📄 সাঈদের দৃষ্টিভঙ্গি: মার্কিন সাম্রাজ্যে আরব ও মুসলিমদের দৃশ্যায়ন
এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রতিজন মুসলিম অথবা আরব নাগরিক নিজেকে শত্রু শিবিরের সদস্য জ্ঞান করে। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, দেশটিতে মুসলমানরা পরিকল্পিত বিদ্বেষের শিকার হচ্ছে। তাদের সঙ্গে শত্রুতামূলক আচরণ করা হচ্ছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হচ্ছে, 'ইসলাম ও মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু নয়'; তবে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথাই বলছে। শত শত আরব তরুণকে আটক করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। মুসলিম অথবা আরবীয় নাম হলে রক্ষা নেই। এমন নামের মানুষ বিমানবন্দরে উপস্থিত হলেই তার প্রতি সন্দিগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয় এবং তাকে তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে জামা-কাপড় খুলেও পরীক্ষা করা হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। আরবদের প্রতি বৈষম্যের এমন ভুরি ভুরি ঘটনা রয়েছে। কেউ আরবিতে কথা বললে অথবা আরবিতে লেখা কোন কাগজপত্র পাঠ করলে তার প্রতি কটাক্ষ করা হয়।
প্রচার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ, ইসলাম ও আরবদের ব্যাপারে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার জন্য বহু বিশেষজ্ঞ ও 'ভাষ্যকার নিয়োগ করা হয়েছে। এদের উচ্চারিত প্রতিটি ছত্রই ইসলামের প্রতি বৈরিতায় পরিপূর্ণ। শুধু তাই নয়, তারা আরবের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দিচ্ছে। প্রচার মাধ্যম আফগানিস্তানে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এবং ইরাকে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারেও তারা একই ভূমিকা পালন করছে। সোমালিয়া ও ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশে মার্কিন বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইরাকের বিরুদ্ধে সমরসজ্জা গড়ে তোলা হচ্ছে। ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনী মুসলমানদের হত্যা করছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি রয়েছে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড ও অন্যরা যা বলছেন আমেরিকা ঠিক তা নয়। প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার উপদেষ্টারা বলছেন যে, তারা একটি 'ন্যায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন এবং তারা এ যুদ্ধকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াই হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
আমাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে যে, আমাদের অবশ্যই এ যুদ্ধের যৌক্তিকতা মেনে নিতে হবে এবং এ ব্যাপারে আমাদের কোন ভূমিকা থাকতে পারে না। আরও বলা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার অনুমতি পাওয়ায় আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে ভিন্ন। আমেরিকা বরাবরই একটি অভিবাসীদের দেশ। এদেশে ঈশ্বর নয়, জনগণই আইন তৈরী করে। আমেরিকায় আজকে যারা বসবাস করছে তাদের প্রায় সবাই অভিবাসী এমনকি প্রেসিডেন্ট বুশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও। এ দেশের সত্যিকার বাসিন্দা হচ্ছে রেড ইভিয়ানরা। যুক্তরাষ্ট্রে একেকজন ব্যক্তি অথবা গােষ্ঠীর জন্য সংবিধান আলাদা নয়। কিন্তু আমেরিকানরা তাই মনে করছে। মার্কিন সন্ত্রাসীরা অন্যের বাক-স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। মিঃ বুশ আমেরিকায় ধর্মের গুরুত্বের উপর জোর দিচ্ছেন। তিনি চীন এবং অন্যান্য দেশে গিয়ে ঈশ্বরের মাহাত্ম প্রচার করছেন। কিন্তু তিনি তার মতামত নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন না অথবা তার সুরে কথা বলতে বাধ্য করতে পারেন না। মার্কিন সংবিধান রাষ্ট্র ও সংবিধানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনেছে। গত নভেম্বরে প্যাট্রিয়ট এ্যাক্ট নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনে প্রথম, চতুর্থ, পঞ্চম ও অষ্টম সংশধোনীর পুরো ধারা হয় বাদ দেয়া হয়েছে নয়তো উপেক্ষা করা হয়েছে। নতুন আইনে ঘটনার শিকার ব্যক্তি আইনজীবী নিয়োগ সমস্যায় পড়বে এবং সে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। এ আইনে গোপনে বিচার, আড়িপাতা ও অনির্দিষ্টকাল আটক রাখার জন্য সরকারকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এটি মার্কিন সরকারকে 'যুদ্ধবন্দীদের অস্ত্রহরণ' তাদেরকে অনির্দিষ্টকাল আটক এবং জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। এ আইন পাস হওয়ার জন্যই গুয়ানতানামো ঘাঁটিতে বিদেশি বন্দীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা এবং তাদেরকে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী প্রাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরদানকারী একটি দেশ।
স্বাক্ষরদানকারী কোন দেশ তাই এই আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করতে পারে না। তবু এদেশে তাই ঘটেছে। এ ব্যাপারে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবাদ উথিত হচ্ছে। ওহাইও'র ডেমোক্রেট দলীয় কংগ্রেস সদস্য ডেনিস কুচিনিচ গত ১৭ ফেব্রুয়ারী এক জ্বালাময়ী ভাষণে বলেছেন যে, সীমা-পরিসীমা ও যুক্তি ছাড়া সারা পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ (অপারেশন এনডিউরি ফ্রীডম) ঘোষণার, প্রতিবছর ৪০ হাজার কোটি ডলারের বেশী সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং বিল অব রাইটস বাতিল করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট অথবা সরকারের নেই। এ ধরনের ক্ষমতা তাদেরকে কেউ দেয়নি। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে আরও বলেন, আমরা চাইনি যে, ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলায় নিহত নিরীহ মানুষের রক্তের বদলা নেয়ার জন্য আফগানিস্তানের নিরীহ গ্রামবাসীদের হত্যা করা হোক। কংগ্রেসম্যান কুচিনিচই মার্কিন সরকারের আগ্রাসী নীতির প্রতিবাদকারী সর্বোচ্চ মার্কিন কর্মকর্তা। আমার মতে, তার বক্তব্যে আমেরিকার নীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটেছে। এজন্য আমি চাই যে, তার ভাষণটি আরবিতে পুরোপুরি প্রকাশিত হোক, যাতে আরবিভাষী মানুষ জানতে পারে যে, বুশ ও ডিক চেনিই যুক্তরাষ্ট্রের সবকিছু নয়।
