📄 ২. বেরেলভীর বংশ, পরিবার ও পেশা
আহমাদ রেযার পরিবার সম্পর্কে কেবল এতটুকু জানা যায় যে, তার পিতা ও দাদাকে হানাফি আলেমদের মধ্যে গণ্য করা হতো। যদিও আহমাদ রেযার বিরোধিরা অভিযোগ করে যে, তার পরিবার শিয়া ছিল এবং সে 'তাকিয়া' [৪৯] করতো এবং তার পুরো জীবনে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করেনি যাতে সে 'আহলুস সুন্নাহ'র মাঝে বসবাস করতে পারে এবং শিয়া আকীদা-বিশ্বাস প্রচার করতে পারে।
তার বিরোধিরা এর (শিয়া বিশ্বাস প্রচারের) যে সকল প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন সেগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. আহমাদ রেযার পিতা, দাদা ও তাদের পূর্ববর্তীগণের নাম শিয়াদের মাঝে পাওয়া নামের সাথে মিলে যায়। তার বংশ তালিকাসহ তার পূর্ণ নাম হলো- আহমাদ রেযা বিন নকী আলা বিন রেযা আলী বিন কাজিম আলী। [৫০]
২. বেরেলভী আহমাদ রেযা সাহাবী আবু বকর সিদ্দিক (রা) ও উম্মুল মু'মিনীন আয়শা (রা) এর বিরুদ্ধে এমন কিছু অসঙ্গত উক্তি করেছিল, যা মুখে উচ্চারণ করার মতো নয়।
৩. শিয়া মতবাদ হতে গৃহীত কিছু ভ্রান্ত আকীদা, রীতিনীতি প্রচারে সে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে, ইতঃপূর্বে যা আর কেউ করেনি। [৫১] যেমন, নবীদের গায়েব জানা, যা হবে ও যা হয়েছে এমন জ্ঞান নবীরা জানেন বলে বিশ্বাস করা, ইচ্ছা, শক্তি ইত্যাদি।
৪. জনাব আহমাদ রেযা সাহেব তার অনেক লেখায় সেই সকল বর্ণনা (হাদীস) ব্যবহার করেছিল যা শিয়াদের বিশিষ্ট বর্ণনা এবং এসকল বর্ণনা (হাদীস) আহলুস সুন্নাহর আকীদার সাথে কোনোই সম্পর্ক নেই। উদাহরণস্বরূপ: ক. আলী (রা) কিয়ামত দিবসে জাহান্নাম বিতরণ করবেন। [৫২] খ. ফাতিমা (রা) এর এ নাম রাখা হয়েছিল কারণ আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁর বংশধরদেরকে আগুন হতে রক্ষা করেছেন। [৫৩] গ. শিয়াদের ইমামগণকে পবিত্র ঘোষণা করে এ আকীদার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে যে, আগওয়াস (গাওস এর বহুবচন। অর্থ সাহায্যকারী, ত্রাণকর্তা) আলী (রা.)-এর মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং হাসান আসকারী পর্যন্ত চলেছে। যার মধ্যে শিয়াদের ১১ জন ইমাম আছে। [৫৪]
ঘ. আহমাদ রেযা সকল সাহাবীগণকে পরিত্যাগ করেছে এবং আলী (রা.)-কে 'মুশকিল কোশা' (বিপদ দূরকারী) বলে ঘোষণা করেছে। সে বলেছে: “যে বিখ্যাত সাইফী দুআ (যা শিয়াদের আকীদা প্রতিফলিত করে) দ্বারা প্রার্থনা করবে, তার বিপদ দূর হয়ে যাবে।” সাইফী দুআটি হলো: "আলীকে ডাকো, যিনি 'কারামত' (অলৌকিক কার্য) দেখিয়েছেন। তুমি তাঁকে সাহায্যকারী হিসেবে পাবে। হে আলী! আপনার বেলায়েতের (ওলীত্বের) মধ্যস্থতায় সকল দুঃশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়।" [৫৫], [৫৬]
ঙ. অনুরূপভাবে, সে 'পাক পাঞ্জাতন' পরিভাষাটি কে সুবিদিত করেছে এবং এ কবিতা ব্যাপকভাবে (সবার মাঝে) ছড়িয়ে দিয়েছে। "এমন পাঁচজন ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের বরকত সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়। (তাঁরা হলেন) মুহাম্মদ মুস্তফা, আলী, হাসান, হুসেইন ও ফাতিমা।” [৫৭]
