📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৩. আয়ের উৎস

📄 ৩. আয়ের উৎস


আহমাদ রেযা বেরেলভীর পেশা সম্পর্কে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। বলা হয়েছে যে, তার পরিবার ছিল কৃষিনির্ভর পরিবার। পরিবারের খরচের জন্য বাৎসরিক পরিমাণে অর্থ গ্রহণ করতেন, যা দিয়ে সে ব্যয় নির্বাহ করতো। [৬৮] মাঝে মাঝে বাৎসরিক অর্থের পরিমাণ অপর্যাপ্ত হতো এবং তাকে ঋণের আশ্রয় নিতে হতো, কারণ (মাঝে মাঝে) তার পোষ্টাল স্ট্যাম্প কেনার মত অর্থ থাকতো না। [৬৯]

আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঊর্ধ্বতন (অলৌকিক) দাতা হতেও সে অর্থ-সম্পদ পেত। জাফর উদ্দীন বিহারী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, বেরেলভী সাহেবের একটি তালাবদ্ধ সিন্দুক ছিল সেটি কেবল প্রয়োজনের সময়ই খুলতো এবং যখনই এটা খুলতো তখন পুরোটা খুলতো না। সে এর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গলিয়ে দিত এবং অর্থ, গহনা, কাপড়-চোপড় অথবা যা ইচ্ছা বের করতো। [৭০]

জনাব বেরেলভীর পুত্র বলেন যে, আহমাদ রেযা প্রায়ই তার বন্ধু-বান্ধব ও অন্যান্য লোকদের মাঝে অলংকার ও অন্যান্য জিনিস বিতরণ করতো। আর এ সবগুলো জিনিসই তিনি এ ছোট সিন্দুক হতে নিত। আমরা আশ্চর্য হতাম যে, এত জিনিস এটা থেকে কিভাবে আসে। [৭১]

তার বিরোধিরা অভিযোগ করে যে, কোনো দৈব হাত (দাতা) ও তালাবদ্ধ সিন্দুক বলে কিছু ছিল না। এটা ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যের হাত যা মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি ও ফাটল সৃষ্টি ও অন্যান্য উদ্দেশ্য পূরনের জন্য তাকে এসকল সম্পদ প্রদান করতো। [৭২]

আমার অভিমত এই যে, তার অধিকাংশ সম্পদ ছিল দান ও আমানত রাখা অর্থ, যেমন এখানে এ প্রথাটি সাধারণভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, গ্রামবাসীরা তাদের মধ্যকার শিক্ষিত/জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট তাদের সহায়-সম্পদ ও মূল্যবান জিনিসপাতি আমানত রাখত এবং তাদের জন্য এটি ছিল জীবনধারনের উপায়।

তার এক অনুসারী বলেছে, “একদা (আহমাদ রেযা) এক 'ডামডি' [৭৩] খরচ করার মত ও কোনো অর্থ তার কাছে ছিল না। সে সারা রাত চিন্তিত ছিল। সকালে একজন ব্যবসায়ী এসে গেল এবং তাকে ৫১ রুপি দান করল। [৭৪] একবার তার হাতে এমনকি পোষ্টাল স্ট্যাম্প কেনার মতোও কোনো অর্থকড়ি ছিল না এবং তার একজন মুরীদ তাকে ২০০ রুপী পাঠালেন। [৭৫]

জমিদারী এবং তালাবদ্ধ সিন্দুকের ব্যাপার হলো, এর কোনো সত্যতা নেই। কোনো সূত্রের মাধ্যমেই প্রমাণিত নয় যে, তার পরিবার কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিল, অলৌকিক কর্মের এবং সিন্দুকের কিচ্ছা-কাহিনী তার অনুসারীরা তার মান-মর্যাদা বাড়াতে বানোয়াটভাবে তৈরী করেছে। এসবই ভিত্তিহীন কথা। তাহলে এটি কিভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, সিন্দুক থাকা সত্ত্বেও সে অর্থ ধার নিয়েছে এবং তার অনুসারীদের নিকট হতে অর্থ গ্রহণ করতে হয়েছে?