বর্তমান মার্কিন নীতির সমালোচনা চলছে এবং নানা কথা হচ্ছে। কিন্তু সরকার এগুলো চাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নজিরবিহীন ক্ষমতাকে কিভাবে মোকাবেলা করা যায় সেটাই আজকের বিশ্বের সমস্যা।
বুশের আশপাশে যে ক'জন মুষ্টিমেয় লোক রয়েছে তারা বিশ্বাস করে যে, মার্কিন স্বার্থ ক্ষুন্ন হলে ওয়াশিংটন যা খুশী তাই করতে পারে। এ ব্যাপারে অন্যান্য দেশের সমর্থন অথবা তাদের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষারও কোন প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এ মনােভাব এখন আর গোপন নেই। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে মার্কিন নীতিতে ইসরায়েলীকরণ ঘটেছে। জর্জ বুশের মনয়োগ কেবলমাত্র সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে। অন্য কিছু নিয়ে ভাবার তার সময় অথবা প্রয়োজন কোনটাই নেই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন বুঝতে পেরেছেন যে, ফিলিস্তিনীদের হত্যার এটাই সুযোগ, তাই তিনি ফিলিস্তিনী জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
কথা হচ্ছে যে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র নয়, আবার যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল নয়। কিন্তু এ বাস্তবতা সত্ত্বেও ইসরায়েল প্রেসিডেন্ট বুশের সমর্থন পাচ্ছে। ইসরাইল একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যার ভৌগোলিক অবস্থান হচ্ছে মুসলিম আরব রাষ্ট্রগুলোর ভেতরে। তাকে টিকে থাকতে হবে ঐ এলাকার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে, মার্কিন সমর্থন অথবা আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে নয়। এই সত্তা অধিকাংশ ইসরায়েলিও অনুধাবন করতে পারছে। তাই তারা শ্যারনের আগ্রাসী নীতিকে আত্মঘাতী বলে আখ্যায়িত করছে। ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে আগ্রাসী অভিযানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের রিজার্ভ সৈন্যরাও প্রতিবাদ করছে। রিজার্ভ সৈন্যদের সঙ্গে কোন কোন ইসরায়েলিও কণ্ঠ মিলাচ্ছে। এদের সংখ্যা দিন দিনই ভারি হয়ে উঠছে। খোদ ইসরায়েলিীদের মধ্যে পরিবর্তনের সূচনা হলেও মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আসছে না। যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক কাল্পনিক ভীতির পেছনে ছুটছে এবং নিজেকে সংঘর্ষে জড়িয়ে ফেলছে। প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার পরিষদবর্গও মনে করছেন যে, তারা সঠিক পথে রয়েছেন। বিগত সপ্তাহগুলোর পত্র-পত্রিকা যারা পাঠ করেছেন তারা একথা বুঝতে পেরেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জনগণ মার্কিন নীতির অস্পষ্টতায় বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে যে, যে কোন দেশকে টার্গেট করার অধিকার তাদের রয়েছে। এ ধরনের মনোভাব থেকে সে বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন শত্রু সৃষ্টি করছে এবং এসব শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছে। লক্ষ্য অর্জন এবং যুদ্ধের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই সে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। দুই সন্ত্রাসবাদ দমন বলতে যুক্তরাষ্ট্র কি বুঝাতে চায়? সে তার বিরুদ্ধাচরণকারী প্রত্যেককে উৎখাত অথবা তার ইচ্ছামত বিশ্বের মানচিত্র বদলাতে পারে না। আমরা যাদেরকে সুবোধ ব্যক্তি অথবা সাদ্দাম হোসেনের মত যাদেরকে ‘দুর্বত্ত’ বলে আখ্যায়িত করি, তাদের কাউকে সে উৎখাত করতে পারে না। ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে দেখতে চান এবং এ লক্ষ্যে তারা একটি দূরবর্তী টার্গেট হিসেবে বিশ্বকে বেছে নিয়েছেন। তাদের চিন্তাধারা হচ্ছে বাস্তবতাবর্জিত। কারণ, তারা বসে থাকেন পেন্টাগনের ডেস্কে। তাদের কাছ থেকে যে কোন দুবৃত্ত রাষ্ট্রের দূরত্ব অন্তত ১০ হাজার মাইল। তবু এসব রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্র হুমকি হিসেবে গণ্য করছে। হাজার হাজার জঙ্গী বিমান, ১৯টি বিমানবাহী জাহাজ, কয়েক ডজন সাবমেরিন, প্রায় ১৫ লাখ সৈন্য ও হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বুশ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কনভোলিসা রাইস স্বস্তি পাচ্ছে না।
ইতোমধ্যেই প্রতিরক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে, তারপরেও প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বুশ দেশকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এদেশের প্রায় সকল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক তাকেই সমর্থন করছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন। তারা এটা বুঝতে চান না যে, যে বিশ্বে আমরা বসবাস করছি সে বিশ্ব গতিশীল এবং বিশ্বকে বুঝতে হলে বিশ্ব রাজনীতিকে বুঝতে হবে। মার্কিনীদের মধ্যে এ এমন একটা ধারণা কাজ করে যে, আমেরিকা বরাবরই ন্যায়ের পক্ষে এবং তার শত্রুরা অন্যায়ের পক্ষে। টমাস ফ্রিডম্যান অক্লান্তভাবে বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন এবং এসব বক্তৃতা বিবৃতিতে তিনি আরবদেরকে আত্মসমালোচনাকারী হওয়ার জন্য বারবার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু তার মত অন্য মার্কিনীদেরও যে আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে তা তিনি মানতে নারাজ।