চ. শিয়াদের আকীদার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি প্রবন্ধ “জাফর” কে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ঘোষণা করে তার বই 'খালিসুল ইতিকাদ' এ সে লিখেছে: 'জাফর' হলো চামড়া দিয়ে তৈরি একটি বই, যা ইমাম জাফর কর্তৃক “আহল-বাইত" এর জন্য লেখা হয়। এতে প্রয়োজনীয় সকল জিনিসের উল্লেখ আছে। অনুরূপভাবে, কিয়ামত পর্যন্ত যেসকল ঘটনা ঘটবে, তার সবকিছু এতে উল্লেখ করা আছে।" [৫৮], [৫৯]
ছ. অনুরূপভাবে, সে শিয়াদের পরিভাষা "আল-জামিয়াহ” উল্লেখ করে লিখেছে যে, আল-জামিয়াহ হলো সেই সহীফা (বই) যাতে আলী (রা.) বিশ্বের সকল ঘটনা বর্ণমালার ক্রম অনুযায়ী লিখেছেন। তার সন্তানদের ইমামগণও এ সকল ঘটনাবলি সম্পর্কে অবগত ছিলেন।" [৬০]
জ. জনাব বেরেলভী শিয়াদের আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছে যে, “イমাম রেযা (শিয়াদের ৮ম ইমাম)-কে এমন একটি দুআ শিক্ষা দিতে বলা হয়েছিল যা তারা আহলে বাইতের কবরের কাছে পাঠ করবে। তখন তিনি বলেছিলেন যে, 'কবরের কাছে যাও এবং চল্লিশবার 'আল্লাহু আকবার' পড় এবং বল, 'আস্সালামু আলাইকুম ইয়া আহলে বাইত।' হে আহলে বাইত! আমি আল্লাহর সামনে তোমাদেরকে ওয়াসীলা বানাচ্ছি আমার সমস্যা ও আমার অসুস্থতার জন্য আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আহলে বাইতের শত্রুদের থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করছি।" [৬১]
তার মানে সে এমন সব বর্ণনা (হাদীস) কে পরিচিত (মাশহুর) করেছে যাতে মুসলিমদের নিকট শিয়াদের ইমামদেরকে সাদরে গ্রহণীয় করে বর্ণনা করতে পারে এবং তাদেরকে সাহাবীগণ ও আহলুস সুন্নাহর আলেমগণের চেয়ে উত্তম হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। যদিও শিয়াদের ইমামদের শাজরানামার সাথে এবং এসকল (জাল) বর্ণনার সাথে আহলুস সুন্নাহ'র কোনো সম্পর্ক নেই।
ঝ. জনাব আহমাদ রেযা "শিয়াদের তাজিয়াহ" কে গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে তার বইতে লিখেছে যে, হুসাইনের কবরের হুবহু নকল (রেপ্লিকা) তোমার ঘরে রাখাতে কোনো দোষ নেই, যেনো তুমি তা থেকে বরকত হাসিল করতে পার। [৬২] এরকম আরো অনেক উদাহরণ তার বই ও লিখনীতে পাওয়া যাবে।
আহমাদ রেযার বাইয়াতের ধারাবাহিকতা শিয়া ইমামদের মধ্যস্থতায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছাত, তা তিনি নিজেই আরবীতে উল্লেখ করেছেন। [৬৩]
اللهم صل و سلم وبارك على سيدنا مولانا محمد المصطفى رفيع المكان المرتضا على الشان الذى رجيل من امته خير من رجال من السالفين وحسين من زمرতে أحسن من كذا وكنا حسنا من السابقين السيد السجاد زين العابدين باقر علوم الانبياء والمرسلين ساقى القوثر ومالك تسنيم وجعفر الذى يطلب موسى الكليم رضاريه بالصلاة عليه
এমনকি সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন আলিমই এর আনাড়িপনা, (শব্দের) অসংগতি এবং উদ্দেশ্যহীনতা বুঝতে পারবে। এ ধরনের লোকের জন্য এ দাবি করা যে, 'তিন বছর বয়স থেকে সে অনর্গল আরবীতে কথা বলতো' পুরোপুরিই অবাস্তব!! নিচের বাক্যাংশের গঠন কতই না অসংগত!