টিকাঃ
৬৮. আনোয়ার রেযা, পৃ. ৩৬০।
৬৯. হায়াতে আলা হযরত, পৃ-৫৮।
৭০. আলা হযরত বাস্তাওয়ী পৃ-৭৫, আনওয়ার রেযা, পৃ-৫৭।
৭১. হযরত আলা হযরত, পৃ-৫৭।
৭২. সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে এর বিস্তারিত বিবরণ আসছে।
৭৩. ডামডি: মূদ্রার ক্ষুদ্রতর একক (যেমন আনা, পয়সা)
৭৪. হায়াতে আলা হযরত, পৃ-৫৬।
৭৫. প্রাগুক্ত, পৃ-৫৮।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৪. অভ্যাস ও আচরণ

📄 ৪. অভ্যাস ও আচরণ


বেরেলভী আহমাদ রেযা প্রায়ই পান চিবাত এবং তা এতই অধিক পরিমাণে ছিল যে, রমযানে ইফতারের পরে সে কেবল পানের উপরেই সন্তষ্ট হয়ে যেতো। [৭৬] আবার সে হুক্কা খেত। অন্যান্য খাদ্য ও পানীয়ের উপর সে হুক্কাকে প্রাধান্য দিত এবং এখানে সচরাচর যাদেরকে দেখা যায়, এধরনের সেকেলে ও অসভ্য লোকদের মতো সে হুক্কা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করতো। [৭৭]

মজার বিষয় জানা যায় যে, বেরেলভী আহমাদ রেযা কর্তৃক বর্ণিত যে, "আমি হুক্কা পানের সময় বিসমিল্লাহ বলতাম না যাতে শয়তানও এতে আমার সাথে অংশীদার হতে পারে। [৭৮] তার একটা অভ্যাস ছিল লোকদের পদচুম্বন করা। তার এক মুরীদ লিখেছে, “সে হযরত আশরাফী মিয়ার পদচুম্বন করতেন। [৭৯] একটি বর্ণনানুযায়ী, কোনো ব্যক্তি হজ্জ সমাপন করে ফিরে এলে, সে তার পদচুম্বন করতো। [৮০]

টিকাঃ
৭৬. আনোয়ার রেযা, পৃ-২৫৬।
৭৭. হায়াতে আলা হযরত, পৃ-২৭।
৭৮. মালফুযাত।
৭৯. আযকার হাবীব রেযা... পৃ-২৪।
৮০. আনওয়ার রেযা, পৃ-৩০৬।

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৫. বেরেলভীর বাচনভঙ্গি

📄 ৫. বেরেলভীর বাচনভঙ্গি


তার বিরোধিরা ছোট-খাট কোনো বিষয়েও যদি তার বিরোধিতা করতো, তাহলে সে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতো। এ ব্যাপারে সে কোনো বাছ-বিচার করতো না। সে খুব রূঢ় ভাষা ব্যবহার করতো। যে সকল শব্দের দ্বারা সে তার বিরোধিদের সম্বোধন করতো, সেগুলোর মধ্যে ছিল 'কুকুর', 'শুয়োরের বাচ্চা/শুয়োর', ইবলিস, কাযযাব, কাফির, ফাজির', মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) এবং অনুরূপ আরো অনেক শব্দ। সে কোনো ভয় বা অনুশোচনা ছাড়াই এ শব্দগুলো ব্যবহার করতো। তার কোনো বই এ ধরনের বাচনভঙ্গী থেকে মুক্ত নয়।

তার 'মধুর বাণী' পূর্বেই কিছু উল্লেখ করেছি। নমুনা হিসেবে তার লিখনী হতে অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করবো যা পাঠকদেরকে তার কথা বলার ভঙ্গিমা বুঝতে সাহায্য করবে। সে দেওবন্দীদের সম্পর্কে লিখেছে: [৮১] তোমাদের ইমাম ও শিক্ষকদের কথা অনুযায়ী একজন মহিলা যেনা করতে সক্ষম। সুতরাং তোমাদের ইলাহর যেনা করার সক্ষমতা থাকা দরকার। দেওবন্দীরা তাকে বলেছে, কিভাবে তুমি উলুহিয়্যাহর দাবী করতে পারো অথচ আমরা যা করতে সক্ষম তা করতে তুমি সক্ষম নও। তখন সে তাদেরকে বলে, তাহলে তো তোমাদের ইলাহর একটি লজ্জাস্থান থাকার দরকার, তাছাড়া কিভাবে সহবাস করবে? [৮২] (আল ইয়াযু বিল্লাহ!)

