📄 অনুবাদকের ভূমিকা
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أَمَّا بَعْدُ - فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وكل ضلالة في النار
আমাদের উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় যে সংকট, তা হলো ঈমান বা আকীদা বিষয়ক জ্ঞান চর্চার সংকট। বক্ষমান বইটিতে যাদের আকীদা বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী হিসেবে দাবি করলেও তারা মূলত শিয়া প্রভাবিত সুফী সম্প্রদায়। এরা 'বেরেলভী', 'রেযভী', 'আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআত' বা 'আহলে সুন্নাত', 'সুন্নী' সুন্নিয়া' ইত্যাদি নামে নিজেদের পরিচয় দেয়।
বাংলাদেশের কবরপূজারী বেরেলভী বা রেযভী হলো যেমন- আটরশী, মাইজভাণ্ডারী, দেওয়ানবাগী, এনায়েতপুরী, চন্দ্রপাড়া, সুরেশ্বরী, রাজারবাগী এবং আরো অনেকে যারা কবরপূজা ও অন্যান্য শিরকী কাজের সংঙ্গে জড়িত।
দুঃখের বিষয় হলো, এদের আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে অনেক মুসলিমই অবগত নন। এমনকি অনেক লোক যারা সমাজে আলিম-উলামা নামে পরিচিতি লাভ করেছেন, তারাও এদের আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে অনবহিত। ফলে আমাদের দেশের সরলপ্রাণ মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করতে এ সকল নামধারী আলিমগণ এদের শিরকী-বিদআতী আকীদা-বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ (!) ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
এরা নামে হানাফী হলেও আবু হানীফা রহিমাহুল্লাহ -এর কোনো আকীদাই তারা মানে না। ইমাম আবু হানীফা (রহমতুল্লাহি আলাইহি) -এর আকীদার কিতাব 'ফিকহুল আকবার' বা তাঁর অনুসারী ইমাম তাহাবী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর 'আকীদাতুত তাহাবী'র অনুসরণ এরা করে না।
এরা শিয়া প্রভাবিত সুফীদের তৈরী বিভিন্ন মতবাদ আমদানী করে আমাদের সরলপ্রাণ মুসলিম ভাইদেরকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। এ সকল নামধারী আলিম ও তাদের অনুসারীদেরকে বিশেষ ভাবে এসকল বেরেলভীদেরকে তাদের বাতিল সুফীবাদী ও বিভ্রান্ত শিয়া-রাফিযীদের থেকে গৃহীত আকীদা-বিশ্বাসসমূহ প্রচার করতে কোনো বেগ পেতে হয় না। সুফীদের নামে যে যা বলে, সকলে তাই বিশ্বাস করে। মূলত সুফী আকীদার অধিকাংশ শিয়া মতবাদ থেকে গৃহীত। শিয়ারা তাদের কথিত ইমামগণের সম্পর্কে যেসকল শিরকী আকীদা পোষণ করে, ঠিক একই আকীদা রাখে সুফীবাদী এসকল লোকেরা তাদের শায়খ বা পীরদের সম্পর্কে।
এ সকল আকীদার মধ্যে অধিকাংশই আছে স্পষ্ট শিরক, কিছু গোপন শিরক এবং কিছু বিদআতী আমল। এদের কিছু নিদর্শন বা চিহ্ন রয়েছে, যার সবচেয়ে প্রভাবশীল হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা, আল্লাহকে বাদ দিয়ে সরাসরি তাঁর কাছে দুআ করা, তাঁর জন্য 'ইলমে গায়েব' বা সকল অদৃশ্যের পরিপূর্ণ জ্ঞান দাবি করা, তাঁকে দুই জাহানের সকল ক্ষমতার মালিক বলে দাবি করা, তাকে সকল কল্যাণের- অকল্যাণের মালিক দাবি করা, তাঁকে 'হাজির-নাযির' বা সবসময় সর্বত্র উপস্থিত ও সবকিছুর দর্শক বলে দাবি করা।
এছাড়া শিয়াদের মত তাদের কথিত ওলী, ইমাম ও পীরদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা, যেমন- তাদের জন্যও সকল গায়েবের জ্ঞান ও ক্ষমতা দাবি করা, তাদের কাছে সরাসরি যাঞ্চা করা, দুআ করা ও হাযত প্রার্থনা করা, কবরকেন্দ্রিক ইবাদত করা, এদের শিরকী ওসীলা দেওয়া, কবরের মাটি আরোগ্য লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা, কবরে বা পীরের দরগায় মানত-নযর দেওয়া, কবরে বা পীরের দরগার নিকট জবাই করা, ভেট বা মানসা দেওয়া, কবর বা পীরকে সাজদা করা, কবরের, মাজারের বা পীরের ছবি হাত দিয়ে মলা এবং চোখে মুখে লাগানো ইত্যাদি যার প্রায় সবটাই শিরকে আকবার যা একজন মুসলিমকে ইসলাম থেকেই বের করে দেয়। আরও একটি বড় নিদর্শন বা চিহ্ন হলো বিদআতী অনুষ্ঠান যেমন 'ঈদে মিলাদুন্নবী' নামে বিভিন্ন জমকালো অনুষ্ঠান, তাযিয়া, জশনে জুলুস, কিয়াম, ওলী আওলিয়ার কবরের নিকট তাদের জন্ম বা মৃত্যুদিবসে কথিত 'ওরস' পালন ইত্যাদি। আমাদের দেশের মুসলিমরা না জেনেই অনেকে এ শিরক ও বিদ'আতের বেড়াজালে আটকে পড়ে অজান্তে নিজের ঈমানটাকেই বরবাদ করে দিচ্ছেন।
এ মুহূর্তে এদের শিরকী-বিদআতী আকীদা খণ্ডনে শায়খ ইহসান ইলাহী যহীরের বক্ষমান বইটি আমাদের প্রিয় মুসলিম ভাইদের হাতে পৌঁছানো অতীব জরুরী। তাই এ অনুবাদের কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করি। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ তা'আলার শোকর করি যে, তিনি আমার মত এক নগণ্য বান্দাকে এ কাজটি করার মতো সাহস, সামর্থ্য ও সুযোগ দান করেছেন। শায়খের এ বইটি মূলত: আরবী ও উর্দু ভাষায় লিখিত। এর ইংরেজী অনুবাদ হয়েছে। এর পূর্বে এর কোনো বাংলা অনুবাদ কেউ করেছে বলে আমাদের জানা নেই। আমরা এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অনুবাদ করেছি, এখনও দুটি অধ্যায় অননুবাদিত (এ সংস্করণে তা অনুবাদ করা হয়েছে) রয়েছে।
বেরেলভী মতবাদের খণ্ডনে সবচেয়ে তথ্যবহুল ও সূত্রবহুল হলো শায়খ যহীরের এ কিতাবটি। অত্যন্ত প্রাজ্ঞ ও সুপণ্ডিত শায়খ তাদের ফিরকার স্বীকৃত আলিমদের লিখনী ও গ্রন্থ থেকে সকল তথ্য সূত্র সহ তাদের প্রতিটি আকীদা উল্লেখ করেছেন এবং এরপর কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে এর বিষয়বস্তু খণ্ডন করেছেন।
অনুবাদের ক্ষেত্রে আমার সর্বাত্মক চেষ্টা ছিল বইটি যাতে হুবহু অনুবাদ হয় সেজন্য মূল বক্তব্যেরও কোনো পরিবর্তন করিনি, কোথাও কোথাও সেজন্য অস্পষ্টতা থাকতে পারে। কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য দিতে বা কোনো আকীদার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিষয় সংযোজন করতে আমি টীকার আশ্রয় নিয়েছি। অনেক লেখকের লেখা থেকে টীকায় উদ্ধৃতি দিয়েছি। বেশিরভাগ টীকাতেই সেসকল লেখকের বই থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি প্রদান করেছি। আল্লাহ সেসকল লেখকদের জাযায়ে খায়ের দান করুন। আর হাদীসগুলির নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে কখনো মূল কিতাবের, কখনো বা প্রচলিত বাংলা অনুবাদের থেকে এবং যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস মুহাম্মদ নাসির উদ্দীন আল আলবানী, মুহাক্কিক শোয়াইব আরনাউত্ব এবং ক্ষেত্রবিশেষে অন্যান্য মুহাক্কিকগণের তাহকীক উল্লেখ করেছি। অনুবাদকের টীকায় যত ভুল-ভ্রান্তি তার সকল দায়ভার আমার, মূল লেখকের নয় কোনোভাবেই। আর অনুবাদ কর্মেও কোথাও কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল লক্ষ্য করলে আমাদেরকে জানালে আমরা তা সংশোধন করবো ইনশাআল্লাহ এবং তার জন্য মহান আল্লাহর নিকট দুআ করবো যেন তাকে জাযায়ে খায়ের দান করেন।
