📄 ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলার পদ্ধতি
ইউরোপে ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে সংঘটিত অসৌজন্যমূলক ও অবমাননাকর ঘটনাবলির বিস্তারে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল অমুসলিমরা ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং ইউরোপে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ঠিক যেভাবে মুসলিমবিশ্ব থেকে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হওয়ার পর প্রাচ্য ও পশ্চিমের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক স্থাপন, ইসলাম গবেষকদের স্বীকৃতি ও পশ্চিমাদের ইসলাম গ্রহণের কারণে ইউরোপে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর অনুগ্রহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা, ইসলামি জীবনব্যবস্থা ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার পরিমাণ বেড়েছে। পশ্চিমাদের বৈরী মনোভবের কারণে পশ্চিমা সমাজের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের ভেতর ইসলামের ব্যাপারে কৌতুহল বেড়েছে। কেননা তারা এখন পশ্চিমা বিশ্বের ইসলামবিরোধিতার কারণ জানতে আগ্রহী। ফলে তারা পশ্চিমা সভ্যতার প্রতারণা ও চাতুর্য সম্পর্কে জেনে যাচ্ছে। একইসঙ্গে তাদের সামনে পশ্চিমাদের সভ্যতার জনক ও পথপ্রদর্শক এবং মানবাধিকার, মুক্তচিন্তা ও সাম্যের প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার দাবির বাস্তবতাও স্পষ্ট হচ্ছে। বিপরীতে তাদের সামনে ইসলামের স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে শত্রুর ঘরে ইসলামের পক্ষে আওয়াজ উঁচু হচ্ছে।
বহু নওমুসলিমের স্বীকার করেছেন তারা ইসলামি জীবনপ্রণালী দ্বারা প্রভাবিত। ইসলামি জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করে তারা সুখ, স্বস্তি ও সৌভাগ্য লাভ করেছে, ইসলাম তাদের পারস্পরিক আস্থা ও মনুষ্যত্বের প্রতি সম্মান করতে শিখিয়েছে এবং ইসলামবিরোধী প্রচার-প্রচারণার কারণে তাদের মনে যেসব সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল তা দূর হয়ে গেছে। এসব নওমুসলিমদের অনেকেই পরে ইসলামের একনিষ্ঠ প্রচারক হয়েছেন, ইসলামের সেবায় ও ইসলাম রক্ষায় নিজের জীবনোৎসর্গ করেছেন। এ ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ আসাদ ও মারিয়াম জামিলার নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। যারা পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্ধকার প্রকাশ করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন রজা জারুদি, মরিস বুকাইলি, মুরাদ হফম্যান, ইউসুফ ইসলাম প্রমুখ। এসব প্রাজ্ঞ মানুষ শুধু আনুষ্ঠানিক ইসলাম গ্রহণ করেননি; বরং ইসলাম ও ইসলামি জীবন নিয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা লাভের পর পরিতৃপ্ত হয়েই তারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেদের জীবন ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেন।
এক সময় মুসলিমরাই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইসলাম রক্ষায় কাজ করতো, পরবর্তী এমন সব লোক এ দলে শামিল হয় যারা খুব কাছ থেকে পশ্চিমা সভ্যতা দেখেছেন এবং পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। যারা পশ্চিমা সমাজের নাস্তিক ও আস্তিক উভয় ধারা সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। এরপর দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে পশ্চিমা সমাজের ধ্বংসযাত্রা নিয়ে মুখ খুলেছেন, ইসলাম ও ইসলামি সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। যা বহু মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের প্রভাবিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে।