চিন্তা করুন, লেখার এ ধরন কি একজন দীনের আলেমের জন্য উপযোগী হতে পারে? তার উপর আবার মুজাদ্দিদ হওয়ার দাবি!! 'দীনের সম্মানে' এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের প্রমাণ কোনো হাদীস হতে পাওয়া যায়?! যদি তাকে 'দীনী আলেম' বলার জন্য নাছোড়বান্দা হও, তবে বলতে পার, কিন্তু তাকে 'মুজাদ্দিদে দীন' বলতে অন্তত তোমার কিছুটা হলেও ইতঃস্তত করা উচিত।

এ সম্পর্কিত বিষয়ের একটি উদাহরণ হলো যখন বেরেলভী সাহেব কোনো এক ব্যক্তির নিকট জ্ঞানার্জনের জন্য গেল। শিক্ষক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তার পেশা কী? সে উত্তরে বলেছিল ওয়াহাবীদের পথভ্রষ্টতা ও কুফর উন্মোচন করাই তার কাজ। তার শিক্ষক বললেন যে, এ ধরনের আচরণ ভাল নয়। সে সেস্থান ত্যাগ করে চলে গেল [৮৩] এবং তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাল, কারণ তিনি তাওহীদপন্থিদের কাফির ঘোষণা দেওয়া করা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন।

ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বদা সে জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক অভিব্যক্তির শব্দ ব্যবহার করতো। অর্থহীন শব্দাবলি ও বাক্যাংশ ব্যবহারের দ্বারা সে বোঝাতে চাইত যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা প্রশাখায় তার অনেক দক্ষতা রয়েছে। কারণ এখানে (ভারতীয় উপমহাদেশে) দীনী আলেমদের যাকে বোঝা যতো কঠিন, যার কথা যত অবোধ্য, সে ততোবেশী 'উচ্চ শ্রেণির আলিম' বলে গণ্য হয়। তার এক অনুসারী লিখেছে যে, আহমাদ রেযার কথা বোঝার জন্য তাকেও জ্ঞানের সাগর হওয়া প্রয়োজন। [৮৪] তার ভাষায় বুৎপত্তি ও সাবলিলতার ঘাটতি ছিল। ফলে সে বক্তব্য দেওয়া থেকে নিজেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিত। ঈদে মিলাদুন্নবী অথবা তার 'আল রাসুল শাহ'র উরস উপলক্ষে সে মাঝে মধ্যে কিছু কথা-বার্তা বলতো। [৮৫]

টিকাঃ
৮১. সুবহান আস সাবুহ, আহমাদ রেযা বেরেলভী, পৃ-১৪২।
৮২. প্রাগুক্ত।
৮৩. হায়াতে আলা হযরত, জাফরুদ্দীন বিহারী।
৮৪. আনোয়ার রেযা, পৃ-২৮৪
৮৫. হায়াতে আলা হযরত, জাফরুদ্দীন বিহারী

📘 বেরেলভী মতবাদ আকীদাবিম্বাস ও ইতিহাস 📄 ৬. বেরেলভীর রচনাবলি ও লিখনী

📄 ৬. বেরেলভীর রচনাবলি ও লিখনী


আহমাদ রেযার লিখনীর উল্লেখ করার পূর্বে পাঠকদের এ ঘটনার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই যে, বেরেলভী ফিরকার নিকট অতিরঞ্জন অত্যন্ত প্রিয়। আর অতিরঞ্জনের সময় মিথ্যা বর্ণনা ব্যবহার করা তাদের সহজাত অভ্যাস। তার রচনাবলি সম্পর্কেও তারা ব্যাপকভাবে এটি ব্যবহার করেছে এবং তার শত শত বই গণনা করেছে চোখ বন্ধ করে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো এর বিপরীত। তাদের স্ববিরোধি কথা বার্তার কিছু নমুনা নিচে দেওয়া হলো -