যা হোক, আমরা দুআ করি যেন মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর কল্যাণময় দীনের সঠিক ও সহীহ আকীদার জ্ঞান দান করেন এবং আমাদের আকীদার সকল ভুল-ত্রুটি গুলো সংশোধন করে দেন। আসলে অনেকেই আছেন যারা না জেনে এ ভুল আকীদার মধ্যে রয়েছেন, হয়তো সঠিক আকীদার লাভ ও তার এ ভুল আকীদার ক্ষতি জানলে ফিরে আসবেন। যে ব্যক্তি ফিরে আসে, অর্থাৎ তাওবা করে, তার তো কোনো গুনাহ-ই অবশিষ্ট থাকেনা। আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমার সেসকল দীনি ভাইদের যাদের উৎসাহ-প্রেরণা আমার এ অনুবাদকর্মের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ এবং সে সকল ভাইদের যারা এর প্রিন্টিং ও প্রকাশনায় আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিশেষভাবে শায়খ মুহাম্মদ ইবরাহীম মাদানীর প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যিনি হাজারো ব্যস্ততার মাঝে অনেক কষ্ট করে এ অনুবাদ কর্মটি দেখেছেন। সকাতর প্রার্থনা করি মহান বিচারক প্রতাপশালী আল্লাহর দরবারে তিনি যেন লেখক, অনুবাদক, অনুবাদকের মাতা-পিতা, পরিবার-পরিজন, প্রকাশক ও এর প্রকাশনার ব্যাপারে আর্থিকভাবে সহায়তাকারী এবং পাঠকসহ সকল মুসলিম ভাইদেরকে ক্ষমা করেন, কিয়ামতে নাজাতের উপলক্ষ বানিয়ে দেন এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফাআতের অধিকারী করেন ও দীনের কল্যাণকামীদের কাতারে আমাদেরকে শামিল করেন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।
আল্লাহুম্মা সল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লিম।
বিনীত আবু রুমাইসা মোঃ নূর-এ- হাবিব মুহাররম ১৪৩৬ হিজরী, নভেম্বর ২০১৪ ঈসায়ী
📄 আতিয়্যা মুহাম্মদ সালিমের বাণী
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর সৃষ্টির সেরা ও শেষ নবীর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি, তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণের প্রতি এবং যারা তাঁর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করেছেন, তাদের প্রতি।
অতঃপর, আমি সুযোগ্য এবং সুপন্ডিত প্রফেসর ইহসান ইলাহী যহীরের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী 'বেরেলভী' ফিরকা সম্পর্কে লিখিত বই "আল-বেরেলভীয়া” (আরবী) পড়ার সুযোগ লাভ করেছিলাম। যদি কোনো দল বা চক্রান্তকারী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে নিজেদেরকে অপরদল বা গোষ্ঠীকে গালাগাল করে বা অভিশাপ দিয়ে তাদের থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে নিতে দেখা যায়, তবে তা সম্পূর্ণভাবে পরিকল্পনা করা হয় স্বার্থপরায়ণতার জন্য, যা অভ্যন্তরীণ বা গোপন উদ্দেশ্য হতে উদ্ভূত বা অন্তরের দুর্বলতার দরুণ কিংবা অজ্ঞতা এবং চিন্তা-ভাবনার অভাবে কিছু কিছু (গোপন) অনুসন্ধান হতে উদ্ভূত। যদি কোনো একদল লোকদেরকে তার সহগামী-দলগুলোর পথ থেকে পথভ্রষ্ট হয়ে এবং তাদের শিক্ষার বিষয়, মূলনীতিসমূহ এবং খুঁটিনাটি তুচ্ছ বিষয়াবলিকে কুফরী ঘোষণা করে তাদের আসল ভিত্তি হতে বিচ্ছিন্ন হতে দেখা যায়, তবে সেটা কোনো নিয়মনীতির বা বিচার-বুদ্ধির কাছেই গ্রহণযোগ্য কোনো আচরণ নয়।
এ ফিরকা সম্পর্কে ইতঃপূর্বে কখনো কোনো অবগতি তো আমাদের ছিলই না, এমনকি এ সম্পর্কে কোনো ধারণাও আমাদের ছিল না, কেবল এ বইটির মাধ্যম যা বিজ্ঞ শাইখ ইহসান ইলাহী যহীর পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তিনি এ ফিরকাকে কাছ থেকে জেনেছেন, তার দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে, তাদের ব্যপ্তির গভীরতাসমূহ অভ্যন্তরীণভাবে এবং বাহ্যিকভাবে পরিমাপ করেছেন, তাদের মূল নথিপত্রগুলো অবিশ্রান্তভাবে পড়েছেন, সেগুলো আয়ত্ব করেছেন এবং তাঁর নিজ দেশে তাদের সাথে বসবাস করেছেন। এ সকল উৎসসমূহের মাধ্যমে তিনি এ দলটির আসল অবস্থার সাথে পাঠকদের পরিচয় করে দিতে এবং অজ্ঞাত সত্য, যা তারা কেবল নিজেদের ব্যতিরেকে অন্য সকলের থেকে এবং যারা তাদের মতো নয় তাদের থেকে তাদের অন্তরে গোপন করে রাখতো, তা উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সত্য তাদের পীড়িত হৃদয়ে লুকায়িত রয়েছে, আর যা তাদের অন্তর গোপন করে তা হয়তো আরও ভয়াবহ।
যদি এ বইয়ের বিজ্ঞ লেখকের এ দলের প্রতিবেশীত্ব ও সাহচার্য-এর সুবাদে তাদের সঙ্গে নিকটবর্তী সম্পর্ক না থাকতো এবং আমরা যদি তাঁর পাণ্ডিত্যের সত্যপরায়ণতার উপর এবং সেই দলের আসল নথিসমূহের দ্বারা তাঁর গ্রন্থে দলিল উপস্থাপন করার উপর আস্থা স্থাপন না করতাম, তবে তাদের মতো কোনো দলের অস্তিত্ব সম্পর্কেও আমরা জানতে পারতাম না।
যখন আমরা এ দলের স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পরিচিত হলাম এবং এদেরকে পাণ্ডিত্যসুলভ পদ্ধতিতে পরিমাপ করলাম, আমরা দেখলাম যে, যে (আকীদা-বিশ্বাস ও) কর্মপদ্ধতিসমূহ তারা অবলম্বন করে তা অর্থহীন এবং গুরুত্বহীন, কারণ তারা বাড়াবাড়ি ও অবজ্ঞা -এ দুটি প্রান্তিক/চরম সীমানায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন বানোয়াট ভাবনা-চিন্তার উপর তাদের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