এ বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও আন্দোলনের ফলে পুরো পৃথিবীতে ইসলামের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্র মতাদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার অপবাদ সত্ত্বেও ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা দিনদিন বাড়ছে। স্বয়ং ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমানের ইতিহাস পাঠের আগ্রহ বেড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে জানা যায়, ইসলাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধাচারণ ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যেমন ডেনমার্কে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর সে দেশে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী পাঠ বেড়ে যায়। একপর্যায়ে ডাচ ভাষায় প্রকাশিত সিরাতের বইয়ের সংকট তৈরি হয় এবং বহু অমুসলিম তখন মুসলিম হয়। এমন বহু দৃষ্টান্ত এখানে দেয়া যাবে- যা প্রমাণ করে ইসলাম বিরোধিতাই সব সময় ইসলামের অগ্রযাত্রার কারণ হয়েছে।
মহান আল্লাহ যেন এদিকে ইঙ্গিত করেই বলেছেন, 'হয়তো তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করবে এবং তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে।' (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
আশাব্যঞ্জক এই চিত্র আমাদের একটি নতুন কর্মপন্থার নির্দেশনা দেয়। তা হলো হামলার বিপরীতে হামলা, আক্রমণের পাল্টা আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। এতে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যই কেবল খর্ব হয়। প্রত্যক্ষ আক্রমণ, আঘাত ও সমালোচনার উত্তরে প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ, শান্তিপূর্ণ আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতাই সময়ের শিক্ষা ও দাবি। শান্তি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতির সুফল এখন স্পষ্ট। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে 'আসনা'- এর উদ্যেগে একটি আন্তঃধর্ম সম্মেলন হয়েছে। তাতে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান, শিখ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অংশগ্রহণ করেছে। অংশগ্রহণকারী সবাই একমত হয়েছে যে, ইসলামের নামে সব ধরনের অপপ্রচার বন্ধ করা হোক। কেননা ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। সুতরাং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও কঠোরতার কারণে অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা করা যাবে না। শান্তিপূর্ণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক নানামুখী প্রচেষ্টার কারণে ইউরোপীয় সমাজের বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের অনেকে ইসলাম, মুসলমান ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নগ্ন আঘাতের সমালোচনা করছেন এবং তারা স্বজাতির এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন। যেমন পাদ্রী টেরি জনস কুরআনের কপি পোড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, 'এমন আক্রমণাত্মক কাজ প্রান্তিকতা বৃদ্ধি করবে এবং চরমপন্থা মাথাচাড়া দেবে। সব ধর্মের প্রতি সম্মান করা এবং যারা ঘৃণা ও শত্রুতা ছড়িয়ে দিতে চায় তাদের নিন্দাজ্ঞাপন করা উচিত।' অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা শুধু ওবামা বলেননি; বরং যারাই উদার মনে ইসলাম-সমালোচনা ও তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করেছে, তারাই সব ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলেছেন। তারা ইসলামভীতির বিরুদ্ধে সরব। ইসলামের ওপর নগ্ন হামলার আরেকটি কল্যাণকর দিক হলো এতে মুসলমানের আত্মমর্যাদা, আত্মরক্ষার চিন্তা ও দ্বিনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দৃঢ় হয়।
ভারতবর্ষের কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি অমুসলিম বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের মধ্যে পবিত্র কুরআনের তরজমা ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী গ্রন্থ বিতরণ করার পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ইসলাম তার অনুসারীদের ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও ক্ষমার শিক্ষা দেয়, অবিচারের বিপরীতে সুবিচার এবং বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে শান্তি ও শৃঙ্খলার নির্দেশ দেয়। মোটকথা পরিবর্তিত পৃথিবীতে বুদ্ধিবৃত্তিক, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সহনশীল পদ্ধতিতে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