তার বর্ণনাকারীদের একজন লিখেছে, "আহমাদ রেযার রচনাবলির সংখ্যা ২০০-এর কাছাকাছি। [৮৬] আরেক বর্ণনায় ৩৫০'র কাছাকাছি বলা হয়েছে। [৮৭] অপর বর্ণনায়, প্রায় ৪৪০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [৮৮] আরো এক ব্যক্তি বলেছেন যে, তা ৫০০ কে ছাড়িয়ে যাবে। [৮৯] কেউ কেউ বলেন যে, সেগুলো সংখ্যায় ৬০০ এর অধিক। [৯০] অপর এক ব্যক্তি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে এবং বলেছে যে, তা সংখ্যায় এক হাজারেরও বেশি। [৯১]

কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো তার বইয়ের সংখ্যা, যাকে বই বলা যেতে পারে, তা ১০টির বেশি নয়। সম্ভবত এটিকেও তারা অতিরঞ্জিত করেছে। বেরেলভী আসলে কোন কিতাবই লিখেননি, বরং তিনি কিছু মানুষের জানতে চাওয়া প্রশ্নের উত্তর ও ব্যখ্যা লিখেছেন, সেটিও করতেন তার নিকটে এই কর্মে নিয়োজিত থাকা কিছু ব্যক্তির সাহায্যে। তারা ফিকহের কিতাবগুলো থেকে মানুষদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে সেগুলো একত্রিত করে দিতেন। কখনো কখনো উত্তর না পেয়ে, প্রশ্নগুলো অন্য শহরে পাঠানো হতো, কেননা তাদের নিকটে কিছু কিতাব আছে যেখানে এর উত্তর পাওয়া যেতে পারে, সেখানে তার সহযোগিরা উত্তরগুলো খুঁজে বের করে লিপিবদ্ধ করে বেরেলভীর নিকটে পাঠাতেন, বেরেলভী সেগুলো কোন প্রকার যাচাই বাছাই ছাড়াই একস্থানে একত্রিত করতেন, ফলে তার এই লেখার মধ্যে অনেক জটিলতা, অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্য বিষয় পাওয়া যায়। এজন্য পাঠক তার এই লেখা পড়তে যেয়ে হয়রান হয়ে যেত, বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যেত। যারা প্রশ্ন করেছে তাদের নিকটে উত্তরগুলো পাঠানোর আগেই বেরেলভী সেগুলো একটি উপযুক্ত নাম ও অন্য কোন তারিখ দিয়ে তারপর পাঠাতেন। আর এটাকেই বই হিসেবে মুদ্রণ করতেন। কখনো কখনো এমন হত, যিনি ফাতোয়া চেয়েছেন তার নিকটে উক্ত ফাতোয়া পৌঁছানোর আগেই পুস্তিকা বা রিসালাহ হিসেবে মুদ্রণ হয়ে যেত। আর এটা তার অভ্যাস ছিল। তার ফাতোয়াসম্মূহের মধ্যে সাধারণত থাকতো একনিষ্ঠ তাওহীদপন্থি, কিতাব ও সুন্নাতের অনুসারীদের খণ্ডন। এজন্য অধিকাংশ সময়ই পাঠকমহল দেখতেন তার লেখনির মধ্যে থাকতো বিতর্কিত ও কল্পকাহীনি সম্পন্ন লেখা। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিরোধীতায় যেসকল নাম দিয়ে লিখতেন। যেমন, ১। নাবী-রাসূলগণ ও সালেহীন ব্যক্তিরা কি গায়েব জানে? ২। নাবী-রাসূলগণ কি অন্য মানুষের মত মাটির নাকি নূরের? তাদের মৃত্যুর পরে তারা কি দুনিয়ার জীবনের মত জীবিত? সেখান থেকে তারা গায়েবের খবর রাখে কি না। তাদের স্বাধিনতা ও শক্তি আছে কিনা। তাদের কবরে বরকত হাসিল করা যাবে কিনা, তাদের মূর্তি ও ভাষ্কর্য্য তৈরি করা যাবে কি না ইত্যাদি মাসআলা।