তাদের তীব্র আবেগতাড়িত দৃষ্টিকোন থেকে দেখা, দ্রুত বিস্তারলাভ, তাদের মিথ্যা বানোয়াট আকীদার প্রসারের কার্যক্রম, আমজনতার নিকট তাদের ভ্রমাত্মক ধ্যানধারণার মাধ্যমে ঘটনাবলির ভুল ব্যাখ্যাকরণ, এর জন্মভূমি (ভারত পাকিস্তান) এর বাইরেও এর প্রচারণা ও বিস্তারলাভ - এসকল বিষয়ই অন্যান্যদের চেয়ে তাদের পক্ষ হতে বিপদ ও ঝুঁকিকে অধিক সংকটপূর্ণ করে তুলেছে। প্রত্যেক ব্যক্তি যে তাদের ব্যাপারে আসল সত্যকে জানে তার উপর আবশ্যক হলো তা প্রকাশ করে দেওয়া। পন্ডিত লেখক আমাদের নিকট এ বইটি উপহার দেওয়ার মাধ্যমে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন যাতে এই ফিরকার কর্মকান্ড সম্পর্কে আমরা খুব ভালভাবে অবগত হতে পারি।
একজন পাঠক প্রত্যেক বইয়ের শুরুতে এটার মত একটি উপক্রমনিকা/ সূচনা দেখতে অভ্যস্ত যা এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোকপাত করবে, এর অধ্যায়গুলো তার সামনে খুলে ধরবে এবং এর সত্যতা/বাস্তবতা সম্পর্কে পরিচিত হতে এর জ্ঞানজাগতিক মানের নিক্তিতে একে পরিমাপ করবে এবং এর রচনাশৈলী ও ভাব বিচার করার জন্য একে মূল্যায়ন করবে।
আমার জন্য যা করা সম্ভব তা হলো, আমি পাঠকদের জন্য কয়েকটি কথা এবং সেগুলোর স্পষ্টভাবে বিবৃত দৃষ্টিকোন উপস্থাপন করতে পারি।
এ বইয়ের লেখক সম্পর্কে, তার জ্ঞানজাগতিক উদ্যোগসমূহ, এ ফিরকার বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম এবং তার মনোমুগ্ধকর রচনাশৈলীর জোরে এবং বিদ্বানসূলভ গবেষণার দ্বারা আধুনিক সময়ে পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিমদের জন্য তার প্রচেষ্টা সম্পর্কে কিছু কথা আমি লিখলাম। তার লিখনী, "আল বেরেলভীয়্যাহ" এর সাথে সাথে তিনি কাদিয়ানী ও বাবী ফিরকা সম্পর্কেও তিনি জ্ঞানগর্ভ বই লিখেছেন।
তিনি শিয়াদের সম্পর্কেও আধুনিক সময়ে বিবেচনাযোগ্য তাদের ব্যপ্তিসমূহ প্রকাশ করে অনেকগুলি রিসালা বা ছোট ছোট পুস্তিকা রচনা করেছেন। সামসময়িক বিভিন্ন বাতিল ফিরকার ধ্বংসাত্মক অন্ধবিশ্বাস বা গোঁড়ামি, বিভ্রান্ত পন্থাসমূহ, মুসলিমদের আকীদা-বিশ্বাস, মতধারার প্রতি মারাত্মক বিপদ হাজির করা-সহ সে সকল বাতিল ফিরকা সম্পর্কে তার লিখনীগুলো এই ক্ষেত্রে তার পূর্বসূরীদের লিখনীগুলোর অনুরূপ গণ্য করা হয়, যারা তাদের সময়ে তাদের সামসময়িক ফিরকাগুলো সম্পর্কে লিখেছেন, যদিও কেবল তাদের নামটিই আজ অবশিষ্ট রয়েছে অথবা যা তারা ইতিহাসের পাতায় লিখে গেছেন, যেমন মু'তাযিলা, খারেজী এবং অনুরূপ অন্যান্য ফিরকা। এ ব্যাপারে যা তাকে সাহায্য করেছিল তা হলো দু'সভ্যতা- ফার্সী ও আরবীর একত্রীকরণ এবং ফার্সী, উর্দু ও আরবীর আঞ্চলিক ভাষায় তার দক্ষতা; এবং প্রাচীন ও সমসাময়িক শিক্ষা, ইসলামী মানহাজের উসূল, কুরআন ও সুন্নাহ, উসুলে ফিকহ, হানাফী ফিকহ, হাদীসের ফিকহ এবং সালাফী আকীদায় তার দক্ষতা, সে তার দেশে হোক কিংবা মদীনা মুনাওয়ারায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনই হোক। এসকল কারণেই তার সকল লেখনীই সংযম, ভারসাম্য এবং ন্যায়সঙ্গত যুক্তি সত্যপরায়ণতা দ্বারা সমর্থিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, তিনি যে ফিরকা সম্পর্কে লিখেন, সেই ফিরকার নির্ভরযোগ্য তথ্য বা প্রমাণের উৎসস্বরূপ প্রামাণ্য গ্রন্থাদির ভিত্তিতে যুক্তি প্রদর্শন করেন। ফলে তার লিখনীগুলো হয় সন্দেহের উর্ধ্বে। তিনি তাদের উৎসসমূহ থেকে যেগুলো বাছাই করে নেন, সেগুলোর কোনো উৎসকে অবিশ্বাস করার কোনো সুযোগই থাকে না। তাদের উৎসসমূহ থেকে (উদ্ধৃতির মাধ্যমে প্রমাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে) তিনি এতই বিশেষজ্ঞ ছিলেন যে, তার বইগুলো ছাত্র এবং গবেষকদের জন্য সম্পদ ও সূত্রে পরিণত হয়েছে। বেরেলভী নামের এ ফিরকা সম্পর্কে তার লিখনীসমূহের ব্যাপারে একই যুক্তি বিদ্যমান। এ হলো এ বইয়ের বিদ্বান লেখক সম্পর্কে সামান্য কিছু কথা যা আমি পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করতে ইচ্ছা করেছিলাম।
বেরেলভী সম্পর্কে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার উপর আমি আরো বেশি জোর দিতে চাই এবং আমি এগুলো এ বইটির পাতা থেকেই পেয়েছি:
প্রথমত: এ ফিরকার প্রতিষ্ঠাতার জীবনেতিহাস, তার জীবনের বিস্তারিত ঘটনাবলি এবং ১২৭২ হিজরী/ ১৮৫৫ খ্রি. হতে ১৩৪০ হিজরী /১৯২১ খ্রি. সালের মধ্যে ময়দানে তার আবির্ভূত হওয়া সম্পর্কিত যুগটি ভারতে জ্ঞানজাগতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সাহিত্যিক আন্দোলনের যুগ ছিল না, কারণ এ সময়ে দেশটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের নির্মম শাসনের অধিনে ছিল যারা জীবন অন্বেষী বা জীবনমুখী সকল আন্দোলনকে ধ্বংস করেছিল। তাই এ ফিরকাটি আপন স্বার্থের জন্য বরং তাদের সেবাদানের জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতার অধীনে জনসম্মুখে অবতীর্ণ হয়েছিল। এ আন্দোলনের আবহ অধ্যয়নের চেয়ে আর কোনো কিছুই এ ঘটনার অধিক নির্দেশক নয়। কাদিয়ানিয়্যাহ বিষয়টিও একই। পণ্ডিত লেখক এর আসল সত্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি এর বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং সাহায্য-সেবাকে উন্মোচন বা প্রকাশ করে দিয়েছেন।
আল্লাহ তার (এ ফিরকার প্রতিষ্ঠাতা) কিছু ক্ষুদ্র রচনায় (রিসালায়) তাকে বলিয়েছেন যে, সে ব্রিটিশদেরকে ওয়াহাবীদের থেকে সতর্ক করে। এর অর্থ সে ব্রিটিশদের খাঁটি বন্ধু, যারা ছিলো দাওয়াহ'র বিরোধী ও শত্রু যা মুসলিম বুদ্ধিজীবীগণ এর সুবিধাদি ও সক্ষমতাসহ প্রত্যক্ষ করেছেন। ইসলামী বিশ্বের মুসলিমদের প্রতিনিধিগণ এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমুহে ইসলামী শিক্ষাগ্রহণের জন্য এ দেশে সফর করেছেন। এ ফিরকার উৎস সম্পর্কে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোনই এর অস্তিত্বের উদ্দেশ্য এবং সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট।
বিজ্ঞ লেখক এ পর্যন্ত প্রকাশ করে দিয়েছেন যে এ ফিরকার প্রধান ব্রিটিশদের থেকে সাহায্য ও সমর্থন লাভ করেছে, যদিও সে সাধাসিধা সাধারণ লোকদের নিকট এর ব্যবহারের দ্বারা ভান করেছে যে, তার কেবল একটি মাত্র ছোট থলে ছিল যা থেকে সে অর্থ, সোনা-দানা এবং কাপড়-চোপড় বের করতো।
এর প্রতিষ্ঠাতার সূচনার বিষয় হলো, তার প্রথম শিক্ষক ছিলো মির্জা কাদির বেগ যে ছিলো গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীর ভাই। এভাবে সত্যি বলতে কি, কাদিয়ানী এবং বেরেলভীরা হলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সেবায় নিয়োজিত যমজ দুই ভাই।