وحسين من زمرته أحسن من كذا وكنا حسنا من السابقين
يطلب موسى الكليم رضاريه بالصلاة عليه - এর মধ্যে - موسى الكليم দ্বারা কাকে বোঝানো হয়েছে? যদি মূসা কাজিম উদ্দেশ্য হয়; তবে 'কালিম' দ্বারা কী বুঝায়? যদি নবী মূসা আলাইহিস সালাম উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে কি মূসা (আ.) (মা'যা আল্লাহ) ইমাম জাফর সাদিকের উপর দরূদ পাঠাতেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করতেন? উভয় দিক দিয়েই এ অনুচ্ছেদটি পুরোটাই শব্দের অসংগত ব্যবহার এবং পুরো অর্থহীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ যুক্তির সারমর্ম হলো, আহমাদ রেযা নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে শিয়া ইমামগণের উল্লেখের মাধ্যমে মুসলিমদেরকে শিয়া রাফিজীদের অধিকতর নিকটে আনার চেষ্টা করেছে।
৬. জনাব বেরেলভী ভারতীয় উপমহাদেশে (প্রকৃত) আহলুস সুন্নাহর আলেমদের উপর তাকফীর করেছে এবং ফতোয়া জারি করেছে যে, তাদের মসজিদ ও বাড়ি-ঘরের হুকুম একই এবং সেগুলোকে (মসজিদগুলোকে) আল্লাহর ঘর মনে করা ঠিক নয়। [৬৪] অনুরূপভাবে সে (প্রকৃত) আহলুস সুন্নাহদের সাথে বসা এবং তাদের বিবাহ করা হারাম ঘোষণা করেছে। এরপর বিপরীতে, যখন শিয়ারা প্রথম 'ইমাম বাড়া' [৬৫] তৈরী করে, তখন শিয়ারা বেরেলভীতে এসে তার কাছে একটি নাম রাখার আবেদন করে। তখন সে আবজাদী পদ্ধতি অনুসারে নাম রাখার সুপারিশ করে। [৬৬]
৭. আহমাদ রেযা বেরেলভীর প্রতি অভিযোগ রয়েছে যে, সে ছিল একজন শিয়া রাফেযী। কারণ সে শিয়াদের মতই শিয়াদের ইমামগণের প্রশংসায় অনেক অতিরঞ্জিত কাসীদা (কবিতা) রচনা করেছে। [৬৭]
টিকাঃ
৪৯. তাকিয়া: শিয়া আকীদার স্বতন্ত্র অংশ যেখানে কোনো ব্যক্তি তার প্রকৃত বিশ্বাসকে লোকদের থেকে লুকিয়ে রাখে এবং বাহ্যিকভাবে কোনো বিষয়ে সম্মতি দেখায়।
৫০. হায়াতে আলা হযরত' পৃ-২।
৫১. ফতওয়া বেরেলভীয়া, পৃ-১৪।
৫২. আলামান ওয়াল আলী, আহমাদ রেযা বেরেলভী, পৃ-৫৩।
৫৩. খতমে নবুয়াত, আহমাদ রেযা, পৃ-৯৭।
৫৪. মালফুযাত, পৃ-১১৮।
৫৫. আল আমান ওয়াল আলী, পৃ-১২-১৩
৫৬. এটি শিয়াদের বানানো একটি জাল হাদীস যা এ বেরেলভীগণ ও তার অনুসারী কবরপূজারী যেমন দেওয়ানবাগী, মাইজভাণ্ডারী, আটরশী, রাজারবাগী, সুরেশ্বরী, চন্দ্রপাড়া, বারো শরীফ ইত্যাদির দোসররা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলন করেছে। একে এরা দলীল বানিয়ে এসব বিভ্রান্তিকর শিরকী আকীদা প্রচার করছে। যেমন- মোল্লা আলী কারী বলেন, শিয়াদের বানানো একটি ঘৃণ্য জাল ও মিথ্যা কথা: "আলীকে ডাক, সে আশ্চর্য কর্মাদি প্রকাশ করে, তাকে তুমি বিপদে আপদে তোমার সহায়ক পাবে। হে মুহাম্মদ, আপনার নবুয়াতের ওসীলায়। হে আলী, আপনার বেলায়েতের ওসীলায়।" (মোল্লা আলী কারী, আল-আসরার, পৃ-২৬৫- ২৬৬; আজলুনী, কাশফুল খফা ২/৪৮৯) উল্লেখ্য যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য যে কোনো মৃত বা অনুপস্থিত ব্যক্তিকে ডাকা বা তার কাছে দুআ করা বড় শিরক। (ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি, পৃ-৪০৯-৪১১)
৫৭. ফতোয়া রিযভিয়্যাহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ-১৮৭।
৫৮. খালিসুল ইতিকাদ, আহমাদ রেযা, পৃ-৪৭।
৫৯. এটিও শিয়াদের বানোয়াট বর্ণনার অন্যতম। যেমন "আবূ আবদিল্লাহ (জাফর সাদিক) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি অবশ্যই আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে, তা জানি এবং আমি আরও জানি জান্নাত ও জাহান্নামে যা কিছু আছে। আর যা হয়েছে এবং যা হবে, তাও আমি জানি।” (আল্-কুলাইনী, উসূলুল কাফী, পৃ-১৬০; হাদীসের নামে জালিয়াতি দ্র.)