আর এজন্য বলা যায় বেরেলভী কোন কিতাব লিখেনি। যদিও এসকল ফাতোয়ার বিরাট অংশ তার নিজের গবেষণা না তবুও তার হাতের আঙ্গুলগুলো এই সকল বিষয়ের ফাতোয়াগুলো নাড়াচাড়া করছে। সারমর্মের দিক থেকে একিভূত হয়েছে।

আমরা উপরে যা বললাম সেগুলোর প্রমাণ নিচের কথাগুলোর মাধ্যমে পেশ করছি।
(১) বেরেলভীরা বলে বেরেলভীর কিতাব হাজারেরও উপরে এটি প্রমাণ বিহীন কথা। কেননা কিতাব শব্দটিতে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত হয় তা তার মূদ্রিত ফাতোয়াগুলো ছোট বড় দিয়ে আট খণ্ড। আর এছাড়া বাকিগুলো বিভিন্ন পুস্তিকা, প্রবন্ধ যেগুলোকে কিতাব বলা যায় না। আবার ঐ সকল ফাতোয়ার কিতাবগুলোকেও কোন কিতাব বলা যায় না। কেননা ঐ আট খণ্ডে এই পুস্তিকা ও রিসালাহগুলোই একত্রিত করা হয়েছে। আপনি মনযোগ দিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন পুস্তিকা ও রিসালাগুলোর বিশাল অংশ এই আট খন্ডে রয়েছে, যদিও সব পুস্তিকাগুলো নেওয়া হয়নি। যেমন, আট খণ্ডের মধ্যে প্রথম খণ্ড হলো আল ফাতাওয়া আল রিদ্বাইয়া এর মধ্যে ৩১ টি পুস্তিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা আমরা একবার দেখে গুনে ফেলেছি। এসকল পুস্তিকার নামগুলো হলো,
১. আল জুদ ওয়াল হুলু ২. তানবিরুল কনদীল ৩. আখার মাসাইল ৪. আন নামিক্বাতুল আনক্বা ৫. রহবুস সাআহ ৬. হিবাতুল হামীর ৭. মাসাইলে আখর ৮. ফাছলুল বি'র ৯. বারিকুন নূর ১০. ইরতিফাউ'ল হাজব ১১. আত তারসুল মু'দাল ১২. আত জ্বলাবাতুল বাদিআ'হ ১৩. বারাকাতুস সামাই ১৪. আত্মাউন নাবী ১৫. আন নূর ওয়ানাওয়ারক ১৬. সামউন নাদর ১৭. হুসনুত তাআম্মুম ১৮. বাবুল আক্বাইদ ১৯. ক্বাওয়ানিনুল উলামা ২০. আল জাদ্দুস সাঈদ ২১. মাজাল্লিশ শুমআ ২২. তিবইয়ানুল উদ্বু ২৩. আদদিক্বাতু ওয়াত তিবইয়ান ২৪. আন নাহয়ু ওয়ান নামীর ২৫. আযুফরু লি কওলি যাফারিন ২৬. আল মাত্মারুস সাঈদ ২৭. লামউল আহকাম ২৮. আল মুআল্লিমুত ত্বারাজ ২৯. নাব্বাহুল ক্বওম ৩০. আজলীল আ'লাম ৩১. আল আহকাম ওয়াল ই'লাল।
এই সকল পুস্তিকা কোনটি মাত্র ৬ পৃষ্ঠা যেমন তানবীরুল ক্বানদীল। আবার কোনটি মাত্র ৭ পৃষ্ঠা যেমন ত্বিবইয়ানুল উদ্বু। আবার কোনটি মাত্র ৮ পৃষ্ঠা যেমন লামঊ'ল আহকাম এবং হিবাতুল হামীর। এই হলো এদের আসল চেহারা, এই হলো বেরেলভীর বিশাল কিতাবের সংখ্যা যার কিছু সংখ্যা আমি উল্লেখ করলাম।

