, আপনি পুনরায় হিমশীতল দুধের কথা উল্লেখ করলেন। 'হুজুর! আপনি ইতোমধ্যেই এটি উল্লেখ করেছেন।' তাই তিনি (আহমাদ রেযা) বললেন, “ওটা আবার লিখ। ইনশা আল্লাহ আমার রব আমাকে কেবল বরফই (বা তুষার) প্রদান করবেন।” এবং সে রকমই ঘটেছিল, দাফনের সময় এক ব্যক্তি বাড়িতে উৎপন্ন হিমশীতল দুধ এনেছিল। [১১৯]

বেরেলভী ফিরকার আহমাদ রেযা ২৫শে সফর, ১৩৪০ হিজরী (১৯২১ খ্রি.) সালে ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে। [১২০] মনে হয়, জনাব বেরেলভীর জানাযায় লোকের উল্লেখযোগ্য লোক সমাগম হয়নি। যাহোক, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছিনা, কারণ কোনো প্রমাণ ব্যতীত কোনোকিছু উল্লেখ করা আমাদের লেখার পদ্ধতি বিরুদ্ধ (কাজ) বলে আমরা মনে করি। যাহোক, আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্য- প্রমাণ থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তার তীব্র/ বিদ্রূপাত্মক ভাষা, ছোট-খাট বিষয়ে তার কুফরী ফতোয়া জারী করা এবং তার ব্রিটিশ বিরোধিতার ঘাটতির কারণে লোক জন তার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল।

এক বেরেলভী লেখক দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছে যে, মুসলিমগণ আহমাদ রেযার প্রতি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল। [১২১] আবার, তার 'খিলাফত'-এর বিরোধিতার কারণে তার ভক্ত ও মুরীদগণ তার সম্পর্কে হতাশ হয়ে গিয়েছিল। [১২২]

যখন বেরেলভীদের ইমাম ও মুজাদ্দিদ (এর কথা) আসে তখন তার ভক্ত মুরীদরা যেকোনো একভাবে অতিরঞ্জন এবং বাড়াবাড়ি করে। এমনকি যদি তার জানাযা অন্যান্য দীনি আলেমদের মতো হতো, তবে তাদের বই পুস্তক এ ধরনের (ঘটনার) অতিরঞ্জনে পরিপূর্ণ থাকতো। কিন্তু তারা এর প্রতি কোনো রকম মনোযোগ দেয়নি। যাহোক, তার জানাযার ব্যাপারেও তারা বাড়াবাড়ি করতে ছাড়েনি কেবল লোকদের উপস্থিতি ('র বিষয়টি) বাদে।

টিকাঃ
১১৭. [ওয়াসীয়াত শরীফ, পৃ-১০]
১১৮. হায়াতে আলা হযরত বেরেলভী, বাস্তাওয়ী, পৃ-১০৫
১১৯. (ওয়াসীয়াত শরীফ, পৃ-১০৮:১০৯)
১২০. [বাস্তাওয়ী, পৃ-১১১]
১২১. [মুকাদ্দিমা, " দাওয়াম আল আইশ", মাসুদ আহমেদ, পৃ-৮]
১২২. [প্রাগুক্ত]
১২৩. [আনওয়ার রেযা, পৃ-২৭২; প্রাগুক্ত রূহু কী দুনিয়া, মুকাদ্দিমা, পৃ-২২]

ফন্ট সাইজ
15px
17px