১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার জন্য তিনি চোখের পানি ফেলছেন এবং এ হামলায় নিহতদের জন্য রোদন করছেন। তার মনোভাব এরকম যে, যুক্তরাষ্ট্রেই কেবল এ ধরনের ভয়ংকর হামলা হয়েছে এবং মার্কিনীরাই কেবল সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে ১১ সেপ্টেম্বরের চেয়েও ভয়াবহ ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে এবং হচ্ছে তাদের প্রতি তার কোন অনুভূতি নেই এবং অন্যান্য দেশে সংঘটিত ঘটনাগুলো তার বিচারে কোন ঘটনাই নয়। ইসরায়েলি বুদ্ধিজীবীদের অবস্থাও মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের অনুরূপ। ইসরায়েলি বুদ্ধিজীবীরা শুধু নিজেদের লোকজনের মৃত্যুই দেখতে পায়। পায়; কিন্তুইসরায়েলি ট্যাংক, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতি মুহূর্তে যে অগণিত ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছে সেদিকে তাদের চোখ যায় না। এজন্য তাদের কোন দুঃখবােধ নেই। জুলুমের প্রতি সহনশীল হওয়া অথবা দেখেও না দেখার ভান করা আজকের বিশ্বে একটি স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে চক্রান্তের অংশীদার হওয়া অথবা ফাদে পা দেয়া শোভনীয় নয়। এ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাদেরকেই উদ্যেগী হতে হবে। সকল মানুষের দুর্ভোগ সমান, একথা মুখে উচ্চারণ করে পরবর্তী মুহূর্তে শুধু নিজেদের লোকজনের জন্য বিলাপ করাই যথেষ্ট নয়। বিরোধে জড়িত শক্তিশালী পক্ষ কী করছে তা দেখতে হবে এবং শক্তিশালী পক্ষের কার্যকলাপ সমর্থন করার পরিবর্তে এগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে হবে। বৃহৎ শক্তিকে সমালােচনা করা এবং এ শক্তির বিরোধিতা করাই বুদ্ধিজীবীদের কাছে বিবেকের দাবি। বুদ্ধিজীবীরা বিবেকের এ দাবি পূরণ করছেন না বলেই ভিকটিমকে উল্টো দোষারোপ করা হচ্ছে এবং অত্যাচারীরা উৎসাহিত হচ্ছে।
৬০ জন মার্কিন বুদ্ধিজীবী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াইকে সমর্থন দিয়ে একটি বিবৃতি দেন। এ বিবৃতি ফ্রান্স, ইতালী, জার্মানী ও ইউরােপের বড় বড় কাগজে প্রকাশিত হলেও ইন্টারনেট ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কোন পত্রিকায় ছাপা হয়নি। এক সপ্তাহ আগে এক ইউরোপীয় বন্ধু এ বিবৃতি সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বিস্মিত হই। এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর দেন স্যামুয়েল হান্টিংটন, ফ্রান্সিস ফুকয়ামা, ড্যানিয়েল প্যাট্রিক ময়নিহাস প্রমুখ।
রক্ষণশীল নারীবাদী বুদ্ধিজীবী জীন থেকি এসটেইন বিবৃতিটি তৈরী করেছিলেন। অধ্যাপক মিশেল ওয়ালজারের উৎসাহে তিনি এ বিবৃতি তৈরি করেন। অধ্যাপক ওয়ালজার ইসরায়েলি লবির লোক হিসেবে পরিচিত। এ লোকের দৃষ্টিতে ইসরায়েলের কোন ভুল ধরা পড়ে না। বরং ইসরায়েল যা কিছু করে সবকিছুই তার কাছে ন্যায় ও যুক্তিসঙ্গত বলে বিবেচিত। অধ্যাপক ওয়ালজার একজন মেকি সমাজতন্ত্রী। সমাজতন্ত্রীর খোলস গায়ে দিয়ে তিনি ইসরায়েলের পক্ষে ওকালতি করেন। তবে এ বিবৃতি তৈরীতে উৎসাহ যোগানোর সময় তিনি তার সমাজতন্ত্রী খোলস খুলে ফেলেন। তিনি তার বর্তমান ভূমিকার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমেরিকাকে সন্ত্রাস ও শয়তানের বিরুদ্ধে একটি আদর্শ যোদ্ধা হিসেবে আখ্যা দেন। এবং বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হচ্ছে এমন দু'টি দেশ যাদের লক্ষ্য হচ্ছে অভিন্ন। অধ্যাপক ওয়ালজারের উক্তি সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। ইসরায়েল হচ্ছে এমন এক রাষ্ট্র যেখানে ইহুদি ছাড়া আর কেউ নাগরিক নয়। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সকল নাগরিকের দেশ।
ওয়ালিজারের একথা বলার সাহস কখনোহবে না যে, তিনি ইসরায়েলকে সমর্থন করতে গিয়ে বরং ইসরায়েলের ইহুদীবাদি নীতিকেই সমর্থন দিচ্ছেন। ঘটনাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রকে শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হলে তিনি নিশ্চিতভাবে বিরোধিতা করবেন। বিবৃতির পেছনে অধ্যাপক ওয়ালজারের ভূমিকা যেমন গোপন রাখা হয়েছে তেমনি মুসলমানদের ধোকা দেয়ার ইচ্ছাও গোপন রাখা হয়েছে।
বিবৃতিতে মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, ইসলাম ও مسلمانوں বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ লড়াই নয়, বরং যারা সকল ধরনের ন্যায়-নীতির বিরোধিতা করে তাদের বিরুদ্ধে এ লড়াই। সকল মানুষ সমান। ধর্মের নামে নরহত্যা পাপ, বিবেকের স্বাধীনতা সবার উপরে, মানুষই হচ্ছে সমাজের মূল শক্তি এবং মানুষের মৌলিক বিকাশের শর্তগুলো লালন এবং রক্ষা করাই হচ্ছে সরকারের কাজ।
বিবৃতিতে এসব নীতিকথা উল্লেখ করে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত। এজন্য কোথাও কোথাও ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটছে। ধর্ম, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা সম্পর্কে নীতিবাক্য আউড়ে বিবৃতির শেষাংশে একটি ফিরিস্তি দেয়া হয়। এ ফিরিস্তিতে ১৯৮৩ সালে বৈরুতে বোমা বিস্ফোরনে মার্কিন সৈন্যদের হতাহত হওয়ার ঘটনাসহ কোন আরব ও মুসলিম দেশে এবং অন্যান্য ঘটনায় কতজন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়। তবে ইরাকে মার্কিন মদদে জাতিসংঘ অবরোধে কতজন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ফিলিস্তিনে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরী ইসরায়েলি বিমান হামলায় এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অপারেশনে নিহতদের সম্পর্কে বিবৃতিতে একটি লাইনও নেই।৮২
টিকাঃ
[৮১] ইনকিলাব, ২৫ মে ২, ভাষান্তর- শাহাদাত হোসাইন খান
[৮২] ইনকিলাব, ২৫ মে ২, ভাষান্তর- শাহাদাত হোসাইন খান
📄 ইসলামোফোবিয়ার চ্যালেঞ্জ বনাম মুসলিমবিশ্বের করণীয়
(হে মুসলিমগণ!) তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও জীবনের ব্যাপারে (আরও) পরীক্ষা করা হবে এবং তোমরা 'আহলে কিতাব' ও 'মুশরিক' উভয় সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অনেক পীড়াদায়ক কথা শুনবে। তোমরা যদি সবর ও তাকওয়া অবলম্বন কর তবে নিশ্চয়ই এটা অতি বড় হিম্মতের কাজ (যা তোমাদের অবলম্বন করতেই হবে)। ৮৩
আমেরিকান ও পশ্চিমাদের অন্তরে ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, আমেরিকার জন্য তা বিপত্তিকর আর মুসলমানদের আমেরিকার সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রচার-প্রচারণায় এসব চিত্রিত করে ইসলাম ও مسلمانوں সম্পর্কে জনমনে ভীতির সঞ্চার করাই ইসলামোফোবিয়ার অন্তরালের তত্ত্ব। আমেরিকার হাসপাতালগুলোতে কি কোনো মুসলমান চিকিৎসক নেই? কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি বিদ্যমান যেখানে মুসলমান অধ্যাপক পাঠদান করেন না? মুসলমান প্রকৌশলী ব্যতীত কোনো স্বয়ংক্রিয় শিল্পকারখানা কি চলমান? তালিকা তো পাওয়াই যায়। হাসপাতালে আমেরিকান অমুসলিম সহকর্মীরা মুসলিম সহকর্মীর হাতে তাদের জীবন ন্যস্ত করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ন্যস্ত করে বাচ্চাদের মেধা-মনন গঠনের দায়িত্ব, তাদের সম্পদ ও যন্ত্রপাতি ন্যস্ত করে স্বয়ংক্রিয় শিল্পকারখানাগুলোতে। মুসলমানরা কি কোনো জীবন ধ্বংস করেছিল বা শিল্পাঙ্গনে কি করেছিল কোনো নাশকতা কিংবা তাদের শিক্ষানবিশদের মনন কি করেছিল কলুষিত!