(২) ওমুক হাজার হাজার কিতাব লিখেছে, দুই হাজার বা আরো বেশি কিতাব লিখেছে এগুলো মুখে বলা খুব সহজ, যা বলতে কোন পরিশ্রম করা লাগে না, কোন কষ্ট করা লাগে না। কিন্তু এটা প্রমাণ করা অনেক কঠিন। এমনই হলো এরা। বেরেলভী নিজেই উল্লেখ করেছে সে মাত্র ১১ টা পুস্তিকা রচনা করেছে আর ঐ সময়ই সেটি ২০০ কিতাব হয়ে গিয়েছিল। তার ছেলে ওহাবীদের বিরুদ্ধে তার কিতাবের তাআ'লীক করে সেগুলোর সংখ্যা ৪০০ তে গিয়ে পৌঁছে ছিল। এর মধ্যে ছিল ১২ টি বিশাল ফাতওয়া। [৯২] এরপরে তার ছাত্র ও খলিফা আলবাহারী ৩৫০ খানা পুস্তিকা সেখানে যুক্ত করে ফলে এগুলো সব আলাদা আলাদা কিতাব গণ্য করেও সর্বোচ্চ ৫৪৮ টি কিতাব হয়।

তাদের হাস্যকর দাবী ও মজার বিষয় স্পষ্ট করার জন্য নিম্নে তাদের গননাকৃত কিছু কিতাবের নাম দেওয়া হলো।
হাশিয়াতু সহীহিল বুখারী, হাশিয়াতু সহীহ মুসলিম, হাশিয়াতুন নাসাঈ, হাশিয়াতু ইবনি মাজাহ, হাশিয়াতুত তাক্বরিব, হাশিয়াতু মুসনাদি ইমামিল আযাম, হাশিয়াতু মুসনাদিল ইমাম আহমাদ, হাশিয়াতুত তাহাবী, হাশিয়াতু খাছাইছি কুবরা, হাশিয়াতু কাংযিল উম্মাল, হাশিয়াতু কিতাবি আসমাই ওয়াস সিফাত, হাশিয়াতুল ইছাবা, হাশিয়াতু মাউদ্বু আতিন কাবীর, হাশিয়াতু শামসিন বাঝিগাত, হাশিয়াতু উমদাতুল ক্বারী, হাশিয়াতু ফাতহিল বারী, হাশিয়াতু নাছবির রাইয়া, হাশিয়াতু ফাইদ্বিল ক্বদ্বীর, হাশিয়াতু আশআতিল লুমআত, হাশিয়াতু মাজমাঈ বিহারিল আনওয়ার, হাশিয়াতু তাহযিবুত তাহযিব, হাশিয়াতু মুসামারাতিন ওয়া মুসাইরাহ, হাশিয়াতু তুহফাতুল ইখওয়ান, হাশিয়াতু মিফতাহিস সাআদাহ, হাশিয়াতু কাশফুল গুম্মাহ, হাশিয়াতু মিযানিশ শারীয়া ইত্যাদ।

এসকল কিতাব যা তারা উল্লেখ করাকে সবগুলো বেরেলভী পাঠাগারে আছে, যেগুলোর কোনটিতে তিনি হয়তো চোখ বুলিয়েছেন, অথবা এক বা দুই পৃষ্ঠা টিকা লিখেছেন ব্যস সেটিকেই তারা তার কিতাব বলে গণ্য করেছে। এর জন্য এগুলোর কোন পুস্তিকাও বের হয়নি। যদি এত সহজ বিষয় হত তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিই দাবি করে বলতো আমার হাজারের উপরে কিতাব আছে। আমাদের উদাহরণ স্বরূপ যে সকল কিতাব যেমন আল ফিরাক্ব ওয়াল আদইয়ান, আরুদুদ আ'লা ফিরাকিল বাতিলাতিল মুনহারিফা আন ছিরাতিল মুসতাক্বীম, ওয়াঝ জাইগাতু আন জাদ্দাতিছ ছাওয়াব। যদি তারা এগুলো একটু দেখতো ও সামান্য সমালোচনা করতো তাহলে তারা বলতো ৫ হাজারের উপরে কিতাব রয়েছে। কেননা আমি তাদের দাবী করা ৩০০ এর অধিক কিতাব পড়েছি এবং এর প্রত্যেকটি কিতাবে আমি টিকা লিখেছি তাহলে ওগুলো কি আমার কিতাব? এই হলো তাদের অবস্থা, তাহলে এত গর্ব কি নিয়ে?