৬০. খালিসুল ইতিকাদ, আহমাদ রেযা, পৃ-৪৭।
৬১. ফতোয়া রিজভীয়্যাহ, আহমাদ রেযা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-২৯৯।
৬২. রিসালাহ বদরুল আনোয়ার, পৃ-৫৭।
৬৩. আনওয়ার রেযা, পৃ-২৭।
৬৪. মালফুযাত, পৃ-১০৪ দ্র.।
৬৫. ইমাম বাড়া: শিয়াদের মুহাররম অনুষ্ঠানের তীর্থস্থান।
৬৬. ইয়াদ আলা হযরত, পৃ-২৯।
৬৭. হাদায়িক বাকশীশ, আহমাদ রেযা, বহু পৃষ্ঠায় এর প্রমাণ দেখুন।
📄 ৩. আয়ের উৎস
আহমাদ রেযা বেরেলভীর পেশা সম্পর্কে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। বলা হয়েছে যে, তার পরিবার ছিল কৃষিনির্ভর পরিবার। পরিবারের খরচের জন্য বাৎসরিক পরিমাণে অর্থ গ্রহণ করতেন, যা দিয়ে সে ব্যয় নির্বাহ করতো। [৬৮] মাঝে মাঝে বাৎসরিক অর্থের পরিমাণ অপর্যাপ্ত হতো এবং তাকে ঋণের আশ্রয় নিতে হতো, কারণ (মাঝে মাঝে) তার পোষ্টাল স্ট্যাম্প কেনার মত অর্থ থাকতো না। [৬৯]
আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঊর্ধ্বতন (অলৌকিক) দাতা হতেও সে অর্থ-সম্পদ পেত। জাফর উদ্দীন বিহারী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, বেরেলভী সাহেবের একটি তালাবদ্ধ সিন্দুক ছিল সেটি কেবল প্রয়োজনের সময়ই খুলতো এবং যখনই এটা খুলতো তখন পুরোটা খুলতো না। সে এর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গলিয়ে দিত এবং অর্থ, গহনা, কাপড়-চোপড় অথবা যা ইচ্ছা বের করতো। [৭০]
জনাব বেরেলভীর পুত্র বলেন যে, আহমাদ রেযা প্রায়ই তার বন্ধু-বান্ধব ও অন্যান্য লোকদের মাঝে অলংকার ও অন্যান্য জিনিস বিতরণ করতো। আর এ সবগুলো জিনিসই তিনি এ ছোট সিন্দুক হতে নিত। আমরা আশ্চর্য হতাম যে, এত জিনিস এটা থেকে কিভাবে আসে। [৭১]
তার বিরোধিরা অভিযোগ করে যে, কোনো দৈব হাত (দাতা) ও তালাবদ্ধ সিন্দুক বলে কিছু ছিল না। এটা ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যের হাত যা মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি ও ফাটল সৃষ্টি ও অন্যান্য উদ্দেশ্য পূরনের জন্য তাকে এসকল সম্পদ প্রদান করতো। [৭২]
আমার অভিমত এই যে, তার অধিকাংশ সম্পদ ছিল দান ও আমানত রাখা অর্থ, যেমন এখানে এ প্রথাটি সাধারণভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, গ্রামবাসীরা তাদের মধ্যকার শিক্ষিত/জ্ঞানী ব্যক্তির নিকট তাদের সহায়-সম্পদ ও মূল্যবান জিনিসপাতি আমানত রাখত এবং তাদের জন্য এটি ছিল জীবনধারনের উপায়।
তার এক অনুসারী বলেছে, “একদা (আহমাদ রেযা) এক 'ডামডি' [৭৩] খরচ করার মত ও কোনো অর্থ তার কাছে ছিল না। সে সারা রাত চিন্তিত ছিল। সকালে একজন ব্যবসায়ী এসে গেল এবং তাকে ৫১ রুপি দান করল। [৭৪] একবার তার হাতে এমনকি পোষ্টাল স্ট্যাম্প কেনার মতোও কোনো অর্থকড়ি ছিল না এবং তার একজন মুরীদ তাকে ২০০ রুপী পাঠালেন। [৭৫]