যদি কাদিয়ানী এবং বেরেলভী (অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাতাগণ) তাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের পতনের এবং তাদের থেকে ওদের (ব্রিটিশদের) সাহায্য-সমর্থন প্রত্যাহারের খবর জানতে পারতো, তবে তারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতো হয়তো। যাহোক, তাদের দৃষ্টি মোটেও অন্ধ ছিল না, কিন্তু তাদের বক্ষে রক্ষিত অন্তরসমূহ অন্ধ ছিলো।
দ্বিতীয়ত: এখন আমি বেরেলভীদের মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করব। তারা দুটো প্রান্তিক সীমাকে একত্রিত করেছে, অতিভক্তি ও অবজ্ঞা-অবহেলা।
ক. আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের মৃত বা জীবিত ওলীদের বিশ্বাসের ব্যাপারে তারা খুবই বাড়াবাড়ি করেছে। তারা তাদের ওলীদের উপর 'সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী'র গুণাবলি আরোপ করেছে। তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ওলীগণ এবং নেককারগণ দুনিয়াবী সম্পদের মালিক এবং আখিরাতে নাজাতের কাঠি তাদের হাতেই, যেগুলো কোনো বিবেকবান ব্যক্তি বিশ্বাস করতে পারে না, এমনকি ইসলাম পূর্ব যুগের কোনো পৌত্তলিক বা মুশরিকও বিশ্বাস করতো না।
খ. তারা সারা জীবন সালাত পরিত্যাগকারী একজন লোকের জন্য ফিদইয়া বা অর্থ বিনিময়ই যথেষ্ট মনে করার মাধ্যমে অবজ্ঞা বা শৈথিল্য চর্চা করেছে; আর সে যত বছর সালাত আদায় করেনি, সেই অনুসারে এ ফিদইয়া বা অর্থ বিনিময় দিতে হবে তাদের মোল্লাদেরকে।
তৃতীয়ত: তারা নিজেদেরকে বাদে আর সকল মুসলিমদেরকে কাফির ঘোষণা করেছে, এমনকি হানাফী দেওবন্দীদেরকেও। এটি তাদের নির্বুদ্ধিতা ও অদূরদর্শিতারই ইঙ্গিত করে, কারণ দেওবন্দীগণও তাদের মত হানাফী ফিকহের অনুসারী এবং এ উভয় দলই তাদের উৎসের জন্য হানাফীদের নিকট কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ। দেওবন্দীদেরকে তারা কাফির ফতোয়া দেয়, যখন দেওবন্দীরাও হানাফী, তারাও হানাফী, পরিশেষে উপসংহার দাঁড়ায় যে, বেরেলভীরাও কাফির। এটি একটি স্পষ্ট ন্যায়সঙ্গত যুক্তি। অতীতের আলিমগণ বলেছেন: "যে ব্যক্তি মহান ব্যক্তিদের গালি দেয় সে যেনো নিজেকেই গালি দেয়।” এভাবে তারা পক্ষান্তরে নিজেদের অজান্তে নিজেদেরকেই কাফির ঘোষণা করে। অন্যদেরকে কাফির ঘোষণা করা তাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে; তারা কাউকে বাদ দেয়নি এবং এতবেশী সীমালংঘন করেছিল যে, লেখক এ ফিরকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, সে মাঝে মাঝে নিজেকেও কাফির ঘোষণা করতো। সে ছিলো কবি জারীর এর মতো। যখন তার বিদ্রূপ সীমাহীন হয়ে গেল, তখন সে বিদ্রূপ করা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো না; যখন বিদ্রূপ করার মতো কাউকে পেতনা, তখন সে নিজেকেই বিদ্রূপ করতো।
তাদের নিজেদেরকে ব্যতীত অন্যদেরকে কাফির ঘোষণা করার কারণ যদি আমরা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি, তাহলে দেখা যায় যে, তাদের নির্বোধ কিচ্ছা ও কুসংস্কার বা গোঁড়ামিতে অন্যদের অবিশ্বাসই হলো এর অন্যতম কারণ। এ চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ি, হঠকারিতা এবং অতি সহজেই অন্যান্যদের কাফির ঘোষণা দেওয়ার ফলে তারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে, পাকিস্তানের ইসলামী কবি ড. মুহাম্মদ ইকবালকে, এমনকি সেসময়ের পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ জিয়াউল হককে কাফির ঘোষণা দিয়েছিলেন।
আমি বিশ্বাস করি তাদের নিকট এটি খুবই স্বাভাবিক কারণ ছিলো যে, এ সকল লোকেরা তার বন্ধুবর ঔপনিবেশিকদের শত্রু ছিলো। তারা হলেন সেই সকল লোক যারা তাদের দেশ থেকে তাদের (ঔপনিবেশিকদের) তাড়ানোর জন্য সংগ্রাম করেছিলেন এবং যা সে (প্রতিষ্ঠাতা বেরেলভী) তাদের থেকে লাভ করতো তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অতএব, তারা তাদের চোখে কাফির হবেন- এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
চতুর্থত: তারা পাক-ভারত উপমহাদেশের বাইরের মুসলিমদেরকেও কাফির ঘোষণা করতে শুরু করেছিল, এমনকি ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহকে সহ, যার শ্রেষ্ঠত্ব এবং মর্যাদা সারা বিশ্বে প্রমাণিত হয়েছে এবং এমনকি তাঁর শত্রুরা পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান ও মেধার সমালোচনা করতে পারেনি। তারা শাইখ মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাবকেও তাকফীরের লক্ষ্যস্থল বানিয়েছিল, যিনি তৎকালীন বিশ্বকে এবং প্রত্যেক ন্যায়বান ব্যক্তিকে নাড়া দিয়েছিলেন। তিনি মুসলিমদের মধ্যকার বিবাদ-বিসম্বাদগুলো মীমাংসা করার জন্য আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর নিকট নিয়ে আসার জন্য তাদেরকে আহবান জানিয়েছিলেন। সেসকল বিদআতী এবং মিথ্যা বাতিল আকীদা বিশ্বাসকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করেছিলেন, যে সকল আকীদা ইসলামের প্রথম যুগের সালফে সালেহীনগণ পোষণ করতেন না। তিনি লোকদেরকে নিম্নলিখিত অসৎকাজসমূহ থেকে বিরত রেখেছিলেন: আল্লাহকে ছাড়া অন্যের কাছে যাঞ্ছা করা বা চাওয়া, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা, অথবা যা প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের নিকট - রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে যে যুগ সম্পর্কে কল্যানকর বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের নিকট অপছন্দনীয় ছিল এমন আমল করা। তিনি মুসলিমদেরকে এই পতাকার অধীনে একত্রিত হওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন-লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এবং শরীয়াত (ইসলামী আইন) কে সালিশ বা বিচারক মানা।