প্রচারমাধ্যমের যথাযথ ব্যবহার
ইসলামের বাস্তবিক ছবি বিকৃতকরণে মিডিয়া ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছে। ইসলাম-দুশমন মিডিয়া এবং ইসলাম প্রশ্নে আপত্তিকারীরা বিষোদগারী কথাবার্তা এবং বয়ান দেয়ার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেন না। পশ্চিমা এবং ইউরোপের লোকদের মিডিয়া ইসলামের মূর্খ লোক এবং পথভ্রষ্ট আখ্যা দেয়। ওপরদিকে ওখানকার লোকদের ইসলাম সম্পর্কে যে ধারণা রয়েছে; তারা হয়তো সেটা সংবাদপত্রের কল্যাণে অর্জন করেছে অথবা টিভির মাধ্যমে। আর এই মাধ্যমটি ইসলামের সবচে বিকৃত চিত্র সর্বদা জনগণের সামনে পরিবেশন করে। zou gov-এর এক জরিপানুযায়ী ওখানকার শতকরা ৫৭ শতাংশ মানুষ ইসলাম সম্পর্কে টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে এবং শতকরা ৪১ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় মিডিয়াকে সংবেদনশীল এবং গুরুতর হওয়া উচিত। এবং মুসলিমদের হেকমতকে মিডিয়ায় ভালো পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে হলেও ফলাও করে প্রচার করা উচিত। এটা শুধু দেখানোর জন্যই না; বরং দাওয়াতি কাজের জন্যই এটা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
চিন্তাগত প্রস্তুতি
আমরা পশ্চিমাদের বলি না যে, আপনারা ইসলাম, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কুরআন এবং ইসলামি সভ্যতার ওপর শাস্ত্রীয় সুতার ভিত্তিতে সমালোচনা করবেন না! বরং আমাদের আকাঙ্ক্ষা তো এটাই যে, বাজারি জবানে ভিত্তিহীন আপত্তি এবং প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা থেকে বিরত থাকেন। প্রফেসার খুর্শিদ আহমদের ভাষ্য-
ইসলাম উপস্থাপনে তারা ব্যাপকভাবে কুসংস্কার, প্রান্তিকতা এবং অবৈজ্ঞানিক পন্থাবলম্বন করেছে। ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা ভ্রান্ত, অপূর্ণাঙ্গ এবং ওভারস্টেটেডেই গণ্ডিবদ্ধ। তাদের এই অধিকার আছে যে, তারা ইসলামের সমালোচনা করবে। কিন্তু সেটা অবশ্যই পছন্দনীয়, নির্ভরযোগ্য, গভীর এবং ওজনদার পন্থায়। ৮৭
কিন্তু মুসলমানদেরও জবাব দেয়ার জন্য রেওয়ায়াতি তরিকা পরিহার করে এক নতুন ভাষাভঙ্গী নিয়ে এগিয়ে আসা চাই। তাদের আপত্তিসমূহ, অপবাদ এবং ইসলামের নবি আলাইহিস সালামদের জীবনের ওপর করা আক্রমণের জবাবে কিছু প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ কোনো সমাধান নয়। আর না জযবাতি হয়ে কোনো কিছু করা। এবং রাগান্বিত হয়ে আঘাতের বদলে আঘাত করে জবাব প্রদান; ইসলামের কোনোরূপ কল্যাণই বয়ে আনবে না। বরং ইলমি এবং চৈন্তিক ভুবন চষে উত্তম তরিকায় জবাব প্রদানই কাম্য।
ইসলামের প্রোজ্জ্বল শিক্ষাকে ব্যাপক করা
ইসলামি বিশ্বের সামনে ইসলামি শিক্ষাকে ব্যাপকতা প্রদানের ধারায় কনফারেন্স, কর্মশালা (ওয়ার্কশপ), দাওয়াতি লাইন, প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, কার্যালয়, কিতাবাদি, আলাপ-আলোচনা- এছাড়াও আরও সম্ভাব্য সম্যক পন্থায় পশ্চিমা এবং ইউরোপীয় চক্রান্ত এবং খ্রিস্টানদের উন্মোচিত করা যায়। ইসলামের প্রোজ্জ্বল শিক্ষাকে এভাবে ব্যাপক করা যায় যে, প্রত্যেকেই তাদের শিক্ষা দেখে প্রভাবিত হবে।
ইসলামের শিক্ষাকে ব্যাপক করা হবে। বিশেষত; বঙ্কীয় ব্যাপারটা আদম সন্তান, ন্যায়ের বিষয়, রহমত এবং নিরাপত্তা ইত্যাদির উপর ইসলামের শিক্ষাকে ব্যাপকতা প্রদান করা হবে। তেমনিভাবে সুদ, জুয়া, বঙ্কীয় গড়িমা, মালের লোভ ইত্যাদির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে; যাতে করে ইসলামোফোবিয়ার প্রকৃত পয়েন্টে করাঘাত করা যায়। এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য পথ সহজ হয়ে যায়। ৮৮ এই ধারায় পারস্পরিক এবং মতাদর্শিক মতানৈক্য ও শাখাগত মাসলাকে একপাশে রেখে উম্মতের বৃহৎ ফায়দার স্বার্থে নানা পলিসি এবং লক্ষ্য স্থির করা যেতে পারে।