এটি হালের কোনো অনুযোগ নয়; বরং প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এক তুরুপের তাস। নুহ আ.-এর সময়কাল থেকে বিশ্বনবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমসাময়িকরা তাদের বিরুদ্ধে সমাজে বিষবাষ্প ছড়ানোর নানা অভিযোগ এনেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি; বরং তাদের দমনে গ্রহণ করেছে নানা ষড়যন্ত্র আর সুদৃঢ় পদক্ষেপ। এমনকি তাদের অনেকে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়ে পান করে শাহাদাতের অমীয় সুধা। প্রেক্ষাপট তো বলা হলো।
এবার আসুন আমেরিকান সহকর্মীদের হৃদয়ে ইসলামের প্রতি ইসলামোফোবিয়ার বীজ যারা ছড়িয়ে চলছে তাদের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? এ বিষয়ে শরিয়তে ঐশী ও নববি কোন আলোকচ্ছটা আছে কি না- সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক!
উত্তর প্রদানের পূর্বে এটা জানা আবশ্যক যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত সমাধানই শ্রেষ্ঠ সমাধান। যা সর্বজনীন নির্দেশনা এবং মানবজীবনের সকল দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। সূরা আলে ইমরানের ১৮৬ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইসলামোফোবিয়ার সাথে আচরণের নমুনা তুলে ধরেছেন। আয়াতে সুষ্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে, মুসলিম জাতি পরীক্ষিত হবে সম্পদ ও জীবনের ক্ষেত্রে এবং তাদের কর্ণকুহর জর্জরিত হবে কতিপয় অমুসলিমদের কর্কশ বাক্যবাণে। আর সাথে প্রদত্ত হয়েছে তা মোকাবিলার স্বরূপ।
নির্দেশনার বিবরণ
আয়াত অনুযায়ী নিঃসন্দেহে আমরা বর্তমান মুসলিম, পূর্ববর্তী মুসলিম ও অনাগত মুসলিম জাতি কতিপয় অমুসলির দ্বারা মৌখিকভাবে নিগৃহীত হবে। এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় আমাদের দুটি বিষয় আমলে নিতে হবে।
১. তাসবিরু (তোমরা ধৈর্য ধারণ কর)
২. তাত্তাকু (তোমরা খোদাভীতি অর্জন কর)
ধৈর্য ধারণ করা, নিষ্ক্রিয়তা নির্দেশ করে না। বরং তা বুঝায় সংবেদনশীল ও উত্তেজিত না হয়ে বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা-হেকমতের সাথে ঐ অভিযোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। আর 'খোদা ভীতি অর্জন করা'র অর্থ কেউ যদি ধরে নেয় যে, আল্লাহ তায়ালার ভয়ে তার নির্দেশাবলি মান্য করে চলা অর্থাৎ সবর তথা ধৈর্য ধারণ করা তাহলেও আমি দ্বিমত হবো না। তবে এ ক্ষেত্রে আমার নিকট 'খোদাভীতি অর্জন করা' বলতে ইসলামোফোবিয়া ছড়ানোর দ্বারা এবং আমাদের অমুসলিম সহকর্মীদের তা শিক্ষা লাভের দ্বারা যেসব অনিষ্ট আমাদের জেঁকে ধরতে পারে তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা।
১. আপনার সম্পত্তি: আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন যে আমরা সম্পদের ব্যাপারে পরীক্ষিত হবো। ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় সম্পদ ব্যয় ফি সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় ব্যয় বলে গণ্য হবে।
২. ইসলামোফোবিয়া নিরসন কল্পে শারীরিকভাবে কোনো কার্যকলাপে অংশগ্রহণ, এটাও উল্লিখিত আয়াতের অংশ (ওয়া ফি আনফুসিকুম- আর তোমাদের জীবনও পরীক্ষিত হবে)
৩. নাগরিক অধিকারমূলক সংগঠন আরও বিভিন্ন সংস্থায় স্থানীয় বা জাতীয়ভাবে আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব থাকে। সাংবিধানিক অধিকারের ওপর ভিত্তি করে বৈষম্য দূর করতে আমাদের এ বন্ধুত্বকে কাজে লাগাতে হবে।
কার্যকর সাংবিধানিক পদ্ধতিতে বুদ্ধিমত্তার সাথে ইসলামোফোবিয়ার মোকাবিলা করলে ইনশাআল্লাহ নিশ্চিতভাবে আমরা আনন্দদায়ক ফলাফল পাবো। প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী চমকপ্রদ সব উপমায় ঠাঁসা। মক্কায় কী পরিমাণ লোককে তার কথা শোনা, তার নিকট গমন করা, এমনকি তার সাথে কথা বলার জন্য হুমকি দেয়া হয়েছে? কত আরব যে নবিজীকে হত্যা করার প্রয়াস চালিয়েছে অথচ পরবর্তীতে তারা মুসলমান হয়েছে।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যারা মিথ্যাচার করে বেড়ায় তাদের নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে। আর তারা সর্বদা مسلمانوں ফাঁদে ফেলার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। আমাদের বিচক্ষণতার সাথে সব অনিষ্টকর ফাঁদ থেকে বাঁচতে হবে।
ইসলামোফোবিয়া-ঘৃণার বীজ বপনকারী এবং কুরআন মাজিদ অগ্নিদাহকারীদের জন্য আমাদের দোয়া থাকবে। তাদের বংশধরদের মধ্যে শুধু ইসলামের সমর্থকই নয় রবং ইসলামের ঝাণ্ডাবাহীও জন্মগ্রহণ করুক- এই দোয়া করি সর্বদা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন যে, 'ভালো-মন্দ সমান হতে পারে না, মন্দকে উত্তমতা দিয়ে প্রতিহত করো। তুমি প্রত্যক্ষ করবে যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে-ই তোমার নিকটতম বন্ধুতে পরিণত হবে।'
এছাড়াও সমাজের প্রতিকূল পরিস্থিতি ও ইসলাম-বিরোধী মনোভাব প্রতিহত করার জন্য مسلمانوں প্রয়োজন উন্নত কৌশল প্রণয়ন। মুসলমানরা যা কিছু করুক আর বলুক না কেন, নিন্দুকেরা তাতেই নিন্দার মশলাপাতি খুঁজে নেবে- 'যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা'। বস্তুত এতো কুরআনেরই ভবিষ্যদ্বাণী। مسلمانوں সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে শয়তান সর্বদা ওঁৎ পেতে থাকবে, নিরপেক্ষদের মনে ধর্মীয় বাণী নিয়ে সন্দেহের বীজ ছড়িয়ে দিতে সর্বদা থাকবে সচেষ্ট। তাই মুসলমান হিসেবে আমাদের করা-বলার সাথে সাথে বিরোধিতা প্রতিহত করার সওদাও জুগিয়ে রাখতে হবে।
বিদ্বেষীদের প্রত্যুত্তর দেয়ার চেয়ে বরং মুসলিম সংগঠনগুলোর স্কুল, কর্মস্থল, মসজিদগুলোতে জনবল নিয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রয়াস গড়ে তোলা উচিত, যেখানে তারা ইসলাম সম্বন্ধে বিষোদগার ছড়ানো কথাগুলোর সমাধান খুঁজে ফিরবে।