সেসময়ে যখন আমাদের ঐক্য ও সংহতি প্রয়োজন ছিল তখন এ বেরেলভী সাহেব (এ ফিরকার প্রতিষ্ঠাতা) তার নিজেকে ব্যতীত আর সকলকে কাফির ঘোষণা করেছিল, এভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে বিভক্ত করেছিল এবং ধর্মের ভিত্তিকে ধ্বংস করেছিল। সে লোকজনদেরকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা থেকে এমন অনেক ব্যক্তির ইবাদতের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছে, তার মতে, যেসকল লোকেরা তাদের ডাকে সাড়া দেয় যারা তাদেরকে ডাকে, তাদের সাহায্য করে যারা তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। আর সে লোকদেরকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে ভিন্নমুখী করে দিয়েছিল, এভাবে তাদেরকে এসকল মন্দ আবেগ এবং প্রবৃত্তির উপর অবিচল থাকার দিকে পরিচালিত করেছিল।
কোনো লোকের পক্ষে কোনো একটি ফিরকার মধ্যে বিদ্যমান সকল ঘটনা সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব ছিল যদি বিদ্বান লেখক এ বইয়ের বিষয়গুলো না লিখতেন, যার জন্য আমরা এ ভূমিকা লিখছি। শীঘ্রই পাঠক নিজেই দেখতে পাবেন এবং বিচার করবেন। আল্লাহই সঠিক পথে পরিচালনাকারী।
যখন ঔপনিবেশিকরা তাদের দেশ ছেড়ে গেছে এবং তাদের সাথে সংযোগ বন্ধনে ছেদ পড়েছে, এ উপলক্ষে আমি এ দলের নিকট যেখান থেকে তারা শুরু করেছিল সেই স্থানে ফিরে আসার জন্য এবং যে ফিকহী মাযহাব তারা অনুসরণ করে সেদিকে পুনরায় ফিরে তাকানোর জন্য আবেদন করছি, এ মাযহাবের ইমাম, আবু হানীফা রহিমাহুল্লাহ যে আকীদা পোষণ করতেন সে আকীদার দিকে ফিরে আসার জন্য, বিশেষত তাঁর মহান কর্ম, ফিকহুল আকবার, যাতে আকীদাসমূহ বিদ্যমান রয়েছে সেদিকে তাদের লক্ষ্য করা উচিত। আল্লাহর কিতাব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের সালাফগণের রীতি-পদ্ধতির দিকেও তাদের লক্ষ্য করা উচিত। যাতে করে এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের অন্তদৃষ্টিকে আলোকিত করতে পারেন, তাদের বক্ষসমূহকে উন্মুক্ত করতে পারেন এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন। তিনি সকল কিছুর উপরে ক্ষমতাবান।
আতিয়্যা মুহাম্মদ সালিম
বিচারক, আইন পরিষদ, মদীনা মুনাওয়ারাহ এবং শিক্ষক, মসজিদে নববী।
📄 শাইখ ইহসান ইলাহী যহীর রহিমাহুল্লাহর সংক্ষিপ্ত জীবনী
(১৩৬৩ হি./১৯৩৬ খ্রি. – ১৪০৭ হি./১৯৮৬ খ্রি.)
জন্ম: শায়খ ইহসান ইলাহী যহীর বিন যুহুর ইলাহী বিন আহমাদুদ্দীন বিন নাযম বিন আলতাফ 'সীথি' বংশের লোক। তিনি পাকিস্তানের পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে ১৩৬৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
শিক্ষাজীবন: তিনি নয় বছর বয়সে কুরআনের হাফেয হন, একই সাথে ইবতেদায়ী মাদ্রাসার পড়া শেষ করেন। অতপর তিনি বিভিন্ন আলেমদের নিকট দীনের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। শায়খ ইহসান মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে যান এবং ১৯৬১ সনে সেখানে ভর্তি হন। যখন তিনি মদীনাতে স্নাতক শেষ করেন, তখন ভালো ফলাফলের জন্য তাকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তিনি এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, "আমাকে আমার নিজের দেশের বেশি প্রয়োজন।"
দেশে ফিরে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে (كلية الحقوق والعلوم السياسة) এ বিষয়ে ভর্তি হন ও অনার্স শেষ করেন। একই সাথে তিনি লাহোরের আহলে হাদীস বড় মসজিদে খুতবা দিতেন। তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে (الشريعة، واللغة العربية، والفارسية والأردية، والسياسة) এ ৫ টি বিষয়ে এবং ও করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে (الحقوق) এ ১ টি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।
বাতিল ফিরকার বিরুদ্ধে সোচ্চার: তিনি বাতিল বিভ্রান্ত বিভিন্ন দল যেমন কাদিয়ানী, হাদীস অস্বীকারকারী, সমাজতন্ত্রী ইত্যাদি খণ্ডন করেন। তিনি সারাজীবন আল্লাহর পথে দাওয়াহ'র কাজে ব্যয় করেছেন। সেটা বই লেখা, লেকচার, কনফারেন্স, পত্রিকা প্রকাশ, রাজনীতি করা, খুতবা দেওয়া, বিতর্ক বাহাস করা অথবা যে মাধ্যমেই হোক না কেন, সবই ছিল সঠিক আকীদা-বিশ্বাস তথা সালফে সলেহীনদের আকীদা ও মানহাজ অনুসরণে কুরআন সুন্নাহর দিকে আহ্বান। তিনি হলেন আল আল্লামা আদ দাইয়্যাহ আল মুজাহিদ। আল্লাহ তাকে রহম করুন, সর্বোচ্চ পুরস্কার দিন তার প্রচেষ্টার জন্য এবং আরও বাড়িয়ে দিন নিজের পক্ষ থেকে। আমীন।
dাওয়াহ ইলাল্লাহ: তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় নিয়োজিত করেছিলেন দাওয়াহ ইলাল্লাহ'র জন্য। তিনি খুতবা, বক্তৃতা, বিতর্ক-বাহাস ইত্যাদির জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত সফর করেছেন। যেমন আফ্রিকা, আরব বিশ্ব, মধ্য প্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়া। লেকচার বা বক্তব্য প্রদানের জন্য যেসকল দেশ সফর করেছেন তার মধ্যে রয়েছে, কুয়েত, সৌদি আরব (বহু বার), ইরাক (বহু বার) ও আমেরিকা। তিনি রাজনীতিে প্রবেশ করেছিলেন এবং বহুবার বন্দী হয়েছেন বিভিন্ন সরকারের আমলে তার অনমনীয়তার জন্য এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের ক্ষেত্রে তিনি বড়-ছোট বাছ-বিচার করতেন না। শায়খ বেরেলভী ও তাদের আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে লিখেছেন এবং নিঃসন্দেহে এ বইটি নেতাদের এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তার আপসহীনতার একটি দৃষ্টান্ত, কারণ অধিকাংশ লোকই তখন বেরেলভী মতাবলম্বী ছিল।
শায়খ ছিলেন একজন সদাচারী, নেককার, দয়ালু, দৃঢ় ঈমানের অধিকারী, দীনের ব্যাপারে অত্যন্ত দৃঢ়, সত্যকে রক্ষার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ, যিনি প্রায়ই দীন রক্ষার ব্যাপারে তা দেখিয়েছেন। তিনি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করেছেন এবং বক্তব্য ও লেখনীর দ্বারা পাকিস্তানে সঠিক আকীদা ও ইসলামী শরীয়াত প্রয়োগের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা পালন করতেন এবং একে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। একটি সংগ্রাম, জিহাদ, জ্ঞান অন্বেষণ, শিক্ষা গ্রহণ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে যেমন- মসজিদ, মজলিস, কনফারেন্সে আল্লাহর পথে দাওয়াহ ইত্যাদি কাজ আঞ্জাম দেওয়া শেষে তার মৃত্যু হয়।
শায়খের লেখনী:
১. الشيعة والسنة (۱۳৯৩هـ).