আমাদের আলোচনার পূর্ণতার জন্য আমরা তাদের পরস্পর বিরোধী কথাগুলো উল্লেখ করছি যা তারা কিতাব গণনার ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছে।
১. বেরেলভীর দাবি তার কিতাব ২০০ টি
২. তার খলিফা ও ছাত্রের দাবি তার কিতাব ৩৫০ টি
৩. তার ছেলের দাবি তার কিতাব ৪০০টি
৪. আনওয়ারুর রিদ্বার লেখকের দাবি, তার কিতাব ৫৪৮টি
৫. আল বাহারীর দাবী তার কিতাব ৬০০ বা ১০০০টি।

(৩) বেরেলভীর জীবদ্দশা থেকে আজ পর্যন্ত তার নামে যত রিসালাহ বা পুস্তিকা দাবি করা হয়ে থাকে সেগুলো মুদ্রণ করলে ২৫০০ এর বেশি হবে না, যা আনওয়ারুর রিদ্বার লেখক উল্লেখ করেছে। আর এসব পুস্তিকা তার ঐ ফাতোয়া যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি।

(৪) আমরা আহমাদ রেযা খান বেরেলভীর লেখালেখি ও রচনাবলি সম্পর্কে বেরেলভীদের মিথ্যাচার ও বাড়াবড়ি উপরে উল্লেখ করলাম। এমনকি হযরত বুরহানুল মিল্লাতি ওয়াদ দীন মাওলানা আল মুফতি মুহাম্মাদ বুরহানুল হক আল কাদিরী, আর রিদ্বাবী, আল মুফতিউল আযম আল জাবাল পুরী লিখেছেন, হযরত বেরেলভী একজন মুজাদ্দীদ ছিলেন তার প্রমাণ হলো, তিনি এমন সব ফাতাওয়া লিখেছেন যা পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কারো কিতাবে পাওয়া যায় না। আর তার ফাতাওয়াগুলো বড় বড় ১২ টি খণ্ডের মধ্যে একত্রিত করা হয়েছে। আর এক এক খণ্ডের পৃষ্ঠা সংখ্যা হাজারেরও উপরে।

আমরা একটু মনযোগ দিয়ে দৃঢ়দৃষ্টিতে এই ফাতওয়ার কতটা মুল্যবান তা পাঠকের নজরে এই স্পষ্ট মিথ্যুক ও নোংরা দলের মিথ্যা সমূহ দেখেছি। লক্ষ্য করুন, মুফতি সাহেব লিখলেন, তার ফাতাওয়ার কিতাবগুলো বড় বড় ১২ টি খণ্ডের মধ্যে একত্রিত করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো আজ পর্যন্ত আট খণ্ডের বেশি মূদ্রিত হয়নি, যার মধ্যে একটি খণ্ড বড় বাকিগুলো সবই ছোট। তিনি আরো লিখেছেন, এগুলোর এক একটির পৃষ্ঠা সংখ্যা নাকি হাজারেরও উপরে, অথচ এর যেটি সবচেয়ে বড় খন্ড সেটির পৃষ্ঠা সংখ্যা হলো ৬২৪ টি আর বাকি গুলোর পৃষ্ঠা সংখ্যা হলো ৫০০, ৬০০ পৃষ্ঠা করে। আবার একটির পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র ৩২৫টি, এর একটিরও পৃষ্ঠা সংখ্যা হাজারের সংখ্যাতে পৌঁছায়নি। আমরা এই ফের্কার লেখালেখি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করে যা দেখালাম তা হলো, এই ফের্কা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, মিথ্যা, বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জনের উপরে।