মুসলমানদের সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে বেশি বেশি অংশ নিতে হবে যা আমেরিকান জনগণ টিভিতে مسلمانوں বিক্ষুব্ধ, সামান্যতেই প্রলয়কাণ্ড ঘটানোর নায়ক হিসেবে مسلمانوں চিত্রায়ণের বিকল্প রূপ জনসমক্ষে দেখতে পাবে। মানব সম্বন্ধীয় ও মানবতামুখী প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইসলামের মহৎ রূপ জনগণের সামনে তুলে ধরাই হবে হাল আমলের সর্বোত্তম বিনিয়োগ।
এছাড়াও ইসলামোফোবিয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিম্নোক্ত বিষয়কে সামনে রেখে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন-
দাওয়াতের ফরযিয়্যাত আদায়: সব নবি আলাইহিমুস সালামদের আল্লাহর দিকে আহ্বানের হুকুম দেয়া হয়েছে। শেষ নবি সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এই আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন-
"হে নবি! আমি আপনাকে সাক্ষীরূপে প্রেরণ করেছি। সুসংবাদ প্রদানকারী এবং ভীতিপ্রদর্শক হিসেবে। আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদের প্রতি দায়ী হিসেবে। এবং প্রদীপ্ত চেরাগ হিসেবে।” ৮৪
"এর পাশাপাশি উম্মাতে মুসলিমার প্রত্যেকটা সদস্যকে এই গুরুদায়িত্বের উপযুক্ত জ্ঞান করা হয়েছে। পৃথিবীর মধ্যে তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ; যাদের মানুষের হেদায়েত এবং এসলাহের জন্য মাঠে নামানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ করো, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো, এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখ।”৮৫
এই আয়াত থেকে জানা যায় যে, মুসলিম উম্মাহ সৎকাজের আদেশ প্রদান এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ প্রদানের শর্তেই শ্রেষ্ঠ উম্মত। এবং প্রত্যেকটা মুসলমানকে আল্লাহর দিকে আহ্বানের ফরযিয়্যাতকে আঞ্জাম দেয়ার জন্য দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে। এটা শুধু কিছু বিশেষ মানুষ, সংগঠন, দল এবং আলেমদের কাজ নয়; বরং উম্মতে মুসলিমার আওতাভুক্ত সকলেরই দায়িত্ব-
"আপনি তাদের পরিষ্কার বলে দিন যে, আমার পথ তো এটাই আমি আল্লাহর দিকে ডাকি। আমি নিজেও পূর্ণ আলোয় আমার পথ দেখতে পাই। এবং আমার সঙ্গীরাও। এবং আল্লাহ পবিত্র এবং মুশরিকদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।” ৮৬
বর্তমানে দাওয়াত ইলাল্লাহর ফায়দা এবং গুরুত্ব আগ থেকে বহুগুণ বেড়ে গেছে। কেননা পূর্ব-পশ্চিমে সত্যানুসন্ধানীরা সঠিক পথ নির্ণয়ে হতাশায় ভোগেন। কিন্তু তাদের দোরগোড়ায় সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়ার মতো কেউ নেই। মুসলিমরা দাওয়াত ইলাল্লাহর ফরযিয়্যাতের সাথে উদাসীনতার আচরণ করছে। এখন সময় এসেছে সমগ্র মুসলমান মিলে এই পুণ্যকর্মের আঞ্জামে মেধা-শ্রম-মন দিয়ে পুরোদমে লেগে যাবে।
টিকাঃ
[৮৩] তাফসিরে তাওযীহুল কুরআন, সূরা আলে ইমরান-১৮৬
(৮৪) সূরা আহযাব ৩৩: আয়াত ৪৫-৪৬
[৮৫] সূরা আল-ইমরান ৩: আয়াত ১১০
[৮৬] সূরা ইউসুফ ১২: আয়াত ১০৮
📄 ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলার পদ্ধতি
ইউরোপে ইসলাম, মুসলিম উম্মাহ ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে সংঘটিত অসৌজন্যমূলক ও অবমাননাকর ঘটনাবলির বিস্তারে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল অমুসলিমরা ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং ইউরোপে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ঠিক যেভাবে মুসলিমবিশ্ব থেকে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হওয়ার পর প্রাচ্য ও পশ্চিমের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক স্থাপন, ইসলাম গবেষকদের স্বীকৃতি ও পশ্চিমাদের ইসলাম গ্রহণের কারণে ইউরোপে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর অনুগ্রহ পশ্চিমা বিশ্বে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা, ইসলামি জীবনব্যবস্থা ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার পরিমাণ বেড়েছে। পশ্চিমাদের বৈরী মনোভবের কারণে পশ্চিমা সমাজের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের ভেতর ইসলামের ব্যাপারে কৌতুহল বেড়েছে। কেননা তারা এখন পশ্চিমা বিশ্বের ইসলামবিরোধিতার কারণ জানতে আগ্রহী। ফলে তারা পশ্চিমা সভ্যতার প্রতারণা ও চাতুর্য সম্পর্কে জেনে যাচ্ছে। একইসঙ্গে তাদের সামনে পশ্চিমাদের সভ্যতার জনক ও পথপ্রদর্শক এবং মানবাধিকার, মুক্তচিন্তা ও সাম্যের প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার দাবির বাস্তবতাও স্পষ্ট হচ্ছে। বিপরীতে তাদের সামনে ইসলামের স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। ধীরে ধীরে শত্রুর ঘরে ইসলামের পক্ষে আওয়াজ উঁচু হচ্ছে।
বহু নওমুসলিমের স্বীকার করেছেন তারা ইসলামি জীবনপ্রণালী দ্বারা প্রভাবিত। ইসলামি জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করে তারা সুখ, স্বস্তি ও সৌভাগ্য লাভ করেছে, ইসলাম তাদের পারস্পরিক আস্থা ও মনুষ্যত্বের প্রতি সম্মান করতে শিখিয়েছে এবং ইসলামবিরোধী প্রচার-প্রচারণার কারণে তাদের মনে যেসব সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল তা দূর হয়ে গেছে। এসব নওমুসলিমদের অনেকেই পরে ইসলামের একনিষ্ঠ প্রচারক হয়েছেন, ইসলামের সেবায় ও ইসলাম রক্ষায় নিজের জীবনোৎসর্গ করেছেন। এ ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ আসাদ ও মারিয়াম জামিলার নাম বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। যারা পশ্চিমা সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্ধকার প্রকাশ করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন রজা জারুদি, মরিস বুকাইলি, মুরাদ হফম্যান, ইউসুফ ইসলাম প্রমুখ। এসব প্রাজ্ঞ মানুষ শুধু আনুষ্ঠানিক ইসলাম গ্রহণ করেননি; বরং ইসলাম ও ইসলামি জীবন নিয়ে দীর্ঘ অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা লাভের পর পরিতৃপ্ত হয়েই তারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেদের জীবন ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেন।