২. الشيعة وأهل البيت (١٤٠٣هـ) وهي الطبعة الثالثة.
৩. الشيعة والتشيع فرق وتاريخ.
৪. الإسماعيلية تاريخ وعقائد (١٤٠٥هـ).
৫. البابية عرض ونقد.
৬. القاديانية (١٣٧٦هـ).
৭. البريلوية عقائد وتاريخ (١٤٠٣هـ)
৮. البهائية نقد وتحليل (١٩٧٥م).
৯. الرد الكافي على مغالطات الدكتور علي عبدالواحد وافي (١٤٠٤هـ).
১০. التصوف، المنشأ والمصادر الجزء الأول (١٤٠٦هـ).
১১. دراسات في التصوف وهو الجزء الثاني.
১২. الشيعة والقرآن (١٤٠٣هـ).
১৩. الباطنية بفرقها المشهورة.
১৪. فرق شبه القارة الهندية ومعتقداتها.
১৫. النصرانية.
১৬. القاديانية باللغة الإنجليزية.
১৭. الشيعة والسنة بالفارسية.
১৮. كتاب الوسيلة بالإنجليزية والأوردية.
১৯. كتاب التوحيد.
২০. الكفر والإسلام بالأوردية.
২১. الشيعة والسنة بالفارسية والإنجليزية والتايلندية.
শায়খের মৃত্যু:
২৩ শে রজব ১৪০৭ হিজরীতে লাহোরের নাদওয়াতুল উলামাতে বক্তৃতা চলাকালে বোমা মেরে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সে সময় ৭ জন আলেম মারা যান ও শায়খ ইহসান ইলাহী যহীর রহিমাহুল্লাহ গুরুতর আহত হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য শায়খ ইবনে বায রহিমাহুল্লাহর সুপারিশে বিশেষ বিমানে সউদী আরবে নিয়ে যাওয়া হয়। ১লা শাবান ১৪০৭ হিজরীতে সউদী আরবের রিয়াদে মারা যান। বিমান যোগে মদীনা মুনাওয়াতে নিয়ে আসা হয় এবং বাকী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
📄 লেখকের ভূমিকা
বিস্মিল্লাহির রহমা-নির রহীম
সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি ব্যতীত সত্য কোনো উপাস্য নেই এবং তিনি একক ও অদ্বিতীয়। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি, যার পরে আর কোনো নবী নেই, আর তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি, তাঁর সম্মানিত সাহাবীগণের প্রতি এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা তাঁর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করবে তাদের প্রতিও।
অতঃপর আমি পাঠকদের সামনে পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন ফিরকার মধ্যে একটি নতুন ফিরকা সম্পর্কে একটি নতুন বই উপস্থাপন করছি। আর তা হলো বক্ষমান বই "আল-বেরেলভীয়্যাহ: আকাইদ ওয়াত তারিখ" বা "বেরেলভী মতবাদ: আকীদা বিশ্বাস ও ইতিহাস"।
এর সূচনা ও আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এ ফিরকা এখন উপমহাদেশের অন্যতম ফিরকা যা অনেকগুলো বিদআতী এবং অন্ধবিশ্বাসী বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ফিরকার জন্ম দিয়েছে যেগুলো বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন আকৃতিতে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এজন্য ভাবলাম যে, এদের উপর আমি আরবী ভাষায় একটি বই লিখব, যেভাবে আমি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত অন্যান্য ফিরকা সম্পর্কে লিখেছি।
যেকোনো দেশের কোনো পাঠক যখন এ বইটিতে তাদের আকীদা বিশ্বাস ও তাদের শিক্ষা-উপদেশাবলি পড়বে, তখন তার মনে হবে যেন সে তার নিজের দেশে কিংবা সারা মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন নামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফিরকা। যেমন: তিজানিয়্যাহ, সানুসিয়্যাহ, মালিদাবিয়্যাহ, কাদরিয়া, চিশতিয়া, রিফাঈ এবং অন্যান্য ফিরকাসমূহের সম্পর্কেই সে পড়ছে।
(১) এসকল দেশের কিছু অধিবাসীরা বংশানুক্রমিকভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের থেকে প্রাপ্ত সামান্য কিছু রসম-রেওয়াজ ও আচার-অনুষ্ঠান ছাড়া ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না।
(২) তারা কষ্টসাধ্য ইবাদত পালন এবং দীনের ফরয, ওয়াজিব দায়িত্ব হতে অব্যহতি লাভ হিসেবে অজ্ঞাত ওলী ও সুফী শায়খদের নিকট নযর-মানত, কুরবানী করাকে অবলম্বন করেছে।
(৩) অথবা প্রত্যেক বৃহস্পতিবার এবং বছরের নির্দিষ্ট কিছু দিনে তারা যাদেরকে ওলী ও সৎব্যক্তি মনে করে তাদের কবর (মাজার) যিয়ারত করে, কবরে 'উরস' বা মৃত্যুদিবস পালন করে, মীলাদ বা জন্মদিবস উদযাপন করে এবং অনুরূপ অন্যান্য মন্দ আচার অনুষ্ঠান পালন করা যা পার্শ্ববর্তী অমুসলিম দেশ যেমন- হিন্দু, মাজুসী-অগ্নিপূজক এবং মূর্তিপূজারীদের থেকে মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। ইতিহাসে সুপরিচিত সবচেয়ে জঘন্য সাম্রাজ্যবাদ তথা ইংরেজ ক্রুসেডারদের কিছু কিছু দেশের উপর আধিপত্য লাভের পরে সেসকল দেশ এসকল শয়তানী আচার-অনুষ্ঠান তাদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে।
(৪) সামান্য জ্ঞানসম্পন্ন লোকও জানে যে, ইসলাম আমলের ধর্ম, কিন্তু সাধারণ মুসলিমদেরকে আমল ও আকীদা বিশ্বাস থেকে দূরে রাখা হয়েছে, কেবল সেই ব্যক্তি বাদে 'যে স্বীয় রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজকে বিরত রাখে'।
(৫) তাই তাদের কোনো আমলও নেই, কোনো আকীদা বিশ্বাসও নেই। তারা দীনকে সংক্ষেপ করে নিয়েছে, এতে পরিবর্তন সাধন করেছে এবং তারা আমলের পরিবর্তে কুসংস্কার, গতানুগতিক আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব-উদযাপনকে আঁকড়ে ধরেছে।
পাঠকরা এ বইতে সেসকল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা দেখতে পাবেন যা আসল নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহ থেকে প্রমাণিত, যেভাবে এসকল বিষয়াবলি তিনি তাদের বাস্তব অনুশীলনে বিদ্যমান দেখতে পাবেন।