(৫) এই সকল ফাতাওয়ার লেখক হলেন, বেরেলভীর অসংখ্য সাহায্য ও সহযোগিতাকারী, তার অনুসারী ও ছাত্রগণ। এমনকি আলবাহারী বেরেলভীর জিবনীতে উল্লেখ করেছেন, যখন তার কাছে কোন ফাতওয়া আসতো তখন তিনি লেখকদের মাঝে ভাগ করে দিতেন, এর উত্তর লেখার জন্য। যেমনটি বেরেলভী নিজেই তার একটি চিঠিতে সমসাময়িক একজনের কাছে লিখেছিলেন, আমি তোমাদের নিকটে এমন একজন ব্যক্তিকে পাঠিয়েছি, যিনি আমার মাদ্রাসার একজন শিক্ষক ও আমার ফাতওয়া লেখার সাহায্যকারী।

তিনি আরো একটি চিঠিতে লিখেছেন, আমার নিকটে কিছু তাফসীরে বর্ণনা পৌঁছেছে, আমার বাকিগুলোও প্রয়োজন, আমাকে বলবে তাফসীরে রুহুল মাআনী কি? কে এই আলুসী আল বাগদাদী? আমি তাকে চিনিনা, তোমার নিকটে এই বিষয়ে কোন কিতাব বা তার জীবনী থাকলে আমাকে জানাবে। হাওয়ামিশুল মাদরাকের বর্ণনাগুলোও আমার দরকার।

আরো একটি চিঠিতে লিখেছেন, খেযাবের মাসআলার পূর্ণ বর্ণনা আমার লাগবে, নিম্নের কিতাবগুলো থেকে, যদি তোমার নিকটে কিতাবগুলো থাকে তাহলে তো খুবই ভাল, আর যদি না থাকে তাহলে গ্রন্থাগারে যেয়ে নিয়ে আসবে, কিতাবগুলো হলো, আত তাতারখানিয়‍্যা, যাদুল মাআদ, আকদুল ফারীদ লিইবিন আব্দির রববিহ, নুঝহাতুল মাজালিস, ছাররাহ, কামুস, তাজুল উরুস, খালিকু ঝামাখশারী, মাগরিবু মাত্বরাণী, মিছবাহুল মুনীর, মুখতারুছ ছহহাহ, নিহাতু ইবনিল আসীর, মাজমাউল বিহার, মিরক্বাত, ইশআতুল লুমআত, ফাতহুল বারী, উমদাতুল ক্বারী, ইরশাদুস সারী, শরহু মুসলিম লিন নববী, শারহু শারঈ শামাইলে তিরমিযি, শারহু শারআতিল ইসলাম, শারহু মাশারিক্বীল আনওয়ার, তাইসির, আস সিরাজুল মুনীর, শারহুল জামীইস সাগীর। [৯৩]

এই সকল কিছু প্রমাণ করে সে নিজে কোন ফাতওয়া লিখেনি, বরং তার সাহায্য ও সহযোগিতাকারীরা এই সকল ফাতাওয়া লিখে তাকে দিত, তখন তিনি তা নিজের নামে প্রশ্নকারীর নিকট পাঠাতেন।

টিকাঃ
৮৬. [মুকাদ্দামাহ আল দাউলাহ আল মাক্কিয়াহ]
৮৭. [প্রাগুক্ত]
৮৮. (আল মুজমাল আল মাদাদ তালিফাত আল মুজাদ্দিদ, জাফর বিহারী)
৮৯. (প্রাগুক্ত)
৯০. [হায়াত আল বেরেলভী, পৃ-১৩]
৯১. [মান হুয়া আহমাদ রেযা, পৃ-২৫]
৯২. তার কিতাবের সংখ্যার বিশালতা সম্পর্কে আমরা আলোচনা করেছি।
৯৩. হায়াতু আলা হযরত পৃ ২৮১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px