এক সময় মুসলিমরাই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইসলাম রক্ষায় কাজ করতো, পরবর্তী এমন সব লোক এ দলে শামিল হয় যারা খুব কাছ থেকে পশ্চিমা সভ্যতা দেখেছেন এবং পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। যারা পশ্চিমা সমাজের নাস্তিক ও আস্তিক উভয় ধারা সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। এরপর দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে পশ্চিমা সমাজের ধ্বংসযাত্রা নিয়ে মুখ খুলেছেন, ইসলাম ও ইসলামি সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন। যা বহু মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের প্রভাবিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে।
এ বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও আন্দোলনের ফলে পুরো পৃথিবীতে ইসলামের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্র মতাদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার অপবাদ সত্ত্বেও ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা দিনদিন বাড়ছে। স্বয়ং ইউরোপে ইসলাম ও মুসলমানের ইতিহাস পাঠের আগ্রহ বেড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে জানা যায়, ইসলাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধাচারণ ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যেমন ডেনমার্কে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের পর সে দেশে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী পাঠ বেড়ে যায়। একপর্যায়ে ডাচ ভাষায় প্রকাশিত সিরাতের বইয়ের সংকট তৈরি হয় এবং বহু অমুসলিম তখন মুসলিম হয়। এমন বহু দৃষ্টান্ত এখানে দেয়া যাবে- যা প্রমাণ করে ইসলাম বিরোধিতাই সব সময় ইসলামের অগ্রযাত্রার কারণ হয়েছে।
মহান আল্লাহ যেন এদিকে ইঙ্গিত করেই বলেছেন, 'হয়তো তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করবে এবং তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে।' (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)
আশাব্যঞ্জক এই চিত্র আমাদের একটি নতুন কর্মপন্থার নির্দেশনা দেয়। তা হলো হামলার বিপরীতে হামলা, আক্রমণের পাল্টা আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। এতে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্যই কেবল খর্ব হয়। প্রত্যক্ষ আক্রমণ, আঘাত ও সমালোচনার উত্তরে প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ, শান্তিপূর্ণ আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতাই সময়ের শিক্ষা ও দাবি। শান্তি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতির সুফল এখন স্পষ্ট। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে 'আসনা'- এর উদ্যেগে একটি আন্তঃধর্ম সম্মেলন হয়েছে। তাতে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান, শিখ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অংশগ্রহণ করেছে। অংশগ্রহণকারী সবাই একমত হয়েছে যে, ইসলামের নামে সব ধরনের অপপ্রচার বন্ধ করা হোক। কেননা ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। সুতরাং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও কঠোরতার কারণে অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা করা যাবে না। শান্তিপূর্ণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক নানামুখী প্রচেষ্টার কারণে ইউরোপীয় সমাজের বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের অনেকে ইসলাম, মুসলমান ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নগ্ন আঘাতের সমালোচনা করছেন এবং তারা স্বজাতির এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন। যেমন পাদ্রী টেরি জনস কুরআনের কপি পোড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, 'এমন আক্রমণাত্মক কাজ প্রান্তিকতা বৃদ্ধি করবে এবং চরমপন্থা মাথাচাড়া দেবে। সব ধর্মের প্রতি সম্মান করা এবং যারা ঘৃণা ও শত্রুতা ছড়িয়ে দিতে চায় তাদের নিন্দাজ্ঞাপন করা উচিত।' অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা শুধু ওবামা বলেননি; বরং যারাই উদার মনে ইসলাম-সমালোচনা ও তার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করেছে, তারাই সব ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলেছেন। তারা ইসলামভীতির বিরুদ্ধে সরব। ইসলামের ওপর নগ্ন হামলার আরেকটি কল্যাণকর দিক হলো এতে মুসলমানের আত্মমর্যাদা, আত্মরক্ষার চিন্তা ও দ্বিনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দৃঢ় হয়।
ভারতবর্ষের কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি অমুসলিম বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের মধ্যে পবিত্র কুরআনের তরজমা ও মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী গ্রন্থ বিতরণ করার পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ইসলাম তার অনুসারীদের ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও ক্ষমার শিক্ষা দেয়, অবিচারের বিপরীতে সুবিচার এবং বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে শান্তি ও শৃঙ্খলার নির্দেশ দেয়। মোটকথা পরিবর্তিত পৃথিবীতে বুদ্ধিবৃত্তিক, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সহনশীল পদ্ধতিতে কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।
প্রচারমাধ্যমের যথাযথ ব্যবহার