বাতিল ফিরকা ও স্বার্থান্বেষী দলসমূহ যেমন কাদিয়ানী, বাবী, বাহাঈ, বাতিনী এবং শিয়াদের সম্পর্কে লেখার পরে বেরেলভীদের সম্পর্কে লেখার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না, কারণ আমি ভেবেছিলাম যে, এ ফিরকাটি হলো অজ্ঞতার ফলশ্রুতি। জ্ঞান যতই ছড়িয়ে পড়বে, অজ্ঞতা দূরীভূত হবে এবং গুণী সম্প্রদায় আলোকিত হবে, ততই তাদের আমলের তিক্ততা এ আবেগকে প্রশমিত করবে, তাদের প্রচেষ্টা ততই সংকুচিত হয়ে আসবে এবং তাদের অবস্থা উল্টে যাবে। তাদের এবং মুসলিম বিশ্বের অনুরূপ অন্যন্য ফিরকার এ অবস্থা ঘটবে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম যে, তাদের কাজ-কর্ম বেড়েই চলছে এবং বহিঃদেশসমূহে একই আকীদা-বিশ্বাস পোষণকারী তাদের ভ্রাতৃবৃন্দের সহযোগিতায় তাদের প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পাচ্ছে যাতে তারা তাদের বাতিল ও মিথ্যা আকীদা-বিশ্বাস ছড়িয়ে দিতে পারে এবং ইসলামের সুপ্রাচীন শুভ্র চেহারাকে বিকৃত করতে পারে।
কিচ্ছা-কাহিনী, নির্বোধ ও ভিত্তিহীন আকীদা-বিশ্বাস, কথাবার্তা, ধোঁকাবাজি; যেমন নবী ও ওলীগণের অলৌকিক ক্ষমতা, পীর ও সুফীদের কর্তৃত্ব-ক্ষমতা, ফিদইয়া ও নযর মানতকে সালাত, যাকাত ও হাজ্জের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা এবং এভাবে সাধারণ লোকদের কে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করার মাধ্যমে তারা এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
যারা কুরআন সুন্নাহর অনুসারী এবং আল্লাহর একত্বের দিকে আহ্বান করে, আল্লাহকে তাঁর প্রতিপালনে ও সার্বভৌম ক্ষমতায় (রুবুবিয়াতে) একত্বের পবিত্রতায় বিশ্বাস রাখে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর নবুয়াতের একত্বে বিশ্বাস রাখে এবং যারা কঠোরভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর অনুসরণ করে এবং মুসলিমদেরকে ওলী ও সুফী শায়খদের বাণীর পরিবর্তে কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, তাদের সাথে এরা প্রতারণা করে এবং তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে।
যে ব্যক্তি আমল করার এবং কুরআন সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকার দিকে আহ্বান করে, এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তারা 'ওয়াহাবী' ও 'নবী-ওলীদের অসম্মানকারী' বলে বিষোদগার করে।
উপরন্তু, যারা তাদের কুসংস্কারসমূহে বিশ্বাস করে না এবং মূর্তিপূজারী, বহু ঈশ্বরবাদী (মুশরিক) ও হিন্দুদের থেকে আগত মিথ্যা ও বাতিল কল্পনাবৃত্তি ও আকীদা বিশ্বাসের উপর নির্মিত তাদের মতামতের এবং মুসলিমদেরকে অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার দিকে আহ্বানকারী শিক্ষাবলির যারা বিরোধিতা করে, তাদেরকে তারা 'মুরতাদ' ও 'কাফির' বলে ফতোয়া দিয়েছে।
তাছাড়া, তারা এ মিল্লাতের খ্যাত উলামায়ে কেরামকে আক্রমণ করেছে, যারা কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা প্রসার ও এগুলো সংরক্ষণ করার মর্যাদায় আসীন হয়েছেন এবং বিদআতীদের বিদআতসমূহকে এবং যে সকল কিচ্ছা-কাহিনীকারগণ তাদের কিচ্ছা-কাহিনীসমূহ দ্বারা বৈষয়িক স্বার্থ হাসিল ও হীন শয়তানী আবেগ-অনুরাগের বহিঃপ্রকাশের উদ্দেশ্যে যেসকল কিচ্ছা-কাহিনীকে কুরআন-সুন্নাহর বিকৃত ব্যাখ্যা দ্বারা সমর্থন করেছে, তাদের কল্প-কাহিনীসমূহকে যারা খণ্ডন করার কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। যেসব বিদআতী আলেম ওহীভিত্তিক আইন-বিধান ও তা বাস্তবায়ন করাকে স্থগিত করার চেষ্টা করেছে, হকপন্থী আলেম তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাদের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে অজ্ঞতা এদের সম্পর্কে লেখালেখি থেকে আমাকে বিরত রেখেছিল, কারণ আমি ভাবতাম এবং আমার মত অনেকেই ভাববে- যে, তারা সঠিক পথ থেকে এবং সালফে সালেহীনদের পরিষ্কার আকীদা বিশ্বাস থেকে পথভ্রষ্ট হয়েছে, তার কারণ প্রকৃত ইলম থেকে দূরে থাকা ও অজ্ঞতা।
কিন্তু যখন আমি শিয়াগণ ও তাদের আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে লিখলাম এবং সেগুলো নিয়ে যাচাই বাছাই করলাম, দেখলাম যে, তারাও তাদের আকীদাগুলোকে সেই অবাস্তব উৎসসমূহ থেকে গ্রহণ করেছে: 'আহলুস সুন্নাহ' নামে কথিত বেরেলভীদের থেকে এবং অতীত ও বর্তমানে তাদের মত অন্যান্যদের থেকে। কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ও এ সকল ফিরকার মাঝে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। তারা এক উপত্যকায় আর আহলুস সুন্নাহ অন্য উপত্যকায় রয়েছে। তাই, আতঙ্কিত হই- পাঠক ও আতঙ্কিত হবেন- যখন আমি এ সকল লোকদের আকীদা বিশ্বাস তাদের আসল উৎসসমূহ থেকে পড়ি। এসকল আকীদা বিশ্বাসের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এ হলো সেই আকীদা বিশ্বাস, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর আসার পূর্বে জাহেলী যুগের আরবের মুশরিকরা যে আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করতো। এমনকি এ ফিরকা কর্তৃক আল্লাহর সাথে শিরক করার ক্ষেত্রে এ ধরনের বাড়াবাড়ি, অতিরঞ্জন ও সীমাতিরিক্ততা এবং আল্লাহর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা খর্ব করা যা আরব পৌত্তলিক যুগেও ছিল না।