ইসলামের অপর নামই হলো- শান্তি ও নিরাপত্তা। এবং ইসলাম ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইসলামের ভিত্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হলো; নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং ইনসাফ। বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী জুলুম, কঠোরতা, ফ্যাসিবাদ, বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, খুন, লুটপাট ইত্যাদি ব্যাপকমাত্রায় হচ্ছে। এই ধারায় ইসলাম এবং ইসলামভিত্তিক শিক্ষাসমূহকে বর্তমানে ব্যাপকতা প্রদান করার এটাই মোক্ষম সময়। কেননা বর্তমান পৃথিবী ইসলামের নিরাপত্তা এবং বরকতের আশায় বিলাপ করছে। পশ্চিমাবিশ্ব আজো পর্যন্ত ইসলাম ও ইসলামের নবি এবং ইসলাম-শিক্ষায় কেবল ভুল বুঝেরই শিকার নয়; বরং অজ্ঞও! একটি জরিপানুযায়ী পশ্চিমে শতকরা ৬০ শাতংশ মানুষের বক্তব্য এমন যে, আমরা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ! সেখানে মাত্র শতকরা ১৭ শতাংশ লোকের বক্তব্য আমরা ইসলামের মৌলিক ধারণা রাখি না। ৮৯
ইসলামোফোবিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামকে সামনাসামনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুঁড়ে দেয়াই শুধু মুসলিমদের প্রয়োজনীয়তা নয়; বরং ইসলামকে মানবিক পৃথিবীর কাছে পৌঁছানোর কাজে কষ্ট-মুজাহাদা করা আরও আধিক প্রয়োজন। যাতে করে পৃথিবী ইসলামের সঠিক শিক্ষা সম্পর্কে জানতে পারে। এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রোপাগান্ডার এই চক্রান্ত খোদ পশ্চিমেই ইসলাম-পরিচিতির মাধ্যম বনে যায়।
বিপ্লবের পথ সুন্দর হোক
আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদিকে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ শ্রেষ্ঠের ভিত্তি তাদের ওপর অর্পিত সুমহান দায়িত্ব। তা হলো, আল্লাহ কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মাদিকে যে পরম সত্যের সন্ধান দিয়েছেন তা তারা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করবে এবং অন্যের কাছেও সে বাণী পৌঁছে দেবে। শুধু পৌঁছে দিয়েই শেষ করবে না; বরং সে কথা যেন অন্যদের বোধগম্য হয় এবং তারা তা গ্রহণ করে সে চিন্তাও মুসলিমরা করবে। তারা ইসলামের বাণী চাপিয়ে না দিয়ে তা এমনভাবে উপস্থাপন করে যা অন্যদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ইসলামের ওপর আরওপিত সব প্রশ্ন, সব সংশয় ও সব অস্পষ্টতা দূর করার দায়িত্বও তারা পালন করবে।
কাউকে সত্য মানতে বাধ্য করা মুসলমানের দায়িত্ব নয়। আল্লাহর প্রেরিত বার্তা এমন অর্থপূর্ণ ও কল্যাণের ধারক যে মানুষ সহজেই তা গ্রহণ করে নেয়। যদি না সে অসুস্থ মানসিকতা, ইসলামবিদ্বেষ ও গোড়ামি লালন করে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মুসলিম জাতির প্রতি যে মন্দ ধারণা ও ইসলাম বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে তার পেছনে মুসলিম জাতির ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলাও দায়ী। প্রমাণ হলো, পৃথিবীর যেখানেই ইসলামের শ্বাসত বাণী যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে প্রচার করা হচ্ছে সেখান থেকেই সুসংবাদ আসছে, মানুষ তা গ্রহণ করছে। ইউরোপ-আমেরিকায়ও যারা দ্বিনের প্রচার ভালোবাসা ও সহমর্মিতার সঙ্গে করছে, যাদের কাজে সততা ও নিষ্ঠা রয়েছে তারা সুফলও পাচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার আগে আমেরিকায় মুসলিম বিদ্বেষ প্রবল ছিল না। তখন প্রতিবছর ২০ হাজারের মতো মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিত। ১১ সেপ্টেম্বরের পর ঘটনার দায় মুসলিমদের ওপর চাপানো হয়- যদিও আমেরিকার মতো একটি উন্নত রাষ্ট্রে হামলা করার মতো যোগ্যতা ও উপকরণ মুসলিমদের হাতে থাকার কথা নয় এবং মার্কিন মুলুকে ইসলাম বিদ্বেষ চরম রূপ ধারণ করে। এতে একদিকে মুসলিমরা চরম ক্ষতি ও হুমকির মুখে পড়ে, অন্যদিকে ইসলামের প্রতি মানুষের কৌতুহল জন্মে, তারা ইসলাম জানতে আরম্ভ করে, পুরো পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম জাতি ও তাদের ধর্মাদর্শ নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান ও গবেষণা শুরু হয়। অনুসন্ধানের পর তারা ইসলামের স্বরূপ জানতে পারে এবং তাদের বিদ্বেষ ভালোবাসায় পরিণত হয়। এখন (২০০৩) ২০ হাজারের পরিবর্তে প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ ইসলামের ছায়া গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এটাই পরম সত্যের শক্তি। যা ঘৃণা-বিদ্বেষকে ভালোবাসায় পরিণত করে।