ইসলামের বাস্তবিক ছবি বিকৃতকরণে মিডিয়া ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছে। ইসলাম-দুশমন মিডিয়া এবং ইসলাম প্রশ্নে আপত্তিকারীরা বিষোদগারী কথাবার্তা এবং বয়ান দেয়ার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করেন না। পশ্চিমা এবং ইউরোপের লোকদের মিডিয়া ইসলামের মূর্খ লোক এবং পথভ্রষ্ট আখ্যা দেয়। ওপরদিকে ওখানকার লোকদের ইসলাম সম্পর্কে যে ধারণা রয়েছে; তারা হয়তো সেটা সংবাদপত্রের কল্যাণে অর্জন করেছে অথবা টিভির মাধ্যমে। আর এই মাধ্যমটি ইসলামের সবচে বিকৃত চিত্র সর্বদা জনগণের সামনে পরিবেশন করে। zou gov-এর এক জরিপানুযায়ী ওখানকার শতকরা ৫৭ শতাংশ মানুষ ইসলাম সম্পর্কে টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে এবং শতকরা ৪১ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় মিডিয়াকে সংবেদনশীল এবং গুরুতর হওয়া উচিত। এবং মুসলিমদের হেকমতকে মিডিয়ায় ভালো পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে হলেও ফলাও করে প্রচার করা উচিত। এটা শুধু দেখানোর জন্যই না; বরং দাওয়াতি কাজের জন্যই এটা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।
চিন্তাগত প্রস্তুতি
আমরা পশ্চিমাদের বলি না যে, আপনারা ইসলাম, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কুরআন এবং ইসলামি সভ্যতার ওপর শাস্ত্রীয় সুতার ভিত্তিতে সমালোচনা করবেন না! বরং আমাদের আকাঙ্ক্ষা তো এটাই যে, বাজারি জবানে ভিত্তিহীন আপত্তি এবং প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা থেকে বিরত থাকেন। প্রফেসার খুর্শিদ আহমদের ভাষ্য-
ইসলাম উপস্থাপনে তারা ব্যাপকভাবে কুসংস্কার, প্রান্তিকতা এবং অবৈজ্ঞানিক পন্থাবলম্বন করেছে। ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা ভ্রান্ত, অপূর্ণাঙ্গ এবং ওভারস্টেটেডেই গণ্ডিবদ্ধ। তাদের এই অধিকার আছে যে, তারা ইসলামের সমালোচনা করবে। কিন্তু সেটা অবশ্যই পছন্দনীয়, নির্ভরযোগ্য, গভীর এবং ওজনদার পন্থায়। ৮৭
কিন্তু মুসলমানদেরও জবাব দেয়ার জন্য রেওয়ায়াতি তরিকা পরিহার করে এক নতুন ভাষাভঙ্গী নিয়ে এগিয়ে আসা চাই। তাদের আপত্তিসমূহ, অপবাদ এবং ইসলামের নবি আলাইহিস সালামদের জীবনের ওপর করা আক্রমণের জবাবে কিছু প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ কোনো সমাধান নয়। আর না জযবাতি হয়ে কোনো কিছু করা। এবং রাগান্বিত হয়ে আঘাতের বদলে আঘাত করে জবাব প্রদান; ইসলামের কোনোরূপ কল্যাণই বয়ে আনবে না। বরং ইলমি এবং চৈন্তিক ভুবন চষে উত্তম তরিকায় জবাব প্রদানই কাম্য।
ইসলামের প্রোজ্জ্বল শিক্ষাকে ব্যাপক করা
ইসলামি বিশ্বের সামনে ইসলামি শিক্ষাকে ব্যাপকতা প্রদানের ধারায় কনফারেন্স, কর্মশালা (ওয়ার্কশপ), দাওয়াতি লাইন, প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, কার্যালয়, কিতাবাদি, আলাপ-আলোচনা- এছাড়াও আরও সম্ভাব্য সম্যক পন্থায় পশ্চিমা এবং ইউরোপীয় চক্রান্ত এবং খ্রিস্টানদের উন্মোচিত করা যায়। ইসলামের প্রোজ্জ্বল শিক্ষাকে এভাবে ব্যাপক করা যায় যে, প্রত্যেকেই তাদের শিক্ষা দেখে প্রভাবিত হবে।
ইসলামের শিক্ষাকে ব্যাপক করা হবে। বিশেষত; বঙ্কীয় ব্যাপারটা আদম সন্তান, ন্যায়ের বিষয়, রহমত এবং নিরাপত্তা ইত্যাদির উপর ইসলামের শিক্ষাকে ব্যাপকতা প্রদান করা হবে। তেমনিভাবে সুদ, জুয়া, বঙ্কীয় গড়িমা, মালের লোভ ইত্যাদির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে; যাতে করে ইসলামোফোবিয়ার প্রকৃত পয়েন্টে করাঘাত করা যায়। এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য পথ সহজ হয়ে যায়। ৮৮ এই ধারায় পারস্পরিক এবং মতাদর্শিক মতানৈক্য ও শাখাগত মাসলাকে একপাশে রেখে উম্মতের বৃহৎ ফায়দার স্বার্থে নানা পলিসি এবং লক্ষ্য স্থির করা যেতে পারে।
ইসলামের অপর নামই হলো- শান্তি ও নিরাপত্তা। এবং ইসলাম ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইসলামের ভিত্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হলো; নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং ইনসাফ। বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী জুলুম, কঠোরতা, ফ্যাসিবাদ, বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, খুন, লুটপাট ইত্যাদি ব্যাপকমাত্রায় হচ্ছে। এই ধারায় ইসলাম এবং ইসলামভিত্তিক শিক্ষাসমূহকে বর্তমানে ব্যাপকতা প্রদান করার এটাই মোক্ষম সময়। কেননা বর্তমান পৃথিবী ইসলামের নিরাপত্তা এবং বরকতের আশায় বিলাপ করছে। পশ্চিমাবিশ্ব আজো পর্যন্ত ইসলাম ও ইসলামের নবি এবং ইসলাম-শিক্ষায় কেবল ভুল বুঝেরই শিকার নয়; বরং অজ্ঞও! একটি জরিপানুযায়ী পশ্চিমে শতকরা ৬০ শাতংশ মানুষের বক্তব্য এমন যে, আমরা ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ! সেখানে মাত্র শতকরা ১৭ শতাংশ লোকের বক্তব্য আমরা ইসলামের মৌলিক ধারণা রাখি না। ৮৯
ইসলামোফোবিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামকে সামনাসামনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছুঁড়ে দেয়াই শুধু মুসলিমদের প্রয়োজনীয়তা নয়; বরং ইসলামকে মানবিক পৃথিবীর কাছে পৌঁছানোর কাজে কষ্ট-মুজাহাদা করা আরও আধিক প্রয়োজন। যাতে করে পৃথিবী ইসলামের সঠিক শিক্ষা সম্পর্কে জানতে পারে। এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রোপাগান্ডার এই চক্রান্ত খোদ পশ্চিমেই ইসলাম-পরিচিতির মাধ্যম বনে যায়।
বিপ্লবের পথ সুন্দর হোক
আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মদিকে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ শ্রেষ্ঠের ভিত্তি তাদের ওপর অর্পিত সুমহান দায়িত্ব। তা হলো, আল্লাহ কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মাদিকে যে পরম সত্যের সন্ধান দিয়েছেন তা তারা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করবে এবং অন্যের কাছেও সে বাণী পৌঁছে দেবে। শুধু পৌঁছে দিয়েই শেষ করবে না; বরং সে কথা যেন অন্যদের বোধগম্য হয় এবং তারা তা গ্রহণ করে সে চিন্তাও মুসলিমরা করবে। তারা ইসলামের বাণী চাপিয়ে না দিয়ে তা এমনভাবে উপস্থাপন করে যা অন্যদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ইসলামের ওপর আরওপিত সব প্রশ্ন, সব সংশয় ও সব অস্পষ্টতা দূর করার দায়িত্বও তারা পালন করবে।