তাদের কথিত ওলী, পীর ও আকাবীরদেরকে প্রদত্ত মর্যাদা, শিরকের বিভিন্ন ধরণ এবং কিচ্ছা-কাহিনী বানানো, হাদীস বানানো বা জালকরণ এবং তাদের গুজবসমূহ তৈরী করা- এ সকল কিছুই তাদের জালিয়াতি ও বিদআতের চূড়ান্ত প্রমাণ। মিথ্যার প্রমাণ মিথ্যাই। ইসলামপূর্ব আরব মুশরিক ও পৌত্তলিকদের সাথে এ বেরেলভীদের কোনো তুলনাই চলে না, কারণ বেরেলভীরা বৈচিত্র ও সংখ্যাধিক্যের দিক থেকে তাদেরকে অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত আমি তাদের সম্পর্কে বিশেষভাবে আরবীতে লেখা থেকে বিরত ছিলাম, কারণ প্রথমে আমি ভেবেছিলাম ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশের বাইরে এ ফিরকার কোনো অস্তিত্ব নেই। যদিও এ অঞ্চলে বহু সংখ্যক মুসলিম থাকার কারণে এদের আমল, আকীদা ও বিশ্বের এ অঞ্চলে মুসলিমদের মতামতের সাথে পরিচিত হওয়ার মুসলিম বিশ্বের প্রয়োজন রয়েছে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত ও পাশ্ববর্তী অন্যান্য দেশের মুসলিম মিলিয়ে মুসলিমের সংখ্যা ৩০ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমার এ অনুমান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, যখন আমি দেখলাম সেই একই আকীদা, অন্ধবিশ্বাস-গোঁড়ামী, বাজে কথাবার্তা, পৌরাণিক কল্পকাহিনী, কুরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যা এবং প্রক্ষিপ্তকরণ, হাদীস অবমাননা, কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিচ্যুতি, অবাস্তব-অসম্ভব ঘটনাবলির উপর ভিত্তি করে যুক্তি প্রদান এবং কথিত অলৌকিক কাণ্ডসমূহ, সুদূর পূর্ব হতে সুদূর পশ্চিমের দেশ আফ্রিকা হতে এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করে এবং সফলতা প্রার্থনা করে আমি এগিয়ে এলাম এবং এ কাজটি শুরু করলাম। আমার এ মত পোষণ করতে আমাকে মোটেও বেগ পেতে হয়নি যে, তাদের সম্পর্কে উপমহাদেশের মুসলিমদের ভাষা উর্দুর সাথে সাথে আরবীতেও লিখব- কারণ এ ফিরকাটি তার সকল ধ্যান-ধারণা, আকীদা-বিশ্বাস এবং মতবাদসহ অন্যান্য মুসলিম দেশেও অঞ্চলভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন স্থানীয় রং-এ বিভিন্ন নামে অবস্থান করছে।
যারা মুসলিমদের বিষয়াদিতে জড়িত এবং তাদের সংস্কারে নিয়োজিত এবং যারা ইসলামী কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে চায় এবং শিরক, বিদআত, সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ভয়ানক অস্ত্রে সুসজ্জিত হতে চায়, তারা মন্দ কামনা-কুবাসনার অনুসারীদের বাতিল-মিথ্যা আকীদা এবং প্রতারকদের যুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে এ বই থেকে উপকৃত হবে। অনুরুপভাবে, সাধারণ পাঠকরাও তাদের গ্রন্থ ও পুস্তিকাদিতে লুকায়িত সত্য ও গোপন বিষয়াদির সাথে পরিচিতির দ্বারা উপকৃত হবে।
এটা অপরিহার্য্য যে, আমাদের কে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন এবং এর আলোকে আমাদের আকীদা বিশ্বাস সংশোধনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আমাদেরকে অতি গোঁড়ামী, (কুরআন-সুন্নাহর পরিবর্তে অন্যান্য) লোকদের কথা বা বাণী এবং সুফীদের তরীকা ও তাদের অন্ধবিশ্বাসসমূহে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকাকে পরিত্যাগ করতে হবে। উল্লেখ্য যে, শুরুতে এবিষয়গুলো খুব হালকা ও সহজ মনে হয়, কিন্তু অবশেষে এগুলো ইসলাম এবং এর শিক্ষা ও পদ্ধতি থেকে পথভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যায়। পাঠক এ বিষয়গুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ এ বইতে পাবেন।
এ বই লিখতে আমার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিয়োগ করেছি এবং বোধ ও জ্ঞান শূন্য ৩০০'র ও বেশি পুস্তিকা ও গ্রন্থ পড়ার আপ্রান চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে যে জড়িত রয়েছে কেবল সে ব্যক্তিই এ বিষয়টি সবচেয়ে ভাল বুঝবে। কিন্তু যখন আমি নিজের জন্য অপরিহার্য্য করে নিলাম যে, যে ফিরকার খণ্ডন করতে যাচ্ছি তাদের উৎসসমূহ হতে এ বইয়ের প্রত্যেকটি বিষয় উল্লেখ করব, আমার জন্য জরুরী হলো আমার ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় থাকা। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আমাকে এর বিনিময় দেবেন।
আমাকে লিখতে দিন যে, কিছু মুদ্রণ ভ্রম ও যত্নের অভাব সত্ত্বেও এ বইটি এত সুন্দর সাজে প্রকাশিত হতে পারতো না- যদি না মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার কিছু শুভানুধ্যায়ী ও শিক্ষক এবং এখানকার কর্তৃপক্ষ এর দায়িত্ব না নিতেন। তাঁদের প্রত্যেকেই আমাকে দিতে চেষ্টা করেছেন আমার কিসের প্রয়োজন এবং এমনকি আমার কি প্রয়োজন নেই। তাদের প্রচেষ্টার ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শহরের একটি প্রেসে এ বইটি মুদ্রণ আমার জন্য সম্ভব হয়েছে। আমি এ সকল জালিমদের বিরুদ্ধে জিহাদ করছি এবং তাদের আক্রমণ করছি সুন্নাহকে সমুন্নত করা ও তাঁর শিক্ষাকে সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে। আমার কৃতজ্ঞতা রইল মদীনায় মাতাবি'-আর রাশীদ এর ভাইদের প্রতি যারা এ কাজটি অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেছেন। আল্লাহ তাঁদের সবাইকে পুরস্কৃত করুন।
মধ্যরাত্রিতে বিশ্বের পবিত্র স্থানে মসজিদে নববীর সম্মুখে আমি যে মুহূর্তে এ লাইন কয়টি লিখছি, এ মুহূর্তে নিজেকে খুব গর্বিত অনুভব করছি। আমি আশা করি যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমার এ বিনীত খেদমত আমার থেকে গ্রহণ করবেন এবং তাঁর নিজের জন্য একে খালিস ও পবিত্র করবেন এবং তাঁর একত্ব, মুখাপেক্ষীহীনতা, ক্ষমতা এবং মহত্ত্বকে রক্ষা করতে এবং তাঁর মনোনীত পুরুষ, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহকে সংরক্ষণ করতে আমাকে সাহায্য করবেন, যতক্ষণ আমি জীবিত থাকি, যতক্ষণ আমার হাত নড়াচড়া করে, আমার জিহবা কথা বলে এবং হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হয়। তিনি সর্বশ্রোতা ও কবুলকারী। আল্লাহ তা'আলার শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক সাইয়্যেদিনা মুহাম্মদ খাতামান নাবিয়্যিন ওয়া সাইয়্যেদুল মুরসালীন ওয়া ইমামুল মুত্তাকীন-এর উপর এবং তাঁর সাহাবীগণ, যাদের ললাট আলোকিত এবং যারা পবিত্র, তাঁদের উপর এবং তাঁদের অনুসারী (তাবিঈ) গণের উপর এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা পুরোপুরি তাঁদের অনুসরণ করেন এবং যারা দীনের মধ্যে নতুন (বিদআত) সৃষ্টিকারী নন, তাদের উপর।
ইহসান ইলাহী যহীর
আল-মদীনা আল মুনাওয়ারাহ্, বৃহস্পতিবার রাত্রি, ২৩ শে মার্চ, ১৯৮৩। ১২ই জুমাদাল আখিরাহ, ১৪০৩ হিজরী