মুসলিম জাতি যদি নিজের জীবনাচারকে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শের আলোকে গড়ে তোলে এবং দাওয়াতি দায়িত্ব পালন করে, তবে তারা পৃথিবীর চেহারা বদলে দিতে পারে। এতে তাদের ওপর আপতিত বিপদ ও সংকটের পরিণাম কমবে, আল্লাহর সুরক্ষা-নিরাপত্তা ও সাফল্য লাভ করবে। বিভিন্ন দেশে মুসলিমরা যে রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে তার পরিমাণও কমে আসবে। কেননা তখন ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি জাতিগত বিদ্বেষ কমে যাবে এবং শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো অবশিষ্ট থাকবে। আর মুসলিমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটগুলো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই মোকাবিলা করতে পারবে। মুসলিম জাতির ভেতর যদি আল্লাহর নিঃশর্ত আনুগত্য, সত্য দ্বিনের সেবক হওয়ার অনুপ্রেরণা বিদ্যমান থাকে এবং তারা সুস্থ চিন্তাধারা, সহমর্মিতা ও মানুষের প্রতি কল্যাণকামিতা লালন করে তবে সমাজ থেকে মুসলিম বিদ্বেষও বিদায় নেবে। তখন পার্থিব লাভ-ক্ষতির হিসাবই কেবল অবশিষ্ট থাকবে আর তা সমাধান করা কঠিন কোনো বিষয় নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার পেছনে রয়েছে তাদের সুদূর প্রসারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। তাদের অপকর্ম আড়াল করতে মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়া নানামুখী অপপ্রচার চালিয়েছে। মুসলমানের উচিৎ তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা বিচার করা। মধ্যপ্রাচ্যের শাসকরা- তারা সামরিক বাহিনী থেকে আসুক বা রাজনৈতিক দল থেকে আসুক সবাই পশ্চিমা রাজনীতিক ও দার্শনিকদের প্রতি অতি আস্থাশীল। তারা ইসলামকে কেবল নিজের পৈতৃক ধর্ম মনে করে এবং জনগণের মনতুষ্টির জন্য ইসলামের আনুগত্যের ঘোষণা দেয়। এজন্য পশ্চিমা রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা সহজে মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের নিজেদের ক্রীড়নকে পরিণত করতে পারে, তাদের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এর চেয়েও বড় কথা হলো প্রাচ্যের শাসকরা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক জালে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত কথাও বলতে পারে না। আর যদি কেউ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সাহসী হয়ে ওঠে তবুও শক্তিমত্তা, প্রযুক্তি ও অস্ত্রের অভাবে বেশি দূর এগুতে পারে না।
মুসলিম জাতির সুদিন ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সত্যের বাহক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা, আল্লাহ প্রদত্ত সম্মান রক্ষায় মনোযোগী হওয়া, সময়োপযোগী শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও উপকরণ গ্রহণ করা। মুসলিমরা স্বীকার করুক আর নাই করুক তারা পশ্চিমা রাজনীতিক ও বিজ্ঞানীদের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাস অনেক বেশি, তাদের সঙ্গে যোগাযোগও বেশি। ফলে মুসলিম সমাজে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণের সাহস খুব কম লোকেরই আছে। অবশ্য মুসলিম সমাজে রাতারাতি পরিবর্তনেরও আশা করা যায় না। এখন প্রত্যেক মুসলমানের প্রথম দায়িত্ব ব্যক্তিগত জীবনে দ্বীন পালনে যত্নেশীল হওয়া, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দ্বীনি দায়িত্ব পালন করা, ইসলামবিরোধীদের ধোঁকা ও প্রতারণার ব্যাপারে সচেতন থাকা। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন। ১০
টিকাঃ
[৮৭] প্রফেসার খুরশিদ আহমাদ; ইসলাম অ্যান্ড দ্যা ওয়েস্ট, ইসলামিক পাবলিকেশনস, লাহোর, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা- ৬২
[৮৮) আব্দুর রশীদ আগওয়ান, ইসলামোফোবিয়া, রুজহানাত, আছরাত, তাদারুক, আকলেতু-কে হুবাক আওর ইসলামোফোবিয়া, ইফা পাবলিকেশনস, দিল্লী ২০১১, পৃষ্ঠা-৫১৭
[১০] সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে হাসানি নদভি, তামিরে হায়াত