কাউকে সত্য মানতে বাধ্য করা মুসলমানের দায়িত্ব নয়। আল্লাহর প্রেরিত বার্তা এমন অর্থপূর্ণ ও কল্যাণের ধারক যে মানুষ সহজেই তা গ্রহণ করে নেয়। যদি না সে অসুস্থ মানসিকতা, ইসলামবিদ্বেষ ও গোড়ামি লালন করে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মুসলিম জাতির প্রতি যে মন্দ ধারণা ও ইসলাম বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে তার পেছনে মুসলিম জাতির ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলাও দায়ী। প্রমাণ হলো, পৃথিবীর যেখানেই ইসলামের শ্বাসত বাণী যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে প্রচার করা হচ্ছে সেখান থেকেই সুসংবাদ আসছে, মানুষ তা গ্রহণ করছে। ইউরোপ-আমেরিকায়ও যারা দ্বিনের প্রচার ভালোবাসা ও সহমর্মিতার সঙ্গে করছে, যাদের কাজে সততা ও নিষ্ঠা রয়েছে তারা সুফলও পাচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার আগে আমেরিকায় মুসলিম বিদ্বেষ প্রবল ছিল না। তখন প্রতিবছর ২০ হাজারের মতো মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিত। ১১ সেপ্টেম্বরের পর ঘটনার দায় মুসলিমদের ওপর চাপানো হয়- যদিও আমেরিকার মতো একটি উন্নত রাষ্ট্রে হামলা করার মতো যোগ্যতা ও উপকরণ মুসলিমদের হাতে থাকার কথা নয় এবং মার্কিন মুলুকে ইসলাম বিদ্বেষ চরম রূপ ধারণ করে। এতে একদিকে মুসলিমরা চরম ক্ষতি ও হুমকির মুখে পড়ে, অন্যদিকে ইসলামের প্রতি মানুষের কৌতুহল জন্মে, তারা ইসলাম জানতে আরম্ভ করে, পুরো পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম জাতি ও তাদের ধর্মাদর্শ নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান ও গবেষণা শুরু হয়। অনুসন্ধানের পর তারা ইসলামের স্বরূপ জানতে পারে এবং তাদের বিদ্বেষ ভালোবাসায় পরিণত হয়। এখন (২০০৩) ২০ হাজারের পরিবর্তে প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ ইসলামের ছায়া গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এটাই পরম সত্যের শক্তি। যা ঘৃণা-বিদ্বেষকে ভালোবাসায় পরিণত করে।
মুসলিম জাতি যদি নিজের জীবনাচারকে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শের আলোকে গড়ে তোলে এবং দাওয়াতি দায়িত্ব পালন করে, তবে তারা পৃথিবীর চেহারা বদলে দিতে পারে। এতে তাদের ওপর আপতিত বিপদ ও সংকটের পরিণাম কমবে, আল্লাহর সুরক্ষা-নিরাপত্তা ও সাফল্য লাভ করবে। বিভিন্ন দেশে মুসলিমরা যে রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে তার পরিমাণও কমে আসবে। কেননা তখন ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি জাতিগত বিদ্বেষ কমে যাবে এবং শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো অবশিষ্ট থাকবে। আর মুসলিমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটগুলো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই মোকাবিলা করতে পারবে। মুসলিম জাতির ভেতর যদি আল্লাহর নিঃশর্ত আনুগত্য, সত্য দ্বিনের সেবক হওয়ার অনুপ্রেরণা বিদ্যমান থাকে এবং তারা সুস্থ চিন্তাধারা, সহমর্মিতা ও মানুষের প্রতি কল্যাণকামিতা লালন করে তবে সমাজ থেকে মুসলিম বিদ্বেষও বিদায় নেবে। তখন পার্থিব লাভ-ক্ষতির হিসাবই কেবল অবশিষ্ট থাকবে আর তা সমাধান করা কঠিন কোনো বিষয় নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার পেছনে রয়েছে তাদের সুদূর প্রসারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। তাদের অপকর্ম আড়াল করতে মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়া নানামুখী অপপ্রচার চালিয়েছে। মুসলমানের উচিৎ তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা বিচার করা। মধ্যপ্রাচ্যের শাসকরা- তারা সামরিক বাহিনী থেকে আসুক বা রাজনৈতিক দল থেকে আসুক সবাই পশ্চিমা রাজনীতিক ও দার্শনিকদের প্রতি অতি আস্থাশীল। তারা ইসলামকে কেবল নিজের পৈতৃক ধর্ম মনে করে এবং জনগণের মনতুষ্টির জন্য ইসলামের আনুগত্যের ঘোষণা দেয়। এজন্য পশ্চিমা রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা সহজে মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের নিজেদের ক্রীড়নকে পরিণত করতে পারে, তাদের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এর চেয়েও বড় কথা হলো প্রাচ্যের শাসকরা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অর্থনৈতিক জালে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত কথাও বলতে পারে না। আর যদি কেউ পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সাহসী হয়ে ওঠে তবুও শক্তিমত্তা, প্রযুক্তি ও অস্ত্রের অভাবে বেশি দূর এগুতে পারে না।
মুসলিম জাতির সুদিন ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন সত্যের বাহক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা, আল্লাহ প্রদত্ত সম্মান রক্ষায় মনোযোগী হওয়া, সময়োপযোগী শিক্ষা, প্রজ্ঞা ও উপকরণ গ্রহণ করা। মুসলিমরা স্বীকার করুক আর নাই করুক তারা পশ্চিমা রাজনীতিক ও বিজ্ঞানীদের প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাস অনেক বেশি, তাদের সঙ্গে যোগাযোগও বেশি। ফলে মুসলিম সমাজে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণের সাহস খুব কম লোকেরই আছে। অবশ্য মুসলিম সমাজে রাতারাতি পরিবর্তনেরও আশা করা যায় না। এখন প্রত্যেক মুসলমানের প্রথম দায়িত্ব ব্যক্তিগত জীবনে দ্বীন পালনে যত্নেশীল হওয়া, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দ্বীনি দায়িত্ব পালন করা, ইসলামবিরোধীদের ধোঁকা ও প্রতারণার ব্যাপারে সচেতন থাকা। আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দিন। আমিন। ১০
টিকাঃ
[৮৭] প্রফেসার খুরশিদ আহমাদ; ইসলাম অ্যান্ড দ্যা ওয়েস্ট, ইসলামিক পাবলিকেশনস, লাহোর, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা- ৬২
[৮৮) আব্দুর রশীদ আগওয়ান, ইসলামোফোবিয়া, রুজহানাত, আছরাত, তাদারুক, আকলেতু-কে হুবাক আওর ইসলামোফোবিয়া, ইফা পাবলিকেশনস, দিল্লী ২০১১, পৃষ্ঠা-৫১৭
[১০] সাইয়েদ মুহাম্মদ রাবে হাসানি নদভি, তামিরে হায়াত