জমিদারী এবং তালাবদ্ধ সিন্দুকের ব্যাপার হলো, এর কোনো সত্যতা নেই। কোনো সূত্রের মাধ্যমেই প্রমাণিত নয় যে, তার পরিবার কৃষিকাজের সাথে জড়িত ছিল, অলৌকিক কর্মের এবং সিন্দুকের কিচ্ছা-কাহিনী তার অনুসারীরা তার মান-মর্যাদা বাড়াতে বানোয়াটভাবে তৈরী করেছে। এসবই ভিত্তিহীন কথা। তাহলে এটি কিভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, সিন্দুক থাকা সত্ত্বেও সে অর্থ ধার নিয়েছে এবং তার অনুসারীদের নিকট হতে অর্থ গ্রহণ করতে হয়েছে?
টিকাঃ
৬৮. আনোয়ার রেযা, পৃ. ৩৬০।
৬৯. হায়াতে আলা হযরত, পৃ-৫৮।
৭০. আলা হযরত বাস্তাওয়ী পৃ-৭৫, আনওয়ার রেযা, পৃ-৫৭।
৭১. হযরত আলা হযরত, পৃ-৫৭।
৭২. সামনের পৃষ্ঠাগুলোতে এর বিস্তারিত বিবরণ আসছে।
৭৩. ডামডি: মূদ্রার ক্ষুদ্রতর একক (যেমন আনা, পয়সা)
৭৪. হায়াতে আলা হযরত, পৃ-৫৬।
৭৫. প্রাগুক্ত, পৃ-৫৮।
📄 ৪. অভ্যাস ও আচরণ
বেরেলভী আহমাদ রেযা প্রায়ই পান চিবাত এবং তা এতই অধিক পরিমাণে ছিল যে, রমযানে ইফতারের পরে সে কেবল পানের উপরেই সন্তষ্ট হয়ে যেতো। [৭৬] আবার সে হুক্কা খেত। অন্যান্য খাদ্য ও পানীয়ের উপর সে হুক্কাকে প্রাধান্য দিত এবং এখানে সচরাচর যাদেরকে দেখা যায়, এধরনের সেকেলে ও অসভ্য লোকদের মতো সে হুক্কা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করতো। [৭৭]
মজার বিষয় জানা যায় যে, বেরেলভী আহমাদ রেযা কর্তৃক বর্ণিত যে, "আমি হুক্কা পানের সময় বিসমিল্লাহ বলতাম না যাতে শয়তানও এতে আমার সাথে অংশীদার হতে পারে। [৭৮] তার একটা অভ্যাস ছিল লোকদের পদচুম্বন করা। তার এক মুরীদ লিখেছে, “সে হযরত আশরাফী মিয়ার পদচুম্বন করতেন। [৭৯] একটি বর্ণনানুযায়ী, কোনো ব্যক্তি হজ্জ সমাপন করে ফিরে এলে, সে তার পদচুম্বন করতো। [৮০]
টিকাঃ
৭৬. আনোয়ার রেযা, পৃ-২৫৬।
৭৭. হায়াতে আলা হযরত, পৃ-২৭।
৭৮. মালফুযাত।
৭৯. আযকার হাবীব রেযা... পৃ-২৪।
৮০. আনওয়ার রেযা, পৃ-৩০৬।
📄 ৫. বেরেলভীর বাচনভঙ্গি
তার বিরোধিরা ছোট-খাট কোনো বিষয়েও যদি তার বিরোধিতা করতো, তাহলে সে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতো। এ ব্যাপারে সে কোনো বাছ-বিচার করতো না। সে খুব রূঢ় ভাষা ব্যবহার করতো। যে সকল শব্দের দ্বারা সে তার বিরোধিদের সম্বোধন করতো, সেগুলোর মধ্যে ছিল 'কুকুর', 'শুয়োরের বাচ্চা/শুয়োর', ইবলিস, কাযযাব, কাফির, ফাজির', মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) এবং অনুরূপ আরো অনেক শব্দ। সে কোনো ভয় বা অনুশোচনা ছাড়াই এ শব্দগুলো ব্যবহার করতো। তার কোনো বই এ ধরনের বাচনভঙ্গী থেকে মুক্ত নয়।
তার 'মধুর বাণী' পূর্বেই কিছু উল্লেখ করেছি। নমুনা হিসেবে তার লিখনী হতে অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করবো যা পাঠকদেরকে তার কথা বলার ভঙ্গিমা বুঝতে সাহায্য করবে। সে দেওবন্দীদের সম্পর্কে লিখেছে: [৮১] তোমাদের ইমাম ও শিক্ষকদের কথা অনুযায়ী একজন মহিলা যেনা করতে সক্ষম। সুতরাং তোমাদের ইলাহর যেনা করার সক্ষমতা থাকা দরকার। দেওবন্দীরা তাকে বলেছে, কিভাবে তুমি উলুহিয়্যাহর দাবী করতে পারো অথচ আমরা যা করতে সক্ষম তা করতে তুমি সক্ষম নও। তখন সে তাদেরকে বলে, তাহলে তো তোমাদের ইলাহর একটি লজ্জাস্থান থাকার দরকার, তাছাড়া কিভাবে সহবাস করবে? [৮২] (আল ইয়াযু বিল্লাহ!)
চিন্তা করুন, লেখার এ ধরন কি একজন দীনের আলেমের জন্য উপযোগী হতে পারে? তার উপর আবার মুজাদ্দিদ হওয়ার দাবি!! 'দীনের সম্মানে' এ ধরনের ভাষা ব্যবহারের প্রমাণ কোনো হাদীস হতে পাওয়া যায়?! যদি তাকে 'দীনী আলেম' বলার জন্য নাছোড়বান্দা হও, তবে বলতে পার, কিন্তু তাকে 'মুজাদ্দিদে দীন' বলতে অন্তত তোমার কিছুটা হলেও ইতঃস্তত করা উচিত।
এ সম্পর্কিত বিষয়ের একটি উদাহরণ হলো যখন বেরেলভী সাহেব কোনো এক ব্যক্তির নিকট জ্ঞানার্জনের জন্য গেল। শিক্ষক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তার পেশা কী? সে উত্তরে বলেছিল ওয়াহাবীদের পথভ্রষ্টতা ও কুফর উন্মোচন করাই তার কাজ। তার শিক্ষক বললেন যে, এ ধরনের আচরণ ভাল নয়। সে সেস্থান ত্যাগ করে চলে গেল [৮৩] এবং তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাল, কারণ তিনি তাওহীদপন্থিদের কাফির ঘোষণা দেওয়া করা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন।
ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বদা সে জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক অভিব্যক্তির শব্দ ব্যবহার করতো। অর্থহীন শব্দাবলি ও বাক্যাংশ ব্যবহারের দ্বারা সে বোঝাতে চাইত যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা প্রশাখায় তার অনেক দক্ষতা রয়েছে। কারণ এখানে (ভারতীয় উপমহাদেশে) দীনী আলেমদের যাকে বোঝা যতো কঠিন, যার কথা যত অবোধ্য, সে ততোবেশী 'উচ্চ শ্রেণির আলিম' বলে গণ্য হয়। তার এক অনুসারী লিখেছে যে, আহমাদ রেযার কথা বোঝার জন্য তাকেও জ্ঞানের সাগর হওয়া প্রয়োজন। [৮৪] তার ভাষায় বুৎপত্তি ও সাবলিলতার ঘাটতি ছিল। ফলে সে বক্তব্য দেওয়া থেকে নিজেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিত। ঈদে মিলাদুন্নবী অথবা তার 'আল রাসুল শাহ'র উরস উপলক্ষে সে মাঝে মধ্যে কিছু কথা-বার্তা বলতো। [৮৫]
টিকাঃ
৮১. সুবহান আস সাবুহ, আহমাদ রেযা বেরেলভী, পৃ-১৪২।
৮২. প্রাগুক্ত।
৮৩. হায়াতে আলা হযরত, জাফরুদ্দীন বিহারী।
৮৪. আনোয়ার রেযা, পৃ-২৮৪
৮৫. হায়াতে আলা হযরত, জাফরুদ্দীন